মানবতার কবি শেখ সাদি

0
36

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
দামেশকের জামে মসজিদে হযরত ইয়াইয়া (আ.)-এর কবরের শিয়রে এতকাফে ছিলাম (শেখ সা’দীর কথা)। ঘটনাচক্রে আরবের তামীম গোত্রের এক বাদশাহ, যে জুলুম ও স্বৈরাচারের জন্য কুখ্যাত ছিল, সেখানে জিয়ারত করতে আসে। সে সেখানে নামাজ আদায় করে। তারপর দোয়া করে আর নিজের অভাব অভিযোগের কথা জানিয়ে মোনাজাত করে। (সত্যিই) ‘ফকির ও ধনী এ দরবারের ভিখারি সবাই যারা অধিক ধনী অধিক ভিখারি তারাই।’
এ সময় সে আমাকে বলল, ‘যেহেতু দরবেশদের মনোবল মজবুত এবং সততার ওপর তাদের জীবন চলে, সেহেতু আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। কারণ, শক্ত একজন শত্রুর পক্ষ হতে পেরেশানিতে আছি।’ আমি তাকে বললাম, ‘আপনি দুর্বল প্রজাদের প্রতি দয়া দেখাবেন, তাহলে সবল দুশমনের ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকবেন।’ ‘সবল বাহু আর শক্তিশালী হাতের পাঞ্জায় নিরীহ দুর্বলের হাতভাঙা বড় অন্যায়।


পতিতের প্রতি দয়া দেখান না, সে কি ভয় পায় না নিজে পতিত হলে কেউ যে এগিয়ে আসবে কি? মন্দের দানা বুনে যে দিন কাটে ভালোর আশায় ভ্রান্ত চিন্তায় ঘুরপাক খায় বেভুল বাতিল কল্পনায়।
কানের তুলা বের করো, শোধ করো মানুষের প্রাপ্য যদি আজ না দাও, সেদিন ফেরত দিবে অবশ্যই। আদম সন্তান পরস্পরে এক দেহের অঙ্গ স্বস্তিতে থাকতে পারে না, বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অন্যদের দুঃখ-কষ্টে তুমি যে নির্বিকার তোমাকে মানুষ বলা অনুচিত, অবিচার।’ (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, হেকায়াত নং ১০)


ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষ কবি শেখ সা’দী তাঁর সাহিত্য কর্মের সর্বত্র মানবতার জয়গান গেয়েছেন। বর্ণনাশৈলীর চমৎকারিত্ব, ভাষার লালিত্য ও মাধুর্য এবং মানবীয় গুণাবলির উৎকর্ষ সাধনে তাঁর অবদান বিশ্ব সভ্যতায় অবিস্মরণীয়। উপরিউক্ত বাণীতে দুর্বল মানুষের অধিকার আদায়ের যে চমৎকার আবেদন তিনি রেখেছেন তা অতুলনীয়। শেষ কয়েকটি পঙক্তিতে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন মানব প্রেমের এক বিশ্বজনীন আবেদন। সহজ সরল ভাষায় অতি সংক্ষেপে, কাব্য শৈলীর অসাধারণ নৈপুণ্যে ও যুক্তির মানদন্ডে উপস্থাপিত মানবাপ্রেমের এই আবেদন যেকোনো মানুষের অন্তর ছুঁয়ে যায়। মানুষের চিন্তাকে মুহূর্তে নিয়ে যায় আপন সৃষ্টি তত্ত্ব, সমজাত মানুষের প্রতি দায়িত্ব চেতনা, বিশেষ করে মানুষে মানুষে সাম্য ও সম্প্রীতির বিস্তৃত নিলীমায়।
আজকের দিনে কালো সাদা, ধর্ম, বংশ ও জাত-পাতের বিভিন্নতায় মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। শেখ সা’দী কবিতার অলঙ্করে মানব জাতির সামনে যে সত্যটি উপস্থাপন করেছে, তা হলো সব মানুষ এক আদমের সন্তান, সৃষ্টির মূলে সবার অভিন্ন উপাদান। কাজেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক হওয়া চাই একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গের অন্তর্গত সম্পর্কের মতো। দেহের কোনো অঙ্গে আঘাত হলে অন্য অঙ্গগুলো যেমন স্বস্তিতে থাকতে পারে না, তেমনি পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে কোনো আদম সন্তান ব্যথায় কাতর হলে কোনো মানুষ তার প্রতি সমব্যথী না হয়ে পারে না। এই দায়িত্ব যে ভুলে যায়, অন্যের দুঃখ-দুর্দশা দেখেও যে নির্বিকার থাকে, সে মানুষ নয়, শেখ সা’দীর ভাষায় তাকে ‘মানুষ’ নামে আখ্যায়িত করা অন্যায়। শেখ সা’দীর এই বিশ্বজনীন বাণীতে সাহিত্যের অলঙ্কারে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষাই প্রস্ফুটিত হয়েছে। কোরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে: ‘হে মানবমন্ডলী! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। আর আমি তোমাদেরকে পারস্পরিক পরিচয়ের সুবিধার্থে বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছি। তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত হলো সে, যে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে আল্লাহ ভীরু ও সংযমী।’ (সূরা হুজুরাত: আয়াত ১৩)


