রবীন্দ্রনাথের বিশালতা

1
177
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাবুল আনোয়ার
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বিশালতা, ভাবের অতলস্পর্শী আবেদন, চিরকালীন গুরুত্বে ধ্বনিময়। তাই তো আমরা বারবার রবীন্দ্রনাথের কাছে ফিরে যাই। তাঁর ছায়ায় আশ্রয় নিই পরম নির্ভরতায়। তাঁর সৃষ্টিকে পাঠ করে, উপলব্ধি করে, ধারণ করে আমরা হয়ে উঠি ঋদ্ধ, চিরচেনা বাঙালি। জীবনের নানা দ্যোতনা, নানা ব্যঞ্জনার রসে সিক্ত হয়ে খুলে দিই রুদ্ধ দুয়ার, বন্ধ জানালা।
রবীন্দ্রনাথ মহাকালের অমোচনীয় স্বাক্ষর, অনন্ত নক্ষত্রের মিলিত আলোর আধার। তবে তাঁর সৃষ্টির বিশালত্বের আলোচনা বা বিশ্লেষণ এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। রবীন্দ্রনাথকে আরেকবার স্মরণ করা। দূরে গিয়ে আবার কাছে চলে আসা। রবীন্দ্র সরোবারে আরেকবার স্নান করে নিজেকে পরিশুদ্ধতার কাতারে শামিল করে নেওয়া। তবে সব কিছু ছেড়ে যে কথা সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে বড়ো তা হলো আমাদের জীবনে রবীন্দ্রনাথের নিত্য উপস্থিতি। আমাদের যাপিত জীবনাচারে তা কখনো সাড়ম্বরে কখনো বা নীরবে, হৃদয় ও চেতনার গভীরে। তিনি তো ধ্বনিময়, জাগরুক প্রগাঢ় মহিমায়। সেটাই সবচেয়ে বড়ো সত্য। এ তো ছায়া। শরীর থাকলে ছায়া, বস্তু থাকলে ছায়া। ছায়াকে তো আর চাইলেও এড়িয়ে চলা যায় না। ছায়া তো আর হারিয়ে যায় না কোনো কিছুতে, কোনোভাবে। আর সে ছায়া যদি হয়, মননে, ভাবনার দিগন্তে, চেতনার নিভৃতে, আধ্যাত্মিকতার গভীরে পরিব্যাপ্ত তবে তা থাকে চলমান, বহমান, অক্ষয় চিরকাল। রবীন্দ্রনাথের ছায়া তা-ই।
রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার এক বিশাল বিস্তৃত ভুবন নির্মাণ করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি একাই একটা যুগের প্রবর্তক। যাকে বলা হয় রবীন্দ্রযুগ। প্রথম থেকে শেষাবধি রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় মানবতা ও প্রগাঢ় জীবনবোধকে ধারণ করেছেন তাঁর বিশ্বাস ও প্রতিভার বিশালত্ব দিয়ে। তিনি তো শুধু কবি নন। আরো অনেক কিছু। গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সংগীত রচয়িতা, সুরকার, প্রবন্ধকার, নাট্যকার, অভিনেতা, আঁকিয়ে। সব ক্ষেত্রে তিনি বিস্ময়করভাবে সফল। এছাড়া তাঁর শিক্ষা, কৃষিভাবনাও আধুনিক গবেষকদের চিন্তা-ভাবনার উর্বর ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির যে ভান্ডার রেখে গেছেন, অনেক পাঠকই তা সারাজীবনেও পড়তে বা অনুশীলন করতে পারেননি বা পারেন না। লেখালেখি, সংগীত সাধনা, সম্পাদনা, অভিনয়, জমিদারি দেখাশেনা, সংসার, সমকালীন রাজনৈতিক ও সমাজিক পরিস্থিতিসহ সবকিছু সামলেছেন বিস্ময়কর দক্ষতা ও সহনশীলতায়। তিনি ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, শতাধিক ছোটগল্প, দুই হাজারের মতো গান রচনা করেন। তিনি আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’-এর রচিয়তাও। চিঠিপত্রকে তিনি সাহিত্যের কাতারে উন্নীত করেন। তাঁর চিঠিপত্রসমূহ ১৯ খন্ডে প্রকাশিত হয়েছে। ছবিও আঁকেন প্রায় ২ হাজারের মতো। ‘রবীন্দ্র নৃত্য’ তাঁর প্রবর্তিত নৃত্যশৈলী। বাংলা সাহিত্যে শুধু নয়, সৃষ্টির বিশালত্ব ও বৈচিত্রে বিশ্বসাহিত্যে তাঁর তুলনা বিরল।
