মহামানবগণের আদর্শ নিজ হৃদয়ে ধারণ করাই ধর্ম

0
404

মুহাম্মদ জহিরুল আলম
সৃষ্টির শুরু থেকে মহান রাব্বুল আলামিন মানবজাতির মুক্তির জন্য অসংখ্য মহামানব প্রেরণ করে আসছেন। তাঁরা সমকালীন যুগের মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে প্রভুর সান্নিধ্য লাভের পদ্ধতি শিক্ষা দেন। যাঁরা এ শিক্ষা প্রদান করেছেন নবুয়তের যুগে মোর্শেদ হিসেবে তাঁদেরকে বলা হতো নবি-রাসুল। দয়াল রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ধরায় আগমনের মাধ্যমে নবুয়তের যুগের সমাপ্তি হয়েছে। হযরত রাসুল (সা.)-এর পর জগতে আর কোনো নবি-রাসুল আসবেন না। তারপর শুরু হয়েছে বেলায়েতের যুগ। এখন মানুষের মুক্তির কি বিধান, তা জানার জন্য বেলায়েতের যুগে যাঁরা মোর্শেদ হিসেবে আসবেন তাঁরাই অলী-আল্লাহ। যাঁদের উপর আসমানি কিতাব নাজিল হয়েছে তাঁদেরকে রাসুল এবং তাঁদের খলিফাদেরকে নবি বলা হয়েছে। বেলায়েতের যুগে, অলী-আল্লাহগণ নবি-রাসুলদের ধর্মের অনুকরণে মানুষকে আলোর পথ দেখাবেন। দয়াময় আল্লাহ তাঁদের সম্বোধন করে বলেন ‘অলী-আল্লাহ’, অলী-আল্লাহ মানে ‘আল্লাহর বন্ধু’। এ যুগটা বন্ধুত্বের যুগ। নবুয়তের যুগে অনেক নবি-রাসুল দয়াময় আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করেছিলেন, দয়াময়! আমি রাসুল না হয়ে, নবি না হয়ে, শেষ জামানার রাসুলের উম্মত যদি হতে পারতাম, আমার জন্য বুলন্দ নসিব হতো। অনেকের প্রার্থনা আল্লাহ কবুল করেছেন। যেমন, হযরত ঈসা (আ.), তিনি শেষ জামানায় রাসুলের উম্মত হয়ে জগতে তাশরিফ নিবেন। তিনি ইমাম মাহদী (আ.)-এর জামানায় এসে তাঁর হাতে হাত দিয়ে বায়েত হয়ে, ইমাম মাহদী (আ.)-এর শিক্ষা ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করবেন। এ বিষয়টি পবিত্র কুরআন ও রাসুলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সুফি সাধকগণের মতে, যুগে যুগে অসংখ্য হেদায়েতকারী মহামানবকে মহান আল্লাহ জগতে পাঠাবেন। এর মূল লক্ষ্য হলো- মানুষের মুক্তি ও কল্যাণ।
একথা সুস্পষ্ট মহামানবগণ মোর্শেদরূপে নবুয়তের যুগে নবি-রাসুল এবং বেলায়েতের যুগে অলী-আল্লাহ হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আমার সৃষ্টির মাঝে একটি সম্প্রদায় রয়েছে, যারা মানুষকে সৎ পথ দেখান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন।” (সূরা আরাফ ৭ : আয়াত ১৮১) মহান আল্লা আরো বলেন, “প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি হেদায়েতকারী পাঠাই।” (সূরা রাদ ১৩ : আয়াত ৭) আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে বিভিন্ন গোত্রে, বিভিন্ন বংশে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে দয়া করে নবি-রাসুল প্রেরণ করেছিলেন, তাঁদের স্ব স্ব গোত্রের মানুষকে হেদায়েত করার জন্য। একেক জন নবি একেকটা সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আমি রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত কোনো কওম বা জাতিকে শাস্তি দেই না।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭ : আয়াত ১৫) সৃষ্টির শুরু হতে কেয়ামত পর্যন্ত মহান আল্লাহ মানবজাতির মুক্তির জন্য মহামানব প্রেরণ করে মানুষকে মুক্তির পথে আহবান করেন, যুগে যুগে মহামানবগণের শিক্ষা ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করাই ছিল সমকালীন মানুষের ধর্ম। এর ভিন্নতা করে আমরা যা কিছুই করি না কেন, সবই ধর্মের নামে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। মহামানবকে ছেড়ে দিয়ে ধর্ম পালন মূল্যহীন।