অনুরূপভাবে মহানবি (সা.)-এর বাণীতে উচ্চারিত একটি হাদিসের আবেদন ব্যক্ত হয়েছে শেখ সা’দীর এ রচনায়। আল্লাহর নবি বলেছেন, ‘তুমি মুমিনদেরকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতায় দেখবে যে, তারা একটি দেহের মতো। দেহের একটি অঙ্গ যখন ব্যথায় কাতর হয়, তখন অন্য অঙ্গগুলো জ¦র ও রাত্রি জাগরণের মাধ্যমে তার প্রতি সমবেদনা জানায়।’ (বুখারী শরীফ ৫৬৬৫ : মুসলিম শরীফ ২৫৮৬)
মানব সমাজকে পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ ও শান্তিময় করার আদর্শ ও শিক্ষা শেখ সা’দী কোরআন ও হাদিস থেকে চয়ন করে বিশ্ব সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন। চিন্তার পরিশুদ্ধির সূত্রে সুন্দর চরিত্র ও আচরণে আদর্শ সমাজ নির্মাণের উপাদান জোগার দিয়েছেন।


পারস্যের রাজধানী শিরাজের রাজ দরবারের কবি ছিলেন শেখ সা’দী। তাঁর কবি নাম সা’দী গ্রহণ করেন সিরাজের শাসক সাদ ইবনে আবুুবকর ইবনে সাদ (৫৯৯-৬২৩ হিজরি) এর নাম অনুসারে। কিন্তু তখনকার দিনের সভাকবিদের মতো সাহিত্য চর্চা তিনি করেননি। তিনি পূর্ববর্তি রাজা-বাদশাহদের জীবন চিত্র তুলে ধরেছেন নানা কাহিনীর অবতারণা করে। তার মাধ্যমে বর্তমান শাসক শ্রেণিকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করেছেন আর মন্দ কাজ হতে বিরত থাকার তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর অমর দু’টি গ্রন্থের একটির নাম ‘গুলিস্তান’ অপরটি ‘বূস্তান’। গুলিস্তান মানে ফুলের স্থান আর বূস্তান মানে সুবাসের স্থান। ‘গুলিস্তান’-এ যেসব কাহিনী দিয়ে তিনি মানব মনের চিরন্তন বাগানে ফুল ফুটিয়েছেন তা অনেকটা দৃশ্যমান। কিন্তু ‘বূস্তান’-এর ফুলগুলো দৃশ্যমান নয়, কাছে গেলে তার সুবাস মন-মস্তিষ্ককে বিমোহিত করে। ‘গুলিস্তান’ গদ্যের ফাঁকে ফাঁকে কবিতা দিয়ে রচিত। তবে গদ্যও এতই ছন্দময় যে, তার মতো রচনা অনেক কবি-সহিত্যিক চেষ্টা করেও সৃষ্টি করতে পারেননি। ‘বূস্তান’ সম্পূর্ণটাই কাব্য। মানব সমাজকে সুপথে বা বিপথে পরিচালিত করার অন্যতম চালিকা শক্তি রাজা-বাদশাহরা। তাই তিনি আট বেহেশতের সংখ্যায় রচিত ‘গুলিস্তান’-এর আট অধ্যায়ের প্রথম অধ্যায়টি বরাদ্দ করেছেন রাজা-বাদশাহদের জীবন চরিত্র আলোচনায়। বর্তমান গণতন্ত্রের স্লোগানের যুগেও ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার ঝুঁকি আমরা কমবেশি বুঝি। সে যুগের রাজা-বাদশাহদের সমালোচনা ও সংশোধনের অভিনব পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করলে শেখ সা’দীকে একজন দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক হিসেবে দেখা যায়। যাঁর লেখনির প্রভাব সভ্যতা ও সমাজকে পথ দেখাবে যুগ যুগ ধরে। শেখ সা’দী বর্ণনা করেন:


