শিশুদের আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা

0
211

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
আমাদের শরীরে রক্তে তিন ধরনের কোষ থাকে। যেমন: লোহিত রক্ত কণিকা (Red blood cell), শ্বেত রক্ত কণিকা (White blood cell) এবং অনুচক্রিকা (Platelet). লোহিত রক্তকণিকার মাঝে থাকে হিমোগ্লোবিন, যার কাজ মূলত শরীরের সব জায়গায় অক্সিজেন বহন করা। পাশাপাশি দেহকোষ থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করে তা পুনরায় ফুসফুসে পৌঁছে দেয় যাতে তা নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহ থেকে বের হয়ে যেতে পারে।

রক্তস্বল্পতা কী?
রক্তের এই হিমোগ্লোবিনের সাধারণ মাত্রা যদি ১১ গ্রাম/ডেসিলিটার-এর কম হয় এবং সিরাম ফেরিটিন (serum ferritin)-এর মাত্রা যদি ১২ মাইক্রোগ্রাম/লিটার-এর কম হয় তাহলে সেই অবস্থাকে বলা হয় অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা। অনেকে রক্তশুন্যতা শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু শরীরের রক্ত তো কখনো একেবারে শুন্য হয়ে যায় না। তাই রক্তস্বল্পতা শব্দটি ব্যবহার যুক্তিযুক্ত।

আমাদের দেশে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সের শিশুদের শতকরা ৫২.৭ ভাগ এবং ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শতকরা ৩৮.৪ ভাগ রক্তস্বল্পতা রোগে ভুগছে। সাধারণত ৯ থেকে ২৪ মাস বয়সের শিশুদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতিজনিত এই রক্তস্বল্পতা বেশি দেখতে পাওয়া যায়।

রক্তস্বল্পতার কারণ :
শিশুদের রক্তস্বল্পতার বেশ কিছু কারণ আছে। যেমন: আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা, থ্যালাসেমিয়া মেজর বা মাইনর, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, ক্রনিক কিডনি ডিজিজ, রক্তের ক্যান্সার ইত্যাদি। এর মধ্যে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতার কারণ :

শিশুদের আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা হওয়ার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। যেমন :

  • গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি পুষ্টিহীনতা থাকে বা বিশেষ করে আয়রনের ঘাটতি থাকে অথবা গর্ভকালীন সময়ে যদি মায়ের রক্তক্ষরণ হয়, তবে গর্ভের সেই শিশুর পরবর্তী সময়ে রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
  • শিশু যদি অপরিণত বয়সে জন্মগ্রহণ করে অথবা জন্মের সময় কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে শিশুর রক্তস্বল্পতা হতে পারে।
  • জন্মের পর প্রথম ৬ মাস শিশুর কেবল মায়ের বুকের দুধ পান করার কথা। ছয় মাসের পর থেকে বুকের দুধের পাশাপাশি অন্যান্য বাড়তি খাবার শুরু করা উচিত। কিন্তু কোনো শিশু যদি ছয় মাসের পরেও বুকের দুধের পাশাপাশি এই বাড়তি খাবার শুরু না করে, সেক্ষেত্রে তার আয়রনের ঘাটতি হতে পারে।
  • যেসব শিশু গরুর দুধ বেশি খায় তাদের আয়রনের ঘাটতি হতে পারে। কারণ গরুর দুধে আয়রনের পরিমাণ এমনিতেই কম থাকে তার উপর গরুর দুধে যতটুক আয়রন থাকে তার শতকরা মাত্র ১০ ভাগ শিশুর অন্ত্র থেকে শোষিত হয়। ফলে সহজেই শিশুর আয়রনের ঘাটতি হয়।
  • এছাড়া গরুর দুধ খেলে অনেক শিশুর অন্ত্রে এলার্জিজনিত ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। ফলে সেখান থেকে রক্তপাত হয়। এর ফলে শিশুর রক্তস্বল্পতা হতে পারে। এজন্য এক বছরের নিচের কোনো শিশুকে গরুর দুধ দেওয়া উচিত নয়।
  • কোনো শিশুর যদি ঘন ঘন পাতলা পায়খানা হয় অথবা দীর্ঘমেয়াদী পাতলা পায়খানা রোগ থাকে সেসব শিশুদেরও আয়রনের ঘাটতি হবার সম্ভাবনা থাকে।
  • এছাড়া শিশুর অন্ত্রে যদি কৃমির সংক্রমণ থাকে, সেই শিশু আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগতে পারে।
  • এছাড়া শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধি তুলনামূলক কিছুটা বেশি থাকে। এ সময় যদি কোনো শিশু আয়রন সমৃদ্ধ খাবার কম খায় তাহলে আয়রনের ঘাটতি হতে পারে।

রক্তস্বল্পতার উপসর্গ কী?

  • রক্তস্বল্পতার মূল উপসর্গ হলো শিশু ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া। এর পাশাপাশি শিশু দুর্বল ও অবসন্নবোধ করে, শিশুর কর্মচঞ্চলতা কমে যায়।
  • ঠোঁটের কোনে ঘা হতে পারে। খাবারে অরুচি থাকতে পারে।
  • আয়রনের ঘাটতি হলে শিশুর দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
  • আয়রনের ঘাটতি হলে শিশু লেখাপড়ায় অমনোযোগী হতে পারে।
  • শিশুর আচার-ব্যবহারেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। যেমন : শিশুর কাদামাটি, চক, দেয়াল থেকে কোনো ময়লা বা রং তুলে খাওয়ার প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। এই সমস্যাকে মেডিকেলের পরিভাষায় বলে পাইকা (Pica).

আয়রন সমৃদ্ধ খাবার কি কি আছে?

  • সকল ধরনের লাল মাংস; যেমন : গরুর মাংস, খাসির মাংস এবং কলিজায় প্রচুর আয়রন থাকে। এছাড়া, মুরগির মাংস, মুরগির কলিজায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন আছে।
  • সবুজ শাকসবজি যেমন : পালংশাক, পুঁইশাক, কচুরশাক, কাঁচা কলা, ব্রোকলি ইত্যাদিতে আয়রন আছে। এছাড়াও সিমের বিচি, মটরশুটি, আলু, টাটকা ফলমূল ইত্যাদিতে আয়রন আছে।

মনে রাখতে হবে যে বাচ্চাদের রক্তস্বল্পতার অন্যতম প্রধান কারণ আয়রনের ঘাটতি হলেও এটাই একমাত্র কারণ নয়। সুতরাং কোনো বাচ্চা যদি হঠাৎ ফ্যাকাশে মনে হয় তাহলে তাকে চিকিৎসকের সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া উচিত। চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে যে তার বাচ্চার এই রক্তস্বল্পতার কারণ কি এবং তার শরীরে আয়রনের ঘাটতি আছে কিনা। শিশুর রক্তস্বল্পতা যদি আয়রনের ঘাটতিজনিত কারণে হয়ে থাকে, সেখেত্রে চিকিৎসক শিশুকে নির্দিষ্ট মেয়াদে আয়রন জাতীয় ঔষধ সেবন করতে দিবেন।

[ লেখক : এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here