ধর্ম বাংলা শব্দ, আরবিতে যাকে দ্বীন বলা হয়। যার মানে জীবন যাত্রার প্রণালী, আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান। বিবেকবান মানুষ স্বকীয় বিবেক বলে তা গ্রহণ করলে ঐ বিধান মানুষকে মুক্তির পথ প্রদর্শন করে। যে পদ্ধতিতে স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাই ধর্ম। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত করো। আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ করো, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই এটাই সরল ধর্ম।” (সূরা আর রুম ৩০ : আয়াত ৩০)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, “ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই, সোজা পথ তো ভ্রান্ত পথ থেকে আলাদা।” (সূরা আল বাকারাহ ২ : আয়াত ২৫৬) এখানে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন যে, আল্লাহর ধর্ম সহজ এবং স্পষ্ট। মহান সংস্কারক সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহবুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, “ধর্ম বলতে এমন একটা স্বর্গীয় সুন্দরতম আদর্শ বা চরিত্রকে বুঝায়, যা পালনের মাধ্যমে শান্তি লাভ হয়। সেই মতে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে বিরাজমান প্রকৃতিগত গভীর সম্পর্ককে ধর্ম বলে। আর্থাৎ স্রষ্টার নির্দেশিত পথে সৃষ্টি পরিচালিত হওয়াতে যে শান্তি, উহাই ধর্মের সার কথা”। হযরত আদম (আ.) হতে হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্যন্ত ১ লক্ষ ২৪ হাজার নবি-রাসুল এসেছেন। তাঁরা সকলেই মানুষের মাঝে সৃষ্টিকর্তার প্রেম সৃষ্টি করে প্রভুর সাথে যোগাযোগের পদ্ধতিই শিক্ষা দিয়েছেন। আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তবে দেখতে পাই, পৃথিবীর সকল ধর্মে সৎ কাজ, সদাচারের কথা বলা হয়েছে। সবার মৌলিক বিষয়ে মিল রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ ধর্ম সম্পর্কে তাঁর অভিমত ব্যাক্ত করেন এভাবে, ধর্ম হচ্ছে সেই ধারণা, যা পশুসুলভ মনোভাবকে মানবিক বোধে উন্নীত করে, প্রকৃত মানুষ তৈরী করে এবং মানুষকেই ভগবানরূপে প্রতিভাত করে। তিনি আরো বলেন, প্রতিটি আত্মাই স্বর্গীয়, কিন্তু তা সুপ্ত হয়ে আছে, উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই পবিত্র স্বর্গীয় ভাবকে প্রকাশ করা।
মহান আল্লাহ জগৎবাসীর নিকট তাঁর পরিচয় তুলে ধরার জন্য যুগে যুগে যত নবি-রাসুল প্রেরণ করেছিলেন, তাদের মতাদর্শই ছিল ইসলাম। যারা ঐ সকল মহামানবগণের শিক্ষা ও আদর্শ মেনে সে মোতাবেক জীবন পরিচালনা করেছেন, তারাই আল্লাহর খাঁটি বান্দা, আর যারা মহামানবগণের শিক্ষা ও আদর্শকে অস্বীকার করেছে তারাই কাফের বলে অভিশপ্ত হয়েছে। নবির আদর্শ মেনে নেওয়া সমকালীন যুগের মানুষের জন্য ফরজ ছিল। পূর্ববর্তী নবিগণ পরবর্তী নবির অগমন সম্পর্কে নিজ নিজ উম্মতদেরকে ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। সুতরাং পরবর্তী মহামানব বা নবিকে অমান্য করার অর্থ পূর্বের নবির নির্দেশ অস্বীকার করা। সকল নবি-রাসুল এক সূত্রে গাঁথা, তাঁদের একজনকে অস্বীকার করার অর্থ মহান আল্লাহ-কে অস্বীকার করা। মানুষ যখন পূর্ববর্তী কোনো নবির আদর্শ হারিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে, তখন নতুন নবি আবির্ভূত হয়ে প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসের ভুলত্রুটি সংশোধন করে পুনরায় মানুষকে মুক্তির সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন। মহামানবের অনুপস্থিতিতে ধর্মগ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছে। কাজেই দয়াময় আল্লাহ পুনরায় মহামানব প্রেরণ করেছেন। