মহামারি কীভাবে শেষ হয়

0
376

আরফাতুন নাবিলা
মহামারি মানে বহু মানুষের মৃত্যু আর জীবিতদের বেঁচে থাকার প্রাণান্ত চেষ্টা। দিনের পর দিন মহামারির ভয়ে বেঁচে থাকতে থাকতে একসময় এর সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে ওঠে মানুষ। শেষ হয়ে আসে মহামারির প্রকোপ। কিন্তু কীভাবে শেষ হয় মহামারি? বর্তমান বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-ই-বা কবে নাগাদ শেষ হতে পারে? বিবিসি অবলম্বনে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

মহামারির সমাপ্তি
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ প্রযুক্তি সব মিলিয়ে আধুনিক যুগে অনেক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও কয়েক মাস ধরে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর সংক্রমণে থমকে আছে বিশ্ব। সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে শোচনীয়ভাবে। অর্থনীতির দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকা দেশগুলো তো বটেই, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোও এ মুহূর্তে করণীয় নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না। কেউ জানে না, কবে নাগাদ শেষ হবে করোনার প্রকোপ। কীভাবে মানুষ মুক্তি পাবে এই মহামারি থেকে। নিরন্তর গবেষণা চলছে। ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ সবাই অতীত পর্যালোচনা করে বর্তমানে কীভাবে মুক্তির পথ পাওয়া যায়, সেই উপায় খুঁজছেন। ইতিহাসবিদদের মতে, মহামারি দুভাবে শেষ হতে পারে। এক. চিকিৎসাগতভাবে। চিকিৎসার মাধ্যমে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার ধীরে ধীরে কমলে। দুই. সামাজিকভাবে। যখন মহামারি সম্পর্কে ভীতি কমে আসে। কিন্তু মানুষ কোনোভাবে মহামারিটির সমাপ্তি দেখতে চায়? এ নিয়ে আমেরিকার জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন এবং ওষুধের ইতিহাস বিষয়ের শিক্ষক ডক্টর জেরেমি গ্রিন বলেন, ‘মানুষ যখন জিজ্ঞেস করে কবে নাগাদ মহামারি শেষ হবে, তখন আসলে তারা সামাজিকভাবে সেটি শেষ হওয়ার কথা জানতে চায়।’ সহজ ভাষায়, একটা রোগ একদম নিশ্চিহ্ন হলে তবেই এর প্রকোপ বন্ধ হয় এমন নয়। বরং মানুষ একসময় এই ভীতিকর অবস্থার সঙ্গে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং রোগের সঙ্গে বেঁচে থাকতে শিখে যায়। ঠিক এমন কিছুই হতে যাচ্ছে কোভিড-১৯-এর বেলায়। হার্ভার্ড ইতিহাসবিদ অ্যালান ব্রান্ড বলেন, ‘অর্থনীতি অনেক দিন ধরেই স্তিমিত হয়ে আছে। সব খাতেই এর গুরুতর প্রভাব পড়েছে। তবু যখন এই অর্থনীতির চাকা সচল করার কথা বলা হলে প্রচুর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মেডিকেল ও স্বাস্থ্য খাত থেকে মহামারি শেষ হয়ে গেছে এমন ঘোষণা আসার আগেই অর্থনীতিকে সচল করার চাপ বাড়ছে। সামাজিক উদ্বেগ বাড়ছে। রাজনৈতিকভাবেও চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তবু কিছু হয়তো করার নেই। অতীতেও এমন ঘটেছিল। ধীরে ধীরে সব নতুন করে শুরু হবে।’ ইংল্যান্ডের এক্সটার ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ডোরা ভার্গা বলেন, ‘এই পরিস্থিতির শেষটা খুব এলোমেলো, অগোছালো। অতীতের কথা যদি বলতেই হয়, তবে সে গল্পেও আশানুরূপ কিছু ছিল না। বরাবরই দুর্বল পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন বর্ণনায়। সঠিক করে কে বলতে পারে মহামারিটি কখন শেষ হবে? এবারও হয়তো এমন এলোমেলো আরও একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে সবাইকে।’

