মোরাকাবার মাধ্যমে আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব।
– ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.)

0
78

মোরাকাবা হযরত আদম (আ.)-এর সময় থেকে শুরু হয়েছে। আদম (আ.) যখন গন্দম খেয়ে ফেললেন, তিনি ৩৯০ বছর আল্লাহর দরবারে কান্না-কাটি করলেন। আল্লাহ তো আর তার সামনে হাজির ছিল না যে, আল্লাহর কদম মোবারক ধরে তিনি বলবেন তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আল্লাহ্ যখন তাকে বেহেশত থেকে নামিয়ে দিলেন তখন তিনি কীভাবে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করবেন? মোরাকাবা করে কান্নাকাটি করেছেন। চোখ বন্ধ করে, তাকে স্মরণ করে, ওগো দয়াল মাওলা, দয়াল খোদা তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার হুকুম এবং নির্দেশনা অমান্য করেছি, তুমি আমাকে সৃষ্টি করে লালন-পালন করেছো, বেহেশতে রেখে সব কিছু দিয়েছো তবুও আমি তোমার নির্দেশ অমান্য করেছি। তুমি যেই বৃক্ষের কাছে আমাকে যেতে নিষেধ করলে, আমি সেখানেই গিয়েছি; যেই ফল খেতে না করলে আমি সেটাই করছি। আমি শয়তান ও রিপুর তাড়নায় এই কাজে লিপ্ত হয়েছি। তুমি দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দাও।


গত ২০ মে, শুক্রবার দিবাগত রাতে বাবে রহমত দেওয়ানবাগ শরীফে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মোহাম্মদী ইসলামের নেতৃত্বপ্রদানকারী মহামানব ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুরের অনুমতিক্রমে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক আশেকে রাসুল (সা.) মাহফিলে বক্তব্য প্রদানকালে এ কথা বলেন।


ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুর বলেন, মহান আল্লাহর কাছে আদম (আ.) যে পদ্ধতিতে ক্ষমা চাইলেন মূলত তাই মোরাকাবা। ঐ জায়গা থেকে মোরাকাবার সূচনা হয়। মোরাকাবার শুরু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মাধ্যমে, আল্লাহ্ তুমি আমাকে ক্ষমা কর। যখনই আল্লাহ্ বান্দার সামনে থাকেন না বান্দা কিভাবে তাকে ডাকবে এবং স্মরণ করবে? বান্দা তাকে ডাকবে মোরাকাবার মাধ্যমে। তাকে খুঁজবে, অনুসন্ধান করবে, অনুধাবন করবে, অনুভব করবে এবং তার রাস্তা খোঁজার জন্যে পর্যবেক্ষণ করবে এই সবকিছুর নামই মোরাকাবা। নিজেকে চরিত্রবান বানানোর নাম মোরাকাবা। বাবা আদম (আ.) থেকে হযরত রাসুল (সা.) পর্যন্ত সকল যুগে মোরাকাবা ছিল। আদম (আ.) সকল নবি এবং সকল মানুষের পিতা। উনি সকলের পিতা হওয়ার পরেও মোরাকাবা করতে হয়েছে। আদম (আ.)-এর মোরাকাবার ইতিহাস পাওয়া যায় ৩৯০ বছর। হযরত রাসুল (সা.)-এর ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ ১৫ বছর মোরাকাবার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। হযরত রাসুল (সা.) যদি ১৫ বছর মোরাকাবা করে থাকেন প্রথম নবি আদম (আ.) মোরাকাবা করে আল্লাহর কাছে যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন তার ইতিহাস পাওয়া যায় ৩৯০ বছর, ৩০০ বছরের বেশি তিনি মোরাকাবা করেন। তাহলে এটা প্রমাণিত যে, মোরাকাবা ছাড়া আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায় না। শুধু মোরাকাবা করলেই যে আল্লাহর সন্তুষ্ট হবে এটাও মানার কোনো কারণ নেই, অসিলাও প্রয়োজন হয়। যেমন চাকরি করতে গেলে বস একটু সুপারিশ করলে প্রমোশন হয় এবং তার কাছের লোক হলে প্রমোশন হয় ঠিক, তেমনিভাবে আল্লাহর কাছেও ক্ষমা পেতে হলে ঐরকমই অসিলা লাগে। এই অসিলা হচ্ছেন নবুয়তের যুগে নবি-রাসুলগণ এবং বেলায়েতর যুগে অলী-আল্লাহগণ।


ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা বলেন, মোরাকাবায় বসে হযরত আদম (আ.) ৩৯০ বছর আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করলেন কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ করলেন না। তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলেন না। কিন্তু যখনই তিনি তার বন্ধুত্বের অসিলা ধরলেন অর্থাৎ নবি মোহাম্মদ মোস্তফা আহম্মদ মোজতবা (সা.)-এর অসিলা ধরে বললেন, ওগো দয়াল মাওলা, দয়াল খোদা! ৩৯০ বছর তোমার দরবারে আমি কান্নাকাটি করেছি, তুমি আমাকে মাফ করোনি। আমি তো অভাগা, তোমাকে এবং তোমার কথাকে অসম্মান করেছি। তুমি যাকে ভালোবাসো, তোমার সাথে যার মহব্বতের সম্পর্ক সেই মোহাম্মদ মোস্তফা আহম্মদ মোজতবা (সা.) যার নামের সাথে তোমার নাম জড়িয়ে আছে তাঁর অসিলা ধরে তোমার দরবারে মাফ চাই, তুমি এই গোলামকে মাফ করে দাও। আল্লাহর কসম আল্লাহ্ তাঁর বন্ধু মোহাম্মদের অসিলায় এবং তার ইজ্জতের খাতিরে আদম (আ.)-কে মাফ করে দিলেন এবং ৩টি পুরস্কার দান করলেন। আদম (আ.) থেকে আমরা দুটি ঘটনা শিক্ষা লাভ করলাম; এক ৩৯০ বছর মোরাকাবা এবং দুই নবি মোহাম্মদ (সা.)-এর অসিলা ধরা। তাহলে ৩৯০ বছর আল্লাহ যাকে ক্ষমা করেনি শুধুমাত্র মোরাকাবায় নবি মোহাম্মদ (সা.)-এর অসিলায় তিনি আদম (আ.)-কে মাফ করে দিলেন। সেই আল্লাহ্ কি আমাকে মাফ করতে পারেন না? আমরা তো শুধু নবি মোহাম্মদের অসিলা ধরি না বরং তাঁর সাথে জগৎ শ্রেষ্ঠ অলী-আল্লাহ্, অলীদের বাদশা, আল্লাহর বন্ধু শাহ্ দেওয়ানবাগী (রহ.)-এর অসিলা ধরি। দেওয়ানবাগীর অসিলা ধরি; নবি মোহাম্মদ (সা.)-এর অসিলা ধরি তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। তাহলে আমার মালিক কি আমাকে মাফ করতে পারেন না? তাহলে এই যে মোরাকাবার মাধ্যমে যুগে যুগে অলী-আল্লাহগণ আল্লাহর সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং আল্লাহর সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা পেয়েছেন এটাই মোরাকাবার মাহাত্ম্য।


