মহিয়সী নারী সৈয়দা হামিদা বেগম (রহ.)

3
377

তাকী মোহাম্মদ জোবায়ের
মোহাম্মদী ইসলামের আকাশে জ্বলজ্বলে নক্ষত্র হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম (রহ.)। মোহাম্মদী ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় তাঁর অপরিসীম ত্যাগ তাঁকে মোহাম্মদী ইসলামের ইতিহাসে অতি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি ছিলেন বর্তমান জামানার মোজাদ্দেদ সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের সহধর্মিণী। হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম (রহ.) গভীর সাধনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতে অতি উচ্চ আসন লাভ করায় মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসুল (সা.)-এর নির্দেশে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান তাঁকে কুতুবুল আকতাব বা দেশরক্ষক অলী-আল্লাহ্গণের প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। পাশাপাশি হাদি শ্রেণির অলী-আল্লাহ্দের দায়িত্বের একটি অংশও তাঁকে পালন করতে হয়। অতি উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি ও একনিষ্ঠ ইবাদতকারী হওয়ায় তাঁর উপাধি দুররে মাখনুন ও খাতুনে জান্নাত।

তিনি ১৯৫৭ সালের ৮ই মে (২৫শে বৈশাখ ১৩৬৪ বঙ্গাব্দ) ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলাধীন চন্দ্রপাড়া দরবার শরীফে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন জামানার মোজাদ্দেদ, সুলতানিয়া-মোজাদ্দেদিয়া তরিকার ইমাম সৈয়দ আবুল ফজল সুলতান আহমদ (রহ.) এবং মাতা ছিলেন বিশিষ্ট সুফি সাধক হযরত ছমিরুন্নেছা খানম (রহ.)।

হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহ.) তিন দিক দিয়ে বিশাল সৌভাগ্যবান। তিনি পিতা হিসেবে পেয়েছেন তৎকালীন জামানার মোজাদ্দেদ ও ইমামকে। আবার স্বামী হিসেবে পেয়েছেন বর্তমান জামানার মোজাদ্দেদ ও ইমামকে। আবার তাঁর পবিত্র গর্ভে জন্মগ্রহণকারী চার ছেলেই জন্মগতভাবে ইমামের সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। সৈয়দা হামিদা বেগমের সৌভাগ্যের সঙ্গে জগতে কেবল মা ফাতেমা (রা.)-এর সঙ্গেই তুলনা চলে।

হযরত দয়াল মা (রহ.) শৈশব হতেই তরিকতের সাধনার প্রতি গভীর মনোযোগী ছিলেন। সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেব্লাজানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁর কাছ থেকে তরিকতের সবক নিয়ে ধাপে ধাপে উচ্চতর সবক মশক করেন। ১৯৯৬ সালের ২৯ নভেম্বর সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান তাঁকে সারা বিশ্বের সমস্ত দেশরক্ষক শ্রেণীর অলী-আল্লাহ্দের প্রধান ‘কুতুবুল আকতাব’-এর দায়িত্ব প্রদান করেন। তিনি একদিকে রূহানি জগতের এই গুরু দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সূফী সম্রাট হুজুর কেব্লাজানের পক্ষে মহিলাদের তরিকতের শিক্ষা দিতেন।

হযরত দয়াল মা (রহ.)-এর সাত সন্তানের মধ্যে সাতজনই পিএইচডি ডিগ্রিধারী। এজন্য তিনি রত্মগর্ভা সম্মানে ভূষিত হন। তিনি ‘আদর্শ রমনী হযরত মা ফাতেমা (রা.)’ নামক গ্রন্থের রচয়িতা।

সূফী সম্রাট হুজুর কেব্লাজানের মেজো ভ্রাতা মরহুম সৈয়দ শামসুর রহমান সাহেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র সৈয়দ আজিজুর রহমান কুতুবুল আকতাব হযরত সৈয়দ হামিদা বেগম দয়াল মা (রহ.)-এর একটি অলৌকিক কারামতের ঘটনা বলেন। তার জীবনে সংঘটিত অলৌকিক কারামতটি তারই বর্ণনায় হুবহু নিম্নে উপস্থাপন করা হলো-

