মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে নিপীড়ন চিত্রণ

0
521
ছবি-প্রতীকী

মিল্টন বিশ্বাস

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলোতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক ২৫ মার্চের নির্মম হত্যাকান্ড, সারাদেশে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু জনগোষ্ঠীসহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন; নারী-পুরুষ নির্বিশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সাহসী সংগ্রাম; যুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের যন্ত্রণাদগ্ধ দিনাতিপাত, বর্বর শত্রু ও রাজাকার দ্বারা বন্দিশিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের অবর্ণনীয় অত্যাচার ও নির্যাতন, পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এ দেশীয় দালালদের দ্বারা নারী ধর্ষণ, হত্যা ও নিপীড়ন প্রভৃতি কাহিনির সঙ্গে যুদ্ধোত্তর নতুন জীবনের আকাঙ্ক্ষা, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক সমাজব্যবস্থার স্বপ্নময় রুপালি চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধোত্তর সোনালি প্রত্যাশার সমাধি ও পাকিস্তানি দালালদের পুনর্বাসন চিত্রণ স্বতন্ত্র তাৎপর্যে অঙ্কিত। বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের সংঘর্ষের কাহিনিও কতগুলো উপন্যাসের মূল বিষয়। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি সেনা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধশক্তি তথা রাজাকার, আলবদর, আলশামসের নিপীড়ন এদেশের ঔপন্যাসিকদের বয়ানে সমুজ্জ্বল। কাহিনির ভেতর দেখা যায়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অনুচর ও সহযোগী হিসেবে ‘শান্তিকমিটি’, ‘আলবদর’ এবং ‘আলশামস’ মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই বাঙালি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার জন্য নিপীড়নের স্টিম রোলার চালাচ্ছে। প্রথম থেকেই সামরিক বাহিনীর ছত্রছায়ায় পাকিস্তানি দালালরা সারাদেশে হত্যাযজ্ঞের উন্মাদনায় মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রদ্রোহী, সমাজবিরোধী, দুষ্কৃতকারী, ভারতের চর, জারজসন্তান ও পঞ্চমবাহিনী বলে গালিগালাজ করত। উপরন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থক ও সহায়তাকারীদের নির্মমভাবে নির্যাতন এবং পাকিস্তানিদের সঙ্গে গণহত্যায় সামিল হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, একাত্তরের পর স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পাকিস্তানি দালাল ও নিপীড়নকারীরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক দলসমূহ এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তাদের সহযোগী করে তুলেছেন। এই বিনষ্ট-রাজনীতি ও সমাজের চিত্র রয়েছে বিভিন্ন লেখকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে।

