মৃগীরোগ বা এপিলেপ্সি নিয়ে কথা

0
290

ডা. স্নিগ্ধা সরকার
রাস্তায়, ক্লাসরুমে বা বাজারে হঠাৎ কারো খিঁচুনি শুরু হয়েছে। কিছু মানুষ তাকে ঘিরে ধরে আছে। কেউ তার মুখের ভিতর চামচ বা কাঠি দিচ্ছে। কেউবা নাকে জুতার গন্ধ শুঁকতে দিচ্ছে। আমাদেরই অনেকেরই কমবেশি এমন অভিজ্ঞতা আছে।
মৃগীরোগ বা এপিলেপ্সি নিয়ে আমাদের মধ্যে এমন অনেক ভুল ধারণা রয়েছে, প্রচলিত আছে অপচিকিৎসা। আজকে আমরা এই মৃগীরোগ নিয়ে প্রাথমিকভাবে জানবো।

মৃগীরোগ কী বা কেন হয়?
মৃগীরোগ বা এপিলেপ্সি একটি মস্তিষ্কের রোগ। আমারে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের অস্বাভাবিক কোনো ডিসচার্জের ফলে নিউরনের মধ্যে সিগনাল বাধাগ্রস্থ হয়। যার ফলে মস্তিষ্কের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হাত-পা বা মুখে খিঁচুনি শুরু হয়।

মৃগীরোগের লক্ষণ:
খিঁচুনি শুরু হবার আগে থেকেই অনেকে বুঝতে পারে। হাত-পা বা শরীরের একাংশে ঝিম ঝিম করা, অস্বাভাবিক বোধ করা, কানে অদ্ভুত কিছু শব্দ শোনা। খিঁচুনি শুরু হবার পর যেসব উপস্বর্গ থাকতে পারে।
১. চোখ উল্টে যাওয়া।
২. মুখ দিয়ে ফেনা বা লালা বের হওয়া।
৩. জিহ্বা বা গাল কেটে যাওয়া।
৪. খিঁচুনির সময় প্রস্রাব হয়ে যাওয়া।
৫. জ্ঞান হারানো, অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে নীল হয়ে যাওয়া।
খিঁচুনি থেমে যাওয়ার পরবর্তী সময়ে রোগীর মাথাব্যথা, খিঁচুনি সময়কালীন ঘটনা মনে করতে না পারা, তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব থেকে যায়।
সাধারণত ৫-১০ মিনিট খিঁচুনি থাকে। তবে অনেক সময় তা আরও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং রোগীর জ্ঞান নাও ফিরতে পারে।
এই রোগ নিয়ে আরও একটি ভুল ধারণা হলো- শুধুমাত্র হা-পা-মুখে খিঁচুনি হলেই তা মৃগীরোগ নয়। এপিলেপ্সি দৃশ্যত খিঁচুনি না হয়েও অন্যভাবে হতে পারে। যেমন- হঠাৎ করে শরীরের একপাশে ঝিমভাব ধরা, হঠাৎ করে কাউকে চিনতে না পারা, অস্বাভাবিক আচরণ করা (কাপড় টানাটানি, ঠোঁটে অদ্ভুত শব্দ করা) আবার কিছুক্ষণ পর সব স্বাভাবিক হওয়া। এভাবেও এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগ প্রকাশ পেতে পারে।
বাচ্ছাদের মধ্যে আরেকধরণের এপ্রিলেপ্সি দেখা যায়। যেখানে মনে হয় বাচ্চা হঠাৎ অন্য মনষ্ক হয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্যহীনভাবে তাকিয়ে থাকে। অনেকে যাকে বলে ধ্যান ধরে আছে। দ্বিবা স্বপ্ন দেখছে। শিক্ষকদের অভিযোগ থাকে, এরা অমনোযোগী, পড়া বুঝতে পারে না। জ্ঞান হারায় না এবং অনেক অল্প সময়ের জন্য এমন হয়, তাই এই সমস্যা সহজে ধরা যায় না।

