মাথাপিছু আয় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি

0
23

অর্থনৈতিক ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতির এখন সবচেয়ে আলোচিত খবর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের মাথাপিছু আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়ে এখন দুই হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার, আর ভারতের মাথপিছু আয় এক হাজার ৯৪৭ মার্কিন ডলার। এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি গর্বের বিষয়। বিষয়টি আমাদের দেশে যতটা না আলোচিত খবর, তার চেয়ে বেশি প্রচারিত হয়েছে ভারতের গণমাধ্যমে এবং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক প্রচারমাধ্যমে। কারণ ভারত বিশ্বের অন্যতম একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ, আর সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি পরিমাপের উল্লেখযোগ্য প্যারামিটারকে যখন বাংলাদেশের মতো একটি দেশ ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটি অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং প্রচারমাধ্যমেও গুরুত্ব পাবে, এটাই স্বাভাবিক।


বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের দেশের মাথাপিছু আয় ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক যুগেরও বেশি সময় একটানা রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এর ফলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়েছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে। শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশের মাথাপিছু আয় ছিল এক হাজার মার্কিন ডলারেরও নিচে, সেটি এখন দুই হাজার অতিক্রম করে গেছে, যা এককথায় অভাবনীয় অর্জন। এই মাথাপিছু আয় নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা সারা বিশ্বেই আছে এবং থাকবে। অনেকে স্বীকারই করতে চান না যে মাথাপিছু আয় দিয়ে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি পরিমাপ করা যায়। তাঁরা বলার চেষ্টা করেন যে মাথাপিছু আয় দিয়ে কখনোই দেশের আপামর জনগণের আর্থিক অবস্থা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সেসব সমালোচকের কথায় যুক্তি থাকলেও বর্তমান বিশ্বে মাথাপিছু আয়ই এখন পর্যন্ত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য প্যারামিটার, যা দিয়ে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি পরিমাপ করা হয়। আজ আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোকে যে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ বলে আখ্যায়িত করা হয়, তা মূলত সেসব দেশের মাথাপিছু আয়ের ওপর ভিত্তি করেই। দেশের মানুষের মাথাপিছু গৃহস্থালি (হাউসহোল্ড) ঋণ অর্থাৎ মর্টগেজ ঋণ বাদ দিয়ে সব ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণকে যদি অর্থনৈতিক উন্নতির মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাহলে আমেরিকা, কানাডাসহ বেশির ভাগ উন্নত দেশগুলোর অবস্থান দাঁড়াত সবার নিচে।


এই মাথাপিছু আয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকেই বলে থাকেন যে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ ধনী আরো ধনী হয় এবং গরিব আরো গরিব হয়। কথাটা আংশিক সত্য। কেননা ধনী আরো ধনী হলেও গরিব আরো গরিব হয় না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হলে তার ছোঁয়া ধনী-গরিব-নির্বিশেষে সবার ওপরই পড়বে। তবে এটি একটি কঠিন বাস্তবতা যে ধনিক শ্রেণির ভাগ্যের উন্নতি যে হারে ঘটে গরিব শ্রেণির ভাগ্যের উন্নয়ন সেভাবে ঘটে না। ফলে ধনী-গরিব বৈষম্য বৃদ্ধি পেতেই থাকে। আর এ কারণেই আজ সারা বিশ্বে ১ শতাংশ বনাম ৯৯ শতাংশ মতবাদটি বিশেষভাবে আলোচিত। অর্থাৎ বর্তমান অর্থব্যবস্থায় বিশ্বের ১ শতাংশ মানুষের হাতে যে পরিমাণ সম্পদ আছে তা অবশিষ্ট ৯৯ শতাংশ মানুষের হাতেও নেই। বর্তমান করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এক বিপর্যস্ত পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। লাখ লাখ মানুষ অসহায়ের মতো মৃত্যুবরণ করেছে। কোটি কোটি মানুষ চাকরি হারিয়েছে। জীবনের সব সঞ্চয় ব্যয় করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। এই যেখানে বিশ্বের ৯৯ শতাংশ মানুষের অবস্থা, সেখানে সেই ১ শতাংশ ধনিক শ্রেণি ঠিকই তাদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে চলেছে। বিগত এক বছরের করোনা মহামারি আক্রান্ত অর্থনীতির মধ্যেও টেসলার প্রধান নির্বাহী এলন মাস্ক ১৪০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণ সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ এবং আমাজানের সাবেক প্রধান নির্বাহী জেফ বেজজ প্রত্যেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার পরিমাণের সম্পদ বৃদ্ধি করেছেন। এগুলো মোটেই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এভাবেই বিশ্বের ১ শতাংশ ধনিক শ্রেণি তাদের সম্পদের পাহাড় উঁচু থেকে উচ্চতর করে চলেছে। আর এটাই স্বাভাবিক। কারণ মুক্তবাজার অর্থনীতির মূলমন্ত্রই এটি অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধিকরণ। এক শ্রেণির মানুষের আরেক শ্রেণির মানুষকে বঞ্চিত করে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করার মন্ত্রই নিহিত আছে এই মুক্তবাজার অর্থনীতিতে।


