মানব জীবনে আধ্যাত্ম্য শিক্ষার গুরুত্ব

0
776

ড. পিয়ার মোহাম্মদ
মানব জীবন মহান আল্লাহ্র এক অনন্য সৃষ্টি। প্রতিটি মানুষ সৃষ্টির পিছনে সৃষ্টিকর্তার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য রয়েছে। মহান প্রভুর প্রতিনিধি এবং সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্ট সেই মানুষ যদি আল্লাহ্ পাকের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বুঝে জীবন পরিচালিত করতে না পারে, তাহলে মানব জীবন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মহান প্রভুর ইচ্ছা অনুসরণ না করে নিজের ইচ্ছামত চললে নিশ্চয় তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেন না। আর প্রভু যদি আমাদের প্রতি অসস্তুষ্ট থাকেন, তাহলে আমাদের পরিণতি সহজেই অনুমেয়। তাহলে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট যে, সফল মানুষ হতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন জীবনের সে উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সে মোতাবেক জীবন পরিচালিত করা। কিন্তু কীভাবে অর্জন করা যাবে সে জ্ঞান?, হ্যাঁ, সে জ্ঞান অর্জনের পথ অবশ্যই আল্লাহ্ সবার জন্য খোলা রেখেছেন, আর তা হলো আধ্যাত্ম্য শিক্ষা। যিনি এ শিক্ষা অর্জন করতে পারে তাঁর কাছে সবই স্পষ্ট হয়ে যায় এবং তিনিই হন সফল মানুষ।

আধ্যাত্ম্য শিক্ষা সম্পর্কে আমাদের মাঝে নানান মত ও পথ রয়েছে। কেউ বলেন, মানুষ ধর্মের প্রাথমিক বিষয়গুলো পালন করতে থাকলে এক পর্যায়ে আপনা আপনিই আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করতে পারে। আবার কেউ বলে থাকেন এটা শিক্ষার বিষয় নয় বরং আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অলৌকিকভাবে পেতে হয়। কেউ আবার শিক্ষাকে বিশ্বাসেই আনতে চান না। আবার এটাও সত্য যে, বিশ্বাসী মাত্রেই আল্লাহ্ এবং রাসুলকে পেতে চান। কিন্তু কিভাবে পাওয়া যাবে, এই বিষয়টি অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেনÑ “আল ইনসানু সিররি ওয়া আনা সিররুহু” অর্থাৎ- মানুষ আমার রহস্য আর আমি মানুষের রহস্য। তাহলে কীভাবে সে রহস্য উদঘাটন করে পাওয়া যাবে আল্লাহ্ ও রাসুলকে? সেটা কি স্বাভাবিকভাবে ধর্ম চর্চার মাধ্যমে নাকি আধ্যাত্ম্য শিক্ষার মাধ্যমে? এ সমস্যার সমাধান কল্পে মানব জীবনে আধ্যাত্ম্য শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু তা বিশ্লেষণ করা দরকার।

আধ্যাত্ম্য শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে জানার আগে জানা দরকার আধ্যাত্মিক শিক্ষ কি? আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যার মাধ্যমে নিজ নিজ ক্বালবকে জাগ্রত করে আত্মশুদ্ধি এবং হুজুরি দিলে ইবাদত ও মোরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে মহান আল্লাহ্ ও হযরত রাসুল (সা.)-কে জানার মাধ্যমে আল্লাহ্ ও রাসুল (সা.)