শিশুদের কিডনি রোগ একিউট গোমেরুলোনেফ্রাইটিস

0
166

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
একিউট গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস কিডনির একধরনের রোগ। এইরোগ যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শিশুদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি। শিশুদের যত রকম কিডনি রোগ হয়ে থাকে, তার মধ্যে একিউট গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস অন্যতম প্রধান।

একিউট গোমেরুলোনেফ্রাইটিস কী?
গ্লোমেরুলাস (Glomerulus)কিডনির ভিতরের একটি আণুবীক্ষণিক অংশ যা মূলত ছোট ছোট অসংখ্য রক্তনালী দ্বারা গঠিত। এই গ্লোমেরুলাস-এর মাধ্যমে কিডনি শরীরের রক্ত পরিশোধন করে। সুতরাং, এই গ্লোমেরুলাসকে ‘ছাঁকনি’-এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, গ্লোমেরুলাস বা এই ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলোর মধ্যে দিয়ে যখন রক্ত প্রবাহিত হয় তখন রক্তের অপ্রয়োজনীয় বা বর্জ্য অংশ আলাদা হয়ে যায় এবং তা প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে বের হয়। কোনো কারণে যখন এই গ্লোমেরুলাসে প্রদাহ হয় তখন তাকে বলে গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস।

গোমেরুলোনেফ্রাইটিস কেন হয়?
আমাদের শরীরে যখন কোনো জীবাণুর সংক্রমণ ঘটে তখন তার বিরুদ্ধে শরীর এন্টিবডি তৈরি করে। এই এন্টিবডির কাজ হলো সেই জীবাণুর এন্টিজেন এর সাথে যুক্ত হয়ে তাকে ধ্বংস করা। তবে কখনো কখনো এই
এন্টিজেন-এন্টিবডি কমপ্লেক্স কিডনির গ্লোমেরুলাস জমা হয়ে সেখানে প্রদাহের সৃষ্টি করে। ফলে এই গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস রোগটি তখন হয়।
কিছু বিশেষ জীবাণু সংক্রমণে এ রকম ঘটনা ঘটে থাকে। তাদের মধ্যে বিটা হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়া প্রধান। এ কারণে একে অনেক সময় ‘একিউট পোস্ট স্ট্রেপটোকক্কাল গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস’ বলা হয়ে থাকে।

সাধারণত বিটা হেমোলাইটিক স্ট্রেপটোকক্কাস নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা যদি গলায় সংক্রমণ হয় তার ১ থেকে ২ সপ্তাহ পরে অথবা যদি ত্বকে কোনো সংক্রমণ হয় তার ২ থেকে ৪ সপ্তাহ পর এই রোগটি হতে পারে। শিশুদের এই রোগটি বেশি হলেও সাধারণত ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হবার হার সবচেয়ে বেশি এবং মেয়ে শিশুর চাইতে ছেলে শিশুর এই রোগ হবার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।

এই রোগের উপসর্গ:
প্রাথমিক পর্যায়ে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চার পাশ এবং মুখমন্ডল ফুলে গেছে এরকম লক্ষ্য করা যায়।
প্রস্রাব লালচে হয় অথবা কোকা কোলার মতো কালচে রঙের হতে পারে।
প্রস্রাবের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
শতকরা ৬০ থেকে ৮০ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ লক্ষ্য করা যায়।

রোগ নির্ণয়:
উপসর্গ থেকে রোগটি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেলেও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

Urine R/E:
প্রস্রাবের এই পরীক্ষায় লোহিত রক্তকনিকা (RBC), শ্বেত রক্তকণিকা (& WBC) এবং প্রোটিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

ASO titer:
স্ট্রেপটোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে রক্তে Serum Creatinine এর মাত্রা বেড়ে যায় যা রোগ নির্ণয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।ASO titter এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে।

USG of KUB:
কিডনির সনোগ্রাফি পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনির বর্ধিত আকার এবং ফোলাভাব লক্ষ্য করা যায়।
ঝবৎঁস ঈ৩ এর পরিমাণ কমে যায়, কিন্তু Serum C4 এর মাত্রা স্বাভাবিক থাকে।
এছাড়াও প্রয়োজন অনুসারে CBC, ANA, HBsAg, Anti-HCV এই পরীক্ষাগুলো করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসা:
এই রোগের চিকিৎসা মূলত উপসর্গ ভিত্তিক। মৃদু উপসর্গের রোগীদের বাড়িতে বসেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ অনেক বেশি মাত্রায় থাকে, প্রস্রাব বেশ কমে যায় বা এই রোগের কোনো জটিলতা দেখা দেয় তাদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিতে হয়।

প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে সেক্ষেত্রে পানি কম পরিমাণে খেতে হয় এবং প্রস্রাবের মাত্রা বাড়ানোর জন্য ডায়রুটিক জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিডনির কার্যকারিতা যদি বেশি কমে যায় সেক্ষেত্রে প্রোটিন জাতীয় খাবার কম খেতে হয়।

রোগ নির্ণয় হবার পর সাধারণত ৭-১০ দিনের জন্য পেনিসিলিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক খেতে হয়।
উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য নিফিডিপিন, অ্যামলোডিপিন বা লোসারটেন জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা হয়।

রোগের জটিলতা:
উচ্চ রক্তচাপ মারাত্মক পর্যায়ে বৃদ্ধি পেলে রোগীর শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি হতে পারে এমন কি রোগী সংজ্ঞাহীন হতে পারে। এছাড়া এই রোগের জটিলতা হিসেবে কিডনির কার্যকারিতা সাময়িকভাবে বেশ কমে যেতে পারে।
এই রোগের জন্য ভবিষ্যতে কি কোনো সমস্যা হতে পারে?

এই রোগে আক্রান্ত শতকরা ৯৫ ভাগ রোগীই সম্মূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। তবে শতকরা ২ ভাগেরও কমসংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কিডনী রোগ হতে পারে।

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here