মানবতার কাছে পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে করোনা ভাইরাস

1
268

ড. সৈয়দ মেহেদী হাসান

বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ যুগে দাঁড়িয়েও মানুষ আজ বড়ো অসহায়। করোনা ভাইরাসের ছোবলে সারা পৃথিবীর মানুষ আজ পর্যুদস্ত। এই ভাইরাসের কবল থেকে ধনী-দরিদ্র, কালো-সাদা কেউই রেহাই পাচ্ছে না। বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি মানুষ আজ এই মানবঘাতী রোগে আক্রান্ত। প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। প্রতিদিনই হাজার হাজার আক্রান্ত মানুষ এই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে। বিশ্বে সকল সময়ই মহামারির পরাজয় ঘটেছে। তেমনি বর্তমানে মানবতার কাছে পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে রয়েছে নভেল করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)।

সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় মহামারি হলে। প্রাচীন যুগে মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য শিকারের উপর নির্ভরশীল ছিল, তখন থেকেই সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব দেখা যায়। আজ থেকে ১০ হাজার বছর পূর্বে মানুষ যখন কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে জড়িত ছিল তখনই মূলত গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় তৈরী হয়। আর সেই সময় থেকেই সংক্রামক রোগ মহামারিতে রূপ নিতে শুরু করে। ম্যালেরিয়া, যক্ষা, কুষ্ঠ, ইনফু¬য়েনজা, গুটিবসন্ত প্রভৃতি বিভিন্ন রোগ নানা সময়ে মহামারির আকার নিয়েছে। মানব সভ্যতার যতই উন্নতি হয়েছে, মহামারির প্রাবল্য ততই বেড়েছে। মূলত এর পিছনে কারণ হচ্ছে ধীরে ধীরে শহর, গ্রাম গড়ে উঠেছে এবং যার ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্য বেড়েছে। ফলে রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে ইতিহাস তালাশ করলে দেখা যায়, প্রতি শতাব্দীতেই পৃথিবীতে মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটে।

ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহামারির কারণে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটেছে। নিম্নে বিভিন্ন সময়ে মহামারির সময় এবং মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করা হলো:

খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে গ্রিসের এথেন্সে টাইফয়েড জ¦রের কারণে দুই তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়। ৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে জাস্টিনিয়ান প্লেগের কারণে মিশরে প্রথম এবং পরে ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই মহামারি। এতে মারা গিয়েছিল প্রায় ৫ কোটি মানুষ যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ।

একাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে কুষ্ঠ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে ১৩৫০ সালে The Black Death নামে এই মহামারির কারণে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়েছিল। একে বলা হয় এক ধরনের বুবোনিক প্লেগ। রোগটি প্রথমে এশিয়া পরবর্তীতে সারা ইউরোপে ছড়িয়ে যায়।

১৬৬৫ সালে The Great Plague of London -এ মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে রোগের উৎস হিসেবে কুকুর বিড়ালের কথা ভাবা হয়েছিল। রোগের আতঙ্কে তখন নির্বিচারে শহরের কুকুর বিড়াল মেরে ফেলা হয়।

১৮১৭ সালে প্রথমে কলেরা মহামারি শুরু হয়েছিল রাশিয়ায়। সেসময় ১০ লাখের মতো মানুষের মৃত্যু হয়। পরে তা ভারতে ছড়ায়। সেখানেও ১০ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। এছাড়া স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে। এ সকল অঞ্চলেও ২ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। ফলে সব মিলিয়ে ২২-২৩ লাখ লোক মারা যায়।

১৮৫৫ সালে তৃতীয় প্লেগ মহামারির চীন থেকে সূত্রপাত হয়েছিল। পরে তা ভারত ও হংকংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঐ মহামারির শিকার হয়েছিল।