১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে জুন। মহান সংষ্কারক সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান এবং কুতুবুল আকতাব হযরত সৈয়দা হামিদা-বেগম দয়াল মা (রহ.)-এর সেজো সাহেবজাদা ইমাম সৈয়দ এ. এফ. এম. ফজল-এ-খোদা (মা. আ.) হুজুরের বয়স মাত্র ১৩ দিন। হঠাৎ তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। বাসায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও ক্রমেই তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। সেজো সাহেবজাদার নিথর দেহ বিছানায় পড়ে আছে। হযরত দয়াল মা (রহ.) অবস্থা খারাপ দেখে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানকে ফোন করলেন। তিনি বাসায় এসে অবস্থা খারাপ দেখে আমাকে বললেন- ফজল-এ-খোদা-কে আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে নিয়ে যাও। আমি দয়াল বাবাজানের একজন খাদেমকে সাথে নিয়ে মহাখালী আইসিডিডিআর,বিতে সেজো হুজুরকে ভর্তি করি। দিন গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হলো, তখন ডাক্তার আমাকে বললেন, শিশু ওয়ার্ডে রাতের বেলা কোনো পুরুষ থাকতে পারবে না। আপনি বাচ্চার মাকে আনার ব্যবস্থা করুন। আমি পড়ে যাই কঠিন সমস্যায়। ডাক্তার ও নার্সদের অনুনয় বিনয় করে কোনো ফল হলো না। তখন আরামবাগে দয়াল বাবাজানের সাথে যোগাযোগও করতে পারছিলাম না। সেজো হুজুরের ডায়রিয়া কমছে না, স্যালাইন চলছে।

আমি কিছুক্ষণের জন্য ক্লান্ত অবস্থায় মাথাটা সিটের উপর রেখে চোখ বন্ধ করে আছি। রাত ৮টার সময় ডাক্তার এসে আমাকে ওয়ার্ডের এক কর্ণারে সিটের ব্যবস্থা করে দিলেন। কিন্তু রাত ১০টা হলে ওয়ার্ড মাস্টার আমাকে বের করে দিবে। এ সময় বিপাকে পড়ে যাবো। কি করবো? তখন অঝোর নয়নে কান্না ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। আমি কাঁদছি আর মনে মনে বলছিলাম- দয়াল মা! আজ কেমন বিপদে পড়লাম? ১০টা বাজলে তো আমাকে থাকতে দিবে না। সেজো হুজুরকে নিয়ে আমি কোথায় যাব? সিট থেকে মাথা উঁচু করে দেখি কুতুবুল আকতাব হযরত দয়াল মা (রহ.) সেজো হুজুরকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসে আছেন। সেজো সাহেবজাদা হুজুরও মায়ের স্পর্শ পেয়ে হাত পা ছুড়ে ছুড়ে খেলা করছিল। আসলে শিশুরা মাতৃক্রোড়েই সুন্দর। দয়াল মাকে দেখে আমি কদমবুছি করে জিজ্ঞাসা করি, মা! আপনি কখন এসেছেন? তিনি আমাকে বললেন, তোমার বাবাজান বাসায় আসার পর তাঁর খাবার শেষে আমি এসেছি। তোমার অসুবিধার কথা আমি জানি। তাই ছুটে এলাম। আমি তখন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নিজেকে নিজে চিমটি কেটে পরখ করলাম স্বপ্ন দেখছি কি-না? না সত্যিই আমি বাস্তবে দয়াল মাকে দেখছি অথচ আমার জানা মতে, দয়াল মা (রহ.) তখন শারীরিকভাবে অসুস্থ। বাসায় অবস্থান করছেন। তবে তিনি কে?

দয়াল মা (রহ.) আমাকে বললেন- আজিজুর, আমি সৃষ্টিজগতের দেশরক্ষক অলীগণের প্রধান। এভাবেই আমি সৃষ্টিজগতে বিচরণ করি। আমি তোমার অবস্থা সম্বন্ধে অবগত আছি। তাই আমি হাজির হয়েছি। তবে আমি যে হাসপাতালে এসেছি, তুমি তোমার বাবাজানসহ কাউকে বলবে না। আমি দুনিয়াতে যখন থাকবো না, তখন বলবে। তারপর সারা রাত তিনি হাসপাতালে সেজো হুজুরকে দেখাশুনা, খাওয়ানো ইত্যাদি করেছেন। ভোরবেলা তিনি চলে গেলেন এবং রাতে আসবেন বলে গেলেন। এভাবে ৭/৮ দিন রাতে আসতেন এবং ভোরবেলা চলে যেতেন। হাসপাতালের আয়া-নার্স ডাক্তারসহ অন্যান্য রোগীদের এটেডেন্টরাও দয়াল মাকে রাতে দেখতেন। এজন্য কেউ কোনো প্রশ্ন তুলতোনা। কিন্তু পাশের সিটের এক মহিলা বলতেন, এ বাচ্চাটির আম্মু নাকি অসুস্থ। তবে প্রতিদিন রাতে যিনি আসেন এবং গভীর মমতা ভরে বাচ্চাটিকে আগলে রাখেন, তিনি কে? আমি বললাম, তিনি এ বাচ্চার আম্মু। ৭/৮ দিন পর সেজো হুজুর সুস্থ হয়ে উঠলে হাসপাতাল থেকে ডাক্তারগণ রিলিজ করে দেন। কুতুবুল আকতাব, দুররে মাকনুন, খাতুনে জান্নাত হযরত দয়াল মা (রহ.) রূহানিতে হাসপাতালের সমস্যার বিষয়টি অবগত হয়েছিলেন। তিনি যে পদ্ধতিতে দেশ রক্ষার কাজ করেন, সেই পদ্ধতিতেই হাসপাতালে রাতে যেতেন এবং সন্তানের কাছে থাকতেন। উল্লেখ্য যে, জাহেরিতে তিনি হাসপাতালে গমন করেননি। (সূত্র: ড. আরসাম কুদরত এ খোদা, মোর্শেদের দরবারে মুরীদের করণীয়)

