মোর্শেদের কাছে আত্মসমর্পণ

2
555

আশেকে রাসুল মাসুদ করিম
বিশ্ব বিধাতার এক ঐশী শক্তি হলো প্রেম। এই প্রেমাবেসে মহান মালিক সৃষ্টি করেছেন তাঁর বিচিত্র সৃষ্টি। অনাদিকালে যে প্রেমের উৎস অনন্তকালে সে প্রেম অম্লান। কালের পরিক্রমায় এ প্রেম ধারণ করেই মোর্শেদ রূপে নবি-রাসুল, আওলিয়ায়ে কেরাম সৃষ্টিজগত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

‘মোর্শেদ’ আরবি শব্দ। এর বাংলা প্রতিশব্দ- পথপ্রদর্শক, আলোকবর্তিকা, শিক্ষক, পথের দিশা, সত্যে উপনীত হওয়ার প্রশিক্ষক ইত্যাদি। বাংলায় বহুল প্রচলিত শব্দ ‘পির’, যা ফারসি ভাষা থেকে উদ্ভুত। তা ‘মোর্শেদ’ শব্দেরই প্রতিশব্দ। মহান মালিক মানব মুুক্তির জন্য দয়া করে পবিত্র কুরআনে মোর্শেদ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘ওয়া মাই ইউদলিল ফালান তাজিদালাহু ওয়ালিয়াম মোর্শেদা।’’ অর্থাৎ- “আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করেন, আপনি কখনো তার জন্য কোনো মোর্শেদ বা পথপ্রদর্শনকারী অভিভাবক পারেবন না।” (সূরা আল কাহ্ফ ১৮: আয়াত ১৭) সার্ভারের সাথে সংযোগ স্থাপন করার জন্য যেমন অপটিক্যাল ফাইবার প্রয়োজন, তদ্রুপ বিশ্ব আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য প্রয়োজন কামেল মোর্শেদ। সার্ভার যত শক্তিশালীই হোক না কেন অপটিক্যাল ফাইবার কোথাও লিক বা ছিঁড়ে গেলে যেমন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তেমনি মোর্শেদের সাথে মুরিদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেলে, মহান রাব্বুল আলামিন ও হযরত রাসুল (সা.)-এর সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মানুষ সর্বদাই বৈষয়িক জগতের লোভ, মোহ-মায়া, কামনা-বাসনার জালে বন্দি। এ বন্দিদশা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে আপন মোর্শেদের কাছে আত্মসমর্পণ।

কার কাছে কিভাবে আত্মসমর্পণ করতে হয়; আত্মসমর্পণের পদ্ধতি কি, পরমাত্মার সাথে মানবাত্মার যোগাযোগের প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি জানা অত্যাবশ্যক। সহজ কথায় বলা যায় এভাবে, আপন মোর্শেদের নির্দেশিত পথে নিজেকে পরিচালিত করে পরমাত্মার প্রতি নতি স্বীকার করাই আত্মসমর্পণ। আসলে জীবাত্মার মুক্তির জন্যই পরমাত্মার কাছে আত্মসমর্পণ। মূর্খের আত্মসমর্পণ জ্ঞানীর কাছে, বস্তুবাদী জ্ঞানের আত্মসমর্পণ ভাববাদী জ্ঞানের কাছে, ভোগীর আত্মসমর্পণ যোগীর কাছে, বুদ্ধিবাদী সত্তার আত্মসমার্পণ ভক্তিবাদী চিত্তের কাছে, জীবাত্মার আত্মসমর্পণ পরমাত্মার কাছে; তেমনি মুরিদ বা ভক্তের আত্মসমর্পণ স্বীয় মোর্শেদের কাছে।

প্রকৃতপক্ষে আত্মসমর্পণকারীই সত্যিকারের মুসলমান। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘‘হে ইমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্কে যথার্থরূপে ভয় করো এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলমান) না হয়ে কোনো অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করো না।’’ (সূরা আলে ইমরান ৩: আয়াত ১০২) বর্ণিত আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিন ইমানদারগণকে প্রকৃত মুসলমান হওয়ার তাগিদ করেছেন।

