মা, আপনার কথা বারবার মনে পড়ে

13
883
হযরত দয়াল মা (রহঃ)-এর রওজা মোবারক ।

ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা
আজ ৮ মে, আমার পরম শ্রদ্ধেয় ‘মা’- আওলাদে রাসুল, কুতুবুল আকতাব, দুররে মাকনুন, হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম (রহ.)-এর শুভ জন্মদিন। আজ থেকে ১১ বছর পূর্বে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি আমাদের সকলকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দারুল বাকায় তশরিফ নেন। অলী-আল্লাহ্গণ জাহেরি জগত থেকে বিদায় নিলেও তারা অমর।

এই প্রসঙ্গে হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “আল্লাহর অলীগণ মৃত্যুবরণ করেন না, বরং তাঁরা এক ঘর থেকে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত হন মাত্র।” (তাফসীরে কাবীর, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ১৮৮১)

সুতরাং হযরত দয়াল মা (রহ.) আমার নিকট অমর হয়ে আছেন। তাঁর স্মৃতিগুলো আজও আমার হৃদয়পটে চির অম্লান ও অক্ষয় হয়ে আছে। হযরত দয়াল মা (রহ.)-এর জীবদ্দশায় প্রতিবছর তাঁর শুভ জন্মদিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্যাপন করে থাকতাম। তাঁর ওফাতের পরও শুভ জন্মদিনটি একইভাবে উদ্যাপন করি। আজ আমি মায়ের শুভ জন্মদিনে তাঁর উদ্দেশে কিছু কথা লিখছি।

মা, আপনাকে নিয়ে লেখা শুরু করতেই আমার চোখ জলে ভিজে যাচ্ছে। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ছি। আজ আপনাকে খুব মনে পড়ছে। আমার মনে আপনাকে নিয়ে ভেসে উঠছে নানা স্মৃতি। আমার হৃদয় মাঝে যে দুটি ফুল চির অম্লান হয়ে ফুটে আছে- তার একটি হলো দয়াল বাবাজান, অন্যটি হলো আপনি। আজ যেন একটি ফুলের স্নেহের স্পর্শ পাচ্ছি না। আপনি ছিলেন আমার পৃথিবী, আমার অনুভূতি, আমার আবেগ, আমার ভালোলাগা ও ভালোবাসা। আজ আপনি নেই, তাই সেই অনুভূতিগুলো এখনও খুঁজে বেড়াই। মা! আমি যে আপনাকে ভুলতে পারি না, বারবার আপনার কথা মনে পড়ে!

আমি যখন ছোটো ছিলাম, তখন আপনি ছিলেন আমার নিরাপদ আশ্রয়। নিজ হাতে আপনি আমার মাথার চুল সুন্দর করে আচড়িয়ে দিতেন। সেসময় আমি আপনার চোখের পানে তাকিয়ে থাকতাম, অপলক দৃষ্টিতে দেখতাম আপনার পবিত্র মুখখানি। শরতের মেঘের মতো শুভ্র ছিল আপনার মন। ছোটো বেলায় দুষ্টামির কারণে যখন দয়াল বাবাজান আমার উপর খুব রাগ করতেন, তখন বাবাজানের রাগ ভাঙানোর জন্য আপনি আমাকে ভালোবাসা মাখানো শাসন করতেন। আর আমার প্রতি আপনার অনুরাগ দেখে বাবাজানের রাগও নিমিষে কমে যেত। মা! আপনার কি মনে পড়ে, আপনি প্রায়শই নতুন নতুন শাড়ি কিনে একটিবার মাত্র পড়ে আলমারিতে তা সযত্নে রেখে দিতেন। তখন আমি আপনাকে বলতাম, “আপনিতো শাড়ি পড়েন না, এতো শাড়ি জমিয়ে রাখেন কেন?’’ আপনি হেসে হেসে বলতেন, ‘‘তোমরা ভাইয়েরা যখন বড়ো হয়ে বিয়ে করবে, তখন এই শাড়িগুলো তোমাদের বউদের দিব।’’ আমি তখন আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারিনি। বিয়ের পর একদিন দেখি আমার স্ত্রী কমলা রং-এর একটি নতুন শাড়ি পরেছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই শাড়ি কে দিয়েছেন?” আমার স্ত্রী বলল, “দয়াল মা দিয়েছেন।” এর কিছুদিন পর আমি পুরনো ছবির অ্যালবাম দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, ঐ কমলা রংয়ের শাড়িটি পড়ে আপনি আমাকে কোলে নিয়ে বাবে জান্নাতের বারান্দায় একটি ছবি তুলেছিলেন। তখন আমার মনে পড়ে গেল আপনার সেই কথা।

