লকডাউন দিয়েও কেন এদেশে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না?

0
133


ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)

গত বছরের ৮ মার্চে আমাদের দেশে সর্বপ্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয়। এরপর সাধারণ ছুটি, লকডাউনসহ নানা স্বাস্থ্যবিধি আরোপ করা সত্ত্বেও দেশে দৈনিক কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আজ প্রায় ১২ হাজারের উপরে। এতো কিছুর পরেও এই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতির মূল কারণ আমাদের অসচেতনতা।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে সচেতনতা না বাড়লে করোনা সংক্রমণ প্রতিহত করতে কেবলমাত্র এই লকডাউন তেমন কোনো কাজে আসবে না।

করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতির কারণ:
আমাদের অসচেতনতার কারণেই কোভিড-১৯ রোগের বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। আর এই অসচেতনতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে এই রোগ সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে আমাদের অবহেলা।

) করোনার মৃদু উপসর্গকে সিজনাল জ্বর মনে করা: সর্দি-কাশি-জ্বর, এটা সাধারণত শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ ঘটায় এরকম যে কোনো ভাইরাল ইনফেকশনের একটি সাধারণ উপসর্গ। প্রতি বছরই কোনো না কোনো সময়ে আমরা অনেকেই কম-বেশি এরকম সমস্যায় আগেও ভুগেছি যা সাধারণত ৪-৫ দিনের মধ্যে তেমন কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ভালো হয়ে গেছে।

করোনা ভাইরাস মূলত আমাদের এই শ্বাসতন্ত্রেই সংক্রমণ ঘটায়। সুতরাং, যারা করোনা ভাইরাসের মৃদু সংক্রমণে ভুগছে তাদেরও কিন্তু এই একই রকম উপসর্গই (সর্দি-কাশি-জ্বর) থাকবে।

সুতরাং, এই করোনা মহামারির সময়ে কারও যদি এরকম সর্দি-কাশি-জ্বরের কোনো উপসর্গ থাকে সেক্ষেত্রে এটাকে সিজনাল জ্বর হিসেবে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। আমরা ভুল করছি এখানেই। এদেশের বেশিরভাগ মানুষ করোনা রোগ বলতে জ্বর, কাশি সাথে শ্বাসকষ্টকেই বোঝে।

ফলে করোনার মৃদু উপসর্গকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না। করোনার মৃদু উপসর্গসহ রোগী, যাদের কোনো শ্বাসকষ্ট নেই বেশিরভাগ মানুষ ভাবছে এটা সিজনাল জ্বর।

করোনার এসব উপসর্গ থাকার পরেও আমরা দিব্যি যত্রতত্র মাস্ক ছাড়াই ঘুরে বেড়াচ্ছি, আরও দশ জন মানুষের সাথে মিশছি এবং নিজের অজান্তেই সমাজে এই রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছি। একটি বিষয় অনুধাবন করা উচিৎ যে আপনার অসাবধানতার বশে যে রোগটি আপনার থেকে অন্যের মাঝে সংক্রমিত হলো, আপনি নিজে ৪-৫ দিন পর ভালো হয়ে গেলেও আপনার থেকে সংক্রমিত হওয়া অন্য মানুষটি হয়তো এই রোগে মারা যাচ্ছে।

সুতরাং, এই সময়ে কারও যদি সর্দি, কাশি, জ্বর, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা ইত্যাদি কোনো উপসর্গ থাকে তাহলে তার উচিৎ হবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং অন্তত ১৪ দিন আইসোলেশনে থাকা। অর্থাৎ, ঘর থেকে বের না হওয়া।

খ) মাস্ক পরার বিষয়ে অনিহা: মাস্ক পরার বিষয়ে আমাদের অনিহা কোভিড-১৯ বিস্তার ঘটাতে সাহায্য করছে। এত প্রচার প্রচারণার পরেও আমরা অনেকেই এই মাস্ক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম কি তা জানিনা।

অনেকেই মাস্ক পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও প্রশ্নের সম্মুখীন হলে তখন অনেকে পকেট থেকে মাস্ক বের করে দেখাচ্ছেন যে তার মাস্ক সাথেই আছে।

মাস্ক আইডি কার্ড সমতুল্য কোনো বিষয় নয় যে এটা প্রয়োজনে পকেট থেকে বের করে শুধু দেখাবেন। এটা মুখে না পরে পকেটে রাখলে কোনো লাভ হবে না। আবার অনেকে মাস্ক থুতনিতে ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে নিজে সংক্রমিত হবার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে তেমনি অন্যকে সংক্রমিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

