যুগে যুগে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার

0
339

লুৎফুল্লাহিল মাজিদ পরাগ

পৃথিবী নামক গ্রহটি নানা সময়ে নানা প্রকার ছোটো বড়ো অনেক যুদ্ধের বিভীষিকা সহ্য করেছে। যুদ্ধের কারণ যেমন নানাবিধ তেমনই এর ধরনও এক নয় । সময়ের পরিবর্তনে বদলে গিয়েছে যুদ্ধাস্ত্রও। দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচিত হচ্ছে বিতর্কিত রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের কথা। মূলত প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রচলিত যুদ্ধ না করে গোপনে ব্যাপক ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও জীবাণু ছড়িয়ে দিয়ে রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত করে বহু মানুষের, প্রাণীর প্রাণহানি ঘটানোর মাধ্যমে এমনকি স্বাভাবিক জৈবিক পরিবেশ ধ্বংস করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হয়। আধুনিক যুগে জীবাণু অস্ত্রের কথা শোনা গেলেও আসলে এখন থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে প্রাচ্যের একদল যোদ্ধার মাধ্যমেই এই অস্ত্রের প্রথম ব্যবহার শুরু হয় ।

জীবাণু অস্ত্র কি?
জৈবিক বিষাক্ত পদার্থ কিংবা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস অথবা ছত্রাকের মতো সংক্রামক অণুজীবের মাধ্যমে মানুষকে বিকলাঙ্গ বা হত্যা করার উদ্দেশ্যে যে অস্ত্র তৈরী হয় তাই জীবাণু অস্ত্র। পৃথিবীতে এখনো প্রায় ১২০০ ধরনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য জীবাণু সংরক্ষিত আছে। জীবাণু অস্ত্র হতে হলে একটা অণুজীবের অবশ্যই উচ্চ সংক্রমণ করার ক্ষমতা, রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা ও রোগের প্রতিষেধকের অপ্রতুলতা এবং সহজে পরিবহন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যা বর্তমানে করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে স্পট দৃশ্যমান।

জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার শুরু যেভাবে
প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের হিত্তিত নামে একটি জাতি তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তাদের শহরের কাছে ৬টি ভেড়া ছেড়ে দিয়ে আসে। স্থানীয় অধিবাসীরা বুঝতে না পেরে এগুলো নিয়ে তাঁদের গবাদিপশুর সাথে লালন-পালন করতে থাকে। তখন ভেড়ার গাঁয়ে আগে থেকেই ছড়িয়ে দেওয়া জীবাণু পুরো এলাকায় ছড়াতে থাকে। স্থানীয় অধিবাসীদের মাঝে সংক্রমিত হতে থাকে রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় শহরের অর্ধেকের বেশি মানুষ। ভাইরাসের সংক্রমণে এত প্রাণহানির পর ওলট পালট হয়ে পড়া শহরের দখল নেওয়া হিত্তিতদের জন্য খুবই সহজ হয়ে যেত। হিত্তিতদের পর বহু বছর পর্যন্ত জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহারের আর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

জীবাণু অস্ত্রের পরীক্ষা ও ভয়াবহ ফলাফল
আবারো জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। সেসময় ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে স্কটল্যান্ডের গ্রুইনার্ড দ্বীপে ভয়ঙ্কর এন্থ্রাক্সের জীবাণু অস্ত্র হিসেবে পরীক্ষা করা হয়। এটা এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল যে টানা ৪৮ বছর দ্বীপটিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হয়।

রাশিয়ার একটি দ্বীপ যা সোভিয়েত সময়ে বিষাক্ত জীবাণু অস্ত্র পরীক্ষা করায় চিরদিনের জন্য কোনো প্রানী বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরে ।

১৯৩০ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিচালিত এক পরীক্ষার কারণে এরাল সাগরের একটি দ্বীপ চিরতরে মানুষ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পরে । যাহা বিট ফিভার, প্লেগ, টাইফাস, ও ভেনেজুয়েলার ইকুইন এনসেলাইটিস এর মতো মারাত্মক জীবাণু সেখানে ছড়ানো হয়েছিল।

১৯৭১ সালে রাশিয়ায় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য তৈরী গুটিবসন্তের জীবাণু দুর্ঘটনাক্রমে ছড়িয়ে পড়লে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর গবেষণাগারে এই জীবাণু মজুদ থাকার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

করোনা কি শুধুই ভাইরাস না কী জীবাণু অস্ত্র?
বর্তমানে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া ভয়ঙ্কর প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস চীনের একটি সামরিক গবেষণাগারে ‘বায়োলজিক্যাল ওয়েপন প্রোগ্রামের’ আওতায় তৈরী করা হয় বলে জোর দাবী করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের গবেষক ও গোয়েন্দারা । ২০১৫ সালে উহান টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন গত সপ্তাহে প্রচার করেছে রেডিও ফ্রি এশিয়া। উহান টেলিভিশনের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের সবচেয়ে উন্নত ভাইরাস গবেষণাগার উহানে রয়েছে। যা উহান ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি নামে পরিচিত। চীন ঘোষণা দিয়ে প্রাণঘাতী সব ভাইরাসের গবেষণা একমাত্র এই গবেষণাগারেই করে। এই ইনস্টিটিউটের কিছু ল্যাবরেটরিতে চীনের নতুন নতুন জীবাণু অস্ত্র তৈরি এবং এসব অস্ত্র নিয়ে গোপনে গবেষণা করা হয় ।

