শবে ক্বদর ও সাদাকাতুল ফিতরার গুরুত্ব

2
416

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান মিয়া
পবিত্র রমজান মাস মানুষকে সংযম সাধনা ও আত্মশুদ্ধি লাভের মহান শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিবছর এসে থাকে। এ মাসে রোজা পালন করে রোজাদার ব্যক্তি আল্লাহর অবারিত রহমত ও বরকত লাভ করে ধন্য হয়। এই রোজা আন্তরিকতার সাথে সঠিকভাবে পালন করলে রোজাদার ব্যক্তির পাপকালিমা দূরীভূত হয় ও সে একজন আদর্শ ও নেককার মানুষে পরিণত হতে পারে। এ মাসের শেষ ভাগে মহিমান্বিত একটি রাত রয়েছে, যাকে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর বলা হয়, যার মর্যাদা অপরিসীম।

লাইলাতুল কদর
পবিত্র রমজান মাসের মধ্যে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন এমন একটি পূন্যময় রাত্রি নিহিত রেখেছেন, যে রাত্রি হাজার মাসের (৮৩ বছর ৪ মাস) চেয়েও উত্তম। এর ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা কদর নাজিল করেছেন। সূরাটি হলো: ইন্না আনজালনাহু ফি লাইলাতিল কাদর, ওয়ামা আদরাকা মা লাইলাতুল ক্বাদর, লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আল ফি শাহর, তানাজ্জালুল মালাইকাতু ওয়াররুহু ফিহা বি ইজনি রাব্বিহিম মিনকুল্লি আমরিন, ছালামুন হিয়া হাত্তা মাতলা ইল ফাজর।

অর্থাৎ ‘‘নিশ্চয়ই আমি ইহা (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে (শবে কদরে)। হে রাসুল (সা.)! আপনি জানেন, শবে কদর কী? কদরের রাত্রি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সেই রাতে ফেরেশতাগণ এবং রূহ (জিব্রাইল) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে সবরকমের কল্যাণ নিয়ে (দুনিয়ায়) অবতরণ করে থাকেন। সেই রাত্রিটি ফজর পর্যন্ত শুধু শান্তি আর শান্তি (বিরাজ করে)।’’

শবে কদরের রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে। প্রতিবছর যতটুকু নাজিল করা হতো এই রাতে আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ হতে তা নির্ধারণ করা হতো। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সারা বছর হযরত রাসুল (সা.)-এর নিকট নাজিল করা হতো। এভাবে ২৩ বছর পর্যন্ত পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। একদা নবি করিম (সা.) সাহাবাদের সম্মুখে বনি ইসরাইলের চার ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। তাঁরা ৮০ বছর যাবৎ মহান আল্লাহর ইবাদত করেছেন। জীবনে একটি নাফরমানিও তারা করেননি। এরপরে হযরত আইউব (আ.), হযরত খারকিল (আ.) হযরত জাকারিয়া (আ.) এবং হযরত ইউশা (আ.) ৪ জন পয়গাম্বরের কথাও উল্লেখ করেন। এ হাদিস শুনে সাহাবিগণ খুব বিস্মিত হলেন। এমন সময় হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হলো- “হে রাসুল (সা.)! এর চেয়ে বিস্ময়করও বস্তু আল্লাহ্ আপনার উম্মতদের দান করেছেন, পরে তিনি সূরা ‘কদর’ পাঠ করে বললেন-এটা তার চেয়েও বিস্ময়কর।” একথা শুনে রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত রাসুল (সা.) খুবই আনন্দিত হলেন। শবে কদরের রাত্রি খুঁজে বের করার জন্য হযরত রাসুল (সা.) বাণী প্রদান করেছেন- আন্ আয়েশাতা (রা.) আনিন্নাবিয়্যি (সা.) আন্নাহু-ক্বলা আনতামছু- অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, হযরত রাসুল (সা.) বলেছেন- তোমরা (শবে কদর) তালাশ কর। (বোখারী শরীফ)

রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাত্রিতে অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের যে কোনো একটি রাতে এই শবে কদর নিহিত রয়েছে বলে প্রমাণ আছে। সুতরাং সুফি সাধকগণ এই পূণ্যময় রাত্রিটির সন্ধান পাওয়ার জন্য উক্ত ৫টি রাতই আল্লাহর প্রেমে গভীর ইবাদতে মশগুল থাকেন। তবে ২৬ রমজান এর মধ্যে শবে কদর নিহিত রয়েছে বলে সাধক পণ্ডিতগণ অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাই আমরা রমজান মাসের ২৬শে দিবাগত রাতে পবিত্র ‘শবে কদর’ পালন করে থাকি।

ইতেকাফ
মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নীরবে ধ্যানে বসে নামাজ ও তসবিহ পাঠ করার নাম ইতেকাফ। এ অবস্থায় দুনিয়ার সমস্ত কথা বার্তা ও কাজ কর্ম হারাম। এমনকি খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ বা নির্ধারিত স্থান থেকে বের হয়ে অন্যত্র যাওয়া নিষেধ। হযরত রাসুল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন ইতেকাফ করতেন। এমনকি (এভাবেই) মহান আল্লাহ্ তাঁকে উঠিয়ে নিলেন (বুখারী শরীফ)। ইতেকাফ করা ‘সুন্নতে’ মুয়াক্কাদা কিফায়া’। কোনো এক গ্রাম বা মহল্লা থেকে অন্তত একজন লোকও যদি এই ইতেকাফ করে, তাহলে সকলেই দায় মুক্ত হবে। ইতেকাফের মাধ্যমে নীরবে একাগ্রতার সাথে মোরাকাবা তথা ধ্যান-সহ ইবাদত করা যায়। আর সেই ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হওয়া সম্ভব।