‘মা’ আপনি যে আমাকে কত ভালোবাসতেন, এই লেখনীর মাধ্যমে তা আমি প্রকাশ করতে পারব না। শৈশবে কতই না দুষ্টামি করতাম। কিন্তু আপনি কখনো একটু রাগ করতেন না, বকাও দিতেন না, বরং সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। মা, আপনি কতটা সহজ সরল ছিলেন, আপনি নিজেও জানতেন না। আপনার পুরোটা হৃদয় জুড়ে ছিল কোমলতায় ভরপুর। আমার মন যখন খুব খারাপ থাকতো, তখন আমি ছুটে যেতাম আপনার কাছে। আপনার কাছে গেলে সাথে সাথে আমার মন ভালো হয়ে যেত। আজও আমার মন খারাপ হয়, কিন্তু আপনার কাছে ছুটে যাওয়ার আর সুযোগ হয় না। মন খারাপ হলে আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কাউকে পাই না।
আমি কোনো সমস্যায় পড়লে আপনি অস্থির হয়ে পড়তেন। আমাকে সাথে নিয়ে ছুটে যেতেন দয়াল বাবাজানের কাছে। আবার কখনো যদি নিজেকে নিয়ে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখতাম, তাহলে আপনি মানত করতে বলতেন, যেন বিপদ কেটে যায়। যখন জানতে পারতেন আমি মানত করিনি, তখন আপনি নিজেই মানত করতেন। ওগো মা! এই স্নেহমমতার প্রতিদান আমি দিব কীভাবে?

‘মা’ আমি যখন আপনার সাথে দেখা করতে যেতাম, পাশের রুমে যদি দয়াল বাবাজান থাকতেন আপনি বাবাজানকে বলতেন- ‘জামান এসেছে’। এখনতো জাহেরিয়াতে আপনি এই কথা বলবেন না, আপনার স্নেহের পরশ পাওয়ার জন্য এই মন যে কীরূপ অস্থির হয়ে উঠে, আমি ছাড়া এই জগতে আর কেউ জানে না।
মাগো, যখন শুনতাম আপনার শরীর মোবারক খারাপ, ছুটে যেতাম আপনাকে দেখার জন্য। কিন্তু আপনাকে অসুস্থ দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যাবে বিধায় আপনি সুস্থ মানুষের মতো কথা বলতেন। আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতাম আপনি অসুস্থ। মা, আপনার মনে পড়ে আমার গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে আপনি নিজ হাতে আমার মুখে হলুদ লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আমি আপনাকে বলেছিলাম, ‘‘মা! আপনি যেভাবে হলুদ লাগাচ্ছেন দেখে মনে হচ্ছে কোনো ছোটো শিশুকে হলুদ লাগিয়ে দিচ্ছেন।’’ আমার এই কথা শুনে আপনি বলছিলেন, ‘‘মায়ের কাছে সন্তানরা কখনোই বড়ো হয় না, ছোটোই থাকে।’’ আজ আপনার এই স্নেহের পুত্র জামান আপনাকে একটি কথাই বলবে- ‘মা! আমি আপনাকে খুব বেশি ভালোবাসি’।

মা! আপনি ছিলেন কুতুবুল আকতাব, দেশরক্ষক অলীগণের প্রধান। আল্লাহর ইচ্ছা মোতাবেক সৃষ্টিজগত পরিচালনা করতেন। আপনার দায়িত্বের জন্য আপনাকে যতটুকু কঠোর হওয়ার কথা ছিল, অথচ আপনি বিন্দুমাত্র কঠোর ছিলেন না। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন, সাথে সাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দূর করার ব্যবস্থা নিতেন। বাবাজানের নির্দেশে আপনি হাদি শ্রেণির অলীদেরও দায়িত্ব পালন করতেন। যখন মহিলা জাকেরদের আপনি সাক্ষাৎ দিতেন, সেসময় আপনার সাথে দেখা করতে এসেও পর্দা প্রথার কারণে আমরা সামনে আসতে পারতাম না। আপনি যখন শুনতেন আমি এসেছি, তখন বাবাজানের রুমে বসে অপেক্ষা করতে বলতেন। আর মহিলাদের সাথে দ্রুত সাক্ষাৎ করে আমাকে আপনার কাছে ডাকতেন। মহিলা জাকেরদের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কথা শুনলে আপনি তাদেরকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করতেন। জাকের বোনদের প্রতি আপনি কতইনা মমতাময়ী ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কী, আপনি তো শুধু আমাদেরই মা ছিলেন না, আপনি ছিলেন জগত জননী!