-এর সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপন করে জীবন পরিচালনা করা যায়। এ শিক্ষা এক বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা। এ বিজ্ঞানকে বলা হয় তাসাউফ বিজ্ঞান। মানুষ এ শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমেই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র প্রতিনিধিতে পরিণত হন। মানুষ বুঝতে শিখে ধর্মের নিগূঢ় রহস্য। মানুষের সুযোগ সৃষ্টি হয় প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্কে জানার এবং সে অনুসারে জীবন পরিচালনা করার। এ আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রাণপুরুষ রাহ্মাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)। তিনি কোনো স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসা হতে এ শিক্ষা লাভ করেননি। তিনি আল্লাহ্র ধ্যানে মগ্ন হয়েই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হয়েছিলেন। এ আধ্যাত্মিক শিক্ষা হলো ইসলামের প্রাণ আর শরিয়ত হলো ইসলামের দেহ। তাই আধ্যাত্মিক শিক্ষা ব্যতীত ইসলাম অপূর্ণ। এ শিক্ষা পদ্ধতি মূলত পবিত্র কুরআন এবং ইসলামের ঐশী বাণী থেকৈ উৎপত্তি হয়েছে। এটা বাহ্যিক সূত্র হতে ধারকৃত বা অন্য কোনো ধর্মের প্রভাবে প্রভাবিত ধারণা থেকে উৎসরিত নয়। মানুষ উত্তম চরিত্রে চরিত্রবান হয়ে, আল্লাহ্র গুণ অর্জন করত তাঁর সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম আল্লাহ্র প্রতিনিধি হওয়ার জন্য আধ্যাত্মিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
পৃথিবীতে এমন কোনো ধর্মীয় মহাপুরুষ ছিলেন না, যিনি আধ্যাত্মিক শিক্ষা অনুশীলন করেননি। বরং আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে তাঁরা মহামানবে পরিণত হয়েছেন। আধ্যাত্ম্য সাধনা করেই নবি-রাসুলগণকে রিসালাত লাভ করতে হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবি ইমামুল মুরসালিন হযরত মোহাম্মদ (সা.) হেরা গুহায় দীর্ঘ ১৫ বছর আধ্যাত্মিক সাধনা করে আল্লাহ্ পাকের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং রিসালাত তথা মোহাম্মদী ইসলাম ধর্মের প্রচারের দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। আধ্যাত্ম্য সাধনার মাধ্যমে তিনি শুনতে পান প্রথম ঐশী বাণী “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক্ব” অর্থাৎ- “হে মোহাম্মদ! পড়ুন, আপনার প্রভুর নামে।” (সূরা আলাক: আয়াত-১) তারপরই তিনি মোহাম্মদী ইসলামের ধর্মের প্রচার এবং ধর্মের বিধি-বিধান চালু করতে শুরু করেন। তাহলে যারা বলেন- শরিয়ত চর্চার মাধ্যমে মারেফত আসে তাদের কথা মোটেই মেনে নেওয়া যায়না। বরং বলা যায় মারেফত চর্চা করলে শরিয়ত এমনিতেই এসে যায়। আবার নবি করিম (সা.) নিজেই বলেছেন “আস শারিয়াতু আকওয়ালী, ওয়াত্তারিক্বাতু আফ’আলী ওয়াল হাকিকাতু আহ্ওয়ালী ওয়াল মারেফাতু আসরারী” অর্থাৎ- শরিয়ত আমার কথা, তরিকত আমার কাজ, হকিকত আমার অবস্থা এবং মারেফত (আধ্যাত্মিকতা) আমার নিগূঢ় রহস্য। তাহলে স্পষ্ট যে, ধর্মের নিগূঢ় রহস্য অনুধাবন করতে হলে মারেফত বা আধ্যাত্মিক চর্চার কোনো বিকল্প নেই। কোনো বিষয়ের নিগূঢ় রহস্য বুঝা গেলেই তার স্বাদ বুঝা যায়। কাজেই ইসলামের পূর্ণাঙ্গ স্বাদ বুঝতে অবশ্যই আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। মানুষকে মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তাঁর প্রতিনিধিত্ব করতে হলে তাঁর সাথে যোগাযোগ হওয়া শর্ত। কারো সাথে যোগাযোগ না হলে তার প্রতিনিধিত্ব করা যায় কীভাবে? কোনো সভায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যোগদান করতে না পারলে তার প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। সে প্রতিনিধি সভায় যাওয়ায় পূর্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে বসে আলোচ্য বিষয়ে বক্তব্য