১৮৮৯ সালে রাশিয়ান ফ্লুর মাধ্যমে মহামারিটি সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে সূত্রপাত ঘটে। পরে মস্কো হয়ে ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে সারা ইউরোপে এর বিস্তার লাভ হয় এবং সমুদ্র পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৩ লাখ ৬০ হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে।

১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর বিশ্বব্যাপী ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এর উৎপত্তি স্থল  ছিল চীনে। পরবর্তীতে চীনা শ্রমিকদের মাধ্যমে তা কানাডা হয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। স্পেনের মাদ্রিসে মহামারির আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর এর নাম হয়  ‘স্প্যানিশ ফ্লু’।

১৯৫৭ সালে এশিয়ান ফ্লু রোগে হংকং থেকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা ৬ মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তখন ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। আবার ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে Asian Flu দ্বিতীয়বারের মতো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তখন এই মহামারিতে ১১ লাখ লোকের মৃত্যু হয়। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। পরে টিকা আবিষ্কার হলে তা দিয়ে মহামারি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল।

১৯৮১ সালে এইডস/এইচআইভি প্রথমবারের মতো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই রোগ শনাক্তের পর এ পর্যন্ত পৃথিবীতে এই প্রথম বিশ্বব্যাপী সাড়ে ৩ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই এইচআইভি ভাইরাস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে ফেলে। ১৯২০ সালের দিকে পশ্চিম আফ্রিকায় এই ভাইরাসের উদ্ভব ঘটে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে নভেল করোনা ভাইরাস নামে এই ভাইরাসটি চীনের হুবেই  প্রদেশের উহান শহরে আবির্ভূত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে ‘সার্স কভ-২’ ভাইরাসটির দ্বারা সংক্রমিত রোগটির নামকরণ করেন কোভিড-১৯। বিশ্বের হাতে গোনা ১২টি দেশ ব্যতীত এ রোগটি মহামারি আকারে বিস্তার করে চলেছে। মৃত্যুর হার কোথায় গিয়ে ঠেকবে এটা বলার সময় এখনও হয়নি। গত ১২ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দাপ্তরিকভাবে এই সংক্রমণকে- পেনডেমিক (Pendemic) মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে। এখন পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি মানুষ এই করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ মানুষ এই রোগে মারা গেছে।

করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল গত ১৮ মার্চ দেশবাসির উদ্দেশে এক ভাষণে করোনা সংক্রমণকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সবচেয়ে বড়ো সংকট বলেছেন। এই করোনা ভাইরাস মহাযুদ্ধের চেয়েও বেশি মাত্রায় চেনা জানা বিশ্বকে পাল্টে দিতে পারে। এই করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ অ্যামিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, করোনা ভাইরাস তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ন্যায় পৃথিবীতে ধ্বংস সাধন করে চলেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা এক গবেষণায় বলেন, বর্তমান বিশ্বে কানেকটিভিটির কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত শতাব্দীর ১ম বিশ্বযুদ্ধে ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১০০ বছর আগের মহামারি স্ফ্যানিশ ফ্লুর পরই পৃথিবীতে আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভব হওয়ার কারণে বিশ্বে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালের পর যাত্রীবাহী বিমান চলাচল শুরু হওয়ায় পৃথিবীর দূরত্ব কমে যায়। যার ফলে পৃথিবীটা একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। মহামারির ক্ষেত্রে এই দ্রুত যোগযোগই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। যার কারণে ভাইরাস দ্রুত এক দেশে থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গোটা পৃথিবীকেই স্তব্ধ করে দিচ্ছে। পূর্বের মহামারি আরো ভয়াবহ ছিল। কিন্তু কানেকটিভিটি না থাকায় এক জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল। করোনা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, আমাদের এই উপমহাদেশে যক্ষা, কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়ার মতো মহামারিগুলো বিভিন্ন সময়ে হানা দিয়েছে। এসব মোকাবিলার কারণে এই অঞ্চলের মানুষের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে যে দুঃসময়ের মুখোমুখি মানবজাতি হয়েছে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে করোনা উত্তর পৃথিবীতে দুটি ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করেন নির্মলেন্দু গুণ। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য অশুভ প্রতিযোগিতা আরো বেড়ে যেতে পারে। আবার বর্তমানের অসহায়, করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে মানুষ পরস্পরের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠতে পারে। এটা হলে আমরা মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ দেখব। এই মানবিক পৃথিবীর জন্যই সবাইকে কাজ করতে হবে।

