‘শিশুকে উড়তে দিন ইচ্ছেডানায়’

0
29

ছোট্ট সুমনের আজ অনেক মন খারাপ। স্কুলে অনুষ্ঠাুন চলছে, কিন্তু তার যাওয়া হয়নি। প্রধান শিক্ষক স্বয়ং তাকে উপস্থিত থাকতে বলেছিলেন। খুব সুন্দর গান গাইতে পারে বলে অনুষ্ঠানে তার বেশ কয়েকটি গান গাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার মা-বাবা চান না সে গান করুক। তাদের এক কথা- ছেলে পড়ালেখা করে বড় হয়ে ভালো চাকরি করবে। ছোট থেকেই গানবাজনা করে বখে যাবে, তা তারা কোনো ভাবেই হতে দেবেন না।শিশু
বাবা-মায়ের এমন ভাবনা থেকেই, ছোট্ট সুমনের মতামত গুরুত্ব পায় না। কিন্তু বাবা-মাকে সুমন কোনোভাবেই বোঝাতে পারে না যে তারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলতে একটা বিষয় আছে। কিন্তু বাবা-মাকে অনেক বলার পরও কোনো লাাভ হয়নি। উল্টো মার খেতে হয়েছে। এসবের কারণে পড়াশোনাতেও মন বসাতে পারে না সুমন। তার কিচ্ছু ভালো লাগে না।


আমাদের সমাজের অনেক শিশুর মধ্যেই রয়েছে সুমনের মতো এমন মনে কষ্ট। পড়াশোনার বাইরেও যে বিশেষ গুণাবলির দ্বারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায় তা অনেক মা-বাবাই মেনে নিতে চান না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে সমাজ বিজ্ঞানী ও নীতি-নির্ধারকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌছেছেন যে, সমাজিক বিকাশে ও সমাজের আমূল পরিবর্তন এবং উন্নতিতে নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ সকলের মতামতসহ পূর্ণ অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রােয়াজন। সমাজের সকলের মতো শিশুদেরও সমাজে অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, রয়েছে অধিকার।
শিশুদের অংশগ্রহণের বিশেষ কয়েকটি অধিকারের মধ্যে রয়েছে অন্যের সঙ্গে অবাধে মেলামেশার অধিকার, তথ্য ও ধারণা চাইবার, গ্রহণ করার ও প্রকাশের অধিকার এবং মতামতের মূল্য পাবার অধিকার।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ধারা ১২’তে শিশুদের অংশগ্রহণ সম্পর্কিত সব বিষয়ের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে অবাধে মতপ্রকাশের অধিকার দেওয়া হয়েছে। সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশও এই অধিকার বাস্তবে রূপদানে উদ্যোগে নিয়েছে। যদিও তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুদিন আগেও তেমন অনুকূলে ছিল না।


এ ব্যাপারে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “অধিকাংশ স্বল্প শিক্ষিত কিংবা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত পরিবারগুলোয় প্রায় ক্ষেত্রেই শিশুদের অপরিণত হিসেবে মনে করেন, তাদের মতামতকে খুবই কম গুরুত্ব দেওয়া হয় অথবা আদৌ দেওয়া হয় না। শিশুরা তাদের মা-বাবা বা অভিভাবকের হেফাজতে থাকে এবং তারাই তার পক্ষে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যা একেবারেই ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার ধরন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাসস্থান বা কী ধরনের জীবন ব্যবস্থা অনুসরণ করা হবে সচরাচর তা নির্ধারণ করেন মা-বাবা বা অভিভাবক। অবশ্য শিক্ষিত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা উচ্চ শ্রেণির পরিবারে এর কিছুটা ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়।”
সরকারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই অনুকুলে এসেছে। শিশুদের মতপ্রকাশে স্বাধীনতার প্রধান যে দিক, তা হলো সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা। পরিবারের ভিতর অভিভাবকেরা যদি তার শিশু সন্তানটির মতামত বিবেচনায় নেয় এবং শিশুটি যদি বুঝতে পারে সংসারে তারও মতামতের একটি স্থান আছে, গুরুত্ব আছে তবে সেই শিশুটি পরিবর্তীতে হয় বিচক্ষণ। তার চারিত্রিক গঠন ও মেধা বিকাশের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি একটি বড়ো ভূমিকা পালন করে।


দেখা যায়, পরবর্তীতে সে একজন দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করে। শিশুর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু শিশুর মেধার বিকাশ বা তার অধিকারের স্বার্থেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজ সংসার সর্বোপরি দেশও এর ফলে ভবিষ্যতে লাভ করে মেধাবী, দায়িত্বশীল এবং উদার মনোভাবাপন্ন একটি উন্নত জাতি। কিন্তু শিশুটির মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুন্ন হলে এক সময়ে দেখা যায় যে সে তার অনাগ্রহের ফলে একজন স্বল্প শিক্ষিত, অদক্ষ ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাাশ করে বা আদৌ সে এগুলোর কোনোটাই হয় না।
কাজেই শিশুদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার খর্ব না করে বরং তাদের মতামত প্রকাশে উৎসাহদান এবং মতামতের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে অভিভাবকসহ সমাজের সকলের আন্তরিক হওয়া একান্ত দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here