নির্ধারণ করে সভায় যোগদান করেন এবং সেভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উপস্থাপন করেন। তাহলে আমরা আমাদের মালিকের সাথে যোগাযোগ না করে প্রতিনিধিত্ব করব কীভাবে? সেজন্য প্রয়োজন হবে মহান প্রভুর সাথে যোগাযোগ করার বিদ্যা অর্জন করা। সেই বিদ্যাইতো আধ্যাত্মিক শিক্ষা। আল্লাহ্র প্রতিনিধিত্ব করবার জন্য অবশ্যই আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে তাঁর সাথে যোগাযোগের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কেনানা এ সাধনার মাধ্যমেই নবি-রাসুলগণ আল্লাহ্ পাকের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। মেশকাত শরীফে বর্ণিত হয়েছে, হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- “ইন্নাল্লাহা খালাক্বা আদামা আলা সুরাতিহি” অর্থাৎ- “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আদমকেই তাঁর নিজ সুরতে সৃজন করেছেন।” যেহেতু আদম তথা মানুষকে আল্লাহ্ নিজ সুরতে সৃষ্টি করেছেন, তাই মানুষের পক্ষে আল্লাহ্র দর্শন লাভ করা অসম্ভব নয়। এ দর্শন এবং যোগাযোগ একমাত্র আধ্যাত্মিক বিদ্যার মাধ্যমেই সম্ভব। পবিত্র কুরআনেও আল্লাহ্ বলেন- “ওয়াফি আনফুসিকুম আফালা তুফসিরুন” অর্থাৎ- “আমি (আল্লাহ্) তোমাদের দিলে অবস্থান করি তোমরা কী দেখ না?” (সূরা আয যারিয়াত ৫১: আয়াত-২১)। হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- “আমার প্রভুকে আমি অতি উত্তম সুরতে দেখেছি।” এতে বুঝা যায় আধ্যাত্মিক জ্ঞানে জ্ঞানী হওয়া গেলে আল্লাহ্র পরিচয় পাওয়া সম্ভব হবে। হযরত রাসুল (সা.) অন্যত্র বলেন, “মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বুহু” অর্থাৎÑ যে নিজেকে চিনেছে সে তার প্রভুকে চিনেছে। এ চেনার জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শিক্ষা। এ শিক্ষা অনুশীলনের মাধ্যমেই মানুষের অন্তরচক্ষু জাগ্রত করা সম্ভব। আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন- “চোখের অন্ধ অন্ধ নয় বরং অন্তরচক্ষুর অন্ধই প্রকৃত অন্ধ’ (সূরা আল হাজ ২২ : আয়াত ৪৬)। অন্যত্র আল্লাহ্ পাক বলেন- “যে এ পৃথিবীতে অন্ধ রইল, সে পরকালেও অন্ধ থাকবে এবং সে পথভ্রষ্ট।” (সূরা বনী ইসরাইল ১৭ : আয়াত-৭৪)। আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন এবং তার চর্চার মাধ্যমেই অন্তরচক্ষু খোলা সম্ভব। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ্ ফরমান- “বান্দা নফল এবাদত দ্বারা আমার এত নিকটবর্তী হয়ে যায় যে, আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি, আর যখন আমি ভালোবাসতে থাকি তার কর্ণ হয়ে যাই, যে কর্ণ দ্বারা সে শোনে, চক্ষু হয়ে যাই, যে চক্ষু দিয়ে সে দেখে; হাত হয়ে যাই, যে হাত দিয়ে ধরে; পা হয়ে যাই, যে পা দিয়ে সে হাঁটে; কোনো বিষয়ে প্রার্থনা করা মাত্র আমি অবশ্যই তা দান করে থাকি এবং কোনো বিষয়ে ক্ষমা চাওয়া মাত্র আমি অবশ্যই তা মাফ করে থাকি (বোখারী শরীফ)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ করেন- “আল্লাহু ওয়ালিয়্যুল লাজিনা আমানু” অর্থাৎ- “যারা মু’মিন আল্লাহ্ তাদের অভিভাবক।” (সূরা বাকারা ২ : আয়াত ২৫৭)। এতে বুঝা যায়, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আমাদের ভিতরেই থাকেন। সুতরাং আধ্যাত্ম্য জ্ঞান সাধনার মাধ্যমেই তাঁর সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমরা রাসুল (সা.)