চীনের হুয়ানে অবস্থিত পি৪ ল্যাব থেকেই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে বলে দাবী বেশকটি দেশের গবেষক ও গোয়েন্দাদের ।

রাসায়নিক অস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার
২৫৬ খৃষ্টাব্দে সিরিয়া আক্রমণে এসে রোমান সৈন্যবাহিনীর ১৯ জন সৈন্য দেয়ালের নিচে সুরঙ্গ খনন শুরু করে এবং সুরঙ্গের মধ্যে প্রায় সব সৈন্যই মারা যায়। ২০০৯ সালে প্রাপ্ত কঙ্কালগুলোর উপর রাসায়নিক পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায় সৈন্যদের মৃত্যুর মূল কারণ বিটুমিন ও সালফারের মিশ্রণে তৈরি একপ্রকার বিষাক্ত ধোঁয়া যা তৎকালীন পারস্য বাহিনী খোদাই করা সুরঙ্গের মুখে প্রয়োগ করে এবং তা বহুল পরিমাণ রোমান সৈন্যের মৃত্যুর কারণ হয়।

১৯১৫ সালের ২২ এপ্রিল প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জার্মান বাহিনী বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে মিত্র বাহিনীর হাজার হাজার সেনাকে হত্যা করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জীবাণু অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে পঁচিশ হাজার মানুষ প্রাণ হারায় ও দশ লক্ষাধিক মানুষ আহত হয়। জার্মানরা কিছুকাল পরে বিষাক্ত ফসজেন প্রয়োগ করে ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর।

১৯৩০-এর দশকে ইথিওপিয়ার বিরুদ্ধে ইতালির যুদ্ধে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীন, ১৯৬৩ সালে ইয়েমেন এবং ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে । মার্কিন সেনারা ভিয়েতনামের ক্ষেত-খামার, জনগণ, শহর, বন-জঙ্গলের উপর আট কোটি লিটারের বেশি বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য বর্ষণ করেছে। পরিবেশের ব্যপক ক্ষতি ছাড়াও ভিয়েতনামের লক্ষ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে।

ইরাকের কুর্দিস্তানের নিরস্ত্র জনসাধারনের উপর সেনাবাহিনীর বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের ফলাফল ।

পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে সাদ্দাম হোসেনকে দেওয়া রাসায়নিক অস্ত্র ইরানের নিরস্ত্র নিরীহ জনগণের উপর প্রয়োগ করা হয়। ইরাকি বাহিনী ৩৫০০ বারের মতো রাসায়নিক হামলা চালায়। এর প্রভাবে তাৎক্ষণিকভাবে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়া ছাড়াও রাসায়নিক গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য মানুষ আহত অবস্থায় বেঁচে থাকে। ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন ইরানের সারাদাশত শহরে চালানো রাসায়নিক হামলায় অন্তত ১০০ জন নিহত ও ৮ হাজারের বেশি মানুষ বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছিল।

১৯৮৮ সালের ১ মার্চ বর্বর সাদ্দাম সরকার নিজ দেশের কুর্দিস্তান প্রদেশের হালাবজায় ভয়াবহ রাসায়নিক হামলা চালায় যার ফলে নিহত হয় ৫০০০ মানুষ।

বিগত কয়েক বছর যাবত সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে ফসফরাস বোমা হামলা চালাচ্ছে যাতে মারা যাচ্ছে অগণিত মানুষ। যারা বেঁচে আছে তাঁদের পোহাতে হচ্ছে প্রচণ্ড যন্ত্রণা।

সম্প্রতি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধেও বিরোধীদের দমনে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১০৬টি রাসায়নিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। নার্ভ গ্যাস সারিন বা ঐ জাতীয় কোনো গ্যাসের আক্রমণে কয়েকশ লোক নিহত হয়। সেই আক্রমণে আক্রান্ত লোকদের ছটফটানোর দৃশ্য সারা পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে। পশ্চিমা দেশগুলো এর জন্য আসাদের সরকারি বাহিনীকে দায়ী করলেও, বাশার আল আসাদ তার বিরোধীদের দায়ী করেন।

রাসায়নিক কিংবা জীবাণু যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে কিছুদিন আগেও সাধারণত এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে, এই অস্ত্র শুধু মানুষের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। যেখানেই রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে, সেখানকার জৈবিক পরিবেশ তো ধ্বংস হয়েছেই, এমন কি সেখানকার সমস্ত প্রাণী, উদ্ভিদ এবং সজীব বস্তুর জীবনই বিপন্ন হয়েছে। যেভাবে বৃহৎ রাষ্ট্রশক্তিসমূহ তাদের রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্রের সম্পদ ভাণ্ডার বাড়িয়ে চলেছে, তাতে মুক্ত ও নির্মল পরিবেশে ফিরে আসার পথটি ক্রমে ক্রমে খুবই দুর্গম হয়ে উঠছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here