মানব জীবনে ইমানের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0
1088

আশেকে রাসুল এমরান হোসাইন মাজহারী

মানব জীবনে ইমান এক অমূল্য সম্পদ। ইমান অর্জনের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ্র প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়। সুতরাং আমাদের জানা প্রয়োজন ইমান কী? ইমানের অবস্থান কোথায়? মানব জীবনে ইমানের গুরুত্ব কতটুকু? এবং কীভাবে ইমানদার হওয়া যায়?

ইমান আরবি শব্দ এর বাংলা অর্থ হল বিশ্বাস। ইমানের বিশদ ব্যাখ্যায় ইমানে মোফাচ্ছালে উল্লেখ রয়েছে, (১) আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, (২) ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, (৩) আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, (৪) রাসুলগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, (৫) পরকালের প্রতি বিশ্বাস, (৬) তাকদিরের ভালোমন্দ সকল বিষয় আল্লাহর পক্ষ থেকে হয় বিশ্বাস স্থাপন এবং (৭) মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হতে হবে বিশ্বাস স্থাপন করা। এই সাতটি বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করাকে ইমান বলে।

ইমানের ৩টি স্তর রয়েছে, (১) এলমুল ইয়াকি অর্থা জ্ঞানের দ্বারা অর্জিত বিশ্বাস, (২) আইনুল ইয়াকিন অর্থাৎ সাধনার মাধ্যমে চক্ষু দ্বারা দেখে অর্জিত বিশ্বাস এটি, (৩) হাক্কুল ইয়াকিন অর্থাৎ সাধনার মাধ্যমে নিজের মাঝে পরিপূর্ণ উপলব্ধির দ্বারা বিশ্বাস।

ইমানের অবস্থান ক্বালব বা অন্তরের মাঝে। আর এটি হলো একটি নুর বিশেষ। হাদিস শরিফে হযরত রাসুল (সা.) ফরমান- “ইমান হলো নূর বা আলো। আর কুফর হলো অন্ধকার।” আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন- “তোমাদের ক্বালবে এখনও ইমান প্রবেশ করে নাই।” (সুরা হুজরাত-আয়াত ১৪)। ইমানের অবস্থান সম্পর্কে যুগের ইমাম সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন- ইমান থাকে ক্বালবের মাঝে। আর মাথায় থাকে জ্ঞান। মানুষ জাগতিকভাবে যত বড় জ্ঞানী হোক না কেন, সে ইমানদার হয় না; যতক্ষণ ইমানের নূর ক্বালবে ধারণ না করে। এ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, ইমান বাহিরে কোথাও অবস্থান করে না। ইমানের অবস্থান হলো মানুষের ক্বালবের মাঝে।

মানব জীবন ইমানের গুরুত্ব অপরিসীম। ইমানের বলেই মানুষ বলিয়ান হয়। ইমানের আলোতেই মানুষ আলোকিত হয়। আমরা দেখতে পাই আলোকিত মানুষ চাই বলে স্লোগান রয়েছে। মূলত যিনি ইমানের আলো দ্বারা নিজেকে আলোকিত করতে পেরেছেন, তিনিই আলোকিত মানুষ।

মানব জীবনে ইমানের গুরুত্ব সম্পর্কে যুগের ইমাম আল্লাহর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলা বলেন, ইমানের আলো দ্বারা দেহকে আলোকিত করতে পারলে, দেহ থেকে অন্ধকারের চরিত্র দূর হয়ে যায়। মানুষটি আলোর চরিত্রে চরিত্রবান হয়। আর এ মানুষটিই হলো আলোকিত মানুষ।

সুতরাং আলোকিত মানুষ হতে হলে আমাদেরকে ইমানের আলো দ্বারা আলোকিত হতে হবে। বর্বর আরব জাতির নিকট ইমান না থাকার কারণে তারা নানান পাপকর্মে লিপ্ত ছিল। যখন তারা হযরত রাসুল (সা.) এর সান্নিধ্য লাভ করে ইমানের আলো দ্বারা নিজেদেরকে আলোকিত করতে সক্ষম হলো, তখন তাঁরাই নক্ষত্র তুল্য হয়েছিল। হযরত রাসুল (সা.) তাদের শানে এরশাদ করেছেন, আমার সাহাবিরা নক্ষত্রতুল্য। মানুষ যদি ইমানদার হতে পারে, তাহলে এ ইমানই তাকে আদর্শ চরিত্রের অধিকারী বানায়, ইমানের আলো দ্বারা সে দেখতে পায়, কোন পথ হক, কোন পথ না হক, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোন পথটি সিরাতুল মোস্তাকিমের পথ।