মা! আপনার ওফাতের দুই দিন পূর্বে আনুমানিক রাত ১১টা বাজে আপনি আমাকে ফোন করে আমার শারীরিক অবস্থা চানতে চাইলেন। আপনার শরীর খুব একটা ভালো না, তাই দেখতে আসার জন্য বললেন। পরদিন রাত ১০টা বাজে আপনার কথা ভীষণ মনে পড়ল। কেন জানি আপনার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে মন চাচ্ছিল। তাই সাথে সাথে আপনার কাছে ছুটে গেলাম, আপনি খাটে বসা ছিলেন। আপনাকে কদমবুসি করে দয়াল বাবাজানের সাথে কথা বলার জন্য বাবাজানের রুমে যাই। সেখান থেকে এসে দেখি আপনি বিছানায় তন্দ্রা অবস্থায়। আপনার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে বলে কিছুক্ষণ আপনার পাশে বসে থেকে আমি আমার রুমে ফিরে আসি। আপনার কোলে মাথা রেখে ঘুমাবো, এই কথা আপনাকে আর বলা হলো না। ভোর ৫টায় ফোন আসল, আপনি খুব অসুস্থ। খবরটা শুনে সাথে সাথে আপনার কাছে ছুটে এলাম। আপনার প্রচণ্ড শ্বাস কষ্ট হচ্ছিল। আপনি সেসময় বিছানায় বসাছিলেন। দয়াল বাবাজান তখন ২য় তলায় ছিলেন। আপনি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘‘আমার সমস্যা তোমরা বুঝবে না, তোমরা তোমাদের বাবাজানকে ডাক।” দয়াল বাবাজান সেই সময় ঘুমিয়ে ছিলেন। দয়াল বাবাজান আসার পর আপনি বাবাজানের কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। বুঝতে আর বাকী রইলো না, দয়াল বাবাজানের জন্যই আপনি এতক্ষণ অপেক্ষা করেছিলেন।

মা, আজ অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা ছোটো ছোটো ভাই-বোনগুলো এখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছি। দয়াল বাবাজান এবং আপনার দয়ায় আমরা ৭ ভাই-বোন সকলেই পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছি। মা, আপনাকে আরেকটি সুসংবাদ বলাই হলো না, সেটি হচ্ছে- দয়াল বাবাজান ও আপনার অপার দয়ায় ২০১৫ সালের ১৯ নভেম্বর আমার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। দয়াল বাবাজান ওর নাম রেখেছেন সৈয়দ ইজায-এ-খোদা। ওর বয়স এখন ৪ বছর। এই রমজানে এখন পর্যন্ত সে তিনটি রোজাও রেখেছে। আপনি আপনার নাতির জন্য প্রাণভরে দোয়া করবেন, যেন সে দয়াল বাবাজানের আদর্শে আদর্শবান হতে পারে।

মা, আমি আমার মনের অব্যক্ত অনেক কথাই আপনাকে জানালাম। অলী-আল্লাহ্গণ অমর। নিশ্চয়ই আপনি আমার এই লেখাগুলো পড়ছেন। পরিশেষে- আপনার কদম মোবারকে আমার নিবেদন, আমি যেন সারাটা জীবন দয়াল দরদি বাবাজান এবং আপনার কদম মোবারকে থাকতে পারি। আমিন।

লেখক : সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান এবং কুতুবুল আকতাব হযরত দয়াল মা (রহ.)-এর সেজো সাহেবজাদা

13 COMMENTS

  1. ওগো দয়াল মা!!! আপনিত জগত জননী, আপনিত আশেকের নয়নের মনি, সূফী সম্রাজ্ঞী মমতাময়ী আপনার তুলনা আপনি নিজেই ।
    মা একটি কথাই বলতে চাই আপনাকে অনেক ভালোবাসি মা………

  2. মা, গো তুমি দয়াল মা ।
    দয়ার সাগর তোমার মতো হয়না মা, গো কেহ আপন।
    লক্ষ্য কোটি সালাম ও কদম বুচি জানাই,, দয়াল মা,
    আপনার নূরের কদম মোবারক এ

  3. কদমবুসি।
    অত্যন্ত সুন্দর একটি লিখা। অলি-আল্লার মুখের ভাষা যেমন সুন্দর। তাঁদের কলমের ভাষাও তেমনি সুন্দর। দয়াল মা নিয়ে লিখাটি সকল সন্তানের জন্য নুকরনীয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here