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, “কোনো নবির অনুসারী হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাঁর সঠিক আদর্শের অনুসারী হওয়া প্রয়োজন। মুসলমানের ঘরে জন্মগ্রহণ করেও আমরা যদি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সঠিক আদর্শের অনুসারী হতে না পারি, তাহলে আমরা মুক্তি পাব কিভাবে? এ জন্য নবির সঠিক আদর্শ ধারণকারী মহামানবগণের অনুসরণ করা, নবির অবর্তমানে সকল যুগের মানুষের মুক্তি লাভের পূর্বশর্ত।”
আল্লাহ প্রাপ্ত সাধকগণের মতে নবি ও রাসুলগণ নিয়ত, আমল, ইখলাস ও তাওহিদের দর্শনের ভিত্তিতে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “সকল নবি ও রাসুল পরস্পর একই বংশধর। আর আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।” (সূরা আলে ইমরান ৩ : আয়াত ৩৪) সকল নবি ও রাসুল ছিলেন, ‘নুরে মোহাম্মদী’ বা ‘সিরাজুমমুনীর’-এর ধারক ও বাহক। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ ‘নুরে মোহাম্মদী’কে ‘প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ’ বলেও সম্বোধন করেছেন। সকল নবি ও রাসুল ঐ একই সিরাজুমমুনীর বা প্রজ্জ্বলিত প্রদীপ হৃদয়ের মাঝে ধারণ করে সমকালীন যুগের মানুষকে আলোকিত করেছিলেন। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, “যেহেতু সকল নবি ও রাসুলের মাঝে ঐ একই নুরে মোহাম্মদী বা সীরাজুম মুনির অবস্থান করেছিল, সে জন্য সকল নবি ও রাসুল মুক্তার মালার ন্যায় একই সুতায় গাঁথা। আর এ জন্যই তাঁরা পরস্পর একই বংশধর এবং তাঁরা একই মালিকের পরিবারভুক্ত। নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে রাসুলের সীরাজুম মুনিরের ধারক ও বাহক মহামানবগণ অলী-আল্লাহ্, ইমাম, মোজাদ্দেদ বা সূফী সম্রাট হিসেবে পরিচিত হবেন। স্থান কাল পাত্র ভেদে এ নুরে মোহাম্মদী বিভিন্ন নামে জগতের বুকে পরিচয় লাভ করে থাকে। আর সকল নবি, রাসুল এবং অলী-আল্লাহগণ ঐ সীরাজুম মুনিরের অধিকারী হওয়ার কারণেই তাঁদের মারেফাত যেমনি এক এবং অভিন্ন, তেমনি তাঁরা পরস্পর একই বংশধর।” (তাফসিরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৯-৩৮০)। দয়াল রাসুল (সা.) ফরমান, “আমি আদম সন্তানদের প্রত্যেক যুগের উত্তম শ্রেণীতে যুগের পর যুগ প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর ঐ যুগে প্রেরিত হয়েছি, যে যুগে আমি বর্তমানে আছি।” (বোখারী শরিফ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৫০৩)। নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগেও নুরে মোহাম্মদী বা সিরাজুম মুনির রাসুলের বংশ হতেই আগমন করবেন। এ জন্যই আল্লাহর রাসুল (সা.) ফরমান, “হযরত হুসাইন (রা.) আমা হতে। আর আমি হযরত হুসাইন (রা.) হতে।” যুগশ্রেষ্ঠ এমন মহামানবকে মোর্শেদরূপে গ্রহণ করে তাঁর শিক্ষা ও আদর্শের অনুসরণ ব্যতীত মুক্তির কোনো পথ নেই।
