‘শাক্ত’ নজরুলের মাতৃসঙ্গীত

0
20

অভিজিৎ পাল
সাধারণ বাঙালির চেতনায় নজরুল ইসলাম চিরকালই বিদ্রোহীর তকমা নিয়ে জীবন্ত হয়ে রয়েছেন। কবি নজরুলের বিদ্রোহী রূপের বাইরে রয়েছে তাঁর এক উদার প্রেমিক সত্তা, শরণাগতি লাভে ইচ্ছুক নিটোল ভক্ত সত্তা। নজরুল ইসলাম গীতিকার হিসাবেও বাঙালির জনজীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলতে পেরেছিলেন। কবি নজরুলের ভক্ত সত্তা যেন বারবার এক অসীম তথা বিরাটের ধ্যান করেছে। এই বিরাট ইসলামি মতে যেমন আল্লাহ, তেমনি হিন্দু মতে অখন্ড ব্রহ্মও। নজরুল ইসলামি পুরাণ বা ইসলামি প্রাচীন সাহিত্যে যেমন দক্ষ ছিলেন, তেমনি দক্ষ ছিলেন হিন্দু শাস্ত্র, পুরাণে। নজরুলের যে- চেতনা বারবার আমাদের ভাবিয়ে তোলে তা একজন ‘মুক্তমনা মানুষ’ নজরুলের পথ-যাপনের জয়গাথা। নজরুল ইসলাম পিতৃপরিচয় ও ধর্মের পরিচয়ে ইসলামপন্থী হলেও তাঁর কবিতা ও গানে সমান মর্যাদা পেয়েছেন হিন্দুদের আরাধ্য দেব-দেবী। একজন উদার হৃদয়ের মানুষ হিসাবে তিনি মনে করতেন- ঈশ্বরের কোনো ধর্ম হয় না, যেমন হয় না ভক্তিবাদী মানুষের। উনিশ শতকের প্রেক্ষাপটে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত গ্রন্থে এক জায়গায় বলছেন: ‘‘এক উপায়ে জাতিভেদ উঠে যেতে পারে। সে উপায়- ভক্তি। ভক্তের জাতি নেই। ভক্তি হলেই দেহ, মন, আত্মা- সব শুদ্ধ হয়।’’
ঈশ্বর-নির্ভরতা নজরুলের সাহিত্যের একটি অনন্য দিক। হয়তো কবি নজরুলও মনে করতেন- ভক্তি ও ভক্তের কোনো জাত নেই, জাত থাকতে পারে না; ভক্তি নিজেই একটি পরিপূর্ণ জাতি, যা মানবমিলনের স্রোত এনে দেয়। শাক্ত-পদসাহিত্যের বাহক কবি নজরুল যেন এই একই বার্তার জীবন্ত মূর্তি দেখেছিলেন বাংলার মধ্যযুগের দুই সাধককবি রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের পদসাহিত্যে। এই দুই সাধক কবি নিজেদের জীবনযাপনের বৈচিত্র্যময় কর্মসূচিতে প্রাচীন তন্ত্রের (বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রচলিত বিষ্ণুক্রান্তা তন্ত্রের) প্রথম মহাবিদ্যা দেবী মহাকালীকে চিরন্তনী বঙ্গমাতৃকার রূপে অভিষিক্ত করেছিলেন। এই সময় পূর্বে মহাদেবীর তন্ত্রে উক্ত যে বিরাট, ভয়ঙ্কর, ভীষণদর্শন চেহারা রয়েছে তা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষদিকে এসে প্রায় মুছে গিয়ে অনিন্দ্য মাতৃরূপ লাভ করতে শুরু করেছিল। এই সূত্র ধরে দেবী কালী বাঙালির বহির্বাটি থেকে অন্তঃপুরে আসন লাভ করতে থাকেন। আরো পরবর্তী সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণ ঊনবিংশ শতাব্দীর নগর কলকাতায় একটি নবধর্ম আন্দোলনের জন্ম দিলেন এবং ভক্তি ও জ্ঞান-এই দুইয়ের সমন্বয়ের নতুন এক অধ্যাত্ম চেতনার জন্ম দিয়ে তাঁর মতাদর্শের প্রসার ঘটালেন, তারও পরবর্তী সময়ে কবি নজরুলের আবির্ভাব এই বঙ্গভূমিতে। কৃষ্ণনন্দ আগমবাগীশ, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য ও শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস- একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক পথে দেবী কালীর উপাসনা। যেভাবে অখন্ড বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল তা থেকে বোঝা যায়, এর পিছনেও ছিল একটি ধর্মান্দোলন। এর নেতৃত্বে ছিলেন না কোনো ধর্মপ্রচারক, এই আন্দোলন ছিল গণসংস্কার থেকে তৈরি হওয়া। এই গণচিন্তা বাংলার অতীতকে নতুনভাবে রক্ষা করতে পেরেছিল। কারণ, বঙ্গদেশের সঙ্গে দেবী কালীর সংযোগ অনেক প্রাচীন।