যে পথ ভয়ের…
মহামারিতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তা করি। আসলে দুশ্চিন্তাটা কাকে নিয়ে? অসুস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে নাকি নিজে আক্রান্ত হওয়ার ভয়? মহামারিতে অসুস্থ না হয়েও এতে সংক্রমিত হওয়ার ভয় যে কাউকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছিলেন ডাবলিনের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনের চিকিৎসক সুসান মুরে। ২০১৪ সালে তিনি যখন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে একটি স্থানীয় হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন, তখন তার নজরে আসে এ বিষয়টি। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় ইবোলায় প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ভয়াবহ সে রোগটি দ্রুত মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছিল, সংক্রমিত করছিল, মৃত্যুহার বাড়ছিল। যদিও সেই প্রাদুর্ভাব ধীরে ধীরে কমে এসেছে এবং আয়ারল্যান্ডে কেউ এতে সংক্রমিত হয়েছে এমন কোনো খবরও ছিল না, তবু সেখানে মানুষ আতঙ্কিত হয়েই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তায়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চারপাশে ছিল শুধু আতঙ্কিত মানুষ। ডাবলিনের হাসপাতালগুলোকে যেকোনো খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তুতির চেয়ে তাদের মধ্যে ভয় ছিল বেশি। ইবোলার চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ না থাকায় দুশ্চিন্তা বেড়েই চলছিল। ইবোলা আক্রান্ত দেশ থেকে যখন একজন তরুণ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে এলো, তখন তার কাছে কেউ যায়নি। নার্সরা লুকিয়ে পড়ে, চিকিৎসকরা হাসপাতাল থেকে চলে যায়। মুরে একা সেই ছেলেটির চিকিৎসা করেছিলেন। পরীক্ষা করার পর জানা যায়, ছেলেটি আসলে ইবোলায় আক্রান্ত ছিল না। ক্যানসারের শেষপর্যায় চলছিল তার। তাকে বিশ্রামে থাকতে বলা হয়। ছেলেটি যখন হাসপাতালে আসার এক ঘণ্টা পর সে মারা যায়। এ ঘটনার তিন দিন পর, ইবোলা মহামারি শেষ হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মুরে বলেন, ‘আমরা যদি ভয় এবং অজ্ঞতার সঙ্গে সহজ স্বাভাবিকভাবে লড়াই করতে না পারি, তাহলে যেকোনো ভাইরাসই দ্রুত মানুষকে ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে। এমনকি যেখানে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবই শুরু হয়নি, সেখানেও শুধু ভয়ের কারণে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। জাতি, নাগরিকদের সুবিধা এবং ভাষার ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে যে কোনো মহামারি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য মানুষের ভেতর ভয় তৈরি করতে সক্ষম। আর এসব কারণে পরিস্থিতিও নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।’ মুরে সম্প্রতি দ্য নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে লিখেছিলেন, ‘বাসে বা ট্রেনে করে যদি আপনি কোথাও যান এবং আপনার গায়ের রং যদি অন্যদের থেকে আলাদা হয়, তবে দেখবেন পরিবহনের সবাই আপনার দিকে খুব বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ঠিক এমনভাবে বর্তমানে যদি কারও সামনে আপনি ভুলেও একটু হাঁচি বা কাশি দিয়ে ফেলেন, তাহলেও দেখবেন সবাই আপনার থেকে দূরে সরে গেছে। ভয় বা আতঙ্ক আসলে এমনই।’

ব্ল্যাক ডেথের অন্ধকার স্মৃতি
গত দুই হাজার বছরের মধ্যে বুবোনিক প্লেগ বিভিন্ন সময় সংক্রমণ করেছে। এই রোগে মৃত্যু হয়েছে অসংখ্য মানুষের। ইতিহাসের অন্যতম একটি কালো অধ্যায় হিসেবে পরিচিত এই বুবোনিক প্লেগ। প্রতিটি মহামারি পরের প্রাদুর্ভাবের সময় ভয় বাড়িয়ে দেয়। প্লেগ রোগের জন্য দায়ী জীবাণুটির জন্য Yersinia pestis  নামের ব্যাকটেরিয়া দায়ী। মাছি ও উকুনের মাধ্যমে এটি মানুষের শরীরে পৌঁছায়। সংক্রমিত মাছি মানুষকে কামড় দিলে ব্যাকটেরিয়া মানুষের রক্তে এসে শরীরের লিম্ফ নোডে জমা হতে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের শরীরের লিম্ফ নোডগুলো দৃশ্যমান থাকে না। কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়ার কারণে লিম্ফ নোডগুলো ফুলতে থাকে, যে অবস্থাকে বলা হয় ‘বুবোস’। এ কারণে এই প্লেগকে বুবোনিক প্লেগ বলা হয়। আগে কিছু তথ্যে ইঁদুরকে এই জীবাণু বহন করার জন্য দায়ী করা হতো।

