মাল্টিভার্স: অন্য এক মহাজগৎ

0
161

এস. কবির

অন্য গ্রহ নিয়ে যেমন মানুষের আগ্রহ রয়েছে, তেমনি অন্য জগৎ নিয়েও মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। আর অন্য জগৎ নিয়ে হয়েছে বিপুল গবেষণাও। তাই সে তৃষ্ণা মেটানোর চেষ্টায় আজকে আলোচনা করব মাল্টিভার্স বা একাধিক মহাজগৎ নিয়ে।

মহাজগৎ হলো এমন এক জায়গা যেখানে অসংখ্য ছায়াপথ, গ্রহ, নক্ষত্র, ইত্যাদি মহাজাগতিক বস্তু বিদ্যমান। একটি ইউনিভার্স বা মহাজগতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ছায়াপথ বা গ্যালাক্সি থাকে। আর প্রতিটি ছায়াপথে থাকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র। প্রতিটি নক্ষত্র নিয়ে তৈরি হয় একেকটি সৌরজগৎ। তবে সৌরজগতে গ্রহ, উপগ্রহের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। আমাদের পৃথিবী ‘সূর্য’ নামক নক্ষত্রের অধীনে এবং আকাশ গঙ্গা/মিল্কিওয়ে নামক গ্যালাক্সিতে অবস্থিত। ধারণা করা হয়, মিল্কিওয়ের ব্যাস ১০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।

এগুলো গেলো প্রাথমিক কথা। এখন চলুন রহস্যময় ইউনিভার্স বা ব্রহ্মাণ্ডের দিকে। মনে রাখতে হবে, ইউনিভার্স বা ব্রহ্মাণ্ড বলতে শুধুমাত্র অবজার্ভে বল ইউনিভার্স বা দৃশ্যমান মহাজগৎকে বুঝায়। এখন পর্যন্ত আমরা মাত্র ৯০ বিলিয়ন আলোক বর্ষ পর্যন্ত রহস্য ভেদ করতে পেরেছি। তাই ৯০ বিলিয়ন আলোক বর্ষ পর্যন্তই আমাদের ব্রহ্মাণ্ড।

অবজার্ভে বল ইউনিভার্স/দৃশ্যমান মহাজগৎ

কোনো কিছুর আকার-আকৃতি, আয়তন, উপাদান জানার একটিই উপায়- ঐ বস্তুটিকে বস্তুর বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ বা ড়নংবৎাব করতে হবে। আমরা আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে এখনো বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করতে পারিনি। এ জন্যই এতো রহস্য।

অসীমেরও একটি সীমা আছে। সীমার মাঝেই সবটা। আগে ধরা হতো আমাদের ব্রহ্মান্ডের জন্ম অসীমে। কিন্তু পরে জানা গেলো, এই অসীম আসলে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর। বিগব্যাঙের কারণে এর সৃষ্টি। এবার আমরা জানার চেষ্টা করবো মাল্টিভার্স, প্যারালেল ইউনিভার্স ইত্যাদি বলতে কী বুঝায় এবং এগুলোর অস্তিত্ব কতোটুকু যৌক্তিক।

মাল্টিভার্স

মাল্টিভার্স বা একাধিক মহাজগৎ। মাল্টিভার্সের ধারণা কসমোলজি, কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং দর্শন- বিজ্ঞানের এই তিনটি শাখা থেকে এসেছে। আমেরিকান দার্শনিক উইলিয়াম জেমস ১৮৯৫ সালে সর্বপ্রথম মাল্টিভার্স শব্দটি ব্যবহার করেন। ‘মাল্টিভার্স’ শুনলে আরেকটি শব্দ মনে আসে- ‘প্যারালেল ইউনিভার্স। দুটো কি একই?

না, এক নয়। এদের মধ্যে খুব সামান্য কিছু পার্থক্য রয়েছে। মাল্টিভার্স শব্দটি দিয়ে একাধিক ব্রহ্মাণ্ডকে বুঝায়। প্যারালেল ইউনিভার্সও তাই, কিন্তু সাথে আরো কিছু অর্থবহন করে। প্যারালেল ইউনিভার্স বলতে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতো অবিকল আরো কিছু ব্রহ্মাণ্ডকে বুঝায়। তবে সেখানে সামান্য পার্থক্য অবশ্যই থাকবে। প্যারালেল ইউনিভার্স অন্য ইউনিভার্সে বা ব্রহ্মাণ্ডে প্রাণের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করে, যেটা মাল্টিভার্স করে না।