২.
বাংলাদেশের অনেক কথাসাহিত্যিকই মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে বাঙালি জনগোষ্ঠীর ওপর পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দালাল কর্তৃক নিপীড়নের অনুপুঙ্খ চিত্র রূপায়ণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘একটি কালো মেয়ের কথা’য় (১৯৭১) পাকিস্তানি দালাল চরিত্রের দ্বারা নির্যাতনের বর্ণনা লক্ষ করা যায়। এর পরে প্রকাশিত উপন্যাসের নামগুলো যথাক্রমে- আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ (১৯৭৩), শওকত ওসমানের ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ (১৯৭১), ‘নেকড়ে অরণ্য’ (১৯৭৩), ‘দুই সৈনিক’ (১৯৭৩) এবং ‘জলাংগী’ (১৯৭৬), সৈয়দ শামসুুল হকের ‘নীল দংশন’ (১৯৮১), ‘নিষিদ্ধ লোবান’ (১৯৮১), ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ (১৯৮৪), ‘অন্তর্গত’ (১৯৮৪), ‘মৃগয়ায় কালক্ষেপ’(১৯৮৬), ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ (১৯৮৯, ৯০) এবং ‘ত্রাহি’ (১৯৮৮), রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’ (১৯৭৪), সেলিনা হোসেনের ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ (১৯৭৬), ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮), হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামলছায়া’ (১৯৭৬), ‘সৌরভ’ (১৯৮৪), ‘১৯৭১’ (১৯৮৬), ‘অনিল বাগচীর একদিন’ (১৯৯২), ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ (২০০৪), রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ (১৯৭৫), ‘অন্ধ কথামালা’ (১৯৮১), ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’ (১৯৮২), মিরজা আবদুল হাইয়ের ‘তোমার পতাকা’ (১৯৮৪), ইমদাদুল হক মিলনের ‘কালোঘোড়া’ (১৯৮১), ‘ঘেরাও’ (১৯৮৫), ‘দ্বিতীয় পর্বের শুরু’ (১৯৮৮), ‘রাজাকারতন্ত্র’ (১৯৮৯), ‘মহাযুদ্ধ’ (১৯৮৯), ‘বালকের অভিমান’ (১৯৯০), ‘একজনা’ (১৯৯১), ‘সুতোয় বাঁধা প্রজাপতি’ (১৯৯৮), ‘জীবনপুর’ (২০০৯), ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ (২০১৫), ‘নয়মাস’ (২০১৭); মঈনুল আহসান সাবের রচিত ‘পাথর সময়’ (১৯৯০), ‘সতের বছর পর’ ( ১৯৯১), ‘কবেজ লেঠেল’ (১৯৯২), ‘ফিরে আসা’ (১৯৯৯); শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ (১৯৮৮); মাহবুব তালুকদারের ‘বধ্যভূমি’ (১৯৯৭), আবুবকর সিদ্দিকের ‘একাত্তরের হূদয়ভস্ম’ (১৯৯৭), আল মাহমুদের ‘উপমহাদেশ’ (১৯৯৩), মাহবুব সাদিকের ‘বারুদগন্ধ দিন’ (১৯৭৩), বেগম জাহান আরার ‘অয়নাংশ’ (১৯৮৩), খুরশীদ আলমের ‘দাহ’ (১৯৯৭), সালাম সালেহ উদদীনের ‘ছায়াশরীর’ (১৯৯৮), মোস্তফা কামালের ‘জনক জননীর গল্প’ (২০১১), মহীবুল আজিজের ‘যোদ্ধাজোড়’ (২০১৪) ইত্যাদি অন্যতম।

আনোয়ার পাশার (১৯২৮-৭১) রাইফেল রোটি আওরাত (১৯৭৩) উপন্যাসের রচনাকাল ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল মাস। বাংলাদেশের সাহিত্যে এটিই মুক্তযুদ্ধভিত্তিক প্রথম উপন্যাস। অবশ্য ১৯৭১ সালে প্রকাশিত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘একটি কালো মেয়ের কথা’য় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তুলে ধরা হয়। হানাদার বাহিনীর তাঁবেদার জাফরউল্লাহ নামের জনৈক পাঞ্জাবি অসহায় বাঙালি নারী নাজমাকে ধর্ষণ করে। তবে পরিণতিতে সে মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বারা নিহত হয়। হানাদার বাহিনীর এই তাঁবেদার জাফর আসলে ‘পাকিস্তানি দালাল’। ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসে যেমন পাকিস্তানি দালাল চরিত্র আছে তেমনি শাসকশ্রেণির আস্থাভাজন হিসেবে জামায়াতে ইসলামি ও মুসলিম লীগের মনোভাবের পরিচয় ব্যক্ত করা হয়েছে। মালেক ও খালেক চরিত্র দুটি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালালি ও স্তুতিবাদের মাধ্যমে নিজেদের জীবনে স্বস্তি আনে ও শাসকগোষ্ঠীর প্রিয়ভাজন হবার চেষ্টা করে। এদের টার্গেট সম্পর্কে নির্ভীক হাশেম শেখ তার মামা ফিরোজকে উদ্দেশ্য করে বলেছে- ‘আপনারও এখানে আর থাকা চলবে না মামা। জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের সঙ্গে সেনাবাহিনীর শলাপরামর্শ চলছে শুনলাম।…চার শ্রেণীর মানুষকে ওরা দেশ থেকে নির্মূল করবে… বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী লীগার, কম্যুনিস্ট ও হিন্দু।’ হাশেম শেখের এই উক্তির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলাম ও মুসলিম লীগের সুসম্পর্ক চিহ্নিত এবং একইসঙ্গে নিপীড়নের ইঙ্গিত রয়েছে।