মানবজীবনের নানা বিষয়, অনুষঙ্গ, তাঁর গভীর দৃষ্টিভঙ্গি, পরিছন্ন ও মানবিক চিন্তা-চেতনায় জারিত হয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি সাহিত্যের যে শাখায় হাত দিয়েছেন, সেখানেই ফলেছে সোনালি ফসল। রবীন্দ্রনাথ চিরকালই এক বিস্ময়। কোনো নির্দিষ্ট দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা সংস্কৃতির গন্ডিতে তিনি আবদ্ধ নন। তিনি সর্বকালের, সব মানুষের। তাঁর সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্ব সাহিত্যের চিরকালীন ঐশ্বর্যময় সম্পদ।
সংগীতের যে অপার সম্পদের ভান্ডার তিনি রেখে গেছেন তা এদেশের মানুষ গভীর আস্থা ও প্রশান্তির সঙ্গে সাদরে গ্রহণ করেছে। রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি করে আপন করে নিয়েছে। সংগীতের মধ্য দিয়ে দেশপ্রেম, স্রষ্টার কাছে নিজেকে সমর্পণের নিবেদন, দুর্দিন-দুঃসময়ে রবীন্দ্রনাথের সংগীত বড়ো অবলম্বন হয়ে আমাদের জীবনধারায় মিশে গেছে। এখানে রবীন্দ্রনাথের ছায়া চিরকালীন মহিমায় উদ্ভাসিত ও প্রলম্বিত। রবীন্দ্রসংগীতের বাণী ও সুরের মধ্যে গভীরতা, বিচিত্রবোধ, জীবনতৃষ্ণা, মানবীয় চেতনার লালন, অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটেছে চিরকালীন বৈভবে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, বৈরাগ্য নয়, সংসার ও জীবনের যাপনের মধ্য দিয়ে অসীম-অনন্ত জীবনকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। জাগতিক ও অনন্ত জীবনের স্বাদ পাওয়ার এ আয়োজন, আনন্দ, অফুরন্ততা তাঁর গানের শক্তি ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের আধার। দেশপ্রেম, ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, সচেতন রাজনৈতিক বোধ, অনন্ত জীবনবোধের জাগরণ তাঁর গানের বিশাল সম্ভারে প্রতিফলিত হয়েছে অপরিসীম মমতা ও অতুলনীয় ঐশ্বর্যে। আমাদের রাজনৈতিক সংকট, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, গণজাগরণে রবীন্দ্রনাথের গান যেমন অনুপ্ররণা জুগিয়ে আসছে-তেমনি প্রেমে, দ্রোহে, আনন্দ-বেদনায়, আধ্যাত্মিকতায়, ঐক্য, মিলনে তাঁর গানই দিয়েছে মানসিক শক্তি ও সান্ত্বনা। রবীন্দ্রনাথের গানে সকল ধর্মের, সকল সম্প্রদায়ের মানুষ পরম এক আশ্রয়ের সন্ধান লাভ করেন।
রবীন্দ্রছায়ায় লালিত, আশ্রিত ও প্রাণিত হয়েছেন সমকালীন ও পরবর্তীকালের অসংখ্য কবি। যাদের রবীন্দ্রঅনুসারী কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় বা বলা হয়। এরা রবীন্দ্র ছায়াতলে বসে কবিতার চাষাবাস করেছেন। অবশ্য কাজী নজরুল ইসলাম এ বলয় থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা কবিতায় নিজস্ব অবয়বে সগৌরবে আবির্ভূত হন। বিদ্রোহী কবিতার অমর, অজর শব্দ, ছন্দ ও চেতনার দীপ্র জাগরণে মধ্য দিয়ে। তবু নজরুল ইসলামের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ও শুভকামনা ছিল সবসময়। রবীন্দ্র-নজরুল-উত্তর বাংলা কবিতায় ত্রিশের যে কাব্য আন্দোলন বেশ জোরেসোরেই সংঘটিত হয় বা সম্পন্ন হয়, তা আজ স্বীকৃত। আর পঞ্চপান্ডব বলে খ্যাত এ কবিবৃন্দের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুসম্পর্ক ছিল সবসময়। ছিল যোগাযোগ।