আজ আমাদের ইমান না থাকার কারণে এক কাপ চায়ের বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে আমরা দ্বিধাবোধ করি না। অথচ মানুষের জীবনের চেয়ে ইমানের মূল্য অনেক বেশি। সাহাবায়ে কেরামের যুগে এমন ছিল না। জীবন চলে গেলেও একটা মিথ্যা কথা বলতেন না, ইমানকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁরা জীবনকে উৎসর্গ করে দিয়েছেন। আজকে মিথ্যা কথা বলতে আমাদের মুখে বাঁধে না। অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম, বোমাবাজী নির্যাতন করতে আমাদের বিবেকে বাধা দেয় না। কারণ আমাদের মাঝে ইমানের নুর নেই। ইমানের শিক্ষা আমাদের সমাজে নেই। ইমানই ব্যক্তিকে শুদ্ধ করে দিবে। ব্যক্তি শুদ্ধ না হলে সমাজ শুদ্ধ হবে না, ব্যক্তি শুদ্ধির মাধ্যমেই সমাজ শুদ্ধ হবে। সমাজ শুদ্ধের মাধ্যমে দেশ শুদ্ধ হবে, জাতি শুদ্ধ হবে। সুতরাং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তি শুদ্ধির প্রয়োজন। একমাত্র ইমানই পারে মানুষকে শুদ্ধ করতে। মানুষ যদি ইমানদার হয়, মুমেন হয়, তখনই আত্মশুদ্ধি হয়ে যাবে। আত্মশুদ্ধি লাভকারী ব্যক্তির দ্বারা কোনো পাপকাজ করা সম্ভব নয়।

আমরা যদি ইমানদার হতে পারি, মুমেন হতে পারি, আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর নুর প্রজ্বলিত করতে পারি, তাহলে সমাজে মারামারি, কাটাকাটি, হিংসা-বিদ্বেষ, বোমাবাজী, জুলুম, অত্যাচার এগুলো থাকবে না। তখন আসবে আমাদের মাঝে শান্তির চরিত্র। চরিত্রই হলো ধর্মের মূল। যার চরিত্র নেই, তার কোনো ধর্ম নেই। সুতরাং আমরা ইমানদার না হলে আদর্শ চরিত্রের অধিকারী হতে পারব না। আমাদের ইমানদার হওয়ার শিক্ষা অর্জন করে শান্তির চরিত্রের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। অন্ধকার রাত্রে হাতে টর্চলাইল থাকলে যেমন রাস্তা চলতে অসুবিধা হয় না। তদ্রূপ ইমানের আলো দ্বারা নিজেকে আলোকিত করেত পারলে জীবনে চলার পথে কোনো অসুবিধা হবে না।

মহান রাব্বুল আলামিন নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ ধর্মের বিধি-বিধান, ইমানদারের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন। সুতরাং ইমান বিহনে ইবাদত বন্দেগি আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। সুতরাং মানবজীবনে ইমানের গুরুত্ব অপরিসীম।

মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন জগতের মানুষকে ইমানদার বানানোর জন্য একের পর এক নবি ও রাসুলকে পাঠিয়েছেন। নবি-রাসুল মহামানবগণ এসে অনন্ধকার যুগে যারা সত্যের পথ সম্পর্কে অবগত ছিল না, তাদেরকে সত্যের পথের সন্ধান দিয়েছেন, আলোর সন্ধান দিয়েছেন, মানুষকে ইমানদার হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁরা শিক্ষক হয়ে জগতের বুকে আগমন করেছেন। নবি-রাসুলগণের জামানায় তাঁদের সান্নিধ্য লাভ করেই মানুষ ইমানদার হয়েছিলেন। আর তাঁদের অবর্তমানে বেলায়েতের যুগে হাদি শ্রেণির অলী আল্লাহ্দেরকে আল্লাহ্ তায়ালা জগতের মাঝে প্রেরণ করেন। তাঁদের সান্নিধ্যে গিয়েই মানুষকে ইমানদার হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়।