-এর বিভিন্ন সুন্নত মেনে চলি বটে কিন্তু তিনি যে দীর্ঘ ১৫ বছর ধ্যান বা আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে আল্লাহ্কে পেয়েছেন সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি পালন করতে আমরা মোটেই আগ্রহী নই। আমাদের সমাজ থেকে আজ সে আধ্যাত্মিক সাধনা বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। সে কারণেই সমাজে শুরু হয়েছে মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা-বিদ্বেষ এবং সমাজে দেখা দিয়েছে চরম অরজাকতা। প্রকৃতপক্ষে নবি-রাসুলগণ আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমেই মহান প্রভুর নুরময় সত্তা নিজ হৃদয়ে ধারণ করে নিজেরা যেমন আল্লাহ্ওয়ালা হয়েছেন, তেমনি মানুষকেও আল্লাহ্র সন্ধান দিতে সক্ষম হয়েছেন। নবি-রাসুলগণের এই বিদ্যার নামই হলো এলমে তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক বিদ্যা। এই বিদ্যার মাধ্যমেই আত্মশুদ্ধি লাভ করা যায় এবং তার পাশাপাশি বিপদ, আপদ, বালা মসিবত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। একমাত্র এ বিদ্যা অর্জনের মাধ্যমেই আল্লাহ্ ও রাসুল (সা.)-এর দিদার লাভের পাশাপাশি রহমত-বরকত ও নেয়ামত লাভ করা যায়। নবুয়তের যুগে নবি-রাসুলগণ এবং বেলায়েতের যুগে অলী-আল্লাহ্গণের হৃদয়ে আল্লাহ্র সত্তা জাগ্রত অবস্থায় বিরাজ করে। মানুষ তাঁদের সংস্পর্শে এসে আধ্যাত্মিক সাধনা করলে তাদের হৃদয়ও আল্লাহ্র নুরে আলোকিত হয়। আল্লাহ্ তায়ালার এ নুর হৃদয়ে ধারণ ছাড়া ইমানদার হওয়া যায় না। মানুষ আল্লাহ্ নামের বীজ বুকে ধারণ করে ইমানদার না হতে পারলে সে আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবানও হতে পারে না। কাজেই মুমেন হতে হলে একমাত্র উপায় হলো আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জন করা। সর্বযুগে মুমেন হওয়ার এটাই চিরন্তন বিধান।

আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমেই নিজের হৃদয়ের ষড়রিপুকে পরিশুদ্ধ করে আত্মশুদ্ধি লাভ করতে হয়। সেজন্য হযরত রাসুল (সা.) সাহাবিদের প্রথমেই তাঁদের ক্বালবে আল্লাহ্ নামের জ্বিকির স্থাপন করে আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিয়েছিলেন। এ আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ জীবন তথা শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন করা সম্ভব। হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রধান শিক্ষাই ছিল আত্মশুদ্ধি, ক্বালবে আল্লাহ্র জ্বিকির এবং একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করা। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন- “ক্বাদ আফলাহা মান তাজাক্বা ওয়া জাকারাছমা রাব্বিহি ফাছাল্লা” অর্থাৎ- “সেই সফলকাম যে আত্মশুদ্ধি লাভ করেছে, ক্বালবে আল্লাহ্ নামের জ্বিকির জারি করেছে এবং একাগ্রচিত্তে নামাজ আদায় করেছে।” (সূরা আলা ৮৭ : আয়াত ১৪-১৫)। পবিত্র কুরাআনে অন্যত্র বলা হয়েছে আরো বলা হয়েছে “ক্বাদ আফলাহা মান যাক্কাহা ওয়া ক্বাদ খাবা মান দাচ্ছাহা” অর্থাৎ- “যে ব্যক্তি আত্মাকে পুত:পবিত্র রাখল, যে সাফল্য লাভ করলো। আর যে ব্যক্তি আত্মাকে কলুষিত করলো, সে ধ্বংস হয়ে গেল।” (সূরা শামস ৯১: আয়াত ৯-১০)। পবিত্র কুরআনে আরো বলা হয়েছে “সেই দিন (কেয়ামত) ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোনো উপকারে আসবেনা, কেবল সেই ব্যক্তি লাভবান হবে, যে আল্লাহ্র নিকট পরিশুদ্ধ হৃদয় (আত্মা) নিয়ে হাজির হবে।” (সূরা : শুআরা ২৬ : আয়াত ৮৮-৮৯)। এ আত্মশুদ্ধির একমাত্র উপায় হলো আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জন করে সে মোতাবেক জীবন পরিচালিত করা।