প্লেগ শুধু একবার এসে শেষ হয়ে গেছে তা না। বিভিন্ন সময় মানুষ সংক্রমিত হয়েছে ভয়াবহ এ রোগে। ইতিহাসবিদরা প্লেগের তিনটি সময়ের কথা বলেছেন। জন্স হপকিন্সের ইতিহাসবিদ ম্যারি ফিসেল বলেন, ‘প্লেগের তিন সময় হলো ষষ্ঠ শতাব্দীতে কন্সট্যান্টিনোপলে দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান, ১৪ শতকে মধ্যযুগীয় মহামারি, ১৯ শতকের শেষের দিকে এবং ২০ শতকের বৈশ্বিক মহামারি।’ মধ্যযুগীয় মহামারি চীনে শুরু হয় ১৩৩১ সালে। চীনে তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। এই রোগে সে সময় চীনের জনসংখ্যার অর্ধেক মারা যায়। সম্ভবত এটি ইসিক-কুল হ্রদে যাওয়ার আগে চীনকে সংক্রমিত করেছিল অথবা এটি ছিল শুধু চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ। চীন থেকে বাণিজ্যিক পথে রোগটি ভারত, ইউরোপ, নর্থ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলে আসে। ১৩৪৭ থেকে ১৩৫১ সালের মধ্যে এই রোগে ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। সিয়েনা, ইতালিরও অর্ধেক মানুষের মৃত্যু হয় এই মহামারিতে। ১৪ শতকের মহামারি নিয়ে কাহিনীকার আগনোলো ডি তুরা বলেছেন, ‘মানুষের পক্ষে সে সময়ের ভয়াবহতার বর্ণনা করা অসম্ভব। যারা সেই ভয়াবহতা দেখেনি তারা সত্যিই ভাগ্যবান। এই রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ কথা বলতে বলতেই মারা যেত। মৃতদের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে জায়গায় জায়গায় গর্ত খুঁড়ে, লাশের স্তূপ করে মাটি চাপা দেওয়া হতো।’ এই মহামারিও শেষ হয়েছিল। কিন্তু প্লেগ আবার ফিরে এসেছে। ১৮৫৫ সালে চীনে আবার প্লেগের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। সেটিও ছড়িয়ে যায় বিশ্বব্যাপী। সে সময় শুধু ভারতেই মারা গিয়েছিল ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্লেগ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বোম্বের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাদের আশপাশের সব প্রতিবেশীকে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তবে এতে আসলে কতটা উপকার হয়েছিল সেটা এখনো অজানা।

‘এই বুবোনিক প্লেগ কীভাবে শেষ হয়েছিল, সেটা অবশ্য এখনো নিশ্চিত করে জানা যায় না। কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি, ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় রোগের জীবাণু বহন করা যেত না বলে রোগ আর ছড়ায়নি। কিন্তু এটা যুক্তিযুক্ত কোনো উত্তর নয়’ বলে জানান ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ফ্র্যাংক স্নোডেন। হতে পারে, এটা ইঁদুরের ভেতরের কোনো পরিবর্তনের কারণে সম্ভব হয়েছে। ১৯ শতকের দিকে কালো ইঁদুর ছাড়া বাদামি ইঁদুরের মাধ্যমেও প্লেগ ছড়াত। অনেকে বলেন, হয়তো রোগের ব্যাকটেরিয়ার কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসছিল। অথবা রোগের প্রকোপ বন্ধ করতে মানুষ বিভিন্ন গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো যে কাজগুলো করেছিল, তাতেও এটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ঠিক কী কারণে মহামারি হুট করেই প্রকোপ ছড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিল, তা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কিছু না বলা গেলেও এখন এ রোগের অ্যান্টিবায়োটিকস তৈরি হওয়ায় ভয়ের কিছু নেই।

স্মলপক্স
স্মলপক্সের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা ছিল অন্যতম সাফল্য। তবে অন্য রোগের চেয়ে এই রোগটি আলাদা ছিল কিছু কারণে। যেমন ১. সারা জীবনের জন্য এর ভ্যাকসিন কার্যকর, ২. এ রোগের ভাইরাস ভ্যারিওলা মেজরের বাহক কোনো প্রাণী নয়, তাই একবার সেরে উঠলে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, ৩. রোগটি একদম সুস্পষ্ট, কোয়ারেন্টাইনে থেকে সুস্থ হওয়া যায়। কিন্তু এর প্রাদুর্ভাব যখন শুরু হয়েছিল, সে সময়টি ভয়াবহ ছিল। একের পর এক মহামারিতে বিশ্ব এমনিতেই বিপর্যস্ত ছিল। এ রোগে শুরুতে জ্বর হয়, এরপর শরীরে ছোট ছোট ফুসকুড়ি ওঠে, সেগুলো ফেটে গিয়ে শুকিয়ে গিয়ে পড়ে যায়, শরীরে অসংখ্য দাগ রেখে যায়। স্মলপক্সে ১০ জনের ভেতর তিনজনই মারা যেত। ১৬৩৩ সালে আমেরিকানদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ শুরু হয়েছিল। এর আগেও ষষ্ঠ, সপ্তম, একাদশ, পঞ্চদশ শতকেও এ রোগের প্রকোপ ছিল। ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনার নামে একজন ইংরেজ চিকিৎসক স্মলপক্সের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন। ১৯৭৭ সালে সোমালিয়ায় আলি মাও মালিন নামে একজন হাসপাতালের কর্মী স্মলপক্সে সর্বশেষ আক্রান্ত হন। তিনি সেরেও উঠেছিলেন। ২০১৩ সালে ম্যালেরিয়ায় তার মৃত্যু হয়।

