যে কারণে মহান আল্লাহ্ সালাম পৌঁছাতেন হযরত খাদিজা (রা.)-এর কাছে

2
268

নারী ও শিশু ডেস্ক : উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন মোহাম্মদী ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম নারী। তিনি ও হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু প্রায় একই সময়ে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। বিশ্বনবি (সা.)-এর পেছনে সর্বপ্রথম যে দুজন জামায়াতে নামাজ আদায় করেছেন তারা হলেন উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (রা.) ও বালক আলী (রা.)। হযরত খাদিজা (রা.) মহান আল্লাহ্র এতটা নৈকট্য লাভ করেছিলেন যে, আল্লাহ্ যখন ওহি নাজেল করতেন দয়াল রাসুল (সা.)-এর কাছে তখন রাব্বুল আলামিন সালাম পৌঁছে দিতেন এই মহীয়সী নারীর কাছে।

মহানবি (সা.)-এর সঙ্গে বিবাহিত জীবনের ২৫ বছর কাটিয়েছেন মহীয়সী নারী হযরত খাদিজা (রা.)। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন বিশ্বনবি (সা.) অন্য কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি।

হযরত রাসুল (সা.)-কে বিয়ের আগেও হযরত খাদিজা (রা.) ছিলেন একত্ববাদে বিশ্বাসী ও হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী এবং আরব জাতির মধ্যে সবচেয়ে ধনাঢ্য মহিলা। হাজার হাজার উট তাঁর বাণিজ্য-সম্ভার নিয়ে দেশ থেকে দেশে যেত ইতিহাসে বর্ণিত রয়েছে। বিশ্বনবি (সা.)-এর সঙ্গে বিয়ের সময় তার বয়স ছিল ৪০ বছর।

বিশ্বনবি (সা.)-এর সঙ্গে বিয়ের ১৫ বছর পর যখন মহান আল্লাহ্ আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর স্বামীকে রেসালাত দান করেন তখন থেকেই উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (রা.) নিজের সব সম্পদ বিশ্বজনীন ধর্ম মোহাম্মদী ইসলামের প্রচার-প্রসার ও নির্যাতিত নও-মুসলিমদের ভরণ-পোষণের কাজে ব্যয় করতে থাকেন। দয়াল রাসুলের মোহাম্মদী ইসলামের পেছনে ব্যয় করেন তাঁর সমস্ত সম্পদ।

দয়াল রাসুল (সা.) ইসলাম প্রচার শুরু করার পর আরবের কাফির সম্প্রদায়ের মহিলারা বিবি খাদিজাকে বয়কট করেছিল। হযরত ফাতেমা (রা.)-এর জন্মের প্রাক্কালে কাফির সম্প্রদায়ের অভিজাত মহিলারা তাঁর সেবার জন্য কোনো নারীকে আসতে দেয়নি। কিন্তু তিনি হযরত ফাতেমা (রা.)-কে প্রসবের সময় দেখতে পান, তাঁর সেবা করার জন্য হযরত ইসহাক (আ.)-এর মা হযরত সারা, হযরত ঈসা (আ.)-এর মা হযরত মারইয়াম, ফেরাউনের স্ত্রী হযরত আছিয়া এবং হযরত মূসা (আ.)-এর বোন উম্মে কুলসুম উপস্থিত ছিলেন।