সম্ভাব্য মাল্টিভার্স

প্যারালেল ইউনিভার্সের ব্রহ্মাণ্ডগুলোর উপাদান, গ্রহের গঠন, এমনকি মানুষ-সহ অন্যান্য প্রাণির গঠন হুবহু এক ধরা হয়। তবে যা বলেছিলাম, কিছু পার্থক্য থাকে। যেমন, আমাদের পৃথিবীকে ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে একটি গ্রহাণু ধাক্কা দিয়েছিলো। এর ফলে ঘটেছিল ডাইনোসরের বিলুপ্তি। কিন্তু হতে পারে অন্য ব্রহ্মাণ্ডের পৃথিবীতে ডাইনোসর এখনো রয়েছে। হয়ত সেখানকার জীবের বিবর্তন প্রক্রিয়া অন্যরকম। আবার এই পৃথিবীর সুখী মানুষ অন্য পৃথিবীতে হয়তো চরম দুঃখী। সব মিলিয়ে প্যারালেল ইউনিভার্স যেকোনো কিছুর অনন্যতা  নষ্ট করে। প্যারালেল ইউনিভার্স বাস্তবে থাকলে কোনো কিছুই আর অনন্য থাকলো না।

নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্র থেকে আমরা দেখি যে, সবকিছুর বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। শুধু পদার্থ বিজ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনেও আমরা এর প্রয়োগ দেখি। সুতরাং প্যারালেল ইউনিভার্স থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এছাড়া আমরা বিগব্যাঙ পর্যন্তই সময় গণনা করতে পারি। এর আগের ঘটনা, এমনকি বিগ ব্যাঙয়ের কারণও আমরা নির্ণয় করতে পারিনা। তাই এটা বলা কঠিন যে, বিগব্যাঙয়ের পূর্বে, সেসময়ে বা পরবর্তী সময়েও অন্য কোনো বিগব্যাঙ হয়েছে কিনা। আর এসব মাল্টিভার্সের পক্ষের যুক্তিকে শক্ত করে। মাল্টিভার্স যদি বাস্তবে থেকে থাকে, তবে তা কী ধরনের হবে সে ব্যাপারে ৫টি বৈজ্ঞানিক যুক্তি বর্ণনা করা হলো-

ইনফিনিট ইউনিভার্স

স্পেস টাইমের সঠিক আকৃতি আমরা এখনো নির্ণয় করতে পারিনি। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য আকার হলো, এটি সমতল এবং চিরকাল ধরে বিস্তার লাভ করবে, যেটা সরাসরিই মাল্টিভার্সকে সমর্থন করে। আরেকটি বিষয় হলো, এক্ষেত্রে ব্রহ্মাণ্ড একা একাই গঠিত হতে পারবে আর এর পুনরাবৃত্তিও চলতে থাকবে। কারণ, পার্টিকেল অসংখ্য উপায়ে গঠিত হতে পারে।

বাবল ইউনিভার্স

বাবল ইউনিভার্স বিষয়টি “ইটার্নাল ইনফ্ল্যাশন থিওরি”-এর উপর ভিত্তি করে গঠিত। এর ব্যখ্যা দিয়েছেন টাফ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কসমোলজিস্ট আলেকজান্ডার ভিলেনকিন। বিগব্যাঙের পর আমাদের ইউনির্ভাস ১০-৩৭ সেকেন্ডের জন্য আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছিল। পদার্থের ভাষায় এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার  ঘটনাকে ইনফ্ল্যাশন বলে। এখন কল্পনা করা যাক, বাবলের একটি বিশাল স্তুপের মাঝে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডএকটি বাবল। অন্য বাবল বা ব্রহ্মাণ্ডগুলোর ইনফ্ল্যাশন আদৌ হবে কিনা, আর হলেও সেটা আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতই হবে এমন ভাবার মানে নেই। ইনফ্ল্যাশন টাইম কম বা বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে একেক ব্রহ্মাণ্ডের পদার্থ সম্বলিত আইন বা সূত্র একেক রকম হবে। আর ব্রহ্মাণ্ডগুলো পরস্পরের সাথে সংযোগবিহীন অবস্থায় থাকবে।

