শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব ১৩) : পারিবারিক পরিবেশের গুরুত্ব

0
235

নারী ও শিশু ডেস্ক: শিশুর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক বৃদ্ধি হলো শারীরিক বিকাশ। আর মানসিক বিকাশ হলো আচার-ব্যবহার, চিন্তা-চেতনা, কথোপকথন, অনুভূতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষমতা অর্জন। প্রতিটি শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক ও মানসিক-এই উভয় ক্ষেত্রে বিকাশ ঘটলেই কেবল সেটাকে পরিপূর্ণ বিকাশ বলা যেতে পারে।

শুধু বাবা-মা নয়, অন্য স্বজনরাও শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে ভূমিকা রাখে। প্রতিটি শিশুই রক্তের সম্পর্কের দিক থেকে একটি পরিবার ও বংশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পবিত্র কুরআনে সূরা ফুরকানের ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনিই পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি তাকে বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্কযুক্ত করেছেন।” শিশু তার পরিবারে বড়ো হবে,এটা তার অধিকার। শিশুর পরিপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পরিবারের সদস্যদের সান্নিধ্য ও সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে। তবে এ ক্ষেত্রে মা-বাবার বিকল্প নেই বললেই চলে। কারণ মা-বাবা সন্তানের সঙ্গে অনেকটা সময় কাটান, তাদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, সব সময় তাদের মঙ্গল চান এবং অন্যদের চেয়ে ভালোভাবে তাদের বুঝতে পারেন।

প্রতিটি মা-বাবারই দায়িত্ব হচ্ছে শিশুর সঠিক বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। সন্তানের সার্বিক ভালো-মন্দ চিন্তা না করে তাকে লক্ষ্যহীন পথে ছেড়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামে বলা হয়েছে, কোনো বাবার অধিকার নেই তার সন্তানের দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করার। মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (স.) বলেছেন, নিজের সন্তান জানার পর যদি কোনো বাবা তার সন্তানকে অস্বীকার করে তাহলে সে আল্লাহ্র দয়া থেকে বঞ্চিত হবে এবং কিয়ামতে সব সৃষ্টির সামনে সে অপমানিত হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, পরিবারের সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া শিশুর সন্তোষজনক বিকাশ ও অগ্রগতি সম্ভব নয়। পারিবারিক নিয়ম, শৃঙ্খলা, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহানুভূতি এবং অনুপ্রেরণার মাধ্যমেই একজন শিশু সমাজে প্রত্যাশিত আচরণ করতে শেখে। পরিবারই সামাজিক সংস্কৃতি, আচার ও নিয়ম-নীতি শিশুর কাছে পরিচিত করে তোলে। 

প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্রেরই নিজস্ব জীবনযাপন প্রণালী, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধসহ নানা গ্রহণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় সম্পর্কে শিশুরা পরিবার থেকেই ধারণা পায়। নৈতিকতা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি শেখানোর ক্ষেত্রে পরিবারই মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ প্রতিটি শিশুর স্কুল জীবন শুরুর আগের পুরো শিক্ষাটা আসে পরিবার থেকে। সেই শিক্ষাই তার জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সুরক্ষা সনদে শিশুদের যেসব অধিকারকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিশুদের জন্মসূত্রে নাম ও জাতীয়তার অধিকার এবং বড়োদের থেকে ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার। পরিবারের পক্ষ থেকে এসব অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবারের সদস্যরা শিশুদের অধিকারগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে তা সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও সহজেই বাস্তবায়িত হবে।

পরিবারে ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধের চর্চা থাকলে ছেলেমেয়েদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ সেভাবেই হয়, আবার যেসব পরিবারে ধর্মীয় মূল্যবোধ দৃঢ় নয় বা ধর্মীয় অনুভূতি অনুপস্থিত, সেখানে ছেলেমেয়েরা সম্পূর্ণ ভিন্ন মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠে। পরিবার থেকেই শিশু সব ধরনের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে প্রথম অবগত হয়। শিশুর মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি কেমন হবে, অন্যের প্রতি সে কী ধরনের মনোভাব পোষণ করবে এবং নানা ক্ষেত্রে তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে- এসব বিষয়েই শিশু পারিবারিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে থাকে। পরিবারে বাবা ও মায়ের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে শিশুরা নারী ও পুরুষের ভূমিকা এবং নিজের লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে অবগত হয়। জন্মের পর একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক পারিবারিক পরিবেশ পাওয়াটা শিশুর অধিকার। কারণ পরিবারে অস্বাভাবিক ও অস্বস্তিকর পরিবেশ থাকলে তা শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন বা মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শিশুদেরকে ভালো কোনো কাজ করানোর জন্যও যদি ভয় দেখানো হয় তাহলে তা তাদের মনে গেঁথে যায়। এর ফলে ওই শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং আত্মবিশ্বাস কমে যায়। আবার পারিবারিক কলহের চাপে অনেক শিশুর স্বাভাবিক জীবনই অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। যেসব শিশু মা-বাবার মনোমালিন্য দেখতে দেখতে বড়ো হয়, তারা হতাশ, অসামাজিক ও সহিংস হয়ে ওঠে। নানা অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে। তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। ফলে মনঃসংযোগের ঘাটতিও দেখা দেয়। মানসিক রোগ ও ব্যক্তিত্বের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। পারিবারিক নির্যাতন দেখে বেড়ে ওঠা শিশুরা এমন ধারণা নিয়ে বড়ো হয় যে, অন্যকে আঘাত করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। সে যে কাউকে আঘাত করতে পারে। আবার সেও অন্যের কাছ থেকে আঘাত পেতে পারে। তাই বয়ঃসন্ধিকাল থেকেই তাদের নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এছাড়া গর্ভকালে যেসব মা নির্যাতনের শিকার হন অথবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকেন, তাদের সন্তানও জন্মের পর নানা জটিলতায় ভোগে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃগর্ভে থাকার সময় যাদের মা মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছিলেন, সেই শিশুরা সহজেই মানসিক চাপে ভেঙে পড়ে এবং নানা মানসিক জটিলতায় ভোগে।

অন্যদিকে শিশুর মা-বাবার বন্ধুত্বপূর্ণ ও মধুর সম্পর্ক শিশুর মধ্যে পরম সুখ ও নিরাপত্তাবোধ জাগায়। বাবা ও মায়ের মধ্যে ভালোবাসা ও শৃঙ্খলাবোধের সম্মিলন ঘটলে পরিবারে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পারিবারিক শিক্ষা শিশুকে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলায় সাহায্য করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here