সৈয়দা হামিদা বেগম সম্পর্কে তাঁর সেজো ছেলে ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা (মা. আ.) এক স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে লিখেছেন, আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন আপনি ছিলেন আমার নিরাপদ আশ্রয়। নিজ হাতে আপনি আমার মাথার চুল সুন্দর করে আচড়িয়ে দিতেন। সেসময় আমি আপনার চোখের পানে তাকিয়ে থাকতাম, অপলক দৃষ্টিতে দেখতাম আপনার পবিত্র মুখখানি। শরতের মেঘের মতো শুভ্র ছিল আপনার মন। ছোটো বেলায় দুষ্টামির কারণে যখন দয়াল বাবাজান আমার উপর খুব রাগ করতেন, তখন বাবাজানের রাগ ভাঙানোর জন্য আপনি আমাকে ভালোবাসা মাখানো শাসন করতেন। আর আমার প্রতি আপনার অনুরাগ দেখে বাবাজানের রাগও নিমিষে কমে যেত। মা! আপনার কি মনে পড়ে, আপনি প্রায়শই নতুন নতুন শাড়ি কিনে একটিবার মাত্র পড়ে আলমারিতে তা সযত্নে রেখে দিতেন। তখন আমি আপনাকে বলতাম, “আপনিতো শাড়ি পরেন না, এতো শাড়ি জমিয়ে রাখেন কেন?’’ আপনি হেসে হেসে বলতেন, ‘‘তোমরা ভাইয়েরা যখন বড়ো হয়ে বিয়ে করবে, তখন এই শাড়িগুলো তোমাদের বউদের দিব।’’ আমি তখন আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারিনি। বিয়ের পর একদিন দেখি আমার স্ত্রী কমলা রং-এর একটি নতুন শাড়ি পরেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই শাড়ি কে দিয়েছেন?” আমার স্ত্রী বলল, “দয়াল মা দিয়েছেন।” এর কিছুদিন পর আমি পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, ঐ কমলা রংয়ের শাড়িটি পরে আপনি আমাকে কোলে নিয়ে বাবে জান্নাতের বারান্দায় একটি ছবি তুলেছিলেন।

মা’ আপনি যে আমাকে কত ভালোবাসতেন, এই লেখনীর মাধ্যমে তা আমি প্রকাশ করতে পারব না। শৈশবে কতই না দুষ্টামি করতাম। কিন্তু আপনি কখনো একটু রাগ করতেন না, বকাও দিতেন না, বরং সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। মা, আপনি কতটা সহজ সরল ছিলেন, আপনি নিজেও জানতেন না। আপনার পুরোটা হৃদয় জুড়ে ছিল কোমলতায় ভরপুর।

মা! আপনি ছিলেন কুতুবুল আকতাব, দেশরক্ষক অলীগণের প্রধান। আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক সৃষ্টিজগত পরিচালনা করতেন। আপনার দায়িত্বের জন্য আপনাকে যতটুকু কঠোর হওয়ার কথা ছিল, অথচ আপনি বিন্দুমাত্র কঠোর ছিলেন না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন, সাথে সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দূর করার ব্যবস্থা নিতেন। বাবাজানের নির্দেশে আপনি হাদি শ্রেণির অলীদেরও দায়িত্ব পালন করতেন। মহিলা জাকেরদের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা শুনলে আপনি তাদেরকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। জাকের বোনদের প্রতি আপনি কতইনা মমতাময়ী ছিলেন। (ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা, ‘মা, আপনার কথা বারবার মনে পড়ে’, সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ)

২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাতটায় কোটি আশেকে রাসুলকে কাঁদিয়ে দারুল বাকায় গমন করেন খাতুনে জান্নাত হযরত দয়াল মা (রহ.)। ওফাতের সময় তিনি সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানকে পর পর তিনবার বলেছিলেন, আপনি দয়া করে আমাকে ইমানের সাথে বিদায় দেন। এরপর তিনি তাঁর পরিবারের সবার সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে রাজধানী ঢাকার মতিঝিলের বাবে মদীনায় সমাহিত করা হয়।

3 COMMENTS

  1. আলহামদুলিল্লাহ্, মারহাবা ইয়া আওলাদে রাসূল কুতুবুল আকতাব দুররে মাকনুন খাতুনে জান্নাত হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহঃ) মারহাবা……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here