খোরাসানের জনৈক বাদশাহ একবার সুলতান মাহমুদ সাবুকতাগীনকে স্বপ্নে দেখেন, তার গোটা দেহ খসে পড়েছে, মাটির সাথে মিশে একাকার হয়েছে। কিন্তু তার চোখ দুটি চোখের কোটরিতে তখনো ঘুরছে আর এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। দরবারের জ্ঞানী-গুণিরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে যখন অপারগ, এক দরবেশ যথা নিয়মে সম্মান জানিয়ে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘তিনি এখনো চিন্তিত, কারণ, অন্যের হাতে তাঁর রাজত্ব।’
‘বহু খ্যাতিমান দাফন হয়েছেন নরম মাটির নিচে যাদের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন নাই মাটির উপরে। জরাজীর্ণ লাশ রাখা হয়েছিল মাটির কবরে পুঁতে তাদের অস্থিমজ্জাও নিশ্চিহ্ন হয়েছে মাটির গ্রাসে। স্বনামখ্যাত আনুশিরওয়াঁ অমর তাঁর সুনাম নিয়ে যদিও বহুকাল চলে গেল, আনুশিওয়ান গত হয়েছেন।
মানুষের কল্যাণে কিছু করে যাও, হায়াতের এই সুযোগে। অমুক ব্যক্তি আর নাই, একদিন এই ঘোষণা আসার আগে।’ (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, ২য় হেকায়াত)
সুলতান মাহমুদ ইতিহাসে সোমনাথ বিজয়ী ও ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তনকারী হিসেবে খ্যাত। তাঁর পুরো নাম আবুল কাসেম আমীর আদ্দৌলা। ৩৮৭ হিজরিতে খোরাসনের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ৪২১ হিজরিতে ইন্তিকাল করেন। তাঁর দরবারে কবি-সাহিত্যিক ও জ্ঞানী পন্ডিতদের বিশেষ কদরছিল। তাঁর সফরসঙ্গী আল বিরুনীর লেখা কিতাব ‘মালিল হিন্দ’ (ভারত তত্ত্ব) ইতিহাসে বিখ্যাত। তাঁর পিতা নাসিরুদ্দীন সাবুকতাগীন ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত খোরাসানের বাদশাহ। পিতার নামের সাথে মিলিয়ে সাবুকতাগীন। আনুশিরওয়ান বানয়শিরওয়ান ইরানের প্রাচীন সাসানি যুগের বাদশাহ। তিনি ন্যায় বিচারক ও প্রজাবৎসল হিসেবে ফারসি সাহিত্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত।


