যিনি বিজ্ঞানে ঈশ্বরের সন্ধান করেছেন

0
50


পরমা
১৯৫৯ সালে স্লোন ফাউন্ডেশন ফেলোশিপ লাভ করে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায় গবেষণার সুযোগ আসে লস অ্যাঞ্জেলসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, কিন্তু বাধ সাধল অর্থ। আমেরিকা যাওয়ার বিমানভাড়া তখন অনেক। সেই সামর্থ্য তাঁর নেই। পাশে দাঁড়ালেন গ্রামের লোকেরা। তাঁরাই চাঁদা তুলে বিমান ভাড়ার টাকা জোগাড় করে দিয়েছিলেন। আমেরিকায় যখন পৌঁছলেন, তখন তাঁর পকেটে মোটে তিন ডলার।
১৯৬১ সালে তিনি জেরক্স ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সিস্টেমস-এর কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রনিক বিভাগে একজন লেসার বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন। এর পাশাপাশি তিনি লং বিচের ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিদ্যায় অধ্যাপনাও চালিয়ে যান। ১৯৬৮ সালে তিনি নর্থরপ রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন, যেখানে পরবর্তীকালে তিনি লেসার টেকনোলজি ল্যাবরেটরির ডিরেক্টর হন এবং একটি দলের নেতৃত্ব দেন, যা এক্সাইমার লেসার প্রযুক্তির গবেষণার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ১৯৭৩ সালের মে মাসে এই গবেষণার ওপর লিখিত প্রবন্ধ অপ্টিক্যাল সোসাইটি অফ আমেরিকা কলোরাডো অধিবেশনে পেশ করা হয়। তিনি এক্সাইমার লেজার আবিষ্কার করেন। এই লেজাররশ্মি প্রাথমিকভাবে সামরিক বাহিনির ব্যবহারের জন্য আবিষ্কৃত হলেও পরে তা দিয়ে লেজিক নামে এক চোখের অপারেশন শুরু হয়। বর্তমানে চোখের ছানির শল্যচিকিৎসায় যা এক অতি পরিচিত নাম। ওই অপারেশনের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তি পরিমার্জিত করা যায় খুব সহজেই। চশমা বা কন্ট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার করার আর প্রয়োজন হয় না। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫ কোটি মানুষ ওই অপারেশন করিয়েছেন। এ সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।


কলোরাডো অধিবেশনে তিনি প্রথমবার পরীক্ষালব্ধ প্রমাণসাপেক্ষে দেখান যে, এক্সাইমার লেসার এতটাই ক্ষমতাসম্পন্ন ও কার্যকরী করা যেতে পারে তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব। তাঁর নতুন ও উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লেসার উদ্ভাবনের ফলে তাঁর সতীর্থরা তাঁকে আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটি ও ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স-এর সদস্যপদের জন্য নির্বাচিত করেন। ডজনখানেক লেসার-এর ‘পেটেন্ট’ তাঁর গবেষণা ও মেধার ফল। বহু পেশাদারি পত্রিকায় পঞ্চাশটিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন তিনি।


বিপুল বৈভবের মধ্যে থাকতে থাকতে হঠাৎই একদিন তাঁর মাথায় আধ্যাত্মিক চিন্তা আসে। কিন্তু বিজ্ঞানীর মন সহজে আধ্যাত্মবাদকে মেনে নিতে চায়নি, কারণ বিজ্ঞান আর আধ্যাত্মবাদের অবস্থান তো দুই বিপরীত মেরুতে। কিন্তু গবেষণা করতে করতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, একসময়ে যে বিজ্ঞান ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে শিখিয়েছিল, অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই বিজ্ঞানই আবার আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছে কোয়ান্টাম ফিজিক্স কসমোলজি বিজ্ঞানের এইসব শাখার মাধ্যমে। এই প্রচেষ্টারই ফসল হলো তাঁর বহু প্রবন্ধ, কোড নেম গড (বাংলায় বিজ্ঞানে ঈশ্বরের সংকেত) ও দ্য কসমিক ডিটেক্টিভ-এর মতো বই এবং কসমিক কোয়ান্টাম রে-র মতো টিভি প্রোগ্রাম।


জন্ম ১৯৩১ সালের ৩০ মার্চ মেদিনীপুরের তমলুকের শিউড়ি গ্রামে। হতদরিদ্র পরিবার। সবদিন ভালভাবে খাওয়াও জুটতো না। বাবা গুণধর ভৌমিক স্কুলশিক্ষক। এর বাইরেও তাঁর একটি পরিচয় ছিল। গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সৈনিক। পুলিশের তাড়ায় প্রায়ই বাড়ির বাইরে অজানা ডেরায় আত্মগোপন করে থাকতে হতো তাঁকে। বাবার খোঁজে প্রায়ই পুলিশ তাদের বাড়িতে এসে তল্লাশির নামে জিনিসপত্র তছনছ করত, এলোপাথাড়ি মারধর করত।
বুদ্ধিমনষ্ক ছোট্ট ছেলেটি ভর্তি হলো কৃষ্ণগঞ্জ কৃষি শিল্প বিদ্যালয়ে। পড়াশোনায় সে বরাবরের তুখোড়। সকালবেলায় দুটো মুখে দিয়ে বা না দিয়ে গরু চরাতে হতো। তারপরে খালি পায়েই চার মাইল হেঁটে স্কুলে যাতায়াত। পড়াশোনা করত প্রদীপের আলোয়।

ছোটবেলায়, রাতের অন্ধকারে আকাশের তারাগুলো দেখতে দেখতে অনেক সময়েই তাঁর মনে সবাকার মতো প্রশ্ন জেগেছে ওই চাঁদ, তারা এগুলো কীভাবে তৈরি হলো! সে প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন পরবর্তীকালে কসমোলজি নিয়ে গবেষণাকালে আমেরিকায়। তিনি মণি ভৌমিক। বাংলা ও বাঙালির গর্ব। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে মেধাই যে তাঁর একমাত্র হাতিয়ার সেটা তিনি সকলকে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এই বাঙালি সেবাব্রতী খড়্গপুর আইআইটি-কে ১৫ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন। স্নাতক স্তরে তিনি যেখানে পড়াশোনা করেছিলেন, সেই স্কটিশ চার্চ কলেজের নবনির্মিত মিলেনিয়াম ভবনের জন্য ২০০০ সালে তিনি প্রায় ২৭ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। ওই ভবনেরই একতলায় মণি ভৌমিকের নামে একটি অডিটোরিয়ামও তৈরি হয়েছে।


মার্কিন মুল্লুকের ঐতিহ্যবাহী ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদা গবেষক, পদার্থবিজ্ঞানী মণি ভৌমিকের ওই বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুদানের পরিমাণ ১ কোটি ১০ লাখ ডলার। মানে, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। ওই প্রতিষ্ঠানের পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ এর আগে কোনওদিন এ পরিমাণ আর্থিক অনুদান পায়নি কোনও একক ব্যক্তির কাছ থেকে। সেটা এল তাঁরই হাত ধরে। ভোলেননি নিজের গ্রামের কথাও। আজও প্রায় প্রতিদিন ফোন করেন বাড়িতে। পরিবারের সকলের খোঁজ নেওয়ার পরে এখনও উনি জানতে চান এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা কেমন চলছে, এলাকার মানুষের আর্থিক অবস্থাই বা কেমন! মণি ভৌমিক এখন চেষ্টা করছেন বাংলায় দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলসের বেভার্লি হিলস্-এর বাসিন্দা এই মহান মানুষটির আমরা দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here