আত্মসমর্পণের প্রথম পর্যায় হচ্ছে রুকু করা। রুকু করার অর্থ ঝুঁকে যাওয়া, অবনত হওয়া, বিনয়াবনত হওয়া, নত শির হওয়া। এর পরের স্তর সেজদা বা মিশে যাওয়া/মানবীয় আমিত্বকে হারিয়ে ফেলা বা ফানা পূর্ণ আত্মসমর্পণে লা মোকামে অবস্থান। আত্মসমর্পণের শপথের নাম বাইয়াত। যিনি বাইয়াত করান তাকে ফারসি ভায়ায় ‘পির’ আর পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘মোর্শেদ’ বলা হয়েছে। আর যে ব্যক্তি বাইয়াতের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের শপথ গ্রহণ করেন, তাকে ‘মুরিদ’ বলা হয়। মুরিদ অর্থ- মরে যাওয়া। অর্থাৎ- নিজের ইচ্ছায় কোনো কিছু করতে অক্ষম। প্রকৃতপক্ষে মুরিদ মানে নিজেকে মোর্শেদের কাছে সমর্পিত করে তাঁর ইচ্ছায় জীবন অতিবাহিত করা। রূহ বিহীন দেহ যেমন নিজের ইচ্ছায় নড়াচড়া বা চলাফেরা করতে পারে না; তেমনি মুরিদ কভু আপন মোর্শেদের ইচ্ছাব্যতীত নিজেকে পরিচালিত করতে পারে না। কামেল মোর্শেদ নুরে মোহাম্মদীর ধারক ও বাহক। সুতরাং মোর্শেদের সংস্পর্শ লাভ করে, মুরিদের কলুষিত আত্মা ক্রমান্বয়ে তাঁরই নুরের পরশে আলোকিত হয়।

যুগের শ্রেষ্ঠ মোর্শেদ সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান মহান প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণের শ্রেষ্ঠ উপায় শিক্ষা দিয়ে থাকেন। তাইতো তিনি আত্মসমর্পণের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম নামাজ আদায়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে বলেন, নামাজ এমন একটি ইবাদত যা বান্দাকে প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ শিক্ষা দেয়। তিনি নামাজ আদায়ের প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘‘নামাজ আদায় করতে গিয়ে আমরা প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়াই যা আইব ‘আলিফ’ অক্ষরের ন্যায়। আলিফ অক্ষরে কোনো নুকতা নেই। একদম শূন্য বা খালি। অর্থাৎ- হে দয়াময়! তুমি দেখ, আমি তোমার সম্মুখে শূন্য হয়ে হাজির হয়েছি। তারপর আমরা রুকু করি যা আরবি ‘হা’ অক্ষরের ন্যায় অর্থাৎ- এই হা অক্ষরটিও নুকতা শূন্য আমি তোমার কাছে সব কিছু ছেড়ে দিয়ে রুকু করলাম। আবার সেজদায় আমরা ‘মিম’ অক্ষরের ন্যায় মহান মালিকের কদমে লুটিয়ে পড়ি। এরপর তাসাহুদ পড়ার সময় আরবি ‘দাল’ অক্ষরের ন্যায় তাও নুকতা শূন্য। আরবি হরফ ‘আলিফ, হা, মিম ও দাল একত্রে সাজালে ‘আহম্মদ’ শব্দটি গঠিত হয়। নামাজের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে মুরিদ মোর্শেদের নির্দেশ অনুসরণ করে আহাম্মদী চরিত্র অর্জন করতে পারে। মহান প্রভুর নিকট আত্মসমর্পণের পূর্বশর্ত হলো- মুরিদকে মোর্শেদের নিকট পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করা। কেননা পৃথিবীতে এমন কোনো বিদ্যা নেই, যা কোনো না কোনো মোর্শেদ বা শিক্ষকের সাহায্য ব্যতীত অর্জন করা যায়। এ প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘‘আর রাহমানু ফাসআল বিহী খাবিরা” অর্থাৎ- “তিনিই রাহমান, তাঁর সম্বন্ধে যিনি অবগত আছেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করে দেখো।” (সূরা আল ফোরকান ২৫: আয়াত ৫৯) এভাবে তিনি মহান রাব্বুল আলামিনের সাথে যোগাযোগের জন্য প্রতিটি ইবাদতে আত্মসমর্পণের শিক্ষা দিয়ে থাকেন। কেন না যোগাযোগ বিহীন ইবাদত অর্থহীন। তাঁর এ আত্মসমর্পণের শিক্ষার লক্ষ্য হলো মোর্শেদের মাধ্যমেই মুরিদের কাঙ্খিত লক্ষ্য আল্লাহ্ এবং হযরত রাসুল (সা.)-কে লাভ করতে পারে।