শওকত ওসমানের (১৯১৭-১৯৯৮) জাহান্নম হইতে বিদায় (১৯৭১), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩), দুই সৈনিক (১৯৭৩) এবং জলাংগী (১৯৭৬) উপন্যাসে বাঙালি জনগোষ্ঠী একাত্তেরে যে নির্মমতার শিকার হয় তার বিবরণ রয়েছে। ‘জাহান্নম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে পাকিস্তানি সৈন্যরা জোরপূর্বক কয়েকজন লোককে দিয়ে নরসিংদী বাজার লুট করায়। ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাসে একাত্তরে একটি গ্রামে কিছুসংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য কর্তৃক বাঙালি নারী ধর্ষণ, নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের ছবি রয়েছে। আরো উঠে এসেছে, গ্রামীণ পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এদেশীয় দালাল ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা ও অবস্থান।

সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের রচয়িতা হিসেবে বিশিষ্ট। আশির দশকে যতগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে তিনি সেসব লেখকদের অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলো হচ্ছে- নীল দংশন (১৯৮১), নিষিদ্ধ লোবান (১৯৮১), দ্বিতীয় দিনের কাহিনী (১৯৮৪), অন্তর্গত (১৯৮৪), মৃগয়ায় কালক্ষেপ (১৯৮৬), ত্রাহি। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ (১৯৮১) উপন্যাসটি একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও বিহারিরা কেবল ঢাকা শহরে নয়, বাংলাদেশের মফস্বল শহর ও গ্রাম-গঞ্জে যে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে এবং বাঙালি নারীদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করেছে তারই শিল্পিত উপস্থাপন। বাংলাদেশের মফস্বল শহরগুলো পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হতে শুরু করে ২৫ মার্চের তিন-চার মাস পরে। তারা সমগ্র দেশে যে হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ চালিয়েছে তার চালচিত্র ঔপন্যাসিক জলেশ্বরীর আক্রমণের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ মুক্তিযুদ্ধের সমগ্র ইতিহাস নয়, একটি খন্ডিত অংশকে স্বল্পপরিসরে নিয়ে আসা হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, আখ্যানের সময়কাল মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি। ঢাকা থেকে বিলকিস তার নিজ গ্রাম জলেশ্বরীতে ফিরে আসে। পিতা-মাতা, ভাই হারানো বিলকিস দেখতে পায় জলেশ্বরীর বাজারে হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ও তাদের দোসর বিহারিদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা। অসংখ্য লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাজারে, তার মধ্যে বিলকিসের ভাই খোকনেরও মৃতদেহ রয়েছে। একপর্যায়ে সিরাজের সহায়তায় বিলকিস মৃতদেহগুলোকে দাফনের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এরই মধ্যে হানাদার বাহিনীর দোসর বিহারিদের দ্বারা ধৃত হয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে বন্দি হয়ে আসে। ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’তে (১৯৮৪) স্থানীয় এমপি হাফেজ মোক্তার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির প্রতীক। যুদ্ধোত্তর তার হাতেই মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন মাজহার নিহত হন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘অন্তর্গত’-এ (১৯৮৪) বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসেনকে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয় স্বাধীনতাবিরোধীর হাতে। আকবর হোসেনের নামে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা গ্রামবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জুটমার্চেন্ট আব্দুর রহমান এবং তার সুন্দরী বান্ধবী শেফালী। ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’-এ (১৯৯৮) বিস্তৃত পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি রূপায়িত হয়েছে।

রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’ (১৯৭৪) উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন রাজধানী ঢাকা শহরের নয় মাসের নাভিশ্বাস জীবনচিত্র অঙ্কিত হয়েছে। সেসময় ঢাকায় থাকা একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপনের কাহিনি বর্ণনার মধ্য দিয়ে লেখক রাজধানীর বাস্তবতা তুলে ধরেছেন; পাশাপাশি ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর গেরিলা তৎপরতা, বিহারিদের লুটপাট, অত্যাচার, রাজাকার বাহিনীর তৎপরতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ততা ও বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকাসহ নানা আনুষঙ্গিক বিষয় উপন্যাসে অভিব্যক্ত। অন্ধ পাকিস্তানপ্রীতি সত্ত্বেও করিম সাহেবের বড়ো ছেলে খালেদকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় রাজাকারদের ক্যাম্পে। সে রাজাকারদের নির্যাতনে নিজের চোখ ও স্ত্রীর সম্ভ্রমের মধ্য দিয়ে তার পাকিস্তানকে ভালোবাসার ফল লাভ করে; উপলব্ধি করে বাঙালি হিসেবে তার আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার উপযুক্ত প্রতিদান কী ভয়ংকর?

ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেডে’ উপন্যাসে (১৯৭৬) গ্রামীণ পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নির্মাণ করেছেন। ‘যুদ্ধ’ (১৯৯৮) উপন্যাসেও লেখক মুক্তিযুদ্ধকে অবলোকন ও কাহিনির সংস্থাপন করেছেন গ্রামীণ পটভূমিতে। একদিকে লেখকের তীক্ষ পর্যবেক্ষণশক্তি, বাস্তববোধ, অন্যদিকে তার কল্পনাশক্তি ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার সমন্বয়ে ঔপন্যাসিক ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি সার্থক চিত্র উপস্থাপন করেছেন ‘যুদ্ধ’ উপন্যাসে। অন্যদিকে ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় নয় মাস পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের পাশাপাশি কিছু সংখ্যক সুযোগসন্ধানী এদেশীয় দালাল ও হানাদার সৈন্যদের সহায়তাদানের উদ্দেশ্যে সৃষ্ট শান্তিকমিটি, রাজাকারবাহিনী ও আলবদর বাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা পাকিস্তানি সৈন্যদেরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দালালদের ব্যক্তিগত লালসা চরিতার্থ করা ও একইসঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যদের খুশি করার দিকটিও সার্থকভাবে উন্মোচিত হয়েছে নীতা বৈরাগিনীর উপ-কাহিনির মধ্যে। মূলত ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ ১৯৪৭-এর বিভাগোত্তর সময় থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় পর্যন্ত পটভূমি বিস্তৃত। এই বিস্তৃৃত পটভূমিতে রাজাকার বাহিনীর হাতে কলীমের মৃত্যু ও ফুলির ধর্ষিত হওয়া দেখে স্বাধীনতার জন্য অজপাড়াগাঁয়ের বুড়ির মনে দৃঢ়প্রত্যয় জাগ্রত হয়। আখ্যানের বয়ানে বুড়ির সই বৈরাগিনী নীতার আর্র্ত জিজ্ঞাসা ‘শান্তি বাহিনীর নামে ওরা মা বোনের সম্ভ্রম নিলো, ওরা এই মাটির শত্রু নয় শত্রু হলাম আমরা?’

অন্যদিকে ‘১৯৭১’ (১৯৮৬) উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি সৈন্যদের গ্রামে প্রবেশ ও হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা, রাজাকার বাহিনীর তৎপরতা এবং মুক্তিবাহিনীর সংবাদ প্রভৃতি বিষয়গুলো ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ স্বল্পপরিসরে বিশ্বস্তভাবে চিত্রিত করেছেন। ১৯৭১ সালের মে মাসে সংঘটিত ঘটনায় ময়মনসিংহ জেলার নীলগঞ্জ গ্রামের সম্পদশালী মাতব্বর জয়নাল মিয়া পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগী হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি সৈন্যদের অকারণে হত্যা, ধর্ষণ ও এইসব বিকৃত রুচির সাক্ষী হয়ে থাকে তাদের বাঙালি সহযোগী রফিক। যদিও এই পাকিস্তানি দালাল চরিত্রটি ব্যতিক্রমী। সে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করে তোলে হানাদার বাহিনীকে। ফলে উপন্যাসের শেষ দৃশ্যে দেখা যায় রফিককে হত্যা করতে বিলের ধারে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্যরা। একাত্তর সালে ক্ষমতাসীন শাসক ও হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মীয় দলগুলোর কনভেনশন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামির প্রত্যক্ষ মদদে সৃষ্ট রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর চালিয়েছিল অত্যাচার, লুটতরাজ ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ। হুমায়ূন আহমেদের ‘অনিল বাগচীর একদিন’ মুক্তিযুদ্ধকালীন এ ধরনের অপতৎপরতার বাস্তবতাকে ধারণ করে আছে। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ দশম পর্বে কবি শামসুর রাহমানকে বলেছেন- ‘গ্রামে আপনার নিরাপত্তা নাই। শান্তিকমিটি, আলবদর কত কিছু তৈরি হচ্ছে। কখন আপনাকে ধরে নিয়ে যায়- এইটাই আমার ভয়। এরা যদি ধরে নিয়ে যায় তার হিসাব থাকবে না। মিলিটারি ধরলে তার হিসাব থাকবে।’ নীলগঞ্জ থানায় একদল মিলিটারি অবস্থানকালে তাদের প্রধান ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ বাসেতের উদ্যোগে সেখানে স্থানীয়ভাবে শান্তিকমিটি গঠন করা হয়। মাওলানা ইরতাজউদ্দিন এর প্রেসিডেন্ট। কমিটির প্রধান কাজ শান্তি বজায় রাখা। শান্তিকমিটির আরেক চেয়ারম্যান হাশেম। এ উপন্যাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র ৮ম খন্ড থেকে নেওয়া ৩৩৩-৩৩৯। এক জায়গায় আছে, ‘পাকবাহিনী সোনাগাজী ও মতিগঞ্জে শিবির স্থাপন করিয়া স্থানীয় দালাল ও রাজাকারদের সহায়তায় শিবিরের আশেপাশের গ্রামগুলি আক্রমণ করিত।’ অর্থাৎ নিপীড়নচিত্রের ইঙ্গিত রয়েছে স্পষ্ট।


রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ (১৯৭৫), ‘অন্ধ কথামালা’ (১৯৮১), ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’ (১৯৮২) উপন্যাসত্রয়ে পাকিস্তানি সেনা ও দালালদের অত্যাচারের কাহিনি আছে। ‘খাঁচায়’ উপন্যাসে ডিসেম্বরের ৩ থেকে ১৬ ডিসেম্বর মাত্র তেরো দিনের কাহিনিতে পাকিস্তানি দালাল হিসেবে বিহারিদের অত্যাচার, ইসলামি ছাত্রসংঘসহ ডানপন্থি দলগুলোর কর্মকান্ড চিত্রিত হয়েছে। আর ‘অন্ধকথামালা’ উপন্যাসের কাহিনিতে দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধা বেলাল হোসেনকে (বেলু) গ্রামের শান্তিকমিটির লোকজন চোখ-হাত-পা বেঁধে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ তারা পাঁচ বন্ধু নওশের, গনি, কাসেম ও মোকসেদ মিলে পরিকল্পনা করেছিল হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর গ্রামে প্রবেশের একমাত্র সেতু বুড়িদ’র সাঁকোটি উড়িয়ে দেবে। পাবনা শহর পতনের পর হানাদার বাহিনী যেকোনো সময় গ্রামে প্রবেশ করতে পারে কিন্তু তাদের এই গোপন পরিকল্পনাটি ফাঁস হয়ে যায়। চোখ-হাত-পা বাঁধা বেল্টু শত্রু সম্পর্কে ধারণা করতে পারেনি। কিন্তু একসময় তার বন্ধু মোকসেদ নিজেই পরিষ্কার করে দেয় তার বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়টি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এ দেশীয় সহযোগী শান্তিকমিটি ও রাজাকারবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে তারই বন্ধু মোকসেদ। মাত্র এক হাজার টাকার বিনিময়ে ওরা বেল্টুকে তুলে দেয় গ্রামের শান্তিবাহিনীর সেক্রেটারি হান্নানের কাছে। অন্যদিকে ‘নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য’ উপন্যাসটি মূলত দুটি আলাদা কাহিনির সমন্বয়ে রচিত হলেও প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধ। অবশ্য ঘটনার সময়কাল ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি। এখানে অঙ্কিত হয়েছে যুদ্ধোত্তরকালে মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাহীন হতাশা, অপ্রাপ্তি ও তার বেদনা, বিপথগামিতা এবং সর্বোপরি আর্থসামাজিক অবক্ষয়।