অনেকে অবশ্য বলে থাকেন- নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। মহামানবগণও তাই বলেছেন। নামাজ একটি আধ্যাত্মিক সাধনার বিষয়। রাহ্মাতুল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ (সা.) যখন মেরাজে গিয়ে আল্লাহ্র দিদার প্রাপ্ত হলেন, তখন মহান আল্লাহ্র কাছে তাঁর প্রশ্ন ছিল আমার উম্মতের সাথে আপনার সাক্ষাৎ কীভাবে হবে? জবাবে আল্লাহ্ পাক বলেছিলেন, নামাজের মাধ্যমে আপনার উম্মতের সাথে সাক্ষাৎ হবে। আল্লাহ্ সত্য, আল্লাহ্র বাণী সত্য। নামাজে আল্লাহ্র সাথে সাক্ষাৎ হবে তাও সত্য। কিন্তু তা হচ্ছে না কেন? তাহলে বুঝতে হবে নিশ্চয় আমাদের নামাজ সাধনায় সমস্যা আছে। আমরা নিশ্চয় সে নামাজ পড়তে জানিনা, যে নামাজ পড়লে আল্লাহ্র দিদার লাভ করা যায়। সে নামাজ শিক্ষা করে আল্লাহ্র নৈকট্য তথা দিদার লাভ করার নামইতো আধ্যাত্মিক শিক্ষা। সাধনা করেই এ বিদ্যা অর্জন করতে হয়। আকাশ কুসুম কল্পনা করে বা সাত আসমানের ওপর আল্লাহ্ তায়ালাকে বসিয়ে রেখে আল্লাহ্কে পাওয়া যায় না। আল্লাহ্র রাহে ধ্যান করেই নিজ নিজ ক্বালব-এর নাফসির মোকামে আল্লাহ্কে পেতে হয়, এছাড়া আল্লাহ্কে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সকল মানুষের সাথেই আছেন। আমাদের জন্মের পূর্বে মাতৃগর্ভে আল্লাহ্র সাথে যোগাযোগ থাকে বলেই মাতৃগর্ভে শিশুরা আল্লাহ্র দিকে এক ধ্যানে মগ্ন হয়ে আনন্দেই বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু ভূমিষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই সে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে কাঁদতে থাকে। আবার সাধনার মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেই সে যোগাযোগ যিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তিনিই সফলকাম হয়ে মাতৃগর্ভের সেই পরিতৃপ্তি অনুভব করে থাকেন। পৃথিবীতে মানুষের একমাত্র কাজই হলো সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়ে, তা আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য পালনের মাধ্যমে ইহলৌকিক জীবনকে আল্লাহ্মুখী করে পারলৌকিক মুক্তি অর্জন করা। এর ব্যত্যয় ঘটলে ইহকাল ও পরকাল উভয় ক্ষেত্রেই তার জন্য অপেক্ষা করে মহাবিপদ। অথচ এ চরম সত্যটি আমরা সহসাই অনুধাবন করতে পারি না। সেখানেই আফসোস। সমস্যা হলো আধ্যাত্মিক বিষয়টা পরিস্কার করে সর্বসাধারণকে বুঝানো যায় না। সেজন্য আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুশ বিশ্বাসে আসে না। আধ্যাত্মিক বিষয়টাও প্রকৃত অর্থে আশেকের সাথে মাশুকের রূহানি জগতের প্রেম বা ভালোবাসার বিষয়। আশেক মাত্রেই বুঝতে পারেন এ প্রেমের মাহাত্ম্য।

