লালন গানের দর্শন

0
34


অধ্যাপক মো. সোলায়মান আলী সরকার
‘বাউল সাহিত্য’, ‘ফোকলোর’, ‘লোকলোর’, ‘লোক-ঐতিহ্য’, ‘লোক-যান’, ‘লোক-সাহিত্য’, ‘লোকসঙ্গীত’, ‘মরমিয়া সাহিত্য’, ‘সুফি সাহিত্য’, ‘নব্য-সুফি সাহিত্য’ ইত্যাদি সহিষ্ণুতা, ভগবৎ প্রেম, অসম্প্রদায়িকতা, আধ্যাত্মিকতা, সমন্বয়ধমী অনির্বচনীয়তা, মনের ব্যাপকতা, উদারতা, ভক্তিবাদিতা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল। বাউল সাহিত্য সাধনা লোকসাহিত্যের অংগ হয়ে পড়ায় এর উৎপত্তি, তাৎপর্য, ইতিহাস, জ্ঞানতত্ত্ব, বিবর্তনবাদ ইত্যাদি নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে। লালন বাউল শিরোমণি। আবহমান কাল থেকে ভারতীয় তথা বাংলার সংস্কৃতিতে মিলিত সাধনা চলে আসছিল। সেই যুক্ত সাধনা লালনের গানে বিধৃত হয়ে রয়েছে। হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির অপূর্ব মিশ্রণে এ সংস্কৃতির জন্ম। সহজ, সরল, সতেজ ও সাবলীল প্রাণবেগ প্রকাশ লালনের গানে দেখা যায়। লালন পরিষদ পত্রিকার সম্পাদক মুনশী আব্দুল মান্নান বলেন, লালন তথাকথিত বাউল বা লোকায়ত সাধক নন, তিনি আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যের অন্যতম দিশারী ও যুগস্রষ্টা মনীষী। লালনের গানে কোথাও ‘বাউল’ শব্দের প্রয়োগ নেই, তাঁর গানে ফকির দরবেশ সাঁই ইত্যাদি শব্দের প্রয়োগ রয়েছে। লালনের ইন্তেকালের পরে পাঞ্জু শাহ বহু ভাবগান বা ফকিরী গান রচনা করেন। সেখানেও কোনো ‘বাউল’ শব্দের ব্যবহার নেই। দুদ্দু শাহ ওরফে দুদ্দ মল্লিক শাহ রচিত গানের সংকলন বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে, তাতে দুটি কিংবা তিনটি গানে দুদ্দু শাহ ‘বাউল’ কথাটি ব্যবহার করেন। তিনি দীর্ঘ প্রায় আশি বছরের কাছাকাছি জীবনে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বহু সাধু সভায় যোগদান করেন এবং শত শত গায়কের কণ্ঠে ভাব গান শোনার সুযোগ পান। তাতে লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ, জহরদ্দি শাহ, তাঁদের গানে ‘বাউল’ কথা সম্বলিত কোনো গান তিনি শুনেননি। তাঁদের গানের একটি লাইন ‘দরবেশী বাউলের ক্রিয়া’ থেকে বুঝা যায় লালনের পরে বাউল কথাটি ব্যাপকভাবে চালু হয়, লালনশাহী ফকিরগান বাউল নামে অভিহিত হতে থাকেন। দুদ্দু শাহ লালনের যথার্থ স্বরূপ ব্যাখ্যা করে বলেন, লালন সম্প্রদায় বাউল হয়ে থাকলে তবে সে তান্ত্রিক বাউল নয়, তাঁরা দরবেশ, সন্ধানী বা তালিব। মনসুরউদ্দিনের ‘হারামণি’ (২য় খন্ড) গ্রন্থের ভূমিকা পড়ে রবীন্দ্রনাথের সহজ সরল ভাব এবং লালনশাহী সংগীতে বিবৃত মরমী চিন্তার প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধ দেখে বিষ্ময় জাগে। “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে।”….


এ গানটি কলকাতার একতারাধারী এক বাউলের মুখে শুনেছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন। তাঁর গৃহীত এ বাউল শব্দটি একেবারে স্বাভাবিক মাটির কাছাকাছি একটি সংসারত্যাগী উদাসীন দেওয়ানা মানুষকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থেকে এ বাউলকে একমাত্র মানুষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করেন। স্রষ্টাকে বহির্বিশ্বে কোথাও পাওয়া যায় না। মানুষের মনের মণিকোঠায় তাঁর আসন। তাঁকে সেখানে খুঁজতে হয়। এই চিন্তা তাঁদের অন্তরে সর্বক্ষণ বিরাজমান। মনের মানুষের সন্ধানে তাঁরা পাগল, তাই তাঁরা বাতুল বা বাউল। তাঁদের ‘মনের মানুষ’-তত্ত্ব প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনদেবতা তত্ত্ব’ লাভ করেন। এ কথা কবিগুরু নিজে স্বীকার করেন। দুঃখের বিষয় পরবর্তীকালের বাউলকে সাম্প্রদায়িক তুলাদন্ডে বিচার করে বহু গবেষক বিভ্রাটের সৃষ্টি করেন। লালন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানবতার পূজারী। এ কথা তাঁরা ভুলে যান। জন্ম জাতি-কুল বিচারে মানুষের একটি পরিচয় থাকে। তাই বলে সেটি নিয়ে বাড়াবাড়ির কোনো অবকাশ নেই। গানের মধ্যে আধ্যাত্ম জগতের কথা বলা হয়েছে কেমন করে ভব বন্ধন-জ্বালা থেকে মুক্তি লাভ করে স্রষ্টার সঙ্গে আধ্যাত্মিক প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যায়।


রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ করে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তারপর থেকে লালন সুধী সমাজে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের মনে হিন্দু-মুসলমানের মিলন-চিন্তা ১৯৪১ সালে তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। হিন্দু-মুসলমানের মিলনকামী চিন্তাবিদ হরিনাথ মজুমদার, অক্ষয় কুমার মৈত্র প্রমুখের ‘ফিকির চাঁন্দ ফকিরের দল’ ও ‘হিতকরী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় নিবন্ধকার, সরলা দেবীর প্রবন্ধ প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ লালনের প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, লালনকে দেশ-বিদেশের সাহিত্যিক ও দার্শনিক পন্ডিতদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। লালন শাহ, হাসন রাজা প্রমুখ সাধকের গানকে তাঁর রচনাবলীতে স্থান করে তার ভাষা, ভাব, ছন্দ, সুর ইত্যাদি প্রশংসা করে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম দর্শন ইত্যাদি ক্ষেত্রে লালন প্রমুখকে অমর করেন। বাংলার মরমী সাধকদের সংগীতের ভাষা, ভাব, ছন্দ, সুর ধর্মীয় ভাবধারা, দর্শন ইত্যাদিকে তিনি পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো বেদ, বেদান্ত, মহাভারত, পুরাণাদির আলোকে দেখেন ও বিচার করেন এবং লালনকে একজন ধর্মসংস্কারক, ধর্ম-প্রচারক ও সমাজ-সংস্কারক রূপে চিহ্নিত করেন, বৈদিক ঋষিদের মতো তিনি বাংলার হাজার হাজার মুসলমানকে আধা-হিন্দু, আধা মুসলমান রূপে চিহ্নিত করে বাউল সম্প্রদায়ভুক্ত করেন। আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, লালন চর্চার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।


অনেকে মনে করেন, লালন-জীবনী, জন্ম-মৃত্যু, জাতি, ধর্ম, সাধন, দর্শন ইত্যাদি অন্ধকার অবস্থার জন্য রবীন্দ্রনাথ দায়ী। পশ্চিমবঙ্গের লোকসাহিত্য গবেষক সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বিশেষ কারণে রবীন্দ্রনাথ লালন সম্পর্কে কোনো উল্লেখ করা থেকে বিরত থেকেছেন। কুমুদনাথ মল্লিক, সন্তোষ বসু প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের উক্তির পুনারাবৃত্তি করে লালনকে ধর্ম-সংস্কারক ও সমাজ-সংস্কারক বলেন। ড. মতিলাল দাশ ‘লালন ফকিরের গান’ প্রবন্ধে উপনিষদ, গীতা ইত্যাদি হিন্দু ধর্মগ্রন্থ, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি প্রমুখ রচিত বৈষ্ণব কাব্যগ্রন্থের আলোকে বিচার করে লালনকে ‘দরবেশ’ নামে উল্লেখ করেন। বসন্তকুমার পাল লালনকে একজন মনস্তত্ত্ববিদ মহাঋষি, একজন সত্যদ্রষ্টা ঋষি বা ‘ভগবানের অংশাবতার’ বলেন। লালন সম্প্রদায়ান্তরে সাধকদের প্রতি যথাসম্ভব সম্মান প্রদর্শন করেন। কারণ প্রত্যেক জাতির ধর্ম, সাধনা, দর্শনাদি হতে গ্রহণযোগ্য উপাদান গ্রহণ করে সার্বিক ‘মরমী সংগীত’, ‘ভাবগান’, ‘ভাবসংগীত’, ‘লোকসংগীত’, ‘আধ্যাত্ম সংগীত’, ইত্যাদি নামের গান রচনা করেন। লালন সাধকদের পরিচয় দিতে গিয়ে মুনি, ঋষি, সাধু, সন্যাসী, শাক্ত, শৈব, রসিক, বৈষ্ণব, বাউল, ব্রহ্মজ্ঞানী, ব্রহ্মজ্ঞানী খ্রীস্টান ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেন। আর মুসলমান সাধকদের পরিচয় দিতে গিয়ে ‘ফকীর’, ‘বেশরা ফকীর’, ‘তালিব’, ‘তালেবুল-মওলা’, ‘দরবেশ’ ‘ওলী’, ‘কুতুব’, আরিফ, ‘পীর’, ‘পীরের পীর’, দরবেশের দরবেশ, ‘কুতুবের কুতুব’, ‘মুরশিদের মুরশিদ’, ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করেন। তিনি মুনি ঋষি, সাধু, সন্ন্যাসী, ব্রহ্মজ্ঞানী, বহ্মজ্ঞানী খ্রীষ্টান প্রভৃতি নামের সাধকদের সমালোচনা করে ‘তালেবুল-মওলা’, ‘ফকীর’, ‘দরবেশদের সাধনা, দর্শন ও অন্যান্য মতবাদ সমর্থন করেন। কোরআন, ‘হাদীস’, ‘তৌরাত’, ‘ইঞ্জিল’, ‘জŸুর’, ‘তাফসীর হুসেনী’, ‘মসনবী কালাম’ প্রভৃতি গ্রন্থ, ফকীর, আউলিয়া, দরবেশ ও সাধকদের বরাত দেন। এসব মুসলমানি শব্দ ও পরিভাষা সমগ্র সুফি সাহিত্য, বাংলার সুফি, নব্য সুফি ও যোগ সাধক সাহিত্যে, ড. ডিল্যাচী ও লিয়ারী, ড. আর এ নিকোলসন প্রমুখের গ্রন্থে দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, মুসলমান সাধকরা, এমন কি হিন্দু সাধকরা নিজেদের ফকির দরবেশ, শব্দ ব্যবহার করে আসছেন, তাঁরা ফকির, দরবেশ, সুফি প্রভৃতি শব্দকে সমার্থবোধক মনে করেন ও ফকির নামে পরিচয় দেন। বসন্ত কুমার পাল, ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখ মরমী সাধক ‘বাউল’, ‘সাচ্চা বাউল’, ‘একক বাউল’ ইত্যাদি নামে উল্লেখ করেন এবং লালনকে ‘বড় বাউল বলেন। কবীর, সৈয়দ আহমদ খাঁ সহ অবিভক্ত ভারতের বিশটির বেশি মুসলমান সম্প্রদায়কে আধা-হিন্দু, আধা-মুসলমান, ‘নেড়ার ফকীর’, বেশরা ফকীর’, ইত্যাদি নামে চিহ্নিত করে প্রথমে ‘বাউল’ সম্প্রদায়ভুক্ত করে নেওয়ার জন্য লেখক হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি আহবান জানান। সাধকদের ‘বাউল’, ‘নেড়া’, ‘সহজিয়া’, ‘আপা-পন্থী’, ‘সৎনামী’, ‘বীজমার্গী’, ‘চুলিমার্গী’, ‘শাক্ত মতাবলম্বী’, ‘পল্টুদাসী’, ‘পুষ্টিমার্গী’, কবিরপন্থী, ‘অঘোরপন্থী’, ‘নানকশাহী’, ইত্যাদি নামে উল্লেখ করা হয়।


১৮৬৭ সালে ‘হিন্দু মেলা’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে মুসলমান সাধকদের হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত করা হয়। উইলসন সাহেব, অক্ষয় কুমার দত্ত প্রমুখ ভারত ও বাংলাদেশের উপাসকদের একটি কাঠামো তৈরী করেন ও উক্ত কাঠামোর ওপর রং দিয়ে সমুজ্জল করে খাড়া করা কাঠামোর ওপর বৌদ্ধ সহজিয়া, বৈষ্ণব সহজিয়া, হিন্দু তান্ত্রিক ইত্যাদি সাধনার প্রলেপ দিয়ে ও লালনকে প্রথমে ‘মহাত্মা লালন ফকীর’, ‘ভগবদ পরায়ণ ব্যক্তি’, ‘মুসলিম সুফি বাউল’, ‘বৈষ্ণব বাউল’, ‘বেশরা ফকীর’, ‘বেশরা দরবেশ’, ‘বাউলপপন্থী মুসলমান ফকীর’, ‘বাউলপন্থী ফকির’, ‘মুসলমান সহজিয়া ফকীর’, ‘মুসলমান সুফি বাউল’, ‘মুসলমান বাউল ফকীর’, ‘মারফতী ফকীর’, ‘সুফি মরমিয়া সাধক’, ‘মুসলমান বাউল’, ‘একক বাউল’, ‘সাচ্চা বাউল’, ‘প্রধান গোঁসাই’, ও পরে ‘চার চন্দ্র ভেদী বাউল’, ‘মুসলমান নামধারী বাউল’ ইত্যাদি নামে উল্লেখ করে হিন্দু কায়স্থ ব্রাহ্মণ প্রভৃতি সম্প্রদায়ভুক্ত করতে চেষ্টা করা হয়।
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here