শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব ১৪) : শিশুরও রয়েছে মত প্রকাশের অধিকার

0
208

নারী ও শিশু ডেস্ক: অনেকেই শিশুকে শেখানোর সঠিক পদ্ধতি জানেন না।  অনেক মা-বাবা শিশুদের মতামত একেবারেই গুরুত্ব দিতে চান না। অনেক মা-বাবা এই বাস্তবতাই উপলব্ধি করতে পারেন না যে, তাদের ছোটবেলায় যে সামাজিক পরিবেশ ছিল,তা অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে। ফলে, মা-বাবাকে বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সন্তানের মনস্তত্ত্বকে বুঝতে হবে। তাদেরকে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়ার পাশাপাশি তারা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে- সেই বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে হবে। মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক থাকবে, যেখানে মা-বাবা ও সন্তান-উভয়েই উভয়ের মতামতকে গুরুত্ব দেবে এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

শিশুরা অনুসন্ধিৎসু। তাদের পিপাসু মন নতুন কিছু শুনলেই তা উচ্চারণ করতে চেষ্টা করে এবং নতুন কিছু দেখলেই তা নিয়ে প্রশ্ন করে। এ সময় সঠিক তথ্য তুলে ধরা না হলে শিশু বিভ্রান্তিতে পড়তে পারে। শিশু যখন কিছু শেখে তখন জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই সে বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করার চেষ্টা করে। নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে থাকে। শিশুর এ ধরনের কথা ও মনোভাবকে মূল্যায়ন করতে হবে। তাহলেই শিশু বিকশিত হবে সাবলীলভাবে। মতামত প্রকাশে স্বাধীনতা পেলে শিশু হয়ে ওঠে সৃজনশীল। স্বাধীন মত প্রকাশের মাধ্যমে শিশু স্বাধীনভাবে কিছু করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তার এ আগ্রহ থেকে সৃষ্টি হয় নতুনত্বের। 

শিশুদের মতামত প্রকাশের মূল্য দেওয়া প্রতিটি সচেতন মা-বাবা’র কর্তব্য। শিক্ষার পাশাপাশি তার ভালোলাগা  ও মন্দলাগা বিষয়ে মা-বাবা সজাগ থাকলে শিশুর কাছে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আশা করা যায়। তাই শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে মানসিকতা বিকাশে খেলাধুলা, বিভিন্ন সামজিক ও পারিবারিক উৎসব ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ ১২-এ বলা হয়েছে, ‘যে সমস্ত বিষয় শিশুর জীবনকে প্রভাবিত করে সেসকল বিষয়ে নিজস্ব মতামত গঠনে সক্ষম একটি শিশুর স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে এবং শরিক রাষ্ট্রগুলো তা নিশ্চিত করবে। শিশুর বয়স এবং চিন্তাশক্তির পরিপক্বতা বিবেচনা করে তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।’

মতামত প্রকাশের সুযোগ পেলে শিশু আত্মবিশ্বাসী হয়। এর ফলে সে আত্মনির্ভরশীল হিসেবে গড়ে উঠে। শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা হলে ভবিষ্যৎ জীবনে সে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। নিজেকে প্রকাশ করতে পারে। নিজে যেকোনো কাজ করতে পারে। একজন শিশু যেন তার আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মানানসইভাবে চলতে পারে, তার মধ্যে সেই যোগ্যতা তৈরি করে দেওয়াই হলো তাকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলা। অনেক সময় শিশুরা তাদের ইