শিশুদের কিডনি রোগ : নেফ্রোটিক সিনড্রোম

0
937

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
কিডনি রোগ শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে বয়স ভেদে কিডনি রোগের ধরন ভিন্ন। একেক বয়সে একেক ধরনের কিডনি রোগের প্রাধান্য দেখা যায়। যেমন, বয়স্কদের মাঝে কিডনি রোগ হিসেবে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (Chronic kidney disease) বেশি পরিলক্ষিত হয়। পক্ষান্তরে শিশুদের মাঝে নেফ্রোটিক সিনড্রোম (Nephrotic syndrome), অবস্ট্রাকটিভ ইউরোপ্যাথি (Obstructive uropathy) ইত্যাদি কিডনি রোগ তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

আজ আপনাদের সামনে নেফ্রোটিক সিনড্রোম নিয়ে কিছু কথা বলবো। অনেক বছর আগে থেকে রোগটির অস্তিত্ব থাকলেও ১৯২৯ সালে হেনরি ক্রিস্টিয়ান নামে এক চিকিৎসক সর্বপ্রথম নেফ্রোটিক সিনড্রোম (Nephrotic syndrome) এই নামটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে প্রতি ১০ লক্ষ শিশুতে গড়ে ১৬ জন এই নেফ্রোটিক সিনড্রোমে ভুগছে। এই রোগ যে কোনো বয়সেই হতে পারে। তবে ২ থেকে ৬ বছর বয়সের শিশুরা এই রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। এই রোগে মেয়ে শিশুর তুলনায় ছেলে শিশুর আক্রান্ত হবার হার প্রায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি।

নেফ্রোটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত একটি শিশু ।

এই রোগটি কী এবং কীভাবে হয়?
আমরা জানি যে, কিডনি আমাদের শরীরে ছাঁকনির মতো কাজ করে। কিডনির মধ্য দিয়ে যখন রক্ত সঞ্চালিত হয় তখন তা আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো রেখে অপ্রয়োজনীয় উপাদান এবং বর্জ্যপদার্থ প্রস্রাব হিসেবে বের করে দেয়। কোনো শিশু যখন এই রোগে আক্রান্ত হয় তখন আমাদের শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রোটিন বা আমিষ বিশেষ করে অ্যালবুমিন (এক ধরনের প্রোটিন) কিডনি দিয়ে বের হয়ে যায়। এর ফলে রক্তে অ্যালবুমিনের ঘাটতি হয় এবং এই অ্যালবুমিনের ঘাটতি হলে রক্তনালীর ভিতরে রক্তের যে জলীয় অংশ থাকে তা আর রক্তনালী ধরে রাখতে পারে না। এর ফলে সেই জলীয় অংশ রক্তনালী থেকে বের হয়ে এসে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জমা হয়। ফলে শরীর ফুলে যায়। এই রোগে কিডনির স্বাভাবিক কাজ অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় উপাদান এবং বর্জ্য পদার্থ কিডনি দিয়ে বের করে দেওয়ার ক্ষমতা সাধারণত ঠিক থাকে। যা আমারা রক্তে ক্রিয়েটিনিন এর মাত্রা দেখে বুঝতে পারি। অর্থাৎ এই রোগে রক্তে “ক্রিয়েটিনিন” এর মাত্রা সাধারণত ঠিক থাকে। তবে অনেক সময় রোগের প্রকোপ এর উপর ভিত্তি করে কিডনির এই স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।

এই রোগের উপসর্গ কী?
এই রোগে আক্রান্ত হলে হঠাৎ করে শিশুর শরীর ফুলে যায়। প্রথমদিকে এই ফোলাটা চোখের চারপাশেই কেবল থাকে। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর তা বেশি ভালো বোঝা যায়। তারপর ধীরে ধীরে সমস্ত শরীর ফুলে যায়। ফোলার মাত্রা বৃদ্ধির সাথে পেটে ও বুকে পানিও জমতে পারে। শরীর ফুলে যাওয়ার সাথে প্রস্রাবের পরিমাণও কমে যায়।

রোগটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
কোনো শিশুর শরীর যদি হঠাৎ করে ফুলে যায়, তখন তার প্রস্রাব পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় যে তার প্রস্রাবের সাথে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন বের হয়ে যাচ্ছে, রক্ত পরীক্ষা করে যদি দেখা যায় যে তার রক্তে অ্যালবুমিনের মাত্রা কমে গেছে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে তখন নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই রোগটি নেফ্রোটিক সিনড্রোম। এ কারণে যদি কোনো শিশুর হঠাৎ করে এরকম শরীর ফুলে যায় তাহলে দেরী না করে তাকে নিয়ে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

এই রোগটি কেন হয়?
শতকরা ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রেই এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। বাকী শতকরা ৫ ভাগ ক্ষেত্রে অন্য কোনো রোগ এই নেফ্রোটিক সিনড্রোমের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন: হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাল ইনফেকশন, ম্যালেরিয়া, রক্তের ক্যান্সার ইত্যাদি। এছাড়াও জিনগত কিছু ত্রুটির কারণেও এই রোগ হতে পারে। তবে সেইক্ষেত্রে এই রোগটি তখন সাধারণত জন্মের প্রথম বছরেই প্রকাশ পায়।

চিকিৎসা:
প্রথমেই আসা যাক যে এই সময় রোগীর খাবার কি হবে। রোগীর জন্য এই সময় পানি পানের পরিমাণ হবে সীমিত। রোগী প্রতিদিন কতটুকু পানি পান করতে পারবে তা তার চিকিৎসক নির্ধারণ করে দিবেন। যেহেতু রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকে তাই চর্বি জাতীয় খাবার কম খেতে হবে। যদি রক্তে অ্যালবুমিনের মাত্রা খুব বেশি কমে যায়, তাহলে অ্যালবুমিন ইনজেকশন শরীরে দেওয়া যেতে পারে। তবে এই রোগের মূল চিকিৎসা হলো স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ, যেমন প্রেডনিসোলন (Prednisolone) সেবন করা। শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট সময় যাবৎ প্রেডনিসোলন সেবন করলে এই রোগ ভালো হয়ে যায়। বাকি ২০ ভাগ ক্ষেত্রে এই প্রেডনিসোলন এককভাবে খুব একটা ভালো কাজ করে না। সেক্ষেত্রে তখন অন্যান্য কিছু ঔষধ যেমন: সাইক্লোফসফামাইড (Cyclophosphamide), মাইকোফেনোলেট মোফেটিল (Mycophenolate Mofetil), ট্যাক্রোলিমাস (Tacrolimus) ইত্যাদি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়।

যাদের জীবনে একবার এই রোগটি হয়েছে, তাদের শতকর ৮০ জনের ক্ষেত্রে এই রোগটি বারবার হবার সম্ভাবনা থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে সাধারণত শরীরে কোনো ইনফেকশন, ঠাণ্ডা কাশি, হাপানি, এলার্জি ইত্যাদি হলে তখন এই রোগটি আবার দেখা দেয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে যাদের কম বয়সে এই রোগটি শুরু হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সের পর এই রোগটি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।
[লেখক : এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here