ইনফ্লুয়েঞ্জার ভয়াবহতা
১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জার ভয়াবহতা আজ আমাদের নতুন করে কোয়ারেন্টাইন এবং সামাজিক দূরত্বের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, এই ফ্লু কেড়ে নিয়েছিল ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষের জীবন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তরুণ-মধ্যবয়সী সবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এ ফ্লু। অসংখ্য সন্তানকে করেছে অনাথ, অসহায় করে তুলেছিল মানবজীবন। ১৯১৮ সালের শরৎকালে বোস্টনের কাছে ডেভেন ক্যাম্পে নিয়োজিত ছিলেন চিকিৎসক উইলিয়াম ভগান। তিনি দেখতে পান তার দেশের ইউনিফর্ম পরা অন্তত একশ তরুণ দল বেঁধে অথবা একাই হাসপাতালে যাচ্ছে। মুহূর্তেই ওয়ার্ডের বিছানাগুলো রোগী দিয়ে ভরে যাচ্ছে। চেহারা নীল হয়ে জ্বর আসছে, প্রচণ্ড কাশির সঙ্গে রক্ত আসছে। পরদিন সকালেই জমিয়ে রাখা কাঠের মতো মর্গে লাশের সংখ্যা বাড়তে লাগল। পুরো বিশ্বকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে ভাইরাসটির প্রকোপ শেষ হয়ে যায় একদম হুট করেই। ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্নোডেন বলেন, ‘রোগটি কেমন যেন আগুনের মতো ছিল। জ্বলার জন্য পর্যাপ্ত কাঠ যত দিন ছিল, জ্বলেছে। এরপর কাঠও শেষ, আগুনও নিভে গেছে।’ সামাজিকভাবেই এটি শেষ হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে মানুষ নতুন করে নতুনভাবে বাঁচার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যুদ্ধ ও ভয়াবহ রোগটি সম্পর্কে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিল লোকে। খুব দ্রুতই, ১৯১৮ সালের ফ্লুয়ের কথা মানুষ ভুলে যায় তখন।

কভিড-১৯ কীভাবে শেষ হবে
মহামারির ভয়াবহতা আমরা সবাই জানি। বর্তমানের কোভিড-১৯ও অসংখ্য মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কীভাবে শেষ হবে কোভিড-১৯? এই রোগটিও কি আগের দেখানো পথে চলবে? ইতিহাসবিদদের মতে, চিকিৎসাগতভাবে এই রোগ শেষ হওয়ার আগে সামাজিকভাবেই শেষ হয়ে যাবে। ভ্যাকসিন অথবা কার্যকর ওষুধ আবিষ্কার হওয়ার আগেই মহামারি নিয়ে নানা বিধিনিষেধেই বিরক্ত হয়ে উঠবে মানুষ। ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ নাওমি রজার্স বলেন, ‘আমার মনে হয় অবসাদ আর প্রতিবন্ধকতা থেকেই সামাজিকভাবে এই রোগ প্রতিরোধের চেষ্টা শুরু হয়ে যাবে। আমরা হয়তো এ মুহূর্তে এমন অবস্থায় আছি, যেখানে সবাই এখন থেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চায়।’ কথাটি অবশ্য ভুল নয়। বেশ কিছু জায়গায় সরকার প্রধানরা লকডাউন উঠিয়ে নিচ্ছেন, সেলুন, জিম, রেস্টুরেন্ট খুলে যাচ্ছে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে না। অর্থনীতি যত ধসে পড়তে থাকবে, তত মানুষ বিরক্ত হয়ে কাজে ফিরতে চাইবে। রজার্সের মতে, এখন এ বিষয় নিয়ে বিতর্ক শুরু হবে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলবেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের চেষ্টায় এ রোগ থেকে মানুষ সেরে উঠছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলবে সামাজিকভাবেই বন্ধ হয়েছে। অতীতেও ঠিক কাউকে নির্দিষ্ট করে রোগ সারানোর কৃতিত্ব দেওয়া যায়নি। এবারও ঠিক এমনই হবে। কোভিড-১৯ নিয়ে এখনো জয় আসেনি। এটাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই মহামারি শেষ হতে আরও লম্বা এবং কঠিন সময় পাড়ি দিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here