রোজার ফিতরা
মুসলমানগণ দীর্ঘ একটি মাস আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা পালন করে থাকে। কিন্তু আল্লাহর হুকুম আহকাম যথাযথভাবে পালনে কোনোরূপ অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি ঘটে যেতে পারে। রোজার মধ্যে এ ধরনের ত্রুটির কথা চিন্তা করে মুসলমানগণ ঈদের নামাজের পূর্বে যে সদকা দিয়ে থাকে, তাকে সদকাতুল ফিতির বা ফিতরা বলা হয়। যে ব্যক্তি আর্থিক দিক দিয়ে মোটামুটিভাবে সচ্ছল, তার উপরে ফিতরা ওয়াজিব। পরিবারের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে (এমনকি যে শিশু ঈদের দিন ভোরে ভূমিষ্ট হয়েছে তার জন্য) ফিতরা আদায় করতে হবে। মাথাপিছু ১,৬৩৩ গ্রাম আটা অথবা তার সমপরিমাণ মূল্য ফিতরা দিতে হয়। যদি কোনো ব্যক্তি এমন অসচ্ছল হয় যে, সকলের জন্য ফিতরা দেওয়ার সাধ্য নেই, তাহলে সেই ব্যক্তিকে অন্তত একজনের ফিতরার টাকা সকলের হাত বুলিয়ে আদায় করতে হবে। ফিতরার টাকা বা মাল খাদ্য, বস্ত্রহীন, এতিম-মিসকিন ও দুঃস্থ মানুষের মধ্যে বন্টন করতে হবে। কোনো একজনকে অধিক পরিমাণও দেওয়া যায়, আবার একজনের ফিতরা একাধিক লোকের মধ্যেও ভাগ করে দেওয়া যায়।

ধনীরা ঈদের আনন্দ উপভোগ করবে, আর গরিবেরা তা থেকে বঞ্চিত থাকবে, এটা ইসলামের বিধান নয়। তাই তারাও যাতে কিছুটা আনন্দ লাভ করতে পারে, সে জন্য ঈদের দিন সকালের মধ্যে এই ফিতরা দেওয়ার বিধান রয়েছে। হাদিস শরীফে আছে, ফিতরা আদায় করা না হলে রোজাদারের রোজা আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে, আল্লাহর দরবারে পৌঁছায় না। তাই ফিতরা আদায় করা একান্ত প্রয়োজন।

ঈদুল ফিতর
দীর্ঘ একমাস রোজা রাখার পর ১লা শাওয়াল তারিখে রোজাদারগণ একটা অনুষ্ঠান বা উৎসবের মাধ্যমে রমজান মাসের বিদায় ঘোষণা করে, এর নাম ‘ঈদুল ফিতর’। ‘‘ঈদ শব্দের অর্থ খুশি। যারা রোজাদার, এদিন কেবল তাদেরই খুশির দিন। ধনী-দরিদ্র একই কাতারে দাঁড়িয়ে এদিন নামাজ আদায় করে ও শুভেচ্ছা বিনিময় করে। এর মাধ্যমে মুসলমান জাতির মধ্যে সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন আরো দৃঢ় হয়।

শেষ কথা
রোজা মুসলমানদের জন্য একটা চরম পরীক্ষা। কারণ ষড়রিপু মানুষকে পার্থিব জগতের লোভ-লালসা, আনন্দ-স্ফূর্তি, ভালোবাসা ও আত্মঅহমিকার প্রবল সুযোগ করে দেয়। কিন্তু একমাত্র রোজার মাধ্যমেই ষড়রিপুর অগ্রযাত্রার পথকে বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে- ‘‘যারা রিপুগুলোকে দমন করে খাঁটি পথে অটল থাকবে, তাদেরকে অগণিত পূণ্য প্রদান করা হবে।’’ মানুষের আত্মা যদি সাধনা ও রিয়াজতের মাধ্যমে শুদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে ষড়রিপু দমন করা সম্ভব হয়। কিন্তু একাকী আত্মাশুদ্ধি লাভ করা যায় না। এজন্য কামেল অলী-আল্লাহর সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। যতক্ষণ পর্যন্ত দেহের রোজা এবং মনের রোজাকে একসূত্রে গাঁথা না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো রোজাই ফলপ্রসু হবে না। তাই, অলী-আল্লাহ্গণ যেভাবে রোজা পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করেছেন, আমাদেরকেও সেপথ অবলম্বন করে দেহ ও মনকে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সমর্পণ করে দিয়ে একাগ্রতার সাথে রোজা পালন করতে হবে। তাহলে আমাদের জীবাত্মা পরমাত্মার দাসত্ব করার অনুপ্রেরণা পাবে।

মহান সংস্কারক, মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান আত্মশুদ্ধির যে মহান শিক্ষা দিয়ে থাকেন, সে অনুযায়ী কাজ করলে, হযরত রাসুল (সা.)-এর বর্ণনানুযায়ী রোজাদার ব্যক্তির ঘুম ইবাদত, চুপ থাকা তসবিহ পাঠের সমান এবং তার দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হবে। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে প্রকৃত রোজা পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here