মুক্তিযুদ্ধ ইমদাদুল হক মিলনের কথাসাহিত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ। এখানে তার দৃষ্টি ও ভাবনার জগৎ প্রসারিত; তার উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধোত্তর হতাশামগ্ন সমাজের চিত্র একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস অন্বেষায় তিনি নির্মোহ। মূলত তিনি নিজ জীবনের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে উপস্থাপন করেছেন। ‘কালোঘোড়া’ (১৯৮১), ‘ঘেরাও’ (১৯৮৫), ‘দ্বিতীয় পর্বের শুরু’ (১৯৮৮), ‘রাজাকারতন্ত্র’ (১৯৮৯), ‘মহাযুদ্ধ’ (১৯৮৯), ‘বালকের অভিমান’ (১৯৯০), ‘একজনা’ (১৯৯১), ‘সুতোয় বাঁধা প্রজাপতি’ (১৯৯৮), ‘জীবনপুর’ (২০০৯) তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। এসব উপন্যাসে দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, তাই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের সূচনা করতে চেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ ভিন্ন অনুসন্ধানী আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে উপন্যাসগুলোতে।

ইমদাদুল হক মিলনের ‘কালোঘোড়া’ উপন্যাসে শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান সিরাজের অপকর্ম ও তার করুণ পরিণতি দেখানো হয়েছে। এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা; একটি গ্রামকে ঘিরে এর কাহিনি আবর্তিত। গ্রামের বেশকিছু তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে, তারা গ্রামে এসে যাতে আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে সেজন্য চেয়ারম্যান সিরাজ শান্তিকমিটি গঠন করে। পাকিস্তানি মিলিটারিদের প্রিয় পাত্র হয়। খোকার বাপ দফাদারসহ অনেককে ডেকে এনে শাসিয়ে দেয়। গ্রাম থেকে বহুদূরে ক্যাম্প পাকিস্তানি মিলিটারিদের, তবুও সিরাজ তাদের হয়ে অশান্তির মূল হোতায় পরিণত হয়। গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা তরুণদের অবস্থান জানানো এবং সেই সংবাদ মিলিটারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শান্তিকমিটির। মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য জানার জন্য সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো ছিল নিত্য দিনের ঘটনা। কীভাবে তারা নারী নির্যাতন করেছে তারও একটি বিবরণ দেখা যায় ‘কালোঘোড়া’ উপন্যাসে।

কথাশিল্পী মঈনুল আহসান সাবেরের উপন্যাসেও বাঙালি জনগোষ্ঠী নিপীড়নের চিত্র রয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে- ‘পাথর সময়’ (১৯৯০), ‘সতের বছর পর’ (১৯৯১), ‘কবেজ লেঠেল’ (১৯৯২), ‘ফিরে আসা’ (১৯৯৯) প্রভৃতি। তার উপন্যাসে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের হেয় প্রতিপন্ন করা ও পাকিস্তানি চেতনার পুনর্জাগরণ বিবরণ বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পরাজয় (১৯৯০), কেউ মানে না (১৯৯০), সতের বছর পর (১৯৯১) উপন্যাসগুলোতে একাত্তরের পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান, মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায় অবস্থাও চিত্রিত। পাকিস্তানি দালাল তথা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী শ্রেণির ক্ষমতাবান সামাজিক শক্তি হয়ে ওঠার কাহিনি রয়েছে ‘পাথর সময়’ (১৯৮৯) উপন্যাসে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় রচনা ঔপন্যাসিক শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ (১৯৯৪)। আখ্যানে মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজাকারদের পৈশাচিকতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় দেড় দশক পর লেখক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আব্দুল মজিদের স্মৃতিচারণার অন্তরালে তুলে ধরেছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হত্যা, নির্যাতন, নৃশংসতা এবং সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ চিত্র। ২৫ মার্চের পর থেকে সমগ্র লক্ষ্মীবাজার এলাকায় দুজন লোকের মাত্র উপস্থিতি ছিল। এদের একজন বদু মাওলানা। অন্যজন এলাকার প্রবীণ মুসলমান খাজা আহমেদ আলী যাকের, যাকে শেষ পর্যন্ত মসজিদে আজান দেওয়া অবস্থায় বদু মাওলানা ও তার লোকজনেরা হত্যা করেছিল। হিন্দু বাড়িগুলো ২৫শে মার্চের পর জনশূন্য হলেও সেগুলি আর কখনো পূর্বতন অধিবাসীদের দ্বারা পূর্ণ হয়নি, এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের পরেও। পাঠক মজিদের স্মৃতির অনুষঙ্গে আরো অবগত হয় কীভাবে ২৫ মার্চের কালোরাত্রির পর বদু মাওলানা বদলে যায় এবং সে পুরো মহল্লার শত্রু হয়ে যায় একাত্তর সালে নয়াবাজারের লেলিহান আগুনে আকাশ জ্বলে ওঠার পরের দিনগুলোতে। তখন সে হঠাৎ করে কাঁধের ওপর কালো কালো খোপ খোপ চেকের স্কার্ফটি ফেলে এগিয়ে আসে এবং মহল্লার লোক পাঞ্জাবি মিলিটারির পাশে তাকে দেখে বুঝতে পারে না সে বাঙালি কিনা এবং লক্ষ্মীবাজারে যারা শেষপর্যন্ত টিকে থাকে তারা পুরোটা বছর তার কাক ওড়ানো দেখে। এভাবে উপন্যাসে লেখকের অনন্য বর্ণনার ভেতর দিয়ে উন্মোচিত হতে থাকে পাকিস্তানি সৈন্যদের পাশাপাশি, বাঙালি হয়েও বাঙালিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতার কাহিনি। রাজাকার বাহিনী কর্তৃক আব্দুল মজিদের বোন মোমেনাকে অপহরণপরবর্তী ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যা, ৩১ ডিসেম্বর ধরা পড়া রাজাকার আব্দুল গণির স্বীকারোক্তি, বদু মাওলানার নির্দেশে লক্ষ্মীবাজার ও তার আশপাশে অসংখ্য মানুষকে জবাই করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার লোমহর্ষক বিবরণ, লুটপাটসহ অসংখ্য নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে কাহিনিতে। উনিশশো একাত্তর সাল অতিক্রান্ত হলেও বদু মাওলানা এবং তার দল, সেই দলের আদর্শ ও রাজনীতি এখনো যে সমান মাত্রায় ক্রিয়াশীল, এই সহজ সত্যটা আব্দুল মজিদ উপলব্ধি করতে সক্ষম।