অতীতে মহামারি থেকে বাঁচার জন্য টিকা বা ভ্যাকসিনের আবিস্কার সহজ ছিল না। এজন্য মানবজাতিকে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৪০০ শতকে ভয়ংকর মহামারি ব্ল্যাক ডেথের সময় পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন থাকার নিয়ম চালু হয়েছিল।

অনেক বিজ্ঞানী অক্লান্ত পরিশ্রম করে মহামারির টিকা বা প্রতিষেধক আবিস্কার করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এমন একজন বিজ্ঞানী ওয়াল্ডিমার হাভকিন। জন্মসূত্রে তিনি রাশান ইহুদি। অনেক গবেষণা কার্যক্রমের পরে তিনি ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম হলেন। মানুষের দেহে এর কার্যকারিতা দেখতে গিয়ে অন্যের শরীরে প্রয়োগের ঝুঁকি না নিয়ে নিজের শরীরেই প্রয়োগ করলেন। বিস্ময়কর ফলাফল দেখলেন। এবার অন্য স্বেচ্ছাসেবকদের ক্ষেত্রেও একই ফলাফল দেখলেন। ১৮৯০ সালে পৃথিবী পেয়ে গেল অনেক আকাক্সিক্ষত কলেরার ভ্যাকসিন। লাখো কোটি মানুষ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসলেন। পরবর্তীতে হাভকিন প্লেগেরও প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। এমনিভাবে ১৭৯৬ সালে গুটি বসন্তের টিকা আবিস্কার করলেন এডওয়ার্ড জেনার।

বর্তমান পৃথিবীতে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীরা এর প্রতিষেধক আবিস্কারের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কার্যকর ভ্যাকসিন আবিস্কারে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জগদ্বিখ্যাত গবেষকরা রাতদিন গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। করোনা ভাইরাস বিরোধী কঠিন লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে মানুষ। তাই বিষয়টি স্পষ্ট যে, মানবতার কাছে পরাজয়ের দ্বার প্রান্তে করোনা ভাইরাস।

করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির প্রধান উপায় ভ্যাকসিন। মানবদেহে চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষে ইতোমধ্যে এই টিকা বাজারে ছেড়েছে রাশিয়া। চীনেও একটি টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে ‘সাধারণ’ মানুষের ওপর। অন্যদিকে একজন অংশগ্রহণকারী অসুস্থ হয়ে পড়ায় অক্সফোর্ডের টিকার পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। আগামী অক্টোবরে আলোর মুখ দেখতে পারে জার্মানির বায়োএনটেক ও যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের যৌথ গবেষণায় উদ্ভাবিত করোনা ভ্যাকসিন। বিশ্বের প্রতিটি মানুষ তাকিয়ে আছে এসব টিকার দিকে। কখন হাতে পাবে করোনা জয়ের এই মহৌষধ। বেশিরভাগ দেশ টিকা উদ্ভাবনের দৌড়ে না থাকলেও চেষ্টা করছে দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা সংগ্রহের।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে ১৯০টির বেশি করোনা টিকার প্রকল্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে ১৪২টি টিকা এখনও প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে আছে। অর্থাৎ মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়নি। ক্লিনিক্যাল (মানবদেহে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) পর্যায়ে আছে ৫৬টি। এর মধ্যে প্রথম ধাপে আছে ২৯টি। ১৮টি দ্বিতীয় ধাপে আর তৃতীয় (চূড়ান্ত) ধাপে আছে ৭টি। সংস্থাটি বলছে, কার্যকারিতা এবং সুরক্ষার নিয়মনীতি মেনে কোনো টিকাই এ বছরের মধ্যে আসতে পারবে বলে তারা মনে করে না। কারণ, এসব টিকার নিরাপত্তার দিকগুলো যাচাই করতে সময় লাগে। তা সত্ত্বেও চীন এবং রাশিয়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টিকার প্রয়োগ শুরু করেছে। সেসব টিকাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তালিকায় পরীক্ষামূলক হিসেবে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ, খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (এফডিএ) আভাস দিয়েছে- তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই হয়তো করোনা ভাইরাসের টিকার অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

