রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমবায় ভাবনা

0
209

সজীব কুমার বসু
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১২৬৮-১৩৪৮) বাংলা ভাষার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক তিনি। রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ ও অসংখ্য গদ্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের লেখা ৯৫টি ছোটগল্প এবং ১৯১৫টি গান আছে। তিনি নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থের জন্য। তিনি শুধু বাংলাভাষায় শ্রেষ্ঠ কবি নন, বিশ্বেরও অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি ও সাহিত্যিক। তিনি আমাদের অহংকার। তাঁর কাব্য-কবিতায়, গল্প, উপন্যাস ও সঙ্গীতে সত্য, ন্যায়, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও বিশ্বমানবতার বাস্তবতাকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে তৎকালীন বিশ্বকে বিমোহিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর রচনা ও ভাবনা সকল স্তরের মানুষের হৃদয়কে সমানভাবে বিমুগ্ধ করে রেখেছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি, স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি, দারিদ্র্য ও শোষণ, উন্নয়ন ও প্রবঞ্চনা, সামাজিক বৈষম্য ও বিদ্রোহ, সমবায়ী উদ্যোগ ও সহযোগিতা সবই এমনভাবে উদ্ভাসিত হয়েছে তার কবিতা, আবহসংগীত, উপন্যাস ও ছোটগল্পে যার বাস্তবতা সমানভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান। তাই বিশ্বকবি চিরঅমর, চিরভাস্বর, সত্যের সন্ধানে এক অমর কালজয়ী পুরুষ, প্রাতঃস্মরণীয় মানব।


বাংলাদেশের জনপদে, দিগন্তপ্রশস্ত পথ-প্রান্তরে, নদী ও মোহনার মিলন মেলায়, শিলাইদহ, কুষ্টিয়া, পতিসর, শাহজাদপুরে যৌবনে উদ্দীপ্ত মোহাবিষ্ট রবীন্দ্রনাথ খেটে খাওয়া মানুষের সংস্পর্শে এসে অসহায় দরিদ্র মানুষের বেদনায় কাতর হয়ে লিখেছেন, “ওরা কাজ করে নগরে বন্দরে”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববঙ্গে জমিদারী দেখতে এসে প্রত্যক্ষ করেন দারিদ্র্য, পীড়িত মানুষের বঞ্চনা, উপেক্ষা ও প্রতারিত হওয়ার বাস্তবতাকে। তিনি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন ব্যাপক চলমান বৈষম্য ও বিভাজনের প্রসারিত প্রক্রিয়াকে প্রতিরোধ করে সামাজিক মূলধন সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। এ কাজে প্রতিটি মানুষের মধ্যে যে সৃজনীশক্তি বিরাজমান তাকে সঠিকভাবে জাগ্রত করতে হবে এবং একই সঙ্গে উৎপাদনের কর্মকান্ডে বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি অনুধাবন করেন প্রকৃতিপ্রদত্ত সম্পদ শুধু কিছুসংখ্যক চতুর মানুষের হাতে জমা হয়ে ঐশ্বর্যের মায়াজাল সৃষ্টি করছে এবং তাদের ভোগের পরিধি বিস্তার করে অসংখ্য প্রবঞ্চিত মানুষেরঅভাবমোচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেন বহুমুখী বৈষম্যে ভরা চকচকে বাহ্যিক অগ্রগতি টেকসই এবং দারিদ্র্য বিমোচনের সহায়ক হতে পারে না। তাই তিনি বলেছেন, ‘সমস্ত শরীরকে প্রতারিত করিয়া কেবল মুখেই যদি রক্ত সঞ্চার হয়, তবে তাহাকে স্বাস্থ্য বলা যায় না।’


রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তির সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং উল্লেখ করেছেন, যদি আমরা দারিদ্র্য নিরসনের পন্থা উদ্ভাবন করতে না পারি, তবে সকল দিকে পিছিয়ে যাবো। একটি সহজ সত্যকে বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যে আছে সম্পদ সৃজনের সুপ্ত শক্তি ও অপার সম্ভাবনা এবং যদি তাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায় তবে দারিদ্র্য নিরসন অবশ্যই সম্ভব। এখানেই নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস-এর প্রয়োগধর্মী অর্থনীতির সাথে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার ব্যাপক সামঞ্জস্য বিরাজমান। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত দৃঢ় প্রত্যয়ে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন, সমাজের বৃহৎ অংশকে নীচে ফেলে উন্নয়নের শিখরে ওঠার অহঙ্কার করা যায় না।
রবীন্দ্রনাথ বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন। তিনি জার্মানি ও আয়ারল্যান্ড থেকে সমবায়ের মাধ্যমে অগ্রগতির উদাহরণকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। রাশিয়া থেকে সাম্যবাদ ও শিক্ষার সুফল প্রত্যক্ষ করেছেন। জাপান থেকে প্রগতির নতুন ধারার শিক্ষা নিয়েছেন। তিনি তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এবং তার বন্ধু পুত্র সন্তোষ মজুমদারকে আমেরিকার ইলিনয়েজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য পাঠিয়েছিলেন।

তিনি ১৯০৭ সালে জামাতালগেন গাঙ্গুলিকে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ, পশুপালন সম্পর্কে উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জামাতাকে উৎসাহ দিয়ে লিখেছেন, “You can start co-operatives farming with cultivators help establish them a bank, provide them healthy habitats, build roads, make embankment, organize them all as supportive associates. The list is endless..”


