মাস্ক নিয়ে কোনো মশকরা নয়!

0
152

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
অঘোষিত লকডাউন শেষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনেক কিছুই আবার আগের মতো চালু হয়েছে। অফিস-আদালত খুলেছে। গণপরিবহন চালু হয়েছে। গার্মেন্টস খুলেছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো চালু হচ্ছে। সরকার থেকে বারবার বলা হয়েছে মানুষজন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করবে।

এই স্বাস্থ্যবিধিগুলো কি, তা আমরা মোটামুটি সবাই জানি। কিন্তু এসব মানছি ক’জন?
যতরকম স্বাস্থ্যবিধি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই মাস্ক পরিধানের বিষয়টি। অথচ মাস্ক পরে চলাচল করতে আমাদের কতইনা অনীহা! আমরা জানি যে এই ভাইরাসটি মূলত আমাদের শ্বাসনালীকে আক্রমণ করে। আর শ্বাসনালীতে এই ভাইরাসটি ঢোকে মূলত আমাদের নাক এবং মুখ দিয়ে। সুতরাং নাক এবং মুখ দিয়ে ভাইরাস ঢোকার পথ যদি বন্ধ করতে পারি তাহলে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারবো। অথচ মাস্ক আমরা অনেকেই পরছিনা। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক সাথে নিলেও অনেকে তা পকেটে ঢুকিয়ে রাখছি। অনেকে মাস্ক থুতনিতে ঝুলিয়ে রাখছি। আবার কেউ কেউ মাস্ক পড়লেও শুধু মুখ ঢেকে, নাক বের করে রাখছি। আর মাস্ক ব্যবহারে এসব অবহেলা করে আমরা নিজেরা নিজেদের করোনায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি যেমন বাড়াচ্ছি পাশাপাশি অন্যকেও বিপদে ফেলছি। কারণ, এটা এমন একটা বিষয় যা আমি-আপনি একা মানলে হবে না। আমাদের চারপাশের মানুষজন যদি এই মাস্ক ঠিকমতো ব্যবহার না করে তাহলে ওই কিছু সংখ্যক ব্যক্তির জন্য সবারই স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়বে।

কোন ধরনের মাস্ক ব্যবহার করবেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাধারণ মানুষের জন্য সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। একটা সার্জিক্যাল মাস্ক যেহেতু একবারই ব্যবহার করা যায়, এটা বারবার ব্যবহার করা যায় না। তাই অনেকের জন্য সার্জিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করাটা ব্যয়বহুল। তারা চাইলে কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। কাপড়ের মাস্ক কিছুটা হলেও আপনাকে নিরাপদ রাখবে। তবে খেয়াল রাখবেন সেটা যেন হয় তিন স্তর বিশিষ্ট। ইচ্ছা করলে নিজেরা কাপড় কিনে এই তিন স্তরের মাস্ক বানিয়ে নিতে পারেন। N95 মাস্ক সাধারণ মানুষের জন্য নয়। এটা কেবলমাত্র স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী চিকিৎসক বা নার্স তাদের ব্যবহারের জন্য, যারা সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে যাচ্ছেন। সুতরাং, সাধারণ মানুষের এই মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তাছাড়া যাদের আগে থেকেই অ্যাজমা অথবা শ্বাসকষ্ট রোগ আছে তাদের জন্য এই মাস্ক ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ।