মানুষ যখন জগৎ ও জীবনের রহস্য হৃদয়ঙ্গম করতে পারে তখন নিজ থেকে সুপথগামী হয়। তার কথা ও কাজে মানবীয় সৌন্দর্যের ফুল ফুটে। শেখ সা’দী তাঁর রচনার ভাঁজে ভাঁজে জীবন ও জগতের রহস্যের পানে মানুষের অন্তর্চক্ষু খুলে দিয়েছেন নানা উপমা উৎপ্রেক্ষায়। তিনি বলেন, ‘এ জগৎ হে ভাই! কারো জন্য থাকবে না স্থায়ী অন্তর বাঁধ তাঁর সাথে, জগৎ সৃষ্টি করেছেন যিনি দুনিয়ার রাজত্ব, সম্পদ, পদের ভরসা করো না, মিছে তোমার মতো অনেককে সে লালন করে হত্যা করেছে পূতপ্রাণ যখন মনস্থ করে এ জগৎ ছেড়ে চলে যাওয়ার তখতের পরে মরণ কি বা মাটির উপর, কি পার্থক্য তার।’ (গুলিস্তান, ১ম অধ্যায়, ১ম হেকায়াত)


যারা ক্ষমতার মোহে অন্ধ তাদের চক্ষু খুলে দিয়েছেন শেখ সা’দী নানা উপাখ্যানের অবতারণা করে। যাতে ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মনে না করেন। এক রাজা ও দরবেশের সংলাপে তিনি বিষয়টির বিশ্লেষণ করেছেন মানব সভ্যতার সামনে। তিনি বলেন :
সংসার বিরাগী এক দরবেশ এক মরু অঞ্চলে বসাছিলেন আপন ভুবনে। সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক বাদশাহ। অল্পে তুষ্টির রাজত্বে দরবেশ ছিলেন প্রশান্তচিত্তে, তাই তিনি মাথা তুললেন না, তাকিয়ে দেখলেন না বাদশাহর দিকে। রাজা-বাদশাহর প্রতাপের কাছে বড্ড বেমানান মনে হলো ব্যাপারটি। মনে কষ্ট পেয়ে তিনি বলে ফেললেন, ‘আলখেল্লা পরা এই গোষ্ঠীটা আসলেই জানোয়ারের মতো। মান-সম্মান, মনুষ্যত্ব এরা চেনে না।’ মন্ত্রী তখন কথা বললেন, ‘ওহে ভালো মানুষ! মহামান্য সুলতান তোমার পাশ দিয়ে চলে গেলেন, অথচ তুমি সম্মান দেখালে না? আদবের লেহায দেখালে যে? দরবেশ বলল, ‘বাদশাহকে গিয়ে বলেন, সম্মান পাওয়ার আবদার যেন এমন কারো কাছে করেন, যে বাদশাহর কাছে কিছু আশায় থাকে। আরেকটি কথা মনে রাখবেন, প্রজার যত্নের জন্যই রাজা। রাজাকে সম্মান করার জন্য প্রজা নয়।’


যদিও দয়া অনুগ্রহে পুষ্ট হয় তার সম্পদে রাখালের খেদমতের জন্য নয় তো ভেড়া বরং রাখালের কাজ ভেড়ার সেবাযত্ন করা। একজনকে আজকে দেখছ সৌভাগ্যবান আরেকজন কৃচ্ছ সাধন করে প্রাণপাত। কয়েকটা দিন সবর করো, যেন খেয়ে যায় কল্পনা বিলাসীর মস্তিস্ক, কবরের মাটি। বাদশাহ বা প্রজার ফারাক উঠে যাবে যখন নিয়মিত ফয়সালা উপস্থিত হবে। কেউ যদি কবরের মাটি খুঁড়ে দেখে ভেতরে চিনবে না কে ধনী, কে গরিব আলাদা করে।
দরবেশের কথাগুলো বাদশাহর বেশ ভেতরে লাগল। তিনি বললেন, ‘আমার কাছে কিছু চান।’ দরবেশ বললেন, ‘আমি চাই, আপনি যেন আর আমাকে বিরক্ত না করেন।’ বাদশাহ বললেন, ‘আমাকে উপদেশ দিন।’ দরবেশ বললেন, ‘বর্তমানকে মূল্যায়ন করো, এই যে নেয়ামত তোমার হাতে। এই নেয়ামত, রাজত্ব হাত বদলে যাবে অন্যের হাতে।’ (গুলিস্তান ১ম অধ্যায়, ২৮তম হেকায়াত)


সংসার, সম্পদ, রাজত্ব, প্রতিপত্তি ক্ষণস্থায়ী, যেন কচুপাতার পানি। এসবের মোহ ত্যাগ করতে হবে। ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি পুরুষগণ এ কথাই বলেছেন নানাভাবে মানব জীবনকে সুন্দর ও সার্থক করার লক্ষে। তাতে মনে হতে পারে, দুনিয়ার প্রতি উদাসীন হয়ে ঘর সংসার ছেড়ে যাওয়ার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত। কিন্তু শেখ সা’দী বা ফারসি সাহিত্যের মহাপুরুষদের রচনার আবেদন তা নয়। তাঁরা দুনিয়ার ধন-সম্পদকে নয়, দুুনিয়ার আর ধন-সম্পদের লোভ-মোহ ত্যাগ করতে বলেছেন। শেখ সা’দী ‘বূস্তান’ এর এক অনবদ্য কাহিনীতে এই জীবন দর্শনটি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই কবিতার দু’টি ছত্র খ্যাতির এমন শীর্ষে উঠে গেছে, যা গোটা ইসলামি জীবনবোধের প্রতিনিধিত্ব করছে। শেখ সা’দী বলেন, ‘আগেকার দিনের বাদশাহদের কাহিনীতে আছে, পারস্য-রাজতাকলা যখন বসলেন সিংহাসনে। শান্তিতে জনগণ কারো ক্ষতি কেউ করে না দেশে, সবাইকে ছাড়িয়ে অগ্রণী তিনি একা এই কীর্তিতে। এক দরবেশের কাছে গিয়ে একদিন বললেন রাজা, আমার এ জীবন কেটে গেল নিম্ফল, অযথা। আমি চাইনি মগ্ন হব ইবাদত-বন্দেগিতে একাগ্রভাবে, জীবনের বাকি কয়দিন কাটে যেন সৎভাবে। এই প্রতিপত্তি, রাজত্ব ও সিংহাসন যখন চলে যাবে জগতের সম্পদ যাবে না সাথে, নিঃস্বই যেতে হবে।


আলোকিত-হৃদয় দরবেশ শুনে তাঁর কথা। তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বললেন, থামো তাকলা।
‘তরীকত বজুয খেদমতে খালকনীস্ত
বে তসবীহ ও সাজ্জাদা ও দালকনীস্ত’।
অর্থাৎ সৃষ্টির সেবা ছাড়া তরিকত নয় অন্যথা তসবীহ, জায়নামাজ ও নয় আলখেল্লা। তুমি সমাসীন থাক তোমার রাজ সিংহাসনে তবে পূতচরিত্রে সজ্জিত হও দরবেশি গুণে। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় উদ্যোগী হও, বড়বড় বুলি, আস্ফালন ছাড়, মুখ সামলাও তরিকত সাধনায় চেষ্টাই চাই, বুলি নয়, সাধনা চেষ্টা, এখানে আস্ফালনের মূল্য নাই। বুযুর্গগণ, যাঁরা সজ্জিত ছিলেন স্বচ্ছতার সম্পদে এমনই উত্তরীয় ছিল তাঁদের আচকানের নিচে।’ (বূস্তান ১ম অধ্যায়, হেকায়াত নং ৯)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here