যে কোনো বিষয় বুঝতে হলে তার নিগূঢ় রহস্য জানা জরুরি। নিগূঢ় রহস্য না জানতে পারলে হয়ত দলে বলে থাকা যাবে কিন্তু প্রকৃত বিষয় বুঝা যাবে না। একমাত্র আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে ধর্ম চর্চা করতে পারলেই বুঝা যাবে ধর্ম কি এবং ধর্মের কি সাধ, কি তার প্রকৃত রূপ। একমাত্র আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমে দিল জিন্দা করা যায় এবং ক্বালবে আল্লাহ্র জ্বিকির জারি হয়। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুর’আনে এরশাদ হয়েছে- “ফাওয়াইলুল্লিল কাছিয়াতি কুলুবুহুম মিন জ্বিকরিল্লাহি উলাইকা ফি দ্বালালিম মুবিন” অর্থাৎ- “যাদের ক্বালব আল্লাহ্র জ্বিকির থেকে গাফেল রয়েছে তারা প্রকাশ্যে গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট।” (সূরা যুমার ৩৯ : আয়াত ২২)। পবিত্র কুর’আনে আরো বলা হয়েছে- “তোমরা যখন নামাজ শেষ করো তখন দাঁড়ানো, বসা ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহ্র জ্বিকির করো।” (সূরা নিসা ৪ : আয়াত ১০৩)।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কিভাবে এ সাধনা করা যায় বা কিভাবে এ বিদ্যা অর্জন করে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভ করা যায়? আমাদের প্রিয় নবি হযরত মোহাম্মদ (সা.) ছিলেন এই বিষয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি স্বয়ং আল্লাহ্ পাকের কাছ থেকেই এ শিক্ষা অর্জন করেছিলেন এবং কুল কায়েনাতের শিক্ষক ও রহমত হিসেবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষা যিনি অর্জন করেছেন এবং সিরাজাম মুনিরার অধিকারী হয়েছেন, তিনি এ শিক্ষা দিতে পারেন। একজন প্রকৃত অলী-আল্লাহ্ই পারেন মানুষকে আল্লাহ্র পথ দেখাতে। শেষ নবি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পরে পৃথিবীতে আর কোনো নবি বা রাসুলের আবির্ভাব ঘটবে না। বেলায়েতের এ যুগে কিয়ামত পর্যন্ত অলী-আল্লাহ্গণ রাসুল (সা.)-এর শিক্ষা দিয়ে যাবেন। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “হে বিশ্বাসী বান্দারা! তোমরা আল্লাহ্কে ভয় করো এবং আল্লাহ্কে পাওয়ার জন্য অসিলা অন্বেষণ করো।” (সূরা মায়েদা ৫ : আয়াত ৩৫)। আরো বলা হয়েছে- “আর রাহমানু ফাসআল বিহি খাবিরা” অর্থাৎ- “তোমরা যদি রহমান (আল্লাহ্) সম্পর্কে জানতে চাও, তবে যিনি তাঁর সম্পর্কে জানেন তাকে জিজ্ঞেস করো।” (সূরা ফুরকান ২৫ : আয়াত ৫৯)। বন্ধুর পরিচয় যেমন বন্ধু জানেন, অনুরূপভাবে আল্লাহ্র পরিচয় জানেন অলী-আল্লাহ্ বা আল্লাহ্র বন্ধুগণ। তাঁদের সংস্পর্শে গিয়েই আল্লাহ্র পরিচয় পাওয়া সম্ভব।

অলী-আল্লাহ্গণ প্রকৃতপক্ষে জ্বলন্ত প্রদীপের মতো। এ প্রদীপের সংস্পর্শে আসলে পথহারা মানুষের নিভে যাওয়া প্রদীপ আস্তে আস্তে জ্বলে উঠে। সিরাজুম মুনিরার আলোয় আলোকিত হয় এবং প্রকৃত ইমানদার হয়ে জীবন যাপন করতে পারে। আল্লাহ্ রাসুলের সাথে পরামর্শ করে জীবন চালাতে পারে। ক্বালবে আল্লাহ্র জ্বিকির চালু করে ঐ জ্বিকির নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে। হাদিস শরীফে আল্লাহ্র রাসুল ফমরমান- “যে ব্যক্তি তার জামানার ইমাম বা মোজাদ্দেদকে চিনতে পারেনি, আর এ অবস্থায় সে মৃত্যু বরণ করলো, তবে তার মৃত্যু অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।” (আবু দাউদ শরীফ ও মেশকাত শরীফ) প্রকৃতপক্ষে একজন মোকাম্মেল পির যখন তাঁর মুরিদের ক্বালবে প্রজ্বলিত নূর প্রবেশ করিয়ে দেন তখন মুরিদের আত্মার কু-রিপুসমূহ দমন হতে থাকে। ফলে উক্ত নুরের জ্যোতিতে মুরিদের অন্ধকার হৃদয় আলোকিত হয়ে যায়। তাই মোর্শেদ ছাড়া আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জন করা