জানা গেছে, একটি টিকা চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে রাশিয়ায়। সেটির নাম ‘স্পুটনিক ভি’। ভ্যাকসিনটি তৈরি করেছে রাশিয়ার ‘গ্যামেলেই ইন্সটিটিউট অব এপিডেমিয়োলজি অ্যান্ড মাইক্রোবায়োলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। গত সোমবার রাতে রাশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের টিকার প্রথম ব্যাচ জনসাধারণের মধ্যে বিতরণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। শুরু হয়েছে দ্বিতীয় ব্যাচের উৎপাদনও।

মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন বলেছেন, কয়েক মাসের মধ্যেই মস্কোর বেশিরভাগ বাসিন্দা করোনার টিকা পাবে। রাশিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের টিকা নিলে অন্তত দু’বছর করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না।

ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে ‘স্পুটনিক ভি’ উৎপাদন করতে পারে রাশিয়া। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ¬াদিমির পুতিন ও সৌদি বাদশাহ সালমানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।

চীনের কোম্পানি সিনোভ্যাক বায়োটেক জানিয়েছে, তাদের উদ্ভাবিত টিকা এরইমধ্যে কোম্পানির কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছে। তাদের ৯০ শতাংশ কর্মী ও স্বজনের শরীরে ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়েছে। টিকা উৎপাদনের জন্য এরইমধ্যে তাদের কারখানা নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। যেখানে বছরে ৩০ কোটি টিকা উৎপাদন করা যাবে। গত সোমবার সিনোভ্যাক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের টিকার এখন পর্যন্ত কোনো বড়ো ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

তবে এই টিকা বয়স্কদের শরীরে অপেক্ষাকৃত কম কাজ করে। চীনের আরও দুটি প্রতিষ্ঠান টিকা উৎপাদনের অনুমোদন পেয়েছে। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘সিনোফার্ম’, আরেকটি ‘বায়োলজিকস’। দুটি টিকাই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে রয়েছে।

করোনা ভাইরাসের টিকা উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে যেসব চেষ্টা চলছে, তার মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকা-অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে ৩০ হাজার অংশগ্রহণকারীর ওপর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এই টিকাটির সব ধরনের আন্তর্জাতিক পরীক্ষা স্থগিত থাকবে, যতদিন না স্বতন্ত্র একজন পরীক্ষক এর নিরাপত্তার বিষয়গুলো যাচাই করে দেখবেন। এরপর তদারকি কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে যে, পুনরায় পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হবে কি না। অক্সফোর্ডের একজন মুখপাত্র জানান, বড় ধরনের পরীক্ষায় অনেক সময় অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। তবে সেটা অবশ্যই স্বতন্ত্র একজন পরীক্ষককে সতর্কভাবে যাচাই করে দেখতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অক্সফোর্ডের এই টিকার পরীক্ষা এর আগেও একবার স্থগিত করা হয়েছিল।

