শিশুর মনোজাগতিক বিকাশ

0
132

মো. অলিউল ইসলাম

মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, শিশুরাই সবচেয়ে নির্মল, মানবিক ও সৃজনশীল। মানুষের দ্রুততম বিকাশ হয় শৈশবের শুরুতে, জন্মের পর থেকে আট বছর বয়স পর্যন্ত থাকে বিকাশের এই পর্ব। প্রথম ছয় মাসেই মানব মস্তিষ্কের অর্ধেক গঠিত হয় এবং আট বছরের মধ্যে তৈরি হয় ৯০ শতাংশ। শিশুর বুদ্ধিবৃত্তি, আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ ও শারীরিক সম্ভাবনা বিকাশের জন্য এই সময়ের সঠিক ব্যবহার অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর মানসিক বিকাশ হলো- আচার-ব্যবহার, চিন্তা-চেতনা, কথা বলা, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন। শিশুর সহজাত প্রবৃত্তি হলো- শেখার আগ্রহ, দেখার আগ্রহ, স্পর্শ করার আগ্রহ ও চিন্তন কাঠামো তৈরি, নিরাপত্তা ও সাহায্যদানকারী সাহচর্য কামনা এবং কৌতূহলী থাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সি শিশুদের মধ্যে স্থান-কালের ব্যবধানে গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যগত কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। শিশুর পরিবেশগত আচরণ ও পারিপার্শ্বিক উপাদানগুলোর পার্থক্যই শিশুতে শিশুতে ব্যবধান তৈরি করে।

অনেকের ধারণা, শিশুর অপরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের প্রধান কারণ হলো অভিভাবকের আচরণ। অভিভাবক নিজেদের অপূর্ণ আকাক্সক্ষাগুলোর রূপায়ণ দেখতে চায় শিশুর মধ্যে। ফলে শিশুর মেধা ও মননের বিকাশ দেখা যায় না। কল্পনাশক্তি কমে যায়। লেখাপড়া যেখানে তার মননের বিকাশে ভূমিকা রাখবে তা তার জন্য হয়ে ওঠে ভীতিকর। কেবল পুঁথিগত বিদ্যা মুখস্থ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

পারিবারিক কলহের জন্য শিশুর স্বাভাবিক জীবন অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব শিশু মা-বাবার মনোমালিন্য দেখে বড় হয় তাদের মধ্যে হতাশা, অসামাজিক ও সহিংস আচরণ পরিলক্ষিত হয়। তাদের মধ্যে মনঃসংযোগের ঘাটতি দেখা যায়। মানসিক সমস্যা ও ব্যক্তিত্বের বিকাশ অস্বাভাবিক হয়। শিশুকে অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করলে তার আবেগের জায়গায় আঘাত লাগে। শিশুদের মধ্যে যে কোনো প্রকার মানসিক আঘাতের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করে। ভবিষ্যতে আবেগজনিত সমস্যায় ভোগে। পরিবারে মাকে নির্যাতিত হতে দেখলে শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। পিতামাতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ ও মধুর সম্পর্ক শিশুর মধ্যে পরম সুখ ও নিরাপত্তা বোধ জাগায়।

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের ওপর নির্যাতন বা প্রসূতি মা যদি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন তবে সন্তানের মধ্যেও জন্মের পর নানা জটিলতা দেখা যায়। গর্ভধারণকালে মায়ের অপুষ্টির কারণে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশ ব্যাহত হয়। জার্নাল অব পিডিয়াট্রিক্সের এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রসূতি অবস্থায় কোনো মহিলা দূষণের শিকার হলে শিশুর মানসিক বিকাশ তুলনামূলকভাবে কম হয়। শিশুমনের বিকাশ ঘটে পরিবেশের উপাদানের মধ্যে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে। উপাদানবিহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠা অস্বাভাবিক হয়। সামাজিক আচরণগুলো রপ্ত করা ও মতামত দেওয়া-নেওয়ার দক্ষতা অর্জনের জন্য সমবয়সিদের সঙ্গে খেলাধুলার সুযোগ দরকার। শহরে উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে অনেক শিশুই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে মুক্ত পরিবেশের আলো-বাতাসের সংস্পর্শ থেকেও তাদের দূরে থাকতে হয়। ফলে শিশুরা বিষন্নতা ও নিঃসঙ্গতায় ভোগে এবং দৈহিক ভার বিঘ্নিত হয়।

শিশুর সঠিক বিকাশে সুস্থ ও শিশুবান্ধব, কৌতূহল উদ্দীপক বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু চার দেওয়ালে আটকে না রেখে অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ করে দিতে হবে। খেলনা নির্বাচনে খেয়াল রাখতে হবে যাতে তা সৃজনশীল হতে সহযোগী হয়। শিশুর স্বাধীনতার চাহিদা, নিরাপত্তার চাহিদা প্রভৃতি যেন বাসগৃহ ও বিদ্যালয়ে পূরণের সুযোগ থাকে। শিশুর কল্পনাশক্তি তুখোড়। তাই তাদেরকে সৃজনশীল চিন্তাভাবনায় মশগুল করতে পারলে বিকাশ দ্রুত হবে। শিশুকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও নেতিবাচক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। ভালো কাজের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তার প্রশংসা করা জরুরি। এতে সে ভালো কাজ করতে উৎসাহী হবে।

ছেলে ও মেয়েশিশুর মধ্যে পার্থক্য করা যাবে না। এর ফলে শিশু মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিশুকে নিজের মতো করে জাজ করতে দিতে হবে। এতে শিশু স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা জন্মাবে। কোনো ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে রাগারাগি না করে বা শাস্তি না দিয়ে তাকে অল্টারনেটিভ উপায়ে বুঝিয়ে বলতে হবে। ভালো-মন্দ দুটো দিকই তার সামনে তুলে ধরতে হবে। বাচ্চারা ক্রমাগত নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং পরিবর্তনশীল আচরণ প্রকাশ করে। তাই, অভিভাবককে সন্তানের গতিবিধি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে সাহায্য করলে শিশুর বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ শিশুই নির্মল পৃথিবী গড়ে তুলতে পারবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here