লালনের নারী দর্শন

0
517

ক্যারল সলোমন

একটি সংকলনে (মতিলাল দাস ও পীযূষ কান্তি মহাপাত্র, ১৯৫৮: ২৯৫ নম্বর গান; মুহম্মদ আবু তালিব, ১৩৭৫: দ্বিতীয় খণ্ড, ১৬১ নম্বর গান; উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ১৩৭৮: ৪৩ নম্বর গান) লালনের এত গানের ভণিতা মোটামুটি এভাবে দেওয়া আছে:

ফকির লালন বলে সে যে

গুপ্ত মক্কা,

আদি ইমাম সেই মিঞে।

বাউল বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের (১৩৭৮: ৩২৫) মতে ‘মিঞে’ হচ্ছে ‘খোদা’র একটি প্রতিশব্দ। আবার ব্রাদার জেমস তাঁর লালনের গানের ‘অনুবাদ’ সংস অব লালন (১৯৮৭: ৭৮-৭৯) গ্রন্থে ‘মিঞে’ শব্দকে সম্ভবত ‘সাঁই’-এর প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচনা করে সেটিকে ‘লর্ড’ হিসেবে অনুবাদ করেছেন। কিন্তু ‘মিঞে’, অর্থাৎ ‘মিঞা’ (মিয়া) শব্দটি বাংলায় মুসলমানদের একটি সম্মানসূচক শব্দ। যদিও বড়জোর প্রাচীন ইংরেজি ভাষা অনুসারে ‘মিঞে’ শব্দটি ‘লর্ড’ বলে অনুবাদ করা যেতে পারে, তবু এই শব্দ বিশেষ কোনো বাংলা শব্দের সঙ্গে যুক্ত না হলে (যেমন ‘আল্লাহ মিয়া’) ‘গড’-এর অর্থে ব্যবহার মোটেই সমীচীন নয়।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউল গায়ক মরহুম খোদা বক্সের পাঠ অনুযায়ী এই গানে ব্যবহৃত ‘মিঞে’ শব্দটি আসলে ‘মেয়ে’। ‘মেয়ে’ কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় ‘মিইঁয়্যে’, এমনকি ‘মিয়া’ হিসেবে উচ্চারিত হয়। ‘মিঞে’ (সম্মানসূচক উপাধি) এবং ‘মিইঁয়্যে’র (অর্থাৎ ‘মেয়ে’র) মধ্যে ধ্বনিগত সাদৃশ্য থাকায় অনেকে ‘মিইঁয়্যে’ কথাটিকে ‘মিঞে’ হিসেবে মনে করেছেন। শুদ্ধ ভাষায় গানটির ভণিতা হবে আসলে:

ফকির লালন বলে সে যে

গুপ্ত মক্কা,

আদি ইমাম সেই মেয়ে।

বাউল আবদুল করিম শাহের কণ্ঠে এই পাঠের অবিকল একই শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। কৌতূহলবশত কুষ্টিয়ায় লালন ফকিরের আখড়া ছেঁউড়িয়ায় বেশ কিছু ফকিরকে এই ভণিতার পাঠের প্রকৃত শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তাঁরা সবাই এই ব্যাপারে একমত। গানটির কলি হচ্ছে ‘আদি ইমাম সেই মেয়ে’। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই যে দুটি সংকলনে, যথাক্রমে ভাব সঙ্গীত (খোন্দকার রফিউদ্দিন, ১৩৭৪: ১৫, ৪০ নম্বর গান) এবং বাউল কবি লালন শাহ-এ (আনোয়ারুল করীম, ১৩৭৩: ৩১৬, ১৯২ নম্বর গান) পরিষ্কারভাবে ‘মেয়ে’ শব্দটি রয়েছে, ‘মিঞে’ নয়। উপরন্তু যখন খোদা বক্সের আশ্রমে রক্ষিত খাতা দেখার সুযোগ পাই, তখন দেখি তাতেও ‘মেয়ে’ লেখা আছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে লালন দর্শনে আশ্চর্যজনকভাবে আদি ইমামকে একজন শ্রদ্ধাষ্পদ নারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য সবার কাছে ‘আদি ইমাম’ নারী, এই বিষয় বিসদৃশ বিবেচিত হলেও বাউল সম্প্রদায়ের কাছে এ হলো ‘শক্তি’র প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধার প্রকাশ। এই শক্তিই হচ্ছে পরম করুণাময় আল্লাহ্র কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। অথচ আরবি ভাষায় ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ ধর্মীয় নেতা এবং সেই নেতা পুরুষ।

মুসলমান বাউলদের মধ্যে এই মর্মে বিশ্বাস রয়েছে যে ‘আদি শক্তি’ হচ্ছে হযরত আলীর সহধর্মিণী বিবি ফাতেমা। এ জন্যই লালন ফকির তাঁর ‘ভজ রে জেনে শুনে’ গানে বলেছেন, ‘নিলে ফাতেমার স্মরণ ফতে হয় করণ’। অর্থাৎ নিবিষ্টচিত্তে বিবি ফাতেমাকে স্মরণ করলে সাধন-সিদ্ধি হবেই। কেবল ‘শক্তি’র মাধ্যমেই পরম করুণাময় সাঁইয়ের দরবারে হাজির হওয়া সম্ভব।

[মূল বাংলায় রচিত; ‘লালনের গানের পাঠোদ্ধার’, প্রথম আলো, ১৪ এপ্রিল ২০১৫

ক্যারল সলোমন: প্রয়াত অধ্যাপক, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here