ডটার ইউনিভার্স

থিওরি অব কোয়ান্টাম মেকানিক্সের উপর ভিত্তি করে হিউগ এভারেট এই থিওরি প্রস্তাব করেন। এভারেটের মতে, ব্রহ্মাণ্ডগঠিত হওয়ার সময় সম্ভাব্যতার নিয়ম মেনে নিজেই তার সকল সম্ভাব্য কপি তৈরি করে থাকে, আর জীব তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্রহ্মাণ্ডকে বেছে নেয় বেঁচে থাকার জন্য। একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি মাল্টিভার্সের জন্য বাংলায় একটি প্রবন্ধ খুঁজছেন। গুগলে সার্চ দিয়ে অনেকগুলো পেলেনও। আপনার সামনে আরো অনেকগুলো অপশন ছিলো। কিন্তু একটাকে আপনার বেশি উপযুক্ত মনে হয়েছে। তাই আর অন্যদিকে আপনি যাননি। এটাই হল ডটার ইউনিভার্সের থিওরি। আর এটাও স্পষ্ট, কেনো এই ব্রহ্মাণ্ডেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। কারণ ব্রহ্মাণ্ডের বাকি সম্ভাব্য কপিগুলো প্রাণ সঞ্চারের জন্য উপযুক্ত ছিলো না। তবে এই থিওরি একটি প্রশ্ন রেখে যায়। আমাদের চার পাশের বাস্তবতা কি আসলেই বাস্তব? আর হলেও তা কতটুকু? অস্ট্রেলিয়ান গণিতবিদ হ্যানিস মোরাভেক একাধিক ব্রহ্মাণ্ডকে এই রহস্য ভেদের জন্য এক পরীক্ষার আবিষ্কার ঘটিয়েছেন এই থিওরিকে কাজে লাগিয়ে। এর নাম কোয়ান্টাম সুইসাইড।

ম্যাথমেটিকাল ইউনিভার্স

এই ইউনিভার্স অন্যসব গুলোর চেয়ে আলাদা। এম.আই.টি প্রফেসর ম্যাক্সটেগ মার্ক এই থিওরির জন্মদাতা। তার মতে, এর কম ব্রহ্মাণ্ড অবশ্যই আছে যেটা পদার্থ নয় বরং গণিতের নিয়মে চলে। আমরা এতোদিন ব্রহ্মাণ্ডকে যেভাবে চিনেছি এই ব্রহ্মাণ্ড হবে তার থেকে একদম আলাদা। তার মতে, এই ব্রহ্মাণ্ড চলবে একদম স্বাধীনভাবে। যদি মানুষ বা অন্যপ্রাণি সেখানে থেকেও থাকে, তবে তা ব্রহ্মাণ্ডের প্রাকৃতিক নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবে না, কারণ ইউনিভার্স চলবে তার নিজস্ব গাণিতিক নিয়মে, সে কারো উপর নির্ভরশীল নয় এবং সে অপরিবর্তনীয়।

প্যারালেল ইউনিভার্স

প্যারালেল ইউনিভার্সের জন্য আবার শুরুতে ফিরে যেতে হবে। ধরে নিতে হবে স্পেসটাইম সমতল এবং এর বিস্তার চলমান ও অসীম। ব্রহ্মাণ্ডের পার্টিকেলগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে মোট ১০-১০-১২২টি ব্রহ্মাণ্ডতৈরি করতে সক্ষম। এ সকল ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবীর স্থানে একটি করে গ্রহ থাকবে। অধিকাংশ ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবী গ্রহটির পুনরাবৃত্তি ঘটবে অর্থাৎ অবিকল থাকবে। বিন্যাসের নিয়ম মেনে যদি দুটো ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে মাত্র একটি পার্টিকেলের অবস্থানেরও পার্থক্য থাকে, তবে দুটো আলাদা ব্রহ্মাণ্ড হিসেবেই তাদের ধরা হবে। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, অবিকল পৃথিবী অনেকগুলো পাওয়া যাবে। আবার এমন পৃথিবীও আসবে যাদের মধ্যে একটি, দুটি বা তিনটি পার্টিকেলের পার্থক্য থাকবে। সুতরাং সেখানের প্রাণের অস্তিত্ব থাকা স্বাভাবিক।

বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টফেন হকিং মাল্টিভার্স নিয়ে মৃত্যুর পূর্বে কাজ করে গেছেন। তবে খুব বেশি করে যেতে পারেননি। ২০১৮ সালের মে মাসে সে পেপারটি প্রকাশিত হয়। তিনি মাল্টিভার্সের পক্ষেই কথা বলে গেছেন। তবে অনেকেই মাল্টিভাসর্ বিশ্বাসে নারাজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here