রবীন্দ্রনাথ এদের কারো কারোর কাব্যভাষা সম্পর্কে একমত হতে না পারলেও তাদের প্রতি উদাসীন ছিলেন না। বরং নতুনদের তিনি হৃদয়ের অর্ঘ্যে গ্রহণ করেছেন, বরণ করেছেন। তাই তিনি নতুনদের সাফল্যকে প্রাণিত করেছেন। তরুণ কবি, লেখকদের নবতর সৃষ্টির প্রেরণায় তিনি অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ছিলেন সবসময়। রবীন্দ্রছায়ায় তারাও শীতল হয়েছেন চৈত্র-খরায়। বাংলা কবিতার ভুবনে তারা আলাদা এক ধারা সৃষ্টি করেছেন। তবে তাদের রবীন্দ্রবিরোধিতা রবীন্দ্রভক্তির সুশীতল ছায়াকে মাড়িয়ে যায়নি কখনো।
সংসার জীবনেও স্নিগ্ধ ছায়ার পরশে সবকিছু সামলে নিয়েছিলেন গভীর মমতায়। তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছেন আর দশজনের মতো সফলতার সাথেই। সংসার বিবাগী ছিলেন না একদম। যদিও লালন শাহ দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু লালন শাহর বৈরাগ্য জীবনের পথ তিনি গ্রহণ করেননি। গ্রহণ করেছিলেন তাঁর বোধের নির্যাস। সরলভাবে বলা যায় লালনের অপরিসীম মানবিক বোধ, অসাম্প্রদায়িকতা আর আধ্যাত্মবাদের পরম পথ ধরে সৃষ্টিকর্তাকে পাওয়ার আরাধনাকে তিনি নিয়েছিলেন। এখানে রবীন্দ্রনাথ আলাদা।
রবীন্দ্রনাথ ধর্মকে উদার মানবিকতার দৃষ্টিতে দেখেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘শেষ কথা’য় বলেছেন, ‘ধর্মকে তার প্রথাগত স্বরূপে না দেখে আমাদের তার নীতিবোধকে গ্রহণ করতে শেখা উচিত। ধর্ম মানে পুরোহিত বা পূজা-আর্চা নয়, ধর্ম মানে সেই অখন্ড শুভময় বিশ্ব যেখানে কিঞ্চিৎ শান্তির সন্ধান পাওয়া যায়।’
তিনি সকল ধর্মের অন্তর্নিহিত নীতিবোধ ও আবেদন, মানবিক কর্মকান্ডের মধ্যে এ ‘শুভময় বিশ্বের’ সন্ধান করেছেন। তিনি পরাধীন জাতির সার্বিক মুক্তির সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে মানসিক, আত্মিক যোগাযোগ ও মিলনকে উপলব্ধি করেছেন গভীরভাবে। তিনি মানবিকতার মহান বোধকে ধারণ করে মানুষ হিসেবে সকলকে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের মানবিকতার এ বোধের ছায়া কালের পথ পেরিয়ে মহাকালের পথে প্রসারিত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনে, আমাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনায়, আমাদের জাতিসত্তার জাগরণে, সংকটময় মুহূর্তে, ভাবনা-চিন্তার গভীর অনুরণনে জাগ্রত সবসময়। তাঁর ছায়া দীর্ঘপরিসরে কাল থেকে মহাকালে বিস্তৃত। অবিচল, নিñিদ্র চিরকাল।

1 COMMENT

  1. সাপ্তাহিক দেওয়ানবাগ পত্রিকা অন লাইনে পাঠ করে আমার নিকট খুবই ভালো লেগেছে। আমরা যেন সবসময় দয়াল বাবাজানের উপর তাসাউফ সংক্রান্ত আর্টিকেল আরো বেশি করে পড়তে পারি সম্মানিত মেজো হুজুরে নিকট আমি গোলাম কাকুতি মিনতি করছি। এর সঙ্গে আল্লাহ্ র বন্ধু সূফী সম্রাট হযরত দেওয়ানবাগী (মা: আ:) দয়াল বাবা কেব্ লাজানের পাক কদম মোবারকে জানাই লক্ষ কোটি সালাম ও কদমবুসি। দয়াল বাবাজান যেন দয়া করে আমাদের দেশ থেকে করোনা ভাইরাস ওনার দয়ার নামের উছিলায় দূর করে দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here