মহান রাব্বুল আলামিন সৃষ্টির কল্যাণের জন্য যুগে যুগে নির্বাচিত মহামানবগণকে প্রেরণ করে সৃষ্টির চলমান ধারা অব্যাহত রেখেছেন। প্রেরিত নবি-রাসুল, অলী-আল্লাহ্গণ প্রত্যেকেই সমকালীন যুগের মোর্শেদ হিসেবে রহমানের পরিচয় সৃষ্টির মাঝে তুলে ধরেছেন। যেমন- সৃষ্টিরাজির আলোর দিশারী আল্লাহ্ রাব্বুল ইজ্জতের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হযরত রাসুল (সা.) বলেন, বুয়িস্তু মুআল্লিমান অর্থাৎ আমি শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি। যিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ না করেও শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছেন, তিনি কেমন আলো! আল্লাহ্ রাব্বুল ইজ্জত নিজের সম্বন্ধে বলেন, ‘‘আমি জ্বালানো বাতির মতো।’’ আর হযরত রাসুল (সা.) সম্বন্ধে বলেন, ‘‘হে রাসুল! আপনি হলেন প্রজ্ঝলিত প্রদীপ।’’ এখানে মহান রাব্বুল আলামিন হযরত রাসুল (সা.)-কে প্রজ্ঝলিত প্রদীপ; অর্থাৎ মোর্শেদ হিসেবে জগতে পাঠিয়েছেন।

‘ইসলাম’ অর্থ শান্তি। আর মুসলমান হলো ‘আত্মসমর্পণকারী’। আত্মসমর্পণই একমাত্র শান্তির পথ। আত্মাকে সমর্পণ করতে হবে আল্লাহর কাছে। এখন প্রশ্ন হলো- আল্লাহ্কে না পেয়ে কিভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করবো। তাইতো মহান মালিক তাঁর পরিচয় দিতে গিয়ে পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘‘আমি (আল্লাহ্) তোমাদের নফসের মাঝে বিরাজ করি, তোমরা কি আমাকে দেখ না?’ অন্যত্র বলেন, “বান্দা তুমি যেখানে আমি মাওলা সেখানে।” অন্য এক জায়গায় বলেন, “আমি (আল্লাহ্) তোমার শাহরগের চেয়েও নিকটে।” হযরত রাসুল (সা.) বলেন, “মুমেন ব্যক্তির ক্বালবই আল্লাহর আরশ।” প্রকৃতপক্ষে মহামানবগণের ক্বালবই আল্লাহর আরশ। অলী-আল্লাহ্গণ সামাজিকভাবে সাধারণ মানুষের সাথে বসবাস করলেও তিনি আল্লাহর বন্ধু। আমরা জানি, একজন সাধারণ মানুষ চিকিৎসাশাস্ত্র পাঠ করে যখন ডাক্তার হয়ে যায়, তখন সে আর সাধারণ মানুষ নন তার পরিচয় হয় ডাক্তার। তেমনি সাধনা করে একজন মানুষ যখন আল্লাহর জ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে যান, তখন তিনি আর সাধারণ মানুষ থাকেন না। তিনি হয়ে যান অলী-আল্লাহ্ তথা মোর্শেদ। যেহেতু আল্লাহর অলীগণ মহান সত্তার সাথে নিজেকে বিলীন করে দিতে সক্ষম সেহেতু মোর্শেদের হাত পা হয়ে যায় আল্লাহর হাত পা। আর তখনই আল্লাহর নুর মোর্শেদের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তাঁর জবানীতে আল্লাহর বাণী প্রকাশিত হয়। তাই তো কবি বলেছেন-
মান না গুনজাম দার জমিনে আসমা
লেকে গুনজাম দার কুলুবে মুমেনা।