আদ্যাস্তোত্রে আদ্যাশক্তি মহামায়ার কালীরূপে বঙ্গভূমিতে অবস্থানের উল্লেখ রয়েছে। কালে কালান্তরে ভারতীয় ধর্মান্দোলনের সহযোগী হয়েছে সাধনসঙ্গীত। বেদের সময়পর্বে সামগান বেদাচারের সহযোগী হয়েছিল, আদি গুরু শঙ্করাচার্যও অজস্র গীতাত্মক স্তব নির্মাণ করেছিলেন; বঙ্গভূমিতে চৈতন্য আন্দোলনের পরিপুষ্টি দিয়েছিলেন রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টচার্য। আরো পরবর্তী সময়ে যখন ব্রাহ্মসমাজ গঠন করা হলো, তখনো তৈরি করা হয়েছে অজস্র ব্রহ্মসঙ্গীত, এমনকি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িকে কেন্দ্রে রেখে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস যখন দেবী কালীর ঐশ্বরিক প্রসার ঘটিয়েছিলেন নাগরিক সমাজের মধ্যে তা বহমান রয়েছে এখনো। কথামৃতে বারবার পাওয়া যায় একটি গানের উল্লেখ- ‘‘গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কে-বা চায়।/কালী কালী কালী বলে আমার অজপা যদি ফুরায়।/ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়।/ সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে, কভু সন্ধি নাহি পায়।’’


এই গানে এক সহজিয়া ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে। কথামৃতে এই গান পাওয়া যায় মোট নয়বার! যা থেকে বোঝা যায়, সহজাতভাবকে কেন্দ্র করে শ্রীরামকৃষ্ণ তাত্ত্বিক ক্রিয়াকান্ডের বাইরে গিয়ে দেবী কালীর ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন মানুষের মনে। বঙ্গনাগরিক হিসাবে এত সবের কিছুটা হলেও প্রভাব এসে পড়েছিল মুক্তমনা নজরুলের নির্মল হৃদয়ে। তাছাড়া এই বঙ্গভূমি রামপ্রসাদী সুরের দেশ। নজরুল জন্মসূত্রে ইসলাম ধর্মালম্বী হলেও তিনি যে একজন বাঙালি হিসাবে রামপ্রসাদী সুরের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন তা হলফ করে বলা যায়। কারণ, এই সুর মানুষের সুর, এই সুর বঙ্গামতার জন্ম দেওয়া নিজস্ব সুর। সবথেকে বড়ো কথা, কবি নজরুল তাঁর জীবনের সংগ্রাম-মুখর দিনগুলিতে বঙ্গভূমির মাটির আসল গন্ধ মেখে বড়ো হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই রামপ্রসাদী গানের টান তাঁর মুক্ত হৃদয়কে আরো সুন্দরভাবে ব্যাপ্তি দিতে পেরেছিল। সাধক রামপ্রসাদের সময় থেকে কমলাকান্ত এবং তারও পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব প্রমুখের কালীচর্চার মধ্যে একটি সহজ মাতৃভাবের পাশাপাশি নতুনতর গভীর আধ্যাত্মিক দর্শনের চেতনাকে অনুভব করা যায়। এই পর্যায় থেকেই তন্ত্রের মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি কালী আর আচারসর্বস্ব পূজাবিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেন না- তিনি হয়ে উঠলেন সর্বজনীন, সকলের নির্ভরতার একজন মা। ব্যক্তি নজরুল হয়তো এভাবেই দেবী কালীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। যেমন, তাঁর পূর্বে এসেছিলেন কবিয়াল এন্টনি ফিরিঙ্গ।


