যুক্তরাজ্যের বর্ষসেরা চিকিৎসক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফারজানা

0
236

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের বর্ষসেরা চিকিৎসক (জিপি অব দ্য ইয়ার) মনোনীত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডা. ফারজানা হুসেইন। করোনা মহামারিতেও সামনের সারিতে থেকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন তিনি। এজন্য তাকে সম্মান জানাতে বিলবোর্ডে ছবি টানানো হয়েছে।

ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) ডা. ফারজানাসহ ১২ জন চিকিৎসককে এ স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতি বছর জেনারেল প্র্যাকটিসের জন্য এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

যুক্তরাজ্যের সাটারস্টক.কম প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, লন্ডনের বিখ্যাত পিকাডেলি সার্কাসের সামনে তাকে নিয়ে টানানো এক বিলবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ডা. ফারজানা।

ব্রিটিশ হাই কমিশনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ‘ইউকে ইন বাংলাদেশ’ও ছবিটি শেয়ার করেছে। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ১৮ বছর ধরে পূর্ব লন্ডনের নিউহ্যামে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ডা. ফারজানা।

তার বাবা ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) থেকে সেখানে পাড়ি জমান। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামনের কাতারে থেকে কাজ করছেন তিনি। কয়েক মাস ধরে অনলাইনে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি টিকা দেওয়ার ক্লিনিকগুলোতে ঘুরে ঘুরে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন।

আজ এনএইসএসের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান। একে সামনে রেখেই নিজেদের ১২ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়ে বিলবোর্ড বানিয়েছে ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য বিভাগ। কঠোর পরিশ্রম ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ সেখানে অন্যদের সঙ্গে স্থান করে নিয়েছেন ফারজানা।

দুই কন্যা সন্তানের মা ডা. ফারজানা যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইমারি কেয়ারের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করাই তার লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ডা. ফারজানা প্রাথমিক কেয়ার নেটওয়ার্কের জন্য একজন ক্লিনিক্যাল পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

রোগী দেখলেই মনে হয় কারও না কারও প্রিয়জন: ডা. ফারজানা

বাবা ছিলেন অ্যানেস্থেসিয়া স্পেশালিস্ট। ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে হাসপাতালে যেতেন, তখন ডাক্তার আঙ্কেল ও নার্স আন্টিরা তাকে চকলেট খেতে দিতেন, সবাই ভীষণ আদর করতেন তাকে।

বছর পাঁচেকের ছোট্ট মেয়েটা তখনই নিজের জীবনের গতিপথ ঠিক করে নিয়েছিল- বড় হয়ে ডাক্তার হবে।

মধ্য চল্লিশে দাঁড়িয়ে ফারজানা হুসেইন নামের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেই নারী এখন চিকিৎসক। ব্রিটেনের সেরা জেনারেল প্র্যাকটিশনার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

কর্মক্ষেত্রে সারা বছরের কাজের ভিত্তিতে করা হয় এই মূল্যায়ন। ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের অজস্র কর্মীকে (ডাক্তার-নার্স) পেছনে ফেলে নিজের কর্মদক্ষতায় গত বছরের সেরা জেনারেল প্র্যাকটিশনার নির্বাচিত হয়েছেন ফারজানা।

ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ইস্টার্ন আই-এ এক সাক্ষাৎকারে জীবনগাথা তুলে ধরেছেন ফারজানা।

বাবা-মা দু’জনই ছিলেন বাংলাদেশি। বাবা ১৯৭০ সালে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে, পরে সেখানেই থিতু হয়েছেন। ফারজানা পড়েছেন ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলসের স্কুল অব মেডিসিনে।

তিনি বলেন, ডাক্তারি পেশাটার প্রতি ফারজানার অন্যরকম ভালোবাসা জন্ম নিয়েছিল মায়ের কারণে। আমি মেডিকেলের প্রথম বর্ষের ছাত্রী, মা তখন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

সারা সপ্তাহ ক্লাস করে সপ্তাহান্তে ছুটে যেতাম ২৫০ কিলোমিটার দূরে, যে হাসপাতালে মা ভর্তি আছেন। রুটিনের মতো হয়ে গিয়েছিল ব্যাপারটা। ফারজানা আরও বলেন, একবার মা প্রচণ্ড অসুস্থ।

শরীর ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। পরদিন গুরুত্বপূর্ণ একটা ক্লাস ছিল। মাকে রেখে ক্যাম্পাসে ফিরে যাব কি যাব না- এই দোটানায় ভুগছিলাম। তখন মা-ই জোর করে ফেরত পাঠালেন, বললেন, তুমি কলেজে ফিরে যাও।

আমি চাই আমার মেয়ে বড় ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না, আমি ঠিক হয়ে যাব।’ তার পাঁচ দিন বাদে মা মারা গিয়েছিলেন, জীবিত অবস্থায় মাকে আর দেখতে পাননি ফারজানা।

তবে মায়ের শেষ কথাগুলো মনে গেঁথে গিয়েছিল তার। বড় ডাক্তার হতে হবে, মানুষের সেবা করতে হবে। গত দুই যুগ ধরে সেই মিশনেই ছুটে চলেছেন ফারজানা হুসেইন। পথচলাটা বন্ধুর ছিল। ফারজানা হার মানেননি কখনও।

তিনি বলেন, ‘যখনই হতাশা আঁকড়ে ধরেছে, তখন মায়ের কথা স্মরণ করেছেন, ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে, অদ্ভুত একটা শক্তি এসে জড়ো হয়েছে মনের ভেতর।’ প্রায় ১৮ বছর ধরে ইংল্যান্ডের নিউহ্যাম শহরে পটারজোনাস নামের এক সিনিয়র ডাক্তারের সঙ্গে মিলে প্রোজেক্ট সার্জারি নামের একটা মিশন চালাচ্ছেন ফারজানা ও তার টিম।

২০০৩ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪৫০০ রোগীকে সেবা দিয়েছেন তারা। পিটার ছিলেন তার সবচেয়ে বড় মেন্টর। ছয় বছর আগে পিটার মারা যাওয়ার পরে পুরো কাজের ভার এসে পড়েছিল ফারজানার কাঁধে।

নিজে বাংলাদেশি হওয়ায় মাইগ্রেন্ট পেশেন্টদের সঙ্গে আন্তরিক হয়ে মিশতে পারেন ফারজানা, যেটা স্থানীয় অনেক চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব হয় না।

নিজের কাজটাকে প্রচণ্ড ভালোবাসেন ফারজানা, জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেওয়ার সামর্থ্য তাকে দেওয়া হয়েছে, সেই দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা তিনি করেন। রোগীদের সঙ্গে তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের মতোই ব্যবহার করেন। তিনি মনে করেন- এই মানুষগুলোও কারও না কারও প্রিয়জন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here