ড. কুদরত এ খোদা বলেন, হযরত আদম (আ.), হযরত নূহ (আ.) করেছে, হযরত শীষ (আ.), হযরত ইব্রাহিম (আ.), হযরত মুসা (আ.), হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা আহম্মদ মোজতবা (সা.) মোরাকাবা করেছেন এবং তাঁদের পরবর্তীতে একে একে যত অলী-আল্লাহ এসেছেন প্রত্যেকে মোরাকাবা করেছেন। আর আপনি আজকে ২০২২ সনে এসে ভেবেছেন মোরাকাবা ছাড়া আল্লাহকে পেয়ে যাবেন? অলী-আল্লাহ এবং নবি-রাসুলগণ করেছেন, আপনি তো তাঁদের চেয়ে বড়ো নন। আল্লাহ তাঁদের সাথে যোগাযোগ করেছেন মোরাকাবার মাধ্যমে। আপনার সাথে কি করবেন না? করবেন। মহান আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)-এর সাথে কথা বলেছেন; হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে কথা বলেছেন; হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে কথা বলেছেন; হযরত নূহ (আ.)-এর সাথে কথা বলেছেন তখন আল্লাহর জবান ছিল আর এই ২০২২ সনে এসে আল্লাহ কথা বলতে পারেন না! এখন আল্লাহর কথা জগতে আর কেউ শুনে না, যদি ভুলেও কেউ আল্লাহর কথা শুনে আমাদের হুজুররা আছে তো ফতোয়া দেওয়ার জন্যে। তাড়াতাড়ি তাকে ফতোয়া দেয়, আল্লাহ তখনও কথা বলেছেন আল্লাহ এখনও কথা বলেন। সমস্যা হলো তখন মোরাকাবা করেছেন এখন করে না। এজন্যে আমরা এখন শুনি না, এটা হচ্ছে আমাদের অসুবিধা। আমরা এই মোরাকাবা ত্যাগ করার কারণে আশেকে রাসুল আছে কিন্তু তাদের অন্তর চক্ষু খুলছে না; মোরাকাবা ত্যাগ করার কারণে আশেকে রাসুল তৈরি হয়েছে কিন্তু চরিত্র তৈরি হচ্ছে না; মোরাকাবা ত্যাগ করার কারণে মানুষ আশেকে রাসুল হচ্ছে কিন্তু অন্তরের কালিমা, পাপ-পঙ্কিলতা থেকে দূরীভূত হচ্ছে না; মোরাকাবা ত্যাগ করার কারণে তারা তওবা পড়ছে না, চরিত্রবান হচ্ছে না, অন্ধকার থেকে আলোকিত হচ্ছে না; নিজের রিপুগুলোকে দমন করতে পারছে না এবং তারা আল্লাহ থেকে হাজার মাইল দূরে সরে গেছে। কিন্তু তারাই তো আবার বলছে,আমরা আশেকে রাসুল।


প্রফেসর ইমাম ড. কুদরত এ খোদা বলেন, আমার দায়িত্ব কি? আমার দায়িত্ব এবং কাজ হচ্ছে-আপনার সমস্যা খুঁজে বের করা এবং এর সমাধান করা। সমাধান আমি করতে পারি না তবে আমি সমাধান দিতে পারি। আমার এই যাত্রাটা সহজ নয়। আমি যে রাস্তায় হাঁটছি এ রাস্তাটা আমার জন্যে অনেক কঠিন। আমি জানি, এই রাস্তাটা আমার জন্যে সহজ হবে না। মানুষকে চরিত্রবান বানানোর রাস্তা অনেক কঠিন। সারা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মানুষ আমার বিপক্ষে দাঁড়াবে যে, এক পাগল মানুষকে চরিত্রবান বানানোর রাস্তায় নেমেছে। এখন আপনার কাছে একটা প্রশ্ন করি, আমি কি মানুষের বিপক্ষের তোয়াক্কা করবো, না-কি মোর্শেদের আমানত রক্ষা করবো? মোর্শেদের আমানত রক্ষা করতে হবে কারণ মোর্শেদ আমার প্রাণাধিক প্রিয় অর্থাৎ প্রাণের অধিক প্রিয়। উনি আমাকে আমানত দিয়েছেন, এই আশেকে রাসুলদের। উনি আমাকে বলেছিলেন, তুমি যদি আমার এই তরিকার হাল না ধরো আমার তরিকাটা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি আমার মুরিদদের তোমার হাতে দিলাম। আমার মোর্শেদ শাহ দেওয়ানবাগী, উনি যখন হুকুম করেছেন, আমার তো আর যাওয়ার জায়গা নেই। আমি আমানত গ্রহণ করলাম মোর্শেদের কাছ থেকে। এবার যদি আপনার ঐ অন্ধকার কবরকে আলোকিত করতে না পারি, আমি তো মোর্শেদের সাথে নিজের আমানতের খেয়ানত করে ফেললাম। তখন আমার কি হবে বলেন?


ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা বলেন, মোর্শেদ আমাকে বিশ্বাস করে বলেছেন, এই মুরিদের কবরকে তুমি আলোকিত করে দাও। আমি কিভাবে আলোকিত করবো যখন মুরিদ আমার কথা শুনবে না? আমি কিভাবে আলোকিত করবো, যখন মুরিদ তাকে চরিত্রবান বানাবে না? আমি কিভাবে আলোকিত করবো, যখন আপনি আলোর সন্ধান চান না? আপনি শুধু মুখে আশেকে রাসুল বলতে চান কিন্তু আপনার মধ্যে সেই চরিত্র তৈরি হয়নি এবং চরিত্র তৈরি করার চেষ্টাও করেন না। আমার জায়গাটা একটু ভাবেন, আমি অনেক বড়ো অসহায়। ঐদিকে কাজ না করলে মোর্শেদ অসন্তুষ্ট হয় আর এইদিকে কাজ করি আপনি ইমানদার হন না তাও মোর্শেদ অসন্তুষ্ট হন। আমি কোথায় যাবো। আমি বলতে চাই মোরাকাবা এমন একটি ইবাদত যাতে আপনি আল্লাহর সাথে এবং আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলতে পারেন। অতএব এটাই সকল নবি-রাসুল এবং অলী-আল্লাহগণ পালন করেছেন। এখন সকল আশেকে রাসুলদের এটা অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয়। আপনি যদি নামাজ পড়েন নামাজে মোরাকাবা করতে হবে; আপনি যদি মিলাদ পড়েন মিলাদে মোরাকাবা করতে হবে। মোরাকাবার মাধ্যমে নামাজ আদায় করবেন; মোরাকাবার মাধ্যমে মিলাদ পাঠ করবেন। নিজেকে চরিত্রবান বানাতে হবে; আল্লাহ ও রাসুলের পথে ধাবিত হতে হবে। বাবাজান একটি কথা বলতেন, গোসল করতে হলে হাঁটু পানিতে নেমে গোসল করো না, তাহলে গোসল হবে না। গোসল করতে হলে গলা পানিতে নেমে গোসল করো তাহলে সুন্দর গোসল হবে। এর অর্থ আশেকে রাসুল হলেন অথচ হাঁটু পানিতে নেমে যদি ভাবেন যে আমার গোসল হবে, আসলে গোসল হবে না অর্থাৎ তরিকা নিলেন ২/৪ বার মিলাদ এবং ২/৪ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে যদি মনে করেন আপনি আশেকে রাসুল। এটা ঠিক হবে না।


মোহাম্মদী ইসলামের নেতৃত্বপ্রদানকারী মহামানব ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা বলেন, আশেকে রাসুল একটি চরিত্রের নাম। এটা শুধু নামাজ পড়া, মিলাদ পড়া বা দুনিয়ার আমল করা নয়; চরিত্রবান হওয়া। চরিত্রবান মানুষ নামাজ পড়লে নামাজে মিরাজ হয়। তখন আল্লাহর সাথে দেখা হবে। সেজন্যে আমরা যাতে নিজেরা পরিবর্তিত হতে পারি এবং নিজেদের পরিবারের সদস্যদের সৎ উপদেশ দিয়ে তাদের পরিবর্তিত করতে পারি, মহান মালিক আমাদের সেই তৌফিক দান করুন। আমার মালিক আপনাদের সৎ চরিত্রবান হওয়ার সুযোগ করে দিন এবং আপনাদের শক্তি ও সামর্থ্য দিন আপনারা যাতে আল্লাহ ও রাসুলের পথে অগ্রসর হতে পারেন।


পরিশেষে মোহাম্মদী ইসলামের নেতৃত্বপ্রদানকারী মহামানব, ইমাম প্রফেসর ড. কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুর তাঁর বাণী মোবারকা প্রদান শেষে আখেরি মোনাজাত প্রদান করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here