নজরুলের কালীচর্চায় একটু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি একাধারে যেমন দেবী মহাশক্তির শরণাগতি চান, তেমনি তিনি আন্তরিক বাৎসল্যে শিশুকন্যারূপে কালিকাকে আপনার বোধে সন্তানের মতো কাছে পেতে চান। যেন তাঁরই কন্যা দেবী স্বয়ং! এই বোধ তাঁকে হয়তো অন্তরে তৃপ্তি দিয়েছিল অনেকখানি; বারবার তাই দেখা যায় সেই অভিমানী কালো মেয়ের কথা। নজরুলের গানে মহাকালী যেমন এক শিশুকন্যা হয়ে উঠেছেন, তেমনই রয়েছেন শাস্ত্রীয় পূর্ণ সংহারমূর্তিরূপেও। এ যেন ঠিক ভক্তি-ভালোবাসায় সিক্ত বৈচিত্র্যময় চালচিত্র। নজরুলের শাক্ত পদাবলির একটি বড়ো অংশ বাগেশ্রী রাগের; এছাড়া ভৈরবী, শিবরঞ্জনী, রামপ্রসাদীও রয়েছে। রয়েছে দুর্গা ও দেশ রাগেও। শাক্ত নজরুলের এই সার্বিক বিশেষ দিকটিই আমাদের অনুধ্যানের বিষয়। শক্তিসাধক নজরুল ইসলামের শ্যামাসঙ্গীত মৌলিকত্বে, দর্শনে, ভাবে ও ভাষায় চিরাচরিত ধারণাকে ভেঙে নতুনভাবে এসে দাঁড়ায় পাঠকের সামনে। এই পদগুলি হিন্দু, মুসলমান ও অন্য সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মাতৃ-আরাধনার পদ হিসাবেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায় অনায়াসে। শাক্তসঙ্গীতে বাঙালির নিজস্ব ঘরানা রয়েছে, এখানে পুরুষ ও প্রকৃতি এবং ব্রহ্ম ও মায়াশক্তি- এই দ্বৈত ভাবধারা বারবার এই দ্বৈতবাদের কাঠামোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই নজরুলের শৈবগীতির পদেও কিছু এমন ধারার গান পাওয়া যায়। এটিকে নজরুলের নিজস্ব ‘ডরঃ’ বলা যেতে পারে। নজরুলের শাক্তগানে দেশমাতা হলেন অজস্র ভারতীয় মানুষেরই শক্তিময়ী দেশজননী। ব্রিটিশশাসিত পরাধীন ভারতবর্ষে যেন আদ্যাশক্তি দেবী কালী দেশমাতৃকার চিদানন্দময়ীরূপে অভিষিক্ত হয়েছেন। নজরুলের গানে তন্ত্রের দেবী মহাকালী হয়ে উঠেছেন ভারতমাতারই সমার্থক এক সত্তা। অজস্র ভারতবাসীর মনোবল যখন বহিরাগত শাসকের অত্যাচারে জর্জরিত, তখন দেবীর তেজোময় ভাবরাশি তাদের করতে পেরেছিল জাগ্রত। ভারতীয় উপমহাদেশের পীড়িত মানুষের অন্তরের আরাধ্য দেবী হিসাবে তাই নজরুলের গানে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন এমন এক কালো মূর্তি, যার জ্যোতির স্পর্শে সমগ্র দেশবাসীর সুপ্ত সংগ্রামী চেতনা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা পেয়ে যায়। এই যে মাতৃত্বের নবভাবধারা নজরুল বিংশ শতাব্দীতে নবনির্মাণ করেছেন তা পূর্ববর্তী সময়ে বঙ্গিকচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম’-এর মধ্য দিয়ে সূচনা করেছিলেন, আরো পরে রবীন্দ্রনাথের দেশ বিষয়ক গানে তথা বঙ্গমাতা ও দেশমাতাকে কেন্দ্র করে লেখা গানে দেখা গেছে। এই ভাবটিও সংগ্রামী নজরুলের অন্তরকে প্রেরিত করেছিল। নজরুল ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাঠক ও গুণগ্রাহী- একথা ভুললে চলবে না। কবি নজরুলের এই মাতৃচেতনা, মাতৃভাবটি এদিক থেকে অনন্য।