যায় না। হাদিস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- তাখাল্লাকু বি আখলাকিল্লাহ” অর্থাৎ- “তোমরা আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হও। আল্লাহ্র চরিত্রে চরিত্রবান হতে হলেই মোর্শেদের সাহচর্যে আসা প্রয়োজন।” অধিকাংশ মানুষই আল্লাহ্ ও রাসূলকে পেতে চায় কিন্তু কিভাবে পাওয়া যাবে সে বিষয়টি জানা নেই। তাদের উদ্দেশ্যে বলা যায়, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে আর দেরী না করে একজন মোকাম্মেল অলী-আল্লাহ্র দরবারে এসে তাঁর পথ অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করা দরকার। তাহলেই জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে ধন্য হওয়া যাবে, সার্থক হবে মানব জীবন।

হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- মানুষের মৃত্যুর সময় তাকে তিনটি প্রশ্ন করা হবে; যখা- মার রাব্বুকা, ওমা দ্বিনুকা, ওমান নাবিয়্যুকা, আওমান হাজার রাজুল।” অর্থাৎ- তোমার প্রভু কে? তোমার নবি কে? অথবা হযরত রাসূল (স:)-কে দেখিয়ে বলা হবে এ ব্যক্তি কে? যিনি রাসুল (সা.)-কে চিনতে পারবেন, তিনিই এ প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হবেন। অন্যথায় বলবে ‘হা হা লা আদরী’ অর্থাৎ- আফসোস! আফসোস! আমি জানি না। পরকালের এ তিনটি প্রশ্নের জবাব ইহকালেই প্রস্তুত করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জন করে রাসুল (সা.)-এর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে নেওয়া। তাহলে আর কোনো ভয় থাকবে না। প্রভুর সাথে যোগাযোগের পাঁচটি মাধ্যম রয়েছে যথা- কাশ্ফ, ফায়েজ, এলহাম, মোরাকাবা ও স্বপ্ন। মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ্র বাসস্থান। যুগে যুগে যত মহামানব আল্লাহ্কে পেয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকেই হৃদয় মাঝে অনুসন্ধান করে প্রভুর পরিচয় লাভ করেছেন। এর একমাত্র উপায় আধ্যাত্মিক বিদ্যা চর্চার মাধ্যমে চেষ্টা করা। এ চেষ্টা একজন মোকাম্মেল অলী-আল্লাহ্র সাহচর্যে থেকে তাঁর সাহায্য নিয়ে পর্যায়ক্রমে ক্বালব এর ছুদুর, নশর, শামছি, নুরি, কুর্ব ও মকিম এই ৬টি স্তর পার হয়ে নাফসির মোকামে পৌঁছাতে পারলেই তার পক্ষে মহান আল্লাহ্র সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য হয়। সেজন্য প্রয়োজন হয় পার্থিব চিন্তা ভুলে গিয়ে আল্লাহ্র চিন্তায় নিমগ্ন থাকা। হাদিস শরীফে আছে “মুতু ক্বাবলা আনতা মউত” অর্থাৎ- “তোমারা মৃত্যুর পূর্বে মরে যাও।” এভাবেই সাধনা করলে মালিককে পাওয়া যায়। আমাদের মহান মোর্শেদ, সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেব্লাজান যুগের ইমাম হিসেবে মানুষের মুক্তির জন্য এই আধ্যাত্ম্য শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সোহবতে থেকে আধ্যাত্মিক সাধনা করে অনেকেই জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য খুঁজে পেয়ে সফলকাম হচ্ছেন। তাঁর পুণ্যময় পরশে মুরিদের ক্বালবে ততক্ষণাৎ আল্লাহ্র জ্বিকির চালু হয়ে যায়। তাঁর নির্দেশনা মোতাবেক আমল করে মুক্তির সন্ধান পাওয়া সম্ভব। আমাদের অন্তরের একান্ত কামনা- মহান আল্লাহ্ যেন আমাদেরকে তাঁর গোলাম হিসেবে কবুল করে আধ্যাত্ম্য শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মুক্তির পথের সন্ধান দান করেন। আমিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here