বাসার বাহিরে বের হলে পিপি অথবা হাতে গ্লাভস পরিধান করা কতটা জরুরি?
পিপিই মূলত সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে যাওয়া চিকিৎসক অথবা নার্সদের জন্য প্রযোজ্য। এটা রাস্তাঘাটে হাটে বাজারে পরে ঘোরার জন্য নয়। বাহিরে বের হলে হাতে গ্লাভস পরার চাইতে কিছুক্ষণ পরপর হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাটা বেশি জরুরি। পিপিই বা গ্লাভস পরে বের হবার কিছু সমস্যাও আছে। তাহলো, সাধারণ মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি হয় যে সে যেহেতু গ্লাভস বা পিপিই পরে আছে, সুতরাং সে সব কিছু থেকে নিরাপদ। বিষয়টি কিন্তু মোটেও সেরকম নয়। আপনি পিপিই বা গ্লাভস যাই পরেন না কেন, মাস্ক যদি সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করেন এবং যখন তখন হাত নাকে-মুখে দেওয়ার অভ্যাস পরিহার না করেন তাহলে এই পিপিই আপনাকে কোনো নিরাপত্তাই দিতে পারবে না। একটা বিষয় মনে রাখবেন, এই করোনা ভাইরাস আমাদের দেহের চামড়া ভেদ করে ঢোকেনা। সুতরাং, হাতে গ্লাভস বা পিপিই যাই পরিনা কেন, মাস্ক পড়ার বিষয়টি যদি উপেক্ষিত হয় তাহলে সবকিছুই জলে যাবে।

মাস্ক পড়ার বিষয়ে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি?
মাস্ক পড়ার বিষয় কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

  • মাস্ক পরে থাকার সময় যখন-তখন মাস্কের সামনের অংশে হাত দিবেন না।
  • যখন তখন মাস্ক খুলে তা ভাঁজ করে পকেটে রাখবেন না।
  • বাসা থেকে বের হবার পূর্বে মাস্ক পরবেন এবং কাজ শেষে বাসায় ফেরার পরে একবারে মাস্ক খুলবেন। সার্জিক্যাল মাস্ক হলে তা দ্বিতীয়বার আর ব্যবহার করা যাবে না। তবে কাপড়ের মাস্ক হলে প্রতিদিন বাসায় এসে তা ধুয়ে পরে আবার ব্যবহার করতে পারবেন।
  • আজকের ব্যবহার করা মাস্ক না ধুয়ে আগামীকাল ব্যবহার করবেন না। প্রতিদিন মাস্ক ধোবার ঝামেলা এড়াতে একাধিক মাস্ক সাথে রাখতে পারেন।

যখন তখন মাস্ক খুললে কী সমস্যা হতে পারে?
আপনি মাস্ক পরে রাস্তায় বের হলেন। আপনি যখন অনেক মানুষের মাঝে চলাচল করবেন, তখন মনে রাখতে হবে আপনার এই মাস্ক এর সামনের অংশে অনেক রোগ-জীবাণু এসে আটকাচ্ছে। মাস্ক এই রোগ জীবাণুগুলোকে নাক-মুখ দিয়ে শরীরে ঢুকতে দিচ্ছে না। আপনি যদি মাস্ক খুলে তা ভাঁজ করে পকেটে রাখেন। তাহলে এর সামনের অংশে লেগে থাকা জীবাণু মাস্কের সব জায়গায় ছড়িয়ে যাবে। এর ফলে আপনি যখন কিছুক্ষণ পর আবার এই মাস্ক পড়বেন, তখন এই মাস্ক বুমেরাং হয়ে আপনার নিজেরই করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবে।

বর্তমানে আমরা এক অস্বাভাবিক সময়ের মধ্যে যাচ্ছি। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই জীবনযাত্রার ধারা পাল্টে গেছে। হাত ধোয়া, মাস্ক পরিধান করা- এসব স্বাস্থ্য বিধিগুলো আমাদের কাছে নতুন। আমরা অনেকেই এভাবে মাস্ক পরে চলাচল করতে অভ্যস্ত নই। প্রয়োজনের স্বার্থে আমরা কত কিছুই না করি। একটু চেষ্টা করলে এই মাস্ক পরার বিষয়টিও আমরা অভ্যস্ত হয়ে যাবো। নিজেদের স্বার্থে, আমার-আপনার চারপাশের মানুষের স্বার্থে এতটুকু কষ্ট কি আমরা করতে পারবো না?

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here