শিশুদের কিডনির ক্যান্সার ‘উইল্মস’ টিউমার বা ‘নেফ্রোব্লাস্টোমা’

0
47

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
‘উইল্মস’ টিউমার (Wilm tumor) বা ‘নেফ্রোব্লাস্টোমা’ শিশুদের অন্যতম একটি প্রধান ক্যান্সার রোগ। ‘উইল্মস’ টিউমার বংশগত কারণে যেমন হতে পারে, তেমনি অন্য কারণেও হতে পারে। শতকরা ১ ভাগ ক্ষেত্রে এটা বংশগত কারণে হয়ে থাকে। আমাদের শরীরে কিছু জিন আছে যা শরীরে কোনো টিউমার তৈরি হতে বাধা দান করে। যেমন: WT1, p53, FWT1, FWT2 ইত্যাদি।

এসব জিনের জেনেটিক মিউটেশন বা ত্রুটির কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে।
নেফ্রোন হলো কিডনীর একক। এরকম লক্ষ লক্ষ নেফ্রোনের সমন্বয়ে আমাদের কিডনী গঠিত হয়। সেই নেফ্রোন থেকে ‘উইল্মস’ টিউমারের উৎপত্তি হয় বলেই এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘নেফ্রোব্লাস্টোমা’। প্রাথমিক অবস্থায় টিউমারটি একটি আবরণী দ্বারা আবরিত থাকলেও পরবর্তীকালে বড়ো হবার সাথে সাথে আবরণী ভেদ করে আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, লসিকা-নালী ও রক্তের মাধ্যমে ফুসফুস, লিভার, হাড় এমনকি মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।


এই ক্যান্সার রোগটি মুলত শিশুদেরই হয়ে থাকে। যাদের এই ক্যান্সারটি হয় তাদের সাধারণত তিন বছর বয়সের মাঝেই রোগটি চিহ্নিত হয়। শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে ১০ বছর বয়সের পূর্বেই রোগটি ধরা পরে। শতকরা ৫-৭ ভাগ ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার উভয় কিডনিতেই হয়।

উপসর্গ:
প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগের কোনো লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যায় না। সর্বপ্রথম পেটের এক পাশে একটি চাকা হিসেবেই রোগটি প্রকাশ পায়। বেশিরভাগ সময় শিশুর পরিচর্যাকারী মা অথবা পরিবারের অন্য কোনো ব্যক্তি শিশুর পেটে অস্বাভাবিক ফোলা কোনো কিছুর বা চাকার উপস্থিতি লক্ষ্য করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আবার অনেক সময় শিশুটিকে যখন ছোটখাটো কোনো অসুস্থতা যেমন: জ্বর, সর্দি-কাশির চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়, তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় চিকিৎসক রোগটির উপস্থিতি বুঝতে পারেন। এর পাশাপাশি শিশুর জ্বর, পেট ব্যথা হতে পারে এবং প্রস্রাবের সাথে রক্তও যেতে পারে। শতকরা ৪০ থেকে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর উচ্চ রক্তচাপ পরিলক্ষিত হয়।

রোগ নির্ণয়:
আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার সাহায্যে কিডনীতে ‘উইল্মস’ টিউমারের উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়। টিউমারটির আকার-আকৃতি ও কিডনীর কোন অংশ থেকে এর উৎপত্তি হয়েছে তা নির্ণয় করা যায়। পেটের মধ্যে এই টিউমারের বিস্তৃতি বা পেটের অন্যান্য অংশে টিউমারটি ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তাও জানা যায়।

সিটি স্ক্যান পরীক্ষা: এটি একটি বিশেষ ধরনের এক্স-রে পরীক্ষা। এই পরীক্ষার সাহায্যে টিউমারটির আকৃতি ও বিস্তৃতি আরও সুক্ষভাবে নির্ণয় করা সম্ভব। চিকিৎসার আগে রোগের সঠিক স্তর-বিন্যাসের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ পরীক্ষা।
বায়োপ্সি: চিকিৎসা শুরুর আগে এই পরীক্ষাটি করা জরুরি। রোগীর দেহে একটি সুক্ষ সুচ প্রবেশ করিয়ে টিউমারটি থেকে টিস্যু সংগ্রহ করে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে সঠিক রোগ-নির্ণয় করা হয়।
এর পাশাপাশি বুকের এক্স-রে, মস্তিস্কের সিটি স্ক্যান, হাড়ের স্ক্যান ও যকৃতের কার্যকারিতা পরীক্ষা, ইত্যাদির সাহায্যে রোগটির স্তরবিন্যাস জানা সম্ভব হয় এবং সেই মোতাবেক চিকিৎসা শুরু করা হয়।