) সময়মত হাসপাতালে না যাওয়া: কোভিড-১৯ আক্রান্ত কারও যখন শ্বাস কষ্ট শুরু হয়, তখন অনেকে বাসায় বসে থেকে অযথা সময় নষ্ট করে। করোনায় আক্রান্ত একজন ব্যক্তি যখন বাড়িতে চিকিৎসা নেয়, তার উচিৎ অক্সিমিটার দিয়ে তার শরীরে অক্সিজেন মাত্রা ঠিক থাকছে কিনা তা মনিটর করা। এই অক্সিমিটার আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে যে আপনি চিকিৎসা বাড়িতে বসেই নিবেন, নাকি চিকিৎসার জন্য আপনাকে হাস্পাতালে যেতে হবে।

এই করোনা মহামারির সময়ে প্রত্যেকের বাসায় এই অক্সিমিটার রাখা জরুরি। একজন সুস্থ মানুষের অক্সিজেন মাত্রা সাধারণত ৯৭% এর বেশি থাকে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত কারও অক্সিজেন মাত্রা যদি কমতে থাকে এবং তা ৯২-৯৩% এ নেমে আসে সেক্ষেত্রে তার হাসপাতালে যাওয়া উচিৎ। অনেকে বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার জোগাড় করে অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেন।

কিন্তু যদি দেখা যায় যে এই সিলিন্ডারের অক্সিজেন প্রয়োগের পরেও অক্সিজেন মাত্রা ৯০% এর উপর উঠছে না সেক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে তার হাসপাতালে যাওয়াই উত্তম। বিলম্বের কারণে অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দেখা যায় যে তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা ইতোমধ্যে ৬০-৭০% এ নেমে গেছে। এই রোগীগুলোকে পরে বাঁচানো মুসকিল হয়ে যায়।

কোভিড-১৯ সনাক্তে পরীক্ষার গুরুত্ব:

আমদের দেশে কোভিড-১৯ সনাক্তের জন্য প্রথম থেকেই পিসিআর টেস্ট করা হচ্ছে। ইদানিং কিছু জেলায় এই পিসিআর টেস্টের পাশাপাশি এন্টিজেন টেস্টও করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সকলেরই উচিৎ টেস্ট করা। এতে আইসোলেশনে থাকার বিষয়ে সচেতনতা যেমন বাড়বে তেমনি চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতেও এই পরীক্ষার ফল সাহায্য করবে।

তবে একটা বিষয় জানা উচিৎ যে এই টেস্টগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এই টেস্ট শতভাগ রোগীকে সনাক্ত করতে সক্ষম নয়। অর্থাৎ, কিছু ক্ষেত্রে রোগ থাকা স্বত্বেও টেস্ট এর ফলাফল নেগেটিভ আসতে পারে।

সেজন্য টেস্টের ফল যাই আসুক না কেন আপনার যদি জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি উপসর্গ থাকে তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং ১৪ দিন নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে থাকুন।

ভ্যাক্সিন এর গুরুত্ব:

ভ্যক্সিন নেওয়া ছাড়া এই রোগকে মোকাবিলা করা কঠিন। সুযোগ থাকলে ভ্যাক্সিন অবশ্যই নিতে হবে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে এই ভ্যাক্সিন নিলেই যে আপনি শতভাগ নিরাপদ থাকবেন, তা কিন্তু নয়। ভ্যাক্সিন নেবার পরেও আপনাকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তবে আশার কথা হলো যে প্রথম দিকে অনেকের মাঝেই এই ভ্যাক্সিন নেবার বিষয়ে অনিহা কাজ করলেও এখন মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই ভ্যাক্সিন নিচ্ছে।

পরিশেষে বলতে চাই যে এখনও সময় আছে, সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যাবার আগেই আসুন আমরা সচেতন হই। যে মানুষটি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি হয়তো এক সপ্তাহ আগেও চিন্তা করেননি যে তাকে এভাবে চলে যেতে হবে।

আমরা কেওই জানি না যে আমাদের সামনে কি কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আসুন, আমরা সচেতন হই অন্তত নিজের কথা ভেবে, সচেতন হই অন্তত নিজ পরিবারের আপন মানুষটির কথা ভেবে।


[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here