লকডাউন ছাড়াই সুইডেন যেভাবে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলা করছে

0
222

দেওয়ানবাগ ডেস্ক : করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ইউরোপের অধিকাংশ দেশেই কোনো না কোনো মাত্রার লকডাউন আরোপ করা হলেও সুইডেনের অধিকাংশ নাগরিকই অনেকটা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন। লকডাউন ছাড়াই সুইডেনের মানুষের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলার পেছনে দেশটির নাগরিকদের সমর্থন এবং ভূমিকা রয়েছে। মূলত দেশটির বিজ্ঞানীরা এই কৌশলের প্রবর্তক এবং সরকার এটিকে সমর্থন করেছে। কিন্তু সুইডেনের সব ভাইরোলজিস্ট এখনো এই কৌশল নিয়ে পুরোপুরি আশ্বস্ত নন।

সুইডেনে কোনো লকডাউন নেই। দেশটির বিভিন্ন পানশালায় মানুষের ছবি থেকে শুরু করে আইসক্রিমের দোকানের সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইনের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার হয়েছে। তবে এসব ছবির আলোকে তাদের জীবনযাপনকে একেবারে স্বাভাবিক বলে মনে করলে ভুল করা হবে। সুইডেনে হয়তো লকডাউনের পরিধি খুব সামান্য, কিন্তু সেখানকার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটির জনসংখ্যার সিংহভাগই স্বেচ্ছায় সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছেন। মূলত দেশবাসীর এই সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণকেই মনে করা হচ্ছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের প্রধান অনুসঙ্গ। দেশটিতে সাধারণ মানুষের গণপরিবহন ব্যবহারের হার যথেষ্ট পরিমাণে কমেছে, জনসংখ্যার একটা বড়ো অংশ ঘরে বসে কাজ করছেন এবং অধিকাংশই ইস্টার সানডের ছুটিতে কোথাও ভ্রমণ করেননি।

সুইডেনের সরকার ৫০ জনের বেশি মানুষ একসঙ্গে জমায়েত হওয়া এবং বৃদ্ধনিবাসে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নোভাস নামের একটি জরিপ পরিচালনা করা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে—প্রতি ১০ জন সুইডিশের ৯ জনই দিনের অন্তত কিছু সময় অন্য ব্যক্তির চেয়ে অন্তত এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখেন।

সুইডেনে সংক্রমণের পরিস্থিতি কী?
সুইডেনের সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতে, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সুইডেনের মানুষ যে রকম মনোভাব দেখিয়েছে তা উদ্যাপনযোগ্য। সুইডেনের বিজ্ঞানীদের নেওয়া কৌশল নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক হয়েছে। সুইডেনের নেওয়া কৌশল বিচক্ষণ ও টেকসই নাকি এর ফলে তারা অদূরদর্শীভাবে দেশের মানুষকে গবেষণার বস্তুতে পরিণত করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দেশটির এমন নীতির কারণে সেখানে অনেকেই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাবেন এবং তারা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থ হবেন। তবে সব বিতর্ক ছাপিয়ে সুইডেনের প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত স্টকহোমে সংক্রমণের হার এরই মধ্যে চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে স্থিতিশীল রূপ নিয়েছে; যদিও গত সপ্তাহের শেষে নতুন সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছিল সেখানে। তবে এখনো সুইডেনের আইসিইউগুলোতে জায়গা রয়েছে এবং নতুন একটি ফিল্ড হাসপাতাল এখনো ব্যবহার শুরু হয়নি।
রাষ্ট্রীয় মহামারি বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেস টেগনেল বলেন, আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম তার অনেকটাই পেরেছি। সুইডেনের স্বাস্থ্য বিভাগ যদিও যথেষ্ট চাপের মধ্যে তাদের কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের এখনো কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দিতে হয়নি। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, অন্যান্য দেশে রাজনৈতিক নেতাদের করোনা ভাইরাস সম্পর্কিত তথ্য দেশবাসীর সামনে পেশ করতে দেখা গেলেও সুইডেনে এসংক্রান্ত অধিকাংশ সংবাদ সম্মেলনে ডা. টেগনেলই নেতৃত্ব দিয়েছেন।