পল্লীউন্নয়নের মাঝে রবীন্দ্রনাথ দারিদ্র্য নিরসনের সন্ধান পেয়েছেন। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রথম শুরু করেছেন চলনবিলের কৃষকদের মাঝে রবীন্দ্রনাথ নিজেই। তিনি বলেছেন, “একা অন্ন ভক্ষণ করা যায়, তাতে হয়তো পেট ভরে। কিন্তু পাঁচজন মিলে খেলে পেটও ভরে, আনন্দেও মিলে এবং সম্প্রীতির ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়।”
সমবায়ের চেতনা ও ধ্যান-ধারণাকে অর্থনৈতিক মুক্তি ও দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম পদ্ধতি হিসাবে বিবেচনা করে রবীন্দ্রনাথ বারবার উল্লেখ করেছেন, ধনীর ধারে দারিদ্র্য বিমোচন হয় না। দারিদ্র্য বিমোচন হতে পারে গরিব জনসাধারণের সম্পদ সৃজন ও উৎপাদনের ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে। আবার গরীব মানুষ একাকী অনেক দূর অগ্রসর হতে পারে না, প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন সমবায়ীভাব। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “যথেষ্ট পরিমাণ স্বাধীনতাকে সর্বসাধারণের সম্পদ করে তোলবার মূল উপায় হচ্ছে ধন অর্জনে সর্বসাধারণের শক্তিকে সম্মিলিত করা”। তিনি সমবায় সম্বন্ধে বলতে গিয়ে আরো বলেছেন, “মানুষ খাটো হয় কোথায়। যেখানে সে দশজনের সঙ্গে ভালো করিয়া মিলিতে পারে না। পরষ্পরে মিলিয়া যে মানুষ সেই মানুষই পুরা, একলা মানুষ টুকরা মাত্র। আমাদের বারোআনা ভয়টাও এই ভূতের ভয়। সেটার গোড়াকার কথাই এই যে, আমরা মিলি নাই, আমরা ছাড়া-ছাড়া হইয়া আছি। ভালো করিয়া ভাবিয়া দল বাঁধিয়া দাঁড়াইতে পারি। বিদ্যাবলো, প্রতাপ বলো, ধর্ম বলো, মানুষের যা কিছুদামি এবং বড়ো, তাহা মানুষ দল বাঁধিয়াই পাইয়াছে।” (সমবায়-১, রবীন্দ্র-রচনাবলী, শ্রাবণ ১৩২৫)


রবীন্দ্রনাথের ভাষায় দারিদ্র্য থেকে মুক্তি হচ্ছে জনগণের অধিকার। দয়া-দাক্ষিণ্য বা অনুকম্পার মাধ্যমে এই উপসম সম্ভব নয়। তিনি মূলত এ কথা বলতে চেয়েছেন বিদেশি অনুদান গ্রহণকে বিরোধিতা করে একটি দেশ ও জাতি যেন আত্মশুক্তিতে বলীয়ান হয় সে চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে। তাঁর ভাষায় আত্মসম্মানবোধ একটি জাতির সমৃদ্ধির পথের মূলমন্ত্র, অন্যতম পাথেয়। আত্মসম্মানের চেতনা হচ্ছে জাতির মর্যাদা সংরক্ষণের বড় শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “নিজের শক্তি দ্বারাই অগ্রসর হওয়াই যথার্থ হওয়া- তাহাতে যদি মন্দগতিতে যাওয়া যায় তবেও সে ভালো। অপর ব্যক্তির কোলেপিঠে চড়িয়া অগ্রসর হওয়ার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নাই। কারণ চলিবার শক্তি লাভই যথার্থ লাভ, অগ্রসর হওয়া মাত্রই লাভ নহে।”


রবীন্দ্রনাথের সমবায় ভাবনা বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রগতির পথের দিকনির্দেশক। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও দারিদ্র্য ও বঞ্চনা আমাদের অর্থনীতিতে জগদ্দল পাথর হয়ে বিরাজ করছে। স্বাধীনতার পর আমাদের জনজীবনের ও জীবনযাত্রায় সামাজিক ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি এসেছে, পরিবর্তন এসেছে চিন্তায় ও চেতনা, এ কথা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সর্বশেষ জরিপ অনুসারে ৩১.৫% শতাংশে উপনীত হয়েছে এবং লক্ষণীয় যে, প্রতিবছর দারিদ্র্য নিরসন হচ্ছে মাত্র ০.২ শতাংশ হারে। একই সঙ্গে ধনী-দারিদ্র্যের বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন। দেশের উচ্চ আসনে অবস্থানকারী ১০ শতাংশ জনগণ মাত্র ০.২ শতাংশ আয় করে। প্রশ্ন হচ্ছে এ জাতীয় চরম বৈষম্যমুলক অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই কি এ দেশের কৃষক শ্রমিক মজুরের যুবক সন্তানেরা হাতে অস্ত্র ধরেছিল? প্রশ্ন হচ্ছে সুশাসনের অবক্ষয় ও আত্মমর্যাদা বির্সজনের যে প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে, তাই কি আমাদের বদলে দেবার অঙ্গীকার?


সময় এসেছে শতফুলকে একসঙ্গে ফোটার সুযোগ সৃষ্টির, দারিদ্র্যকে পাঠাতে হবে জাদুঘরে। বৈষম্যে ভরা অর্থনীতি, দুর্বত্তায়ণের পদচারণায় প্রকম্পিত প্রশাসন বিদ্বেষ ও হিংসায় ভরা রাজনীতিকে বদলাতে হবে। দারিদ্র্য নিরসনের লক্ষ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় সকল জনগণকে এক সাথে কাজ করতে হবে- এটাই হোক আমাদের সকলের প্রত্যাশা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here