যুগের ইমামের পরিচয় লাভের উপায় ও তাঁর বৈশিষ্ট্য

0
280

মহান আল্লাহ আপন পরিচয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে জগৎ সৃষ্টি করে যুগে যুগে এক একজন নবির মাধ্যমে তাঁর এক একটি গুণ তথা বৈশিষ্ট্য বিকশিত করেছেন। পরিশেষে সকল নবির সর্দার হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে প্রেরণ করেছেন। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ্র যাবতীয় গুণাবলী পূর্ণরূপে বিকাশ লাভ করেছে। মহান আল্লাহ্ বলেন- “কেউ রাসুলের আনুগত্য করলে, সে তো আল্লাহ্রই আনুগত্য করল।” (সূরা আন নিসা ৪ : আয়াত ৮০)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন- “হে রাসুল (সা.)! নিশ্চয় যারা আপনার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে, তারা তো আল্লাহরই হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে। আল্লাহ্র হাত তাদের হাতের উপর।” (সূরা আল ফাতহ ৪৮ : আয়াত ১০)
নবুয়ত পরবর্তী বেলায়েতের যুগে একই সময়ে একাধিক অলী-আল্লাহ হেদায়েতের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁদের মধ্যে এক একজন এক এক নবির জিরে কদমে থাকেন, অর্থাৎ ঐ নবির গুণাবলি প্রাপ্ত হন। কিন্তু যিনি সমসাময়িক হেদায়েতকারী অলী-আল্লাহগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, তিনি হযরত মোহাম্মদ (সা)-এর জিরে কদম মোবারকে থাকেন, অর্থাৎ তিনি হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় এবং আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হন। তিনিই অলী-আল্লাহগণের সর্দার ও যুগের ইমাম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্র রাসুল (সা.) এরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি (যুগের) ইমামের আনুগত্য না করে মৃত্যুবরণ করেছে, সে জাহেলী অবস্থা তথা ধর্মহীন বেইমান হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।” (মুসনাদে আহমদ-১৩নং খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৮৮)

যুগের ইমামের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
১। যুগের ইমামের হেদায়েতের কাজ, হযরত রাসুল (সা.)-এর হেদায়েতের কাজের অনুরূপ হবে। এ প্রসঙ্গে আমীরুল মু’মিনীন শেরে খোদা হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন-“আলেমগণ (আল্লাহ্ তত্ত্বের জ্ঞানে জ্ঞানী) পৃথিবীর প্রদীপ এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের প্রতিনিধি কিংবা আলেমগণ আমার উত্তরাধিকারী এবং আম্বিয়ায়ে কেরামেরও উত্তরাধিকারী।” (তাফসীরে মাজহারী-১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৫৭)
২। যুগের ইমামের এত্তেহাদী তাওয়াজ্জোহর ক্ষমতায় মানুষের কলুষিত আত্মা দ্রুত ও সহজ উপায়ে পরিশুদ্ধ হয়ে, আল্লাহ্র দিকে আকৃষ্ট হবে। আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন- “মহান আল্লাহ্ বলেছেন- নিশ্চয় আমার বান্দাদের মধ্যে অলী-আল্লাহ্ হলেন তাঁরা, আমাকে স্মরণ করলে যাঁদের কথা স্মরণ হয় এবং যাঁদেরকে স্মরণ করলে, আমার কথা স্মরণ হয়।” (তাফসীরে মাজহারী-৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪৮)
৩। মানুষ যুগের ইমামের সান্নিধ্যে যাওয়া মাত্র তাঁর ফায়েজে প্রভাবিত হবে এবং মনের অবস্থার পরিবর্তন অনুভব করবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত, একদা সাহাবী হযরত হানজালা (রাঃ)-এর এক প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন- “ঐ সত্তার শপথ, যাঁর পবিত্র হাতে আমার প্রাণ! আমার সোহবতে থাকাকালীন এবং আমার নসিহত চলাকালে তোমাদের মনের যে অবস্থা হয়, সে অবস্থা যদি তোমাদের মনে সর্বক্ষণ থাকত, তাহলে তোমাদের শয়নকক্ষে ও রাস্তা-ঘাটে ফেরেশতারা তোমাদের সাথে করমর্দন করতো। কিন্তু হে হানজালা! অবস্থা এক সময় এক রকম, আবার অন্য সময়ে অন্য রকম হয়ে যায় (অর্থাৎ আমার সোহবতে মনের যে গতি, সোহবত থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মনের গতিও অন্য রকম হয়ে যায়)। আর এ কথাটি আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) তিনবার বলেছেন।” (মুসলিম শরীফের সূত্রে তাফসীরে মাজহারী-৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৪৯)
৪। যুগের ইমামের অনুসারীদের মধ্যে অসংখ্য লোক হযরত রাসূল (সঃ)-এর দীদার লাভ করবেন। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি আমাকে স্বপ্নে দেখবে, সে সত্যই আমাকে দেখবে। কেননা শয়তান আমার সুরত ধারণ করতে পারে না।” (বোখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-৩৯৪)
৫। যুগের ইমামের অনুসারীদের মাঝে হযরত রাসূল (সঃ)-এর সাহাবাগণের ন্যায় চার প্রকার হালত যথা- সালেক, মাজ্জুব, সালেক-মাজ্জুব ও মাজ্জুব-সালেক লোক থাকে। আল্লাহ্ বলেন- “হযরত মোহাম্মদ (সঃ) হলেন আল্লাহ্র রাসূল। আর যারা তাঁর সাহাবী, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে অতিশয় কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে সহানুভূতিশীল। তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে কখনোবা রুকু অবস্থায়, কখনোবা সিজদা অবস্থায় আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অšে¦ষণে। তাদের চেহারায় থাকবে দীপ্তিমান চিহ্ন সিজদার কারণে। তাদের এ গুণাবলীর বর্ণনা তাওরাত ও ইঞ্জিল, উভয় কিতাবেই বিদ্যমান রয়েছে।” (সূরা-আল ফাতহ ৪৮ : আয়াত ২৯)
৬। যুগের ইমাম বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানের চেয়ে ধর্ম পালনের মূল উদ্দেশ্যের উপর অধিক গুরুত্বারোপ করেন। আল্লাহ্ বলেন- “হে রাসূল (সঃ)! আপনি বলুন- নিশ্চয় আমার নামাজ, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ্রই উদ্দেশ্যে।” (সূরা-আল আন’আম ৬ : আয়াত ১৬২)
৭। যুগের ইমাম তাঁর সময়ে ধর্মে অনুপ্রেবশকারী ভুল ধারণাগুলো চিহ্নিত করে, এগুলো সংশোধন করেন। বিষয়টি আল্লাহ্র রাসূল (সঃ) নিজ জবানেই বলেছেন- “নিশ্চয় মহান ও মহিমান্বিত আল্লাহ্ এই উম্মতের জন্য প্রত্যেক শতাব্দীর শিরোভাগে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি তাদের ধর্মকে সংস্কার করে সজীব ও সতেজ করবেন।” (আবু দাউদ শরীফের সূত্রে মেশকাত শরীফ, পৃষ্ঠা-৩৬)
৮। যুগের ইমাম মারেফাতের সাধনা পদ্ধতি সংস্কার সাধন করে যুগোপযোগী করেন।
সুতরাং পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে উপস্থাপিত যুগের ইমামের পরিচয় লাভের উপায় সংবলিত এ সকল নিদর্শনাবলী যাঁর মাঝে বিদ্যমান থাকবে, ঐ মহামানবের আনুগত্যের মাধ্যমে মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-কে অনুসন্ধান করা সকলের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
‘শান্তি কোন পথে?’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here