অর্থাৎ- আসমান জমিনের কোথাও আল্লাহর স্থান সংকুলান হয় না। মুমেন ব্যক্তির হৃদয় হলো মহান রাব্বুল আলামিনের একমাত্র সিংহাসন। আল্লাহর পরিচয় পেয়ে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান। যারা এ মহাসত্যকে উপলদ্ধি করতে পেরেছেন তারা আত্মসমর্পণ করেছেন। অলীয়ে কামেল তথা মোর্শেদে মোকাম্মেলের কাছে হয়েছেন আত্মসমর্পিত। আর আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই মানবজীবনের অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। তাই মুরিদের কর্তব্য হলো মহান রাব্বুল আলামিনের পরিচয় সৃষ্টির মাঝে তুলে ধরে মহান মালিকের প্রতিনিধিত্ব করা। সাহাবাগণ আত্মসমর্পণ করেছিলেন হযরত রাসুল (সা.)-এর হাতের ওপর হাত রেখে বায়াতের মাধ্যমে কালেমা ধারণ করে।

তাই তো মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন- ‘‘হে রাসুল! যারা আপনার হাতে হাত দিয়ে বায়াত গ্রহণ করেছে, তারা আল্লাহর হাতে হাত দিয়েই বায়াত গ্রহণ করেছে। তাদের হাতের উপরই আল্লাহর হাত ছিল।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮: আয়াত ১০) আত্মসমর্পণের পথে বড় অন্তরায় হলো- আমিত্ব বা অহংকার। এই আমিত্বের কারণেই আরবের বিখ্যাত পণ্ডিত ‘আবুল হাকাম’ অর্থাৎ জ্ঞানীদের পিতা আল্লাহর লানতে ‘আবু জাহেল’ তথা মূর্খের পিতায় পরিণত হয়। সত্যিকার অর্থে মহান মালিকের বিশেষ কৃপা যাদের উপর বর্ষিত হবে তারাই এ পথের পথিক হবে। হিন্দু পণ্ডিত ব্রহ্মচারী রেবতী মোহন দাস মানুষকে আত্মসমর্পণে উদ্ধুদ্ধ করতে তার লেখা বই ‘দয়ালের উপদেশ’ গ্রন্থে জোহর আলী শাহর একটি উক্তি তুলে ধরেছেন তা হলো- ‘দয়ালের দয়ায় সারা দুনিয়া আচ্ছন্ন হয়ে আছে, কিন্তু দয়া নেবে কে? দয়ার সাগরে যে আমরা উপুড় হওয়া কলসের মতো ভাসছি। আরে দয়ালের দয়া নিতে চাস একটু কাত হ, একটু কাত হ। দয়ার সাগরে উপুড় হয়ে ভাসমান কলসের একটু কাত হওয়াই আত্মসমর্পণ।

জগদ্বিখ্যাত আলেম জালালউদ্দিন রূমী তাঁর মোর্শেদ শামস তাব্রিজের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং নেয়ামত প্রাপ্তির পর বলেছেন- “খোদ ব খোদ মাওলানা রুম হারগেজ না শোদ,
ত গোলামে শামস তাব্রিজে না শোদ।”

অর্থাৎ- আমি রুমী ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্তে পৌঁছাতে পারিনি যতক্ষণ না আমি শামস তাব্রিজের গোলামী করেছি। এ বিখ্যাত দার্শনিকের উক্তিতে বুঝা যায়- অলী-আল্লাহর সোহবত মহব্বত পায়রবি ও গোলামি ব্যতিত শুধু ইবাদত বন্দেগি আর বিদ্যা বুদ্ধি পাণ্ডিত্য দিয়ে মহান আল্লাহ্কে পাওয়া সম্ভব নয় তথা প্রকৃত মুসলমান হওয়া যায় না।