যখন কোনো অংশগ্রহণকারীর অসুস্থতার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, তখন অনেক সময় তাদের হাসপাতালেও ভর্তি করা হয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েকদিনের মধ্যেই আবার পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু করা হবে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন নিয়ে একজনের অসুস্থ হওয়ার ঘটনা জানার পর পৃথিবীতে ভ্যাকসিন নিয়ে যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে সেটি দুঃখজনক। তবে এ ধরনের ঘটনা ব্যতিক্রম নয়। অক্সফোর্ড বা অ্যাস্ট্রাজেনেকার ইতিবাচক বিষয় হলো- তারা বিষয়টি দ্রুত আমলে নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম স্থগিত রেখেছে। এটা স্পষ্টত প্রমাণ করে এই গবেষণার অংশ হিসেবে তারা মানুষের জীবনকে মুনাফার ওপরে স্থান দিয়েছেন। বিজ্ঞানের প্রতি তাদের এই আন্তরিকতা অভিনন্দনযোগ্য। ২০ বা ৫০ হাজার মানুষের ওপর চলমান একটি গবেষণায় যদি একজন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে ওই ভ্যাকসিনের জন্য অসুস্থ-এটা প্রমাণ করে না।

কোভিড-১৯ টিকা উৎপাদনে চেষ্টা করছে, এমন নয়টি প্রতিষ্ঠান গত মঙ্গলবার এক ঘোষণায় নিশ্চিত করেছে যে, টিকা উৎপাদনে তারা সবরকম বৈজ্ঞানিক এবং গুণগত মান বজায় রাখবে।

ওই ঘোষণায় অংশ নেওয়া নয়টি প্রতিষ্ঠানের একটি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, যারা বলছে, তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পরে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের আবেদন করা হবে।

জনসন অ্যান্ড জনসন, বাইয়োএনটেক, গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লেইন, পিফিজের, মের্ক, মডার্না, সানোফি এবং নোভাভ্যাক্স ওই ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ‘তারা সব সময়ই নিরাপত্তা এবং টিকা দেয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দেবে।

যে পর্যায়ে বিভিন্ন ভ্যাকসিন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, টিকা তৈরির বেশিরভাগ প্রচেষ্টাই এখনও প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে রয়েছে। এই ধাপে বিজ্ঞানীরা ভাইরাস বা তার কোনো একটি অংশ তৈরি করেন। সেটি অন্য প্রাণীর ওপর প্রয়োগ করে দেখেন রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ঠিকঠাক সাড়া দিচ্ছে কি না। ১৩৯টি প্রচেষ্টা এখনও এই ধাপে আটকে আছে। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার প্রথম ধাপে সীমিত সংখ্যক মানুষের মধ্যে টিকাটি প্রয়োগ করা হয়। দেখা হয়, প্রি-ক্লিনিক্যাল পর্বে পশুর দেহে যেভাবে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে, মানুষের শরীরেও তা একইভাবে কাজ করছে কি না। বর্তমানে ২৫টি টিকা রয়েছে এই ধাপে। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার দ্বিতীয় ধাপে আছে ১৫টি ভ্যাকসিন। ক্লিনিক্যাল দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে-সম্ভাব্য টিকাটি কতটা নিরাপদ আর তা কোন মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে-সেটি দেখেন বিজ্ঞানীরা। তৃতীয় ধাপে ভ্যাকসিন পরীক্ষায় কার্যকারিতা ও শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকগুলো দেখা হয়। এই ধাপটিতে এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি সম্ভাব্য ভ্যাকসিন পৌঁছাতে পেরেছে। এ ছাড়া পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ভ্যাকসিন বাজারজাতের অনুমোদন দেয় দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

গত জুনে ক্যানসিনো বায়োলোজিক্সের ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে চীনের সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে পরীক্ষায় সফল হয়েছে দাবি করে সরকারি প্রতিষ্ঠান গামালিয়া ইন্সটিটিউটের ভ্যাকসিনের অনুমোদন করেছে রাশিয়া। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার তৃতীয় ধাপে পৌঁছানো সাতটি ভ্যাকসিনের তিনটি চীনের। এর মধ্যে নিষ্ক্রিয় ভাইরাস থেকে টিকা তেরি করেছে সাইনোভেক নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