এই সম্পর্কে যুগের ইমাম আল্লাহর মহান বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান বলেন, মানুষ একাকী সাধনা করে ইমানদার হতে পারে না, যেমনিভাবে কোন মানুষ একাকী সাধনা করে এমএ পাশ করতে পারে না। যদি এমএ পাশ করতে চায় নিয়ম অনুযায়ী স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ধাপে ধাপে পড়াশোনা করে এমএ পাশ করতে হয়। তদ্রূপ ইমানদার হওয়ার জন্য ইমানদার বানানোর শিক্ষক তথা নবি, রাসুল আওলিয়ায়ে কেরামের সান্নিধ্যে গিয়ে তাদের কাছ থেকে ইমানের ‘নুর’ ক্বালবে ধারণ করে সাধনার মাধ্যমে ইমানদার হতে হয়। তাঁদের সান্নিধ্যে না গিয়ে ইমানদার হওয়া সম্ভব নয়। বীজ বিহনে যেমন গাছ হয় না, তদ্রূপ ইমানের বীজ ক্বালবে ধারণ ব্যতীত ইমানদার হওয়া যায় না।

ইমান পড়ার বিষয় নয়, ইহা ক্বালবে ধারণ করার বিষয়। হযরত রাসুল (সা.)-এর আগমনের পূর্ব যুগকে অন্ধকারের যুগ বলা হয়। তাদের নিকট জাগতিক আলো উপস্থিত থাকার পরও তাদেরকে অন্ধকারের যুগ বলা হয় কেন? আসলে তাদের নিকট ছিল না ইমানের আলো। অন্ধকারের যুগে ইমানের প্রদীপ হয়ে আগমন করেছিলেন হযরত রাসুল (সা.)। সেই বর্বর জাতি হযরত রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্যে গিয়ে তাঁর কাছ থেকে ইমানের নুর হাসিল করে নিজেদেরকে ইমানদার বানিয়েছিলেন। তারা যদি হযরত রাসুল (সা.)-এর সান্নিধ্যে না যেতেন, ইমানদার হতে পারতেন না। বেলায়েতের যুগে আওলিয়ায়ে কেরাম হযরত রাসুল (সা.)-এর সিরাজুম মুনিরা তথা ঈমানের প্রদীপকে সিনায় ধারণ করে জগতে আগমন করেন। তাঁদের সান্নিধ্যে গিয়ে ইমানের নুর ক্বালবে ধারণ করা ব্যতীত মানুষ ইমানদার হতে পারবে না।

আমাদের ইমানদার হতে হলে আওলিয়ায়ে কেরামের সান্নিধ্য লাভ করইে ইমানদার হতে হবে। কেননা, তাঁদের সিনায় ইমানের বিশেষ নুর সংরক্ষিত অবস্থায় আছে। বর্তমান যুগের মানুষ যেন ইমানদার হয়ে আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর নৈকট্য লাভ করতে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন দয়া করে তাঁর প্রিয় বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত শাহ্ দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানকে সিরাজুম মুনিরার ধারক ও বাহক করে এই বাংলার জমিনে প্রেরণ করেছেন। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তাঁর সান্নিধ্য লাভ করে তাঁর পক্ষ থেকে ইমানের নুর নিজেদের ক্বালবে ধারণ করে মুমেনে পরিণত হচ্ছেন।

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে যেন তাঁর প্রিয় বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত শাহ্ দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজানের সান্নিধ্যে এসে নুরে ইমান নিজেদের ক্বালবে অর্জনের মাধ্যমে কামেল ইমানদার হওয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন
[লেখক : সদস্য, আল কুরআন গবেষণা কেন্দ্র, দেওয়ানবাগ শরীফ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here