বঙ্গিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে দুর্গা ও দেশমাতাকে এক করে দেখাতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ‘ডান হাতে তোর খড়গ-এর মধ্য দিয়ে দেশমাতৃকার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিলেন শাস্ত্রীয় মাতৃভাবকে। কবি নজরুল তাঁদেরই উত্তরসূরি, তবে তাঁর পথ একেবারে নিজস্ব চিন্তাধারায় সাজানো, পূর্বসূরিদের থেকে পরিপূর্ণ ঋণগ্রস্ত নয় এবং স্বতন্ত্র। তবে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের মুক্তস্বভাব ও প্রভাব গুণগ্রাহী নজরুলকে অন্তর থেকে কালীকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল সবার অগোচরে। নজরুল ইসলাম কালীসাধক হিসাবে আচার্য শ্রীরামকৃষ্ণের বন্দনা গেয়েছেন ‘রাঙাজবা’ কাব্যে। তিনি লিখেছেন: ‘‘পরমপুরুষ সিদ্ধযোগী মাতৃভক্ত যুগাবতার/ পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ লহ প্রণাম নমস্কার। /জাগালে ভারত- শ্মশানতীরে/অশিবনাশিনী মহাকালীরে,/মাতৃনামের অমৃত নীরে/বাঁচালে মৃত ভারত আবার/… তব নামমাখা প্রেম-নিকেতনে/ভরিয়াছে তাই ত্রিসংসার।’’ গানের এই কথাগুলি যেন পূর্বসূরি সাধকের প্রতি উত্তরসাধকের স্বীকৃতি-উচ্চারণ।


ভারতীয় সনাতন ধর্মে পঞ্চদেবতার যে প্রকরণ রয়েছে, তার মধ্যে দেবী শক্তি বা জয়দুর্গা অন্যতম। এই শক্তিদেবীরই একাধিক রূপ বর্ণনা করা হয়েছে বিভিন্ন পুরাণে। এর মধ্যে দুর্গা ও কালীর বিচিত্র প্রসার দেখা যায় বঙ্গপ্রদেশে। হিন্দু- মতে এই সমস্ত শক্তিদেবীর আদি উৎস স্বয়ং আদ্যাশক্তি মহামায়া। এই দেবীর বিরাটত্বের বিচিত্র ভাব সাধকের পক্ষেও যেন অগম্য ও আয়ত্তাতীত। মহাশক্তির এই বিরাটত্বের ধ্যান করে নজরুল ইসলাম একটি গানে লিখেছেন: ‘‘সিন্ধুতে মার বিন্দু খানিক, ঠিকরে পড়ে রূপের মাণিক,/ বিশ্বে মায়ের রূপ ধরে না, মা আমার তাই দিগবসন।’’ গভীর অনুধ্যান না থাকলে কোনো কবির পক্ষেই এই বিরাটের কল্পনা করা অসম্ভব। নজরুলের এই বিরাটের ভাবনা বহুবার প্রকাশিত হয়েছে; আর-একটি গানে তিনি লিখেছেন: ‘‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশুর আনমনে।/প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা, নিরজনে প্রভু নিরজনে।/’’