সকল যুগে আল্লাহকে পেতে হলে সমকালীন যুগের মানুষকে মোর্শেদ তথা নবি-রাসুল ও অলী-আল্লাহর কাছে বায়াত গ্রহণ করতে হয়। এটিই আল্লাহকে পাওয়ার একমাত্র বিধান। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন, “হে রাসুল (সা.)! নিশ্চই যারা আপনার হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করেছে, তারা আল্লাহর হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করেছে। তাদের হাতের উপর আল্লাহর হাতই ছিল।” (সূরা ফাতাহ ৪৮ : আয়াত ১০)। হযরত রাসুল (সা.)-এর হাতে হাত দিয়ে বায়াত অর্থাৎ পূর্ণ আনুগত্যের শপথ করা। আরবি অবিধানে বায়াত শব্দের অর্থ – মুরিদ হওয়া, আত্মসমর্পণ করা, শপথ করা, আনুগত্য করা, নিজের অস্তিত্বকে বিক্রি করা, আনুগত্যের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া ইত্যাদি। সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী বলেন, “বায়াতের বিধান, সৃষ্টির আদি হতে অদ্যাবধি চলে আসছে এবং কিয়ামত অবধি চলতে থাকবে। আর এজন্যই প্রত্যেক যুগে মুক্তিকামী মানুষকে তার যুগের মোর্শেদ তথা নবি, রাসুল ও আওলিয়ায়ে কেরামের সান্নিধ্যে গিয়ে ইমানের নুর স্বীয় ক্বালবে ধারণ করে মুমিন হতে হয়। নচেৎ তার ইমানের দাবী আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না।” (তাফসীরে সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১২৫৯-১২৬০)।
আল্লাহকে পেতে হলে যিনি আল্লাহকে পেয়েছেন, এমন একজন মহামানবের সংস্পর্শে গিয়ে এলমে তাসাউফের শিক্ষা অর্জন করতে হয়। শুধু কিতাব পড়ে আল্লাহ সম্বন্ধে জানা যায়, কিন্তু আল্লাহকে পাওয়া যায় না। হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “আমি মানবজাতির শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।” পৃথিবীতে শিক্ষা গ্রহণ করতে হলে শিক্ষকের সাহায্যের প্রয়োজন, শিক্ষক বিহনে শিক্ষা লাভ অসম্ভব। এ কারণেই মহান আল্লাহ, পথহারা মানুষকে মুক্তির পথ নির্দেশনা প্রদানের জন্য শিক্ষকরূপে নবি-রাসুল ও অলী-আল্লাহ প্রেরণ করেছেন। তাই বিশিষ্ট ইসলামি গবেষক ও লেখক ইমাম ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.) বলেন, “মহামানবগণের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ নিজ হৃদয়ে ধারণ করার নামই ধর্ম। তাঁদের অনুসরণই সত্যিকার ধর্ম।” (মোর্শেদের দরবারে মুরীদের করণীয়, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৮৫)। মহামানবগণের সংস্পর্শে গিয়ে তাঁদের শিক্ষা, আদর্শ ও চরিত্র নিজ জীবনের চলার পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করলেই দয়াময় আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও দয়া লাভ কার সম্ভব।
বর্তমান সমাজে একশ্রেণীর নামধারী মুসলমান অলী-আল্লাহগণকে অস্বীকার করে এবং বলে বেড়ায়, মোর্শেদের প্রয়োজনীয়তা নেই। কেবলমাত্র ব্যাক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা এ কথা বলে থাকে। অত্যন্ত কৌশল অবলম্বন করে দয়াল রাসুল (সা.)