মহামারি যেভাবে দুনিয়ায় বৈষম্য বাড়াচ্ছে

0
141

করোনা ভাইরাসের আগেই উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশে অসমতা বেড়ে চলছিল। কিন্তু অস্তিত্বমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে আরো বেগবান করেছে এই মহামারি। তেমনই পাঁচটি বৈষম্যের ওপর এখানে আলোকপাত করা হলো।
উপার্জন ও চাকরি হারানো
নভেল করোনা ভাইরাস মহামারি শ্রমিকদের মাঝে বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিয়েছে। লকডাউনের নীতিতে হেঁটে সরকারগুলোর মহামারির বিস্তৃতি রোধের যে প্রচেষ্টা, তা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোর দরিদ্র শ্রমিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
এসব শ্রমিক যারা কিনা বেঁচে থাকার জন্য নির্ভর করে দৈনিক কাজের ভিত্তিতে পাওয়া মজুরির ওপর, লকডাউনের সময়ে নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে যেতে না পেরে অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। তাদের অর্থনৈতিক কোনো সুরক্ষাও নেই, ফলে সেই মানুষগুলোর এখন ভবিষ্যতের জীবনধারণও উচ্চমাত্রায় হুমকির মুখে পড়েছে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রি করা একজন ফেরিওয়ালার কথাই ধরা যাক। মহামারির আঘাত এবং তার প্রতিক্রিয়ায় সরকারের ঘরে থাকার যে নির্দেশ তা রাস্তার সেই সবজি বিক্রেতার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করেছে। কর্মহীন হয়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে ব্যক্তি। বিপরীতে অন্যান্য পেশাদার লোকজন যারা কিনা এ সময়ে ঘরে থেকে কাজ করতে পেরেছে তার আয়ে বেশ সীমিত প্রভাব পড়েছে।
উন্নয়নশীল বিশ্বের বেশির ভাগ শ্রমিকের কাজ হচ্ছে অস্থায়ী। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর শ্রমিকরা যে ধরনের সহায়তা পায়, তারা এর কিছুই পায় না। যেমন অনেক দেশে বেকার ভাতাও প্রদান করা হয়। যা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলোতে ভাবা যায় না। আবার অনেক উন্নয়নশীল দেশে মহামারির প্রতিক্রিয়াস্বরূপ নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু তা মোটেই যথেষ্ট ছিল না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেসব সুরক্ষা ব্যবস্থা বেশির ভাগ দরিদ্র লোকের কাছে পৌঁছাতেও পারেনি।
ডিজিটাল বৈষম্য
এই মহামারি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের গতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কোনো কোনো ব্যবসাকে ডিজিটালি খোলা রাখার ব্যাপারে সহায়তা করেছে এবং সে সঙ্গে প্রচুর মানুষকে বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যা অতীতে সম্ভব ছিল না। অনেক দেশের নাগরিকরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবারিত সুযোগ পেয়েছে এবং পাশাপাশি তারা অনলাইন প্রযুক্তি থেকে সুবিধা নেওয়ার মতো যথেষ্ট শিক্ষিতও বটে। এক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ানের কথা বলা যায়। অন্যদিকে অনেকগুলো দেশ যারা কিনা ডিজিটাল রেসে অনেকটাই পিছিয়ে আছে, বিশেষ করে আফ্রিকার অনেকগুলো দেশ, তারা এ ক্ষেত্রটি থেকে তেমন কোনো সুবিধাই আদায় করতে পারেনি।
প্রশস্ত হয়েছে লিঙ্গ ব্যবধান
যখন লকডাউনের এ সময়ে পুরুষ ও নারী উভয়কেই ঘরে থাকতে হচ্ছিল, তখনো নারীদেরই দেখা যাচ্ছে সন্তান সামলানো এবং ঘরের কাজের দায়িত্ব নিতে, যা কিনা ঘরোয়া কাজের ক্ষেত্রে একটি বৈষম্যমূলক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাপী নারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রিটেইল ও আতিথেয়তা সেক্টরে কাজ করে। সেসব ক্ষেত্রে দূর থেকে কাজ করা বেশ কঠিন। সে সঙ্গে লকডাউন প্রভাবিত কাজ হারানোর তালিকায়ও এগিয়ে আছে সেক্টরগুলো। যা নারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়া স্কুল ও ডে নার্সারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক নারী বেকারত্বের দিকে ধাবিত হয়েছে। অর্থনৈতিক উদ্বেগের এ সময়ে মেয়েদেরই সবার আগে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে কর্মজীবী মায়েদের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে অনেক স্কুল মহামারির কারণে এ সময়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সবকিছু ঠিক হওয়ার পর মেয়েদের বড় একটি অংশের স্কুলে ফিরে না আসার ঝুঁকি রয়েছে। যা সামগ্রিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সুরক্ষাবাদের কড়াকড়ি
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার স্তর যখন দুর্বল অবস্থায় আছে তখনই করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে আঘাত হেনেছে। এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্য লড়াই। এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনেক বক্তব্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিচে নামিয়ে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো প্রধান প্রধান বাণিজ্য ব্লক থেকে বেরিয়ে আসার ফলে জাতীয়তাবাদী অর্থনীতি আরো বেগবান হয়েছে। মহামারি সামনের দিনগুলোতে এ উদ্বেগকে আরো বাড়িয়ে দেবে। উন্নত দেশগুলোর বৃহৎ সুরক্ষাবাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের ধনী বাজারে যাওয়ার রাস্তাকে বন্ধ করে দিচ্ছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য থেকে তাদের অর্জনকেও সীমিত করে দিচ্ছে।
পূর্ব এশিয়া এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে চীনের আয় বৃদ্ধির অন্যতম চালক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বায়ন। কিন্তু সুরক্ষাবাদ মহামারি-পরবর্তী বিশ্বের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার আয়ের বিস্তৃত বৈষম্য হ্রাস করার ক্ষমতাকে সীমায়িত করবে।
ভ্যাকসিনে প্রবেশাধিকার
বর্তমান অনেকগুলো কোম্পানি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী আশার সঞ্চার করেছে। সেগুলো আবিষ্কার হওয়ার পর তার প্রাপ্তি নির্ধারণ করবে মহামারি থেকে কত দ্রুত সেরে ওঠা যাবে সেটি। সমৃদ্ধ ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে এটি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকবে, যা বৈষম্যকে আরো বেশি তীব্র করে তুলবে। ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদ নিয়ে এরই মধ্যে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যেখানে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধনী দেশের নাগরিকরা ভ্যাকসিন পাবে, যারা গবেষণায় কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে।
আমরা এরই মধ্যে সামনের সারিতে নেতৃত্ব দেয়া স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাপক লড়াই প্রত্যক্ষ করেছি। নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে ব্যাপক খরচ বহন করতে হয়েছে।
এখন মহামারির প্রভাব সামনের বছরগুলোতে কতটা অনুভূত হবে তা নির্ভর করছে উন্নয়নশীল দেশের সরকারগুলো সম্মিলিতভাবে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে তার ওপর। তাদের গরিব শ্রমিকদের বড় পরিসরে আয়ের সুযোগ করে দিতে হবে এবং তাদের শ্রমিকদের ডিজিটালি কাজ করার জন্য গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণ দেয়ার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তার ওপর এটা অনেকাংশে নির্ভর করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here