মৃগীরোগের কারণ:
১. বাচ্চা থেকে বয়স্ক যে কেউই আক্রান্ত হতে পারে।
২. বাচ্চাদের যদি জন্মগতভাবে মস্তিষ্কে কোনো ত্রুটি থাকে।
৩. জন্মের পর দেরিতে শ্বাস নেওয়ার জন্য মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবে কিছু সমস্যা হয়। তাদের ভবিষ্যতে এপিলেপ্সি হতে পারে।
৪. অনেক বাচ্চার জ্বর হলে খিঁচুনি হয়।
৫. বয়ষ্কদের ক্ষেত্রে স্ট্রোকের পর, ব্রেইন টিউমারের জন্য, মস্তিষ্কে যক্ষা বা প্রদাহের জন্য খিঁচুনি হতে পারে।
৬. তবে অনেক সময় কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

খিচুনির সময় কী করবো :
১. প্রথমেই রোগীকে দুর্ঘটনার জায়গা থেকে (যেমন- পানি, আগুনের সামনে থেকে, রাস্তা, মেশিনারিজ) নিরাপদে সরিয়ে আনতে হবে।
২. বাম কাত করে শুইয়ে দিতে হবে। যেন মুখের লালা বা ফেনা শ্বাসনালীতে না যায়।
৩. তারপর খিঁচুনি না কমলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা:
মৃগীরোগ বা এপিলেপ্সি নির্ণয়ের জন্য মস্তিষ্কের ইইজি করা হয়। এর মাধ্যমে এপিলেপ্সির ধরন নির্ণয় করা হয় এবং সেই অনুযায়ী ঔষধ শুরু করা হয়।
ব্রেইনের এম.আর.আই; যদিও অনেক ব্যয়বহুল। তবে মস্তিষ্কের রক্তনালীর জটিলতা, টিউমার নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়।
এপিলেপ্সির চিকিৎসার জন্য কয়েক শ্রেণীর ঔষধ রয়েছে। যেমন- লিভাটিরাসিটাম, সোডিয়াম ভ্যালপোরেট, ফিনাইটোইন। এপিলেপ্সির ধরন অনুযায়ী এইসব ঔষধ দেওয়া হয়। বাচ্চাদের ওজন, বয়ষ্কদের অন্যান্য মেডিক্যাল কন্ডিশন অনুয়ায়ী ঔষধ দেওয়া হয়। তাই রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এইসব ঔষধ গ্রহণ করা যাবে না। তবে মস্কিষ্কের গঠনগত কোনো সমস্যা থাকলে সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।

মৃগীরোগে কি করবেন না:
১. কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষধ বন্ধ করা যাবে না। অনিয়মিতভাবেও ঔষধ সেবন করা যাবে না।
২. এপিলেপ্সির ঔষধ গর্ভের সন্তানের কিছু ত্রুটি করতে পারে। তাই মেয়েরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভধারণ করবেন না। গর্ভধারণের পূর্বে এবং গর্ভকালীন সময়ে অবশ্যই চিকিৎসকের ফলোআপে থাকতে হবে।
৩. খিঁচুনির সময় মুখে চামচ বা অন্য কিছু দেওয়া যাবে না। এতে আরও ইনজুরির সম্ভাবনা বাড়ে।
৪. যেসব কাজে খিঁচুনির ঝুঁকি বাড়ে, যেমন- নিদ্রাহীনতা, উচ্চ ভলিউম বা অধিক আলোর ঝলকানিতে টিভি দেখা, মদ্যপান এসব কাজ করা যাবে না।
৫. কিছু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যেমন ড্রাইভিং (বিশেষ করে গাড়ি, বাস চালানো), মেশিনারীজ বা করাত কলের কাজ, একা একা পানিতে নামা, আগুনের কাছে কাজ যেমন- চুলায় রান্না করা এসব করা যাবে না। যথাসম্ভব পরিহার করে চলতে হবে।
পরিশেষে এটাই বলতে চাই যে, মৃগীরোগ কোনো ভুত-প্রেতের আছর নয়, অভিশাপ নয়। সঠিক চিকিৎসায় নিয়ম মেনে স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।
[লেখক: এমডি (নিউরোলজি), ফেজ-বি রেসিডেন্ট; নিউরোলজি বিভাগ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here