কবি ও কথাসাহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিকের ‘একাত্তরের হৃদয়ভস্ম’ নব্বইয়ের দশকের একটি উল্লেখযোগ্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস এবং বাংলাদেশের উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। উপন্যাসে একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক গতিধারা, সামরিক শাসনসৃষ্ট অপরাজনীতির কারণে স্বাধীনতাবিরোধীদের সামাজিক প্রতিপত্তি ও উত্থান, সমকালীন বামরাজনীতির গতিপ্রকৃতি বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। মুক্তিযুদ্ধের সময় ইদ্রিস ইজেদ্দার ছিল সবচেয়ে বড়ো রাজাকার ও পাকিস্তানিদের সহযোগী দোসর; অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারী। ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসকের তৈরি দলের সমর্থক ও তার এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি। পাকিস্তানি দালালের নির্মম আচরণের অসাধারণ চিত্রণ রয়েছে উপন্যাসটিতে। ‘উপমহাদেশ’ (১৯৯৩) এক অর্থে কবি আল মাহমুদের আত্মজৈবনিক উপাখ্যান। একাত্তর সালে ক্ষমতাসীন শাসক ও মিলিটারি তাদের এদেশীয় দোসরসহ সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর চালিয়েছিল নির্যাতন-নিপীড়নতার নিবিড় বিবরণ আছে এ উপন্যাসে।

৪.
মূলত একাত্তর এবং একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের উপন্যাস ও ঔপন্যাসিকদের চেতনা ও মনোভূমিতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল; তাদের জীবনদর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করেছিল কীভাবে সে সমস্তের পরিচয় পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীদের নিপীড়নের বিবরণ থেকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষ সকল মানুষ সেদিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। আর মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই ছিল গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব মধ্যবিত্তের হাতে থাকলেও, মধ্যবিত্তের তুলনায় মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই ছিল সর্বাধিক। পক্ষান্তরে পাকিস্তানি ও তাদের সহযোগী এদেশীয় দালালরা ছিল সুযোগসন্ধানী, গ্রাম্য মাতব্বর ও পুঁজিপতি শ্রেণির অপরাধী। তাদের নির্মমতার স্বরূপ উন্মোচনে মুক্তিযুদ্ধের ঔপন্যাসিকরা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। -সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here