শিশুর হাম: কারণ, লক্ষণ ও আপনার করণীয়

0
420

ডা. মো. তারেক ইমতিয়াজ (জয়)
হাম কী?
হাম বা মিজেলস (Measles) ভাইরাস দ্বারা সংঘটিত একটি সংক্রামক ব্যাধি। মিজেলস ভাইরাসের (Measles virus) সংক্রমণের কারণে এই রোগটি হয়ে থাকে। রোগটি যে কোনো বয়সেই হতে পারে তবে এটি সাধারণত পাঁচ বছরের কম বয়সের শিশুদের সবচেয়ে বেশি হয়। মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে মায়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত এন্টিবডির প্রভাবে সাধারণত ৯ মাসের নিচের শিশুদের এই রোগটি হয় না বললেই চলে। আমাদের দেশে এপ্রিল মাসের দিকে এ রোগের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়।

রোগটি কীভাবে ছড়ায়?
এই রোগটি সাধারণত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই রোগের জীবাণু শ্বাসের মাধ্যমে আমাদের নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। শরীরে র্যাস বা ফুসকুড়ি আসার ৫ দিন পূর্ব থেকে শুরু করে ৫ দিন পর পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে এই রোগের জীবাণু অন্য মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে।

উপসর্গ:
শরীরে জীবাণু প্রবেশ করার সাধারণত ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে এ রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। হালকা জ্বর দিয়ে উপসর্গ শুরু হয়। সাথে শুকনা কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়। আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয়। ধীরে ধীরে জ্বর বাড়তে থাকে এবং তা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। ন্যূনতম ৩ দিন জ্বর থাকার পরে শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। র্যাস প্রথমে কানের পিছনে এবং চুলের রেখা বরাবর কপালে দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শরীর কিছুটা চুলকাতে পারে। র্যাস ওঠার এক থেকে দুই দিন আগে মুখের ভেতর গালের ভিতরের অংশ সাদা বা কিছুটা ধূসর রঙের দানা দানা ফুসকুড়ি দেখা যায় একে বলা হয় কপ্লিক স্পট (Koplik spots) । শরীরে র্যাস উঠার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে এই কপ্লিক স্পট মিশে যায়। শিশুদের অনেক রোগেই এ রকম জ্বরসহ র্যাস হতে পারে। যদিও অনেকেই জ্বরসহ র্যাস হলে তাকে হাম বলে। মনে রাখতে হবে যে জ্বর এবং র্যাস থাকলেই তা হাম হবে, বিষয়টি তা নয়। র্যাস ওঠার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে জ্বরসহ অন্যান্য উপসর্গ কমতে থাকে। যদি কখনও দেখা যায় যে র্যাস ওঠার তৃতীয় বা চতুর্থ দিন পরেও জ্বর থাকছে, সেইক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে শিশুর হামসংক্রান্ত কোনো জটিলতা দেখা দিয়েছে।

জটিলতা:
হামের জটিলতার ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, এই জটিলতায় শিশু মারাও যেতে পারে। শতকরা ৩০ ভাগ হামে আক্রান্ত রোগীদের কোনো না কোনো জটিলতা দেখা দেয়। উন্নয়নশীল দেশে হামের জটিলতায় মারা যাবার হার শতকরা ৪-৬ ভাগ। তাই কোনো জটিলতার উপসর্গ পরিলক্ষিত হলে দেরি না করে শিশুকে নিকটস্থ হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

হাম থেকে শিশুর নিম্নলিখিত জটিলতা হতে পারে যেমন: নিউমোনিয়া, মধ্য কর্ণের ইনফেকশন, ক্রুপ (Croup), পাতলা পায়খানা, ফেব্রাইল কনভালশন বা জ্বরসহ খিঁচুনি, চোখের কর্নিয়ায় ক্ষত হয়ে অন্ধত্ব, এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ ইত্যাদি।

কাদের এই জটিলতা হওয়ার ঝুঁকি বেশি:
কোন অসুখের কারণে বা দীর্ঘ মেয়াদি কোন বিশেষ ঔষধ সেবনের কারণে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে, গর্ভবতী মহিলা, যে সব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, যাদের শরীরে ভিটামিন এ ঘাটতি রয়েছে তাদের এই জটিলতা হবার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

চিকিৎসা:
হাম একটি ভাইরাস দ্বারা সংগঠিত রোগ হলেও এই অসুখের জন্য নির্দিষ্ট কোনো কার্যকর অ্যান্টি ভাইরাল ঔষধ নেই। এ রোগের চিকিৎসা রোগের উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়।

হামে আক্রান্ত রোগীকে প্রচুর পানি পান করতে দিন, পুষ্টিকর খাবার খেতে দিন এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করুন। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল জাতীয় ঔষধ দেওয়া যেতে পারে।

হামে আক্রান্ত শিশুকে পরপর দুই দিন নির্দিষ্ট বয়স অনুপাতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হয়। যাদের ‘ভিটামিন এ’ এর অভাবজনিত কারণে চোখে কোনো জটিলতার চিহ্ন দেখা দেয় তাদেরকে দ্বিতীয় ডোজের ১৪ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ‘ভিটামিন এ’ এর তৃতীয় আরেকটি ডোজ খাওয়াতে হয়। সুতরাং হামে আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এই ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়াতে ভুলবেন না।

প্রতিরোধ:
শিশুকে যথাসময়ে এম আর টিকা (MR vaccine) দিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ৯ মাসের পর এম আর টিকার প্রথম ডোজ দিতে হয় এবং ১৫ মাসের পর এই এম আর টিকার দ্বিতীয় ডোজ দিতে হয়। সুতরাং সময়মতো আপনার শিশুকে টিকা দিন।

বর্তমানে এই করোনাকালীন সময়ে অনেকেই তার শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছেন। পরিস্থিতি দেখে আপাতত বোঝা যাচ্ছে যে এই করোনা আরো অনেক দিন আমাদের মাঝে থাকবে। এই করোনাকে সাথে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সুতরাং সুরক্ষা নিয়ম মেনে আপনার শিশুকে টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে যথাসময়ে টিকা দিন।

বর্তমানে এই করোনাকালীন সময়ে করোনা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে যে রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, হামে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে সেই একই রকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাড়িতে কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে তাকে অন্যান্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখুন। হামে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। রোগীকে সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিদের মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরিধান করে রোগীর কাছে যাওয়া উচিৎ। সকল শিশু হামসহ সকল রোগ থেকে মুক্ত থাকুক এই কামনা করি।

[লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য); শিশু নেফ্রোলজি বিভাগ; ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, ঢাকা।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here