রোগের স্তর বিন্যাস:
প্রতিটি ক্যান্সারজাতীয় রোগ নির্ণয়ের পর ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য রোগটি শরীরে কতদূর বিস্তার লাভ করেছে তা জানা খবুই জরুরি। ‘উইল্মস’ টিউমারের বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে রোগের তীব্রতাকে নিম্ন বর্ণিত পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। স্তর যত উপরে হয়, আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা তত কম হয়।
▸ স্তর-১: এই স্তরে টিউমারটি শুধমাত্র আক্রান্ত কিডনীর মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ থাকে, অন্য কোথাও ছড়ায় না বলে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা খুব বেশি।
▸ স্তর-২: এই স্তরে টিউমারটি কিডনীর আশপাশে ছড়িয়ে পড়লেও শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে পুরোপুরি অপসারণ করা সম্ভব।
▸ স্তর-৩: এই স্তরে শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে টিউমারটি সম্পূর্ণ অপসারণ করা সম্ভব হয় না বলে শল্যচিকিৎসার পরও কিছু টিউমার রোগীর দেহে থেকে যায়।
▸ স্তর-৪: রক্তের মাধ্যমে টিউমারটি যখন শরীরের দূরবর্তী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে তখন রোগটি স্তর-৪ এ আছে বলে পরিগণিত হয়। এই স্তরে রোগটি ফসুফসু, যকৃৎ, হাড় অথবা মস্তিস্কে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
▸ স্তর-৫: এই স্তরে উভয় কিডনী এই টিউমার দ্বারা আক্রান্ত হয়।

চিকিৎসা:
অপারেশন (শল্যচিকিৎসা), রেডিওথেরাপী ও কেমোথেরাপীর সমন্বয়ে এ-রোগের চিকিৎসা করা হয়।
শল্যচিকিৎসা: যেসব রোগীর একটিমাত্র কিডনী আক্রান্ত হয়েছে এবং টিউমারটি পেটের মধ্যভাগে সীমিত আছে অর্থাৎ টিউমারটি পেটের আশপাশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করেনি (স্তরবিন্যাসের বিবেচনায় স্তর-১ কিংবা স্তর-২ এর মধ্যে আছে) এসব ক্ষেত্রে কিডনীসহ টিউমারটি শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে সম্পণূর্ণ অপসারণ করা যায়, এসব রোগীকে চিকিৎসা দ্বারা সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।
কেমোথেরাপী: ‘উইল্মস’ টিউমার রোগে কেমোথেরাপী খুবই কার্যকর। সাধারণত ভিনক্রিস্টিন, ড্যাকটিনোমাইসিন, ডক্সোরুবিসিন, সাইক্লোফসফামাইড, ইটোপোসাইড প্রভৃতি ঔষধ বিভিন মাত্রায় ব্যবহার করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপী: ‘উইল্মস’ টিউমার রেডিও-থেরাপীর প্রতিও খুব কার্যকর। রোগটি যদি উচ্চতর স্তরের (স্তর-৩ থেকে ৫) এ থাকে তবে রেডিওথেরাপী প্রয়োগের প্রয়োজন হয়।

চিকিৎসার ফলাফল:
আগেই বলা হয়েছে, রোগটি ১ থেকে ২ স্তরে থাকলে রোগী পূর্ণভাবে সুস্থও হয়ে যেতে পারে। উচ্চতর স্তরের রোগীদের ক্ষেত্রে যদি টিউমারটির ফলাফল অনুকূল হয় তবে শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর ৫ বছর এবং তার অধিক সময় বাঁচার সম্ভাবনা থাকে। তবে, টিউমারটি উচ্চতর স্তরে (স্তর-৩ থেকে ৫) এ থাকলে শল্যচিকিৎসাসহ বিভিন্ন ধরনের কেমো ও রেডিওথেরাপীর সমন্বিত চিকিৎসায় শতকরা ৬০-৯০ ভাগ রোগীকে ২ বছর পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি এবং উন্নততর কেমোথেরাপী-সংশ্লিষ্ট ঔষধের আবিষ্কার এই রোগ নিরাময়ে অদূর ভবিষ্যতে আরো বেশি কার্যকর ভুমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।


[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here