মাথাপিছু আয়ের পক্ষে-বিপক্ষের আলোচনা-সমালোচনা পেছনে রেখেই আজ এ কথা সবাইকে স্বীকার করতে হবে যে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারাবাহিক উন্নতি এখন স্বীকৃত বাস্তবতা, যার প্রতিফলন ঘটেছে দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে, যা এই মুহূর্তে আমাদের প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ভারতকেও ছাপিয়ে গেছে। এখন আমাদের দেশের প্রধান কাজ হবে এই উন্নতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং একে একটি টেকসই রূপ দেওয়া। এই লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার নিশ্চিতভাবেই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে চলেছে। দেশ এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। ২০৪০ সালের মধ্যে উন্নত দেশে উপনীত হওয়া এবং ডেল্টা পরিকল্পনা সামনে রেখে কাজ করে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। তার পরও কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এখন থেকেই গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। আত্মকর্মসংস্থানকে গুরুত্ব এবং অগ্রাধিকার দিতে হবে সবার আগে। কেননা আত্মকর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়।


এই আত্মকর্মসংস্থানের একটা বড়ো অসুবিধা হলো যে একটি নির্দিষ্ট সময় পরে সেই সুযোগ নষ্ট হয়ে যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অর্থ ধার করে কোনো কাজ শুরু করার ফলে সেই ধারের টাকা পরিশোধের জন্য সার্বক্ষণিক এক চাপে থাকতে হয়। নিজের ও পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য অন্নের জোগান দেওয়া এবং একটু বেশি অর্থ হাতে আসা মাত্র অপ্রয়োজনীয় ফুর্তি করে অর্থের অপচয় করার কারণে আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত ব্যক্তি সঠিকভাবে উপার্জিত অর্থ ব্যয় করতে পারে না। তাদের সে যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা কোনোটাই থাকে না। ফলে সেই কাজে নিয়োজিত থাকাকালীন যথাযথভাবে ঋণের টাকা পরিশোধ, প্রয়োজনীয় সঞ্চয় এবং বিকল্প মূলধন, এর কোনোটাই ঠিকমতো গড়ে ওঠে না। ভবিষ্যতে প্রয়োজনের মুহূর্তেপেশাকে সচল রাখার জন্য পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বা প্রয়োজনে বিকল্প কর্মসংস্থান শুরুর সময় তারা আর অর্থের জোগান দিতে না পেরে অনেকেই আবার বেকারত্বের খাতায় নাম লেখায়, যা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। তা ছাড়া আত্মকর্মসংস্থানের বেশির ভাগ কাজই কায়িক পরিশ্রমের, যা একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই সেই বয়স অতিক্রান্ত হওয়ার পর যাতে বেকার বা অন্য কারো ওপর নির্ভরশীল হতে না হয় তারও একটা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রত্যেক ব্যক্তির আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত থাকার সময়ে তার উপার্জন থেকেই করা প্রয়োজন। এসব বিষয় মাথায় রেখেই আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগকে আরো বেশি প্রসারিত, সুসংহত এবং সুনিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন, যাতে করে এই সুযোগটি যথেষ্ট টেকসই হয় এবং অর্থনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আমার জানা মতে, চীন এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে সফল হয়েছে। এ ব্যাপারে চীন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে তাদের দেশের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগকে আরো প্রসারিত, সুসংহত ও সুনিয়ন্ত্রিত করার দায়িত্ব দিয়েছিল। কারণ সেই অধ্যাপকের এই আত্মকর্মসংস্থানের ওপর রয়েছে অনেক গবেষণা। বাংলাদেশ সরকারেরও এখন এ ব্যাপারে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের সময় এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে যে এই স্বউদ্যোগী ও স্বপ্রণোদিত ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে দিয়ে যেন নতুন করে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি না হয়। আমরা আশা করব, বাংলাদেশের কোনো সংস্থা বা সরকার এই অগ্রসরমাণ আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগকে আরো বেশি প্রসার, সুসংহত এবং সুশৃঙ্খল করার যথাযথ উদ্যোগ নেবে।


একই সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতেও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজে হাত দিতে হবে এখনই। দেশের মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে এই খাতকে একটি মানসম্পন্ন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দেশের ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখা হবে ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা ব্যাংকিং খাতকে দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে দীর্ঘদিনের নানা অব্যবস্থার কারণে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী দেশের বিদ্যুৎ খাতসহ অনেক খাতেই সরাসরি নজর দিয়ে অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়েছেন। তাই দেশের অত্যাবশ্যকীয় এই ব্যাংকিং খাতের দিকেও তিনি নজর দেবেন বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here