কিংবা ‘‘তারকা রবি শশী খেলনা তব, হে উদাসী!/পড়িয়া আছে, রাঙা পায়ের কাছে, রাশি রাশি।’’ এ শুধু কবির কল্পনা নয়, এ হলো সাধকের আস্থার কথা। নজরুল যা বিশ্বাস করতেন না, তা তিনি বলতেন না। এটিই তাঁর স্বভাব। হিন্দুশাস্ত্রে দেবী কালীর ধ্যানমন্ত্রে পাওয়া যায়- ‘‘ওঁ মেঘঙ্গীং বিগতাম্বরাং শবশিবারূঢ়াং ত্রিনেত্রাং পরাং/কর্ণলম্বিনৃমুণ্ডযুগ্মভয়দাং মুণ্ডস্রজাং ভীষণাং।/বামাধোর্ধ্বকরাম্বুজে নরশিরঃ খড়্গঞ্চ সব্যেতরে/দানাভীতি বিমুক্তকেশনিচয়াং বন্দে সদা কালিকাম।’’ আর নজরুল এই মহাদেবীরই অনুধ্যান করছেন এভাবে- ‘‘মহাকালের কোলে এসে/ গৌরী হল মহাকালী।/শ্মশান-চিতার ভস্ম মেখে/ স্লান হল মা-র রূপের ডালি।/তবু মায়ের রূপ কি হারায়/ (সে যে) ছাড়িয়ে আছে চন্দ্র-তারায়/মায়ের রূপের আরতি হয়/ নিত্য সূর্য-প্রদীপ জ্বালি।।/উমা হল ভৈরবী হায়/ বরণ করে ভৈরবেরে,/হেরি শিবের শিরে হাহুবীরে/ শ্মশানে মশানে ফেরে।/ অন্ন দিয়ে ত্রিজগতে/ অন্নদা মোর বেড়ায় পথে./ভিক্ষু শিবের অনুরাগে/ ভিক্ষা মাগে রাজদুলালি।’’


এই ভাবনার মধ্যে যেমন শাস্ত্রোক্ত দেবী কালী, দুর্গা, উমা ও অন্নপূর্ণা মিলেমিশে এক হয়ে গেছেন, তেমনই আবার আরো কয়েকটি পদে দেখা যায়, দেশমাতা দেবী কালীর অঙ্গে মিলে-মিশে এক হয়ে গেছেন। সেখানে কখন যেন মহাশক্তি দেবী কালীই স্বয়ং হয়ে উঠেছেন স্বাধীনতা-আকাক্সক্ষী সহস্র বিপ্লবীর জন্মদাত্রী। তিনিই শক্তিময়ী দেশমাতৃকার বন্দনা করেছেন। তিনি লিখছেন: ‘‘এবার নবীন মন্ত্রে হবে/ জননী তোর উদ্বোধন।/নিত্যা হয়ে রইবি ঘরে, হবে না তোর বিসর্জন।।/সকল জাতির পুরুষ নারীর প্রাণ/সেই হবে তোর পূজা-বেদি/ মা তোর পীঠস্থান।/(সেথা) শক্তি দিয়ে ভক্তি দিয়ে/ পাতব মা তোর সিংহাসন।’’ ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্গিমচন্দ্রের রচনায় দেশভাবনার যে-প্রকাশ দেখি, বিংশ শতাব্দীতে নজরুলের দেশভাবনাও ঠিক যেন তার কাছাকাছি। এ যেন একটি পরস্পরায় স্নাত মাতৃদর্শন।
(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here