তিনি আরও বলেছেন- “গারতু খাহি হাম নিশেনী ব খোদা; তু নিশেনী দার হুজুরে আওলিয়া।” অর্থাৎ- তুমি যদি আল্লাহ্র সংসর্গে বা সোহবতে বা সংস্পর্শে বসতে ইচ্ছা করো তবে কোনো অলী-আল্লাহর সংস্পর্শে বা সংসর্গে বসো। মসনবীতে উল্লেখ করা হয়েছে- “গারতু চাহে অছলে হক্ আয় বে খবর, কামেলুকা খাকে পা ছর বছর।” অর্থাৎ- হে বেখবর! তুমি যদি আল্লাহ্র হুজুরে পৌঁছতে ইচ্ছা করো, তবে অবশ্যই কোনো কামেল অলী-আল্লাহর পদধুলি হয়ে যাও। অর্থাৎ- নিজেকে ফানা বা বিলীন করে দিয়ে আল্লাহ্কে লাভ করার উদ্দেশ্যে কোনো কামেল মোর্শেদের পদধূলি হয়ে যাও।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- “এছছেফাত কা গার মেলে তুঝকো গাদা; জান ওয়া দেলছে তোম উজপর হোফেদা।” অর্থাৎ- যে ব্যক্তির সঙ্গে মহব্বতের সাথে উঠা-বসা ও খেদমত করলে তোমার দিলে নুরে এলাহী অবতীর্ণ হয়ে ফায়েজ বর্ষিত হয় ও মুর্দা দিলে আল্লাহর জ্বিকির জারি হয় এরকম গুণের অধিকারী কোনো মিছকিনকেও যদি পাও তবে জান ও দিল দিয়ে তার খেদমতের জন্য কুরবান হয়ে যাও।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- “ছবছে হো আজাদ উন কে হো গোলাম; গার মেলে দিনকা মজা তুঝকো তামাম।” অর্থাৎ- তুমি যদি ধর্মের স্বাদ গ্রহণ করতে চাও তবে সমস্ত ত্যাগ করে কোনো কামেল অলীর গোলাম হয়ে যাও। প্রকৃত পক্ষে ধর্ম বুঝতে হলে সমস্ত ভুলে কোনো কামেল অলীর কদম মোবারক শক্ত করে ধরলে ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব বুঝতে সক্ষম হবে।

অলী-আল্লাহ্গণের দিলের ফায়েজ সাবান স্বরূপ এবং মুরিদের দিল ময়লা কাপড় স্বরুপ আল্লাহ্র নাম পানি স্বরূপ মোর্শেদ নিজে ধোনে ওয়ালা স্বরূপ। ময়লা কাপড়ে সাবান লাগিয়ে কাচলে যেমন কাপড় পরিস্কার হয়ে যায় তদ্রুপ কামেল অলীর ফায়েজ মুরিদের দিলে পড়ার এবং সোহবত লাভ করার সাথে সাথে মুরিদের দিল মোর্শেদের নুরের আলোতে আলোকিত হতে থাকে। আল্লাহ বলেন- ‘ওয়াকুনু মাস সাদেকীন’ অর্থাৎ- যারা আমার অভিমুখী হয়েছে তাদের সঙ্গী হও। রুকুকারীদের সাথে রুকু কর। হযরত খাজা আবদুল হালিম চিশতি নিজামী তার সঙ্গীতে গেয়েছেন- ‘কয়লাওয়ালার সাথে দোস্তি ময়লা গায়ে লাগবে সত্যি, আতরওয়ালার সাথে দোস্তি সুগন্ধে প্রাণ মোহিত করে।’

আতরওয়ালার সঙ্গ লাভ করার পর চলে গেলেও দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত শরীরে ঘ্রাণ থাকে। তাই জ্ঞানীজনেরা আল্লাহ্ওয়ালা লোকদের সাথে তুলনা করে তাদের সঙ্গ বা সোহবত লাভ করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here