জুলাইয়ে আরব আমিরাতে চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু করেছে সাইনোফার্ম নামে দেশটির আরেকটি কোম্পানি। শেষ ধাপের এই দৌড়ে আরও আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি এবং অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানিও।

অক্টোবরেই আসছে ফাইজারের টিকা : যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উৎপাদনকারী ফাইজার ইনকর্পোরেশন ও জার্মান জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেক যৌথভাবে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরিতে কাজ করছে।

প্রতিষ্ঠান দুটির বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও টাইম ম্যাগাজিন বলছে, এ বছরের মধ্যেই তারা করোনার টিকা সরবরাহ করতে পারবে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রকদের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়েও আত্মবিশ্বাসী তারা।

সংবাদমাধ্যম দুটির ভাষ্য, চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যেই বাজারে আসতে পারে প্রতিষ্ঠান দুটির করোনা টিকা। বায়োএনটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইউগুর শাহিন জানিয়েছেন, তাদের টিকার চূড়ান্ত ধাপ বা তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা এ মাসের শেষেই শুরু হচ্ছে।

এ পরীক্ষায় ৩০ হাজার মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এ পরীক্ষার ফল চলতি বছরের মধ্যেই জানা যাবে। এরপর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিনটির অনুমোদন চাওয়া হবে।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাইজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যালবার্ট বোরলা বলেছেন, তারা আশা করছেন, আগামী অক্টোবর নাগাদ তাদের ভ্যাকসিনের জন্য ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কাছ থেকে অনুমোদন পেয়ে যাবে। সেপ্টেম্বরে তারা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার ফল জেনে যাবেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যাকসিন কোম্পানি নোভাভ্যাক্স সম্প্রতি জানিয়েছে, তারা সরকারের কাছ থেকে ভ্যাকসিন তৈরির জন্য ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা পাচ্ছে। তারা দ্রুত তাদের ভ্যাকসিন পরীক্ষার গতি বাড়াচ্ছে। এ বছরের শেষ নাগাদ তাদের ভ্যাকসিনটি নিরাপদ কি না-তা জানা যাবে। অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিলকেন ইন্সটিটিউটের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে করোনা ভাইরাসের জন্য ১৯০টি ভ্যাকসিন ও ২৬৩ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নয়নে কাজ চলছে। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রিটিশ-সুইডিশ ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার জোট ভ্যাকসিন তৈরিতে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশেও ঔষধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড ভ্যাকসিন আবিস্কারের ঘোষণা দিয়েছিলো আরও আগেই। সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে গ্লোব বায়োটেকের রিসার্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ড. আসিফ মাহমুদ সাক্ষাৎকারে জানান, আগামী ডিসেম্বর নাগাদ ভ্যাকসিন বাজারজাতকরণের আশা প্রকাশ করেন।

ড. আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা এখনও অ্যানিমেল ট্রায়ালে রয়েছি, সেটা এখনও শেষ হয়নি। অ্যানিমেল ট্রায়াল শেষ করে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হিউম্যান ট্রায়ালের (মানুষের মধ্যে প্রয়োগ) জন্য আবেদন করব। হিউম্যান ট্রায়ালের তিন ধাপ শেষ করে ডিসেম্বর নাগাদ বাজারে আসবে ভ্যাকসিন। এই করোনার ভ্যাকসিনটি আবিষ্কারের ফলে বাংলাদেশের মতো একটি গরিব রাষ্ট্র বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। এটা দেশের জন্য গৌরবের হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের ঔষধ বিশ্বের ৫০টিরও বেশি রাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে এবং সেটা প্রশংসিত হচ্ছে। তাই বাঙালি জাতি যেন করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাকসিনটি আবিষ্কার করতে পারে মহান আল্লাহ সেই তৌফিক দান করুন।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here