এ প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (রা.) বলেছেন, ‘‘ফাতিমার জন্মগ্রহণের সময় সাহায্য করার জন্য আমি কুরাইশ নারীদের ডেকে পাঠিয়েছিলাম। তারা এ বলে প্রত্যাখ্যান করল যে, আমি মুহাম্মাদকে বিয়ে করেছি। আমি কিছুক্ষণের জন্য দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ দেখলাম চারজন উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় দীর্ঘকায়া বিশিষ্ট নারী আমার দিকে এগিয়ে আসছেন। আমাকে আতংকিত দেখে তাঁরা বললেন : হে খাদীজা! ভয় পাবেন না। আমি হলাম ইসহাকের মা সারা (হযরত ইব্রাহিম এর স্ত্রী), আর অপর তিনজন হলেন ঈসার মা মারইয়াম, ফিরআউনের স্ত্রী আছিয়া এবং মূসার বোন উম্মে কুলসুম। আল্লাহ্ আমাদের পাঠিয়েছেন আপনাকে সাহায্য করতে। এ বলে সেই জ্যোতির্ময় নারীরা আমার চারপাশ ঘিরে বসলেন। আমার মেয়ে ফাতেমা জন্মগ্রহণ করা পর্যন্ত তাঁরা আমার সেবা করলেন।’’

কন্যা ফাতেমা যখন হযরত খাদিজা (রা.)-এর গর্ভে ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে মা খাদিজা কথা বলেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে।

মোহাম্মদী ইসলামের শরুর দিকে কাফির-মুশরিকরা যখন মুসলমানদের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপ করে তখন শিহাবে আবু তালিব উপত্যকায় দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়েছিল উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা (রা.)-কে।

ইসলাম প্রচারের প্রথম দিনগুলোতে যখন হযরত রাসুল (সা.)-কে নানাভাবে অপমান ও ঠাট্টা-বিদ্রূপের শিকার হতে হতো এবং তাঁর মাথায় ছাই বা পশুর নাড়ীভুঁড়ি চাপানো থেকে শুরু করে পুরো শরীর মোবারক রক্তাক্ত করেছিল কাফেররা তখন সবচেয়ে বড়ো সহায়তাকারী হিসেবে পাশে ছিলেন জীবন-সঙ্গী উম্মুল মু’মিনিন হযরত খাদিজা (রা.)।

হযরত মা খাদিজা (রা.)-এর পবিত্র স্মৃতি যখনই স্মরণে আসত তখনই বিশ্বনবি (সা.)-এর পবিত্র দুচোখ মোবারক বেয়ে ঝরে পড়ত অশ্রুধারা। অন্য কোনো স্ত্রী হযরত খাদিজা (রা.)-এর সমকক্ষ নন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

একবার হযরত রাসুল (সা.)-এর কোনো এক স্ত্রী, হযরত আয়শা (রা.), নিজেকে হযরত খাদিজা (রা.)-এর চেয়ে উত্তম বলে দাবি করলে আল্লাহর রাসুল তাকে তিরস্কার করে বলেন: ‘‘আল্লাহর কসম, মহান আল্লাহ্ আমাকে তাঁর চেয়ে কোনো উত্তম স্ত্রী দান করেননি। তিনি আমার প্রতি তখনই ইমান এনেছিলেন যখন অন্যরা আমাকে বিদ্রুপ করত, তিনি আমাকে তখনই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন যখন অন্যরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তিনি তার সম্পদ ব্যয় করেছেন আমার জন্য এবং তাঁর মাধ্যমেই আমি সেইসব সন্তানের অধিকারী হয়েছি যা অন্য কোনো স্ত্রীর মাধ্যমে আমার জন্য নির্ধারিত হয়নি।’’ (বুখারি শরিফ)

বলা হয়ে থাকে বিশ্বনবি (সা.)-এর চারিত্রিক সুষমা ও মহানুভবতা, হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর তরবারি এবং খাদিজা (রা.)-এর অঢেল সম্পদ ছাড়া ইসলাম কখনও এতটা বিকশিত হতে পারত না।

হযরত খাদিজা (রা.) দয়াল রাসুল (সা.) ও আশেকে রাসুলদের কাঁদিয়ে ৬১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ রমজান ওফাত গ্রহণ করেন। যে বছর হযরত খাদিজা (রা.) ওফাত লাভ করেন সেই বছর ইন্তিকাল করেন হযরত রাসুল (সা.)-এর প্রিয় চাচা ও অভিভাবক হযরত আবু তালিব (রা.)। তাই এ বছরটিকে ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল হুজুন’ বা ‘দুঃখের বছর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here