সুইডেন কেন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করল?
ডা. টেগনেলের নেতৃত্বাধীন দল একটি মডেলের মাধ্যমে অনুমান করে যে জনসংখ্যার অনুপাতে ভাইরাসের প্রভাব সীমিত হবে, যা ইউরোপের অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের করা ধারণার বিপরীত। পাশাপাশি সুইডেনের জনস্বাস্থ্য সংস্থা আগেই ধারণা দিয়েছিল যে আক্রান্তদের একটা বড়ো অংশেরই রোগের তীব্রতা থাকবে মৃদু। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল—সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নিয়মগুলো যেন কম কঠোরভাবে আরোপ করা হয়—যেন দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার বিষয়টি পালন করতে পারে মানুষ। অনূর্ধ্ব-১৬ বছর বয়সিদের স্কুলগুলোও খোলা রাখা হয়েছে যেন তাদের অভিভাবকরা নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।

সংখ্যা কী বলছে?
মোট আক্রান্তের সংখ্যার হিসেবে ১ কোটি মানুষের দেশ সুইডেন পৃথিবীর শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে পড়ে, যদিও সুইডেনে তীব্র মাত্রায় উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে কাউকে পরীক্ষা করা হয়নি। ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ১৮ হাজার ৬০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে আর মৃত্যু হয়েছে ২১০০ মতো মানুষের।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ার যে কোনো দেশের তুলনায় জনসংখ্যার অনুপাতে সুইডেনে মৃত্যুর হার বেশি। তবে সুইডেন তাদের করোনা ভাইরাস পরিসংখ্যানে বৃদ্ধনিবাসে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্যও সংযোজন করে, যা অন্য অনেক দেশেই করা হয় না; প্রায় ৫০ শতাংশ মৃত্যু নথিবদ্ধ হয় ঐ বৃদ্ধনিবাসগুলোতে।

যদিও সুইডেনের বৃহত্তম মেডিক্যাল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একজন মহামারি বিশেষজ্ঞ ও সরকারের নেওয়া কৌশলের সমালোচক ক্লডিয়া হ্যানসন মনে করেন করোনা ভাইরাসের কারণে অতিরিক্ত মানুষ মারা যাচ্ছে যা প্রতিরোধে আরো কঠোর মাত্রায় লকডাউন আরোপ করা উচিত ছিল। সুইডেনের শীর্ষ দৈনিকে গত সপ্তাহে ক্লডিয়া হ্যানসনসহ ২২ জন বিজ্ঞানীর লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে মন্তব্য করা হয়—‘মেধাহীন কর্মকর্তাদের’ নীতিনির্ধারক হিসেবে বসানো হয়েছে।

এই সপ্তাহে প্রকাশিত স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে উঠে আসে— মে মাসের শুরুতে স্টকহোমের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। অবশ্য পরে জানায়, সুইডেনের ২৬ শতাংশ বাসিন্দার মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ হবে। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কনট্রোলের (ইসিডিসি) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক জোহান জিয়েসেক মনে করেন, স্টকহোমের অন্তত অর্ধেক মানুষ মে মাস শেষ হওয়ার আগে সংক্রমিত হবে।

সুইডেনের অনেকে বিশ্বাস করেন সংকটের সবচেয়ে খারাপ ধাপ পার হয়ে গেছে। কাজেই মানুষ ধীরে ধীরে সামাজিক দূরত্ব মানার ব্যাপারে আগ্রহ হারাচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লভরেন সতর্ক করেছেন যে, এটি ঢিল দেওয়ার সময় নয়। দেশবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে বেশি বেশি সময় কাটানোর পরামর্শ দেন।—বিবিসি

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here