-এর বাণী বিকৃত করে বলে আমাদের জন্য কুরআন ও সুন্নাহই যথেষ্ট। সাধারণ মানুষ খুব সহজেই তা সরল মনে গ্রহণ করে। অথচ বিদায় হজের খুৎবা দিয়ে বিশ্বনবি হযরত রাসুল (সা.) বলেছেন, “হে লোক সকল! আমি তোমাদের নিকট ঐ বস্তু রেখে যাচ্ছি, যা আঁকড়ে ধরলে তোমরা পথভ্রষ্ট (ধ্বংস) হবে না। আর তা হলো আল্লাহর কিতাব এবং আমার আহলে বাইত।” (মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা ৫৬৯)। বক্ষমান প্রবন্ধে আমরা লক্ষ্য করেছি। দয়াময় আল্লাহ তাঁর পরিচয় প্রকাশের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য মহামানব প্রেরণ করেছেন, সমকালীন যুগে তাঁদের বিধান মানাই ছিল ধর্ম। মহামানবগণই সবাক কুরআন। এ প্রসঙ্গে হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু বলেন, “আমিই সরব আল্লাহর কিতাব।” অর্থাৎ – আমি আল্লাহর কিতাবের প্রকৃত রহস্য বর্ণনাকারী। (তাফসীরে জিলানী, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪)। হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আরো বলেন, “ইহা নির্বাক কুরআন আর আমি সবাক কুরআন।” (এজিদের চক্রান্তে মোহাম্মদী ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৬৮ এবং সূফীবাদের আত্মপরিচয় ও ক্রমবিকাশের অন্তরায়, পৃষ্ঠা ১৩৪)। মহান আল্লাহ, অলী-আল্লাহগণকে সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “সাবধান! আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয়ভীতি নেই এবং তাঁরা কোনোরূপ দুঃখিতও হবেন না।”(সূরা ইউনুস ১০ : আয়াত ৬২)। হাদিস শরীফে এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, “সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহর অলীগণ অমর।” হাদিস শরীফে আরো বর্ণিত হয়েছে, “মুমেন ব্যাক্তি কাবাঘরের চেয়ে অধিক সম্মানিত।” (ইবনে মাজাহ শরীফ)। জগৎ বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত জালাল উদ্দিন রুমী (রহ.) বলেন, “সমস্ত আসমান ও জমিনের কোথাও আল্লাহর সংকুলান হয় না, একমাত্র মুমেন ব্যাক্তির হৃদয়েই তাঁর সংকুলান হয়ে থাকে।” যিনি আল্লাহকে পেয়েছেন এমন একজন মহামানবই কেবল পারেন অন্য একজনকে আল্লাহর সন্ধান দিতে। নিজে নিজে হাজারো চেষ্টা করে কাজ হবে না। প্রত্যেক বিদ্যা শিক্ষা করার প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আল্লাহকে পেতে হলে- যে প্রতিষ্ঠানে আল্লাহকে পাওয়ার বিদ্যা শিক্ষা দেওয়া হয় এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যেতেই হবে। কাজেই একজন মহামানবের তত্ত্বাবধানে, তাঁকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করে, তাঁর সোহবতে গিয়ে পরিশুদ্ধ চরিত্রের অধিকারী হয়ে, তাঁর নির্দেশিত পথে সাধনা করলেই সাধক মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে সক্ষম হবেন। যুগের ইমাম সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান আল্লাহ প্রাপ্তির পথে ৩৭টি ক্লাসের শিক্ষা দেন, প্রতিটি ক্লাসের বর্ণনা পবিত্র কুরআনে রয়েছে। তিনি আত্মশুদ্ধি, দিল জিন্দা, নামাজে হুজুরি ও আশেকে রাসুল হওয়ার যে শিক্ষা দেন, তা কুরআন সম্মত ও দয়াল রাসুল (সা.)-এর শিক্ষার অনুরূপ। পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়, কিন্তু ইমান নিয়ে কবরে যাওয়া যায় না। ইমান নিয়ে কবরে যেতে হলে অলী-আল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে ক্বালবে আল্লাহর জিকির জারি করে দয়াময় আল্লাহকে নিজ হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে পাওয়ার জন্য অসিলা অন্বেষণ করো।” (সূরা মায়েদা ৫ : আয়াত ৩৫)। এখানে অসিলা হলেন বর্তমান যুগে আল্লাহর মনোনীত মহামানব তথা অলী-আল্লাহ। ইসলামের প্রতিটি বিধান মূলত মহামানবগণের অনুকরণ ও অনুসরণ।
হজ এবং কোরবানি মুসলমানগণের পবিত্র বিধান। এর ভিত্তি আল্লাহর মনোনীত মহামানবগণের স্মৃতিকে স¥রণ ও অনুসরণ করা। বিবি হাজেরা (আ.) ও শিশু হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর অনুসরণে হাজিগণ, হজের আহকাম হিসেবে সাফা মারওয়া পর্বত ছায়ী করেন; মিনায় কোরবানি, শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য প্রকাশ করা হয়; বায়তুল্লাহ শরীফে রক্ষিত ‘হাজরে আসোয়াদ’ পাথরে চুমু খাওয়া সবইতো মহামানবগণের অনুসরণ। মহান আল্লাহ মুসলমানদের কেবলার স্থান নির্ধারণ করেছেন ইব্রাহীম (আ.)-এর কদম মোবারকের স্থান মাকামে ইব্রাহীমকে। অর্থাৎ ধর্মের মূল শিক্ষাই হলো মহামানবগণকে হৃদয়ে ধারণ।
মানব সভ্যতা আজ করোনা মহামারিতে বিপর্যস্ত। আমরা প্রভুকে স্মরণ করছি ঠিকই, কিন্তু প্রভুর মনোনীত মহামানবকে উপেক্ষা ও অবজ্ঞা করে যাচ্ছি। কোনো যুগেই মহামানবের সুপারিশ ছাড়া মানুষ আল্লাহ্র দয়া পায়নি। দয়া পেতে হলে দয়াময় আল্লাহর মনোনীত মহামানবের মাধ্যমেই পেতে হবে, এটি আল্লাহর বিধান। আমরা কখনও অবচেতন, কখনও সচেতন ভাবেই, সমাজে প্রচলিত ধর্ম কর্মের মাধ্যমে মহামানব হতে দূরে সড়ে পড়েছি। আত্মকেন্দ্রিকতা ও অর্থনৈতিক বিষয়াবলীতেই শুধু নিজেকে আবদ্ধ করার কারণে আমরা দিন দিন নিজের ভেতরের মানুষটিকে অবহেলা করে যাচ্ছি। যদি কোনো দিন কোনো মহামানবে সংস্পর্শ পায়, দেখা যায় ভেতরের সেই মানুষটি পরম আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠে, হৃদয় মন প্রভুর আলোয় আলোকিত হয়। এক জীবনে একবার কি সে চেষ্টা করে দেখা যায় না? মহামানবের সান্নিধ্যে হৃদয় যখন পরম প্রশান্তি লাভ করে, তখন সেই বুঝে নেয় আমার গন্তব্য কোথায়?
মহামানবের দয়া ছাড়া আত্মার মুক্তি অসম্ভব। হানাফি মাযহাবের ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, “আমি (নুমান) যদি দুই বছর আমার মোর্শেদ ইমাম বাকের (রহ.)-এর গোলামি না করতাম, তাহলে আমি ধ্বংস হয়ে যেতাম।” আমাদের মাযহাবের ইমামের অভিমত যদি এমন হয়, তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায়? তাঁর বক্তব্য আমাদের স্পষ্ট করে দেয়, শুধু যুগশ্রেষ্ঠ মহামানবের শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করলেই হবে না বরং গোলামির মাধ্যমে নিজের ভেতরের আমিত্ব ও অহংকার দূর করে তাঁর দয়ার নজর লাভ করতে হবে। বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব, সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান। তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ গ্রহণ করে দেশ ও বিদেশের অসংখ্য মানুষ আশেকে রাসুল হয়ে ইসলামের শান্তি বাস্তব জীবনে উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছেন। হাজার বছর ধরে ধর্মের নামে পুঞ্জিভূত কুসংস্কার দূর করে, ধর্মের প্রকৃত রূপ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, “ইসলাম একটি চরিত্রের নাম, যার চরিত্র নেই তার কোনো ধর্মও নেই”। তিনিই মোহাম্মদী ইসলামের মোর্শেদ। মহান অল্লাহর দরবারে প্রার্থনা, তাঁর প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্যে গিয়ে যুগশ্রেষ্ঠ এ মহামানবের শিক্ষা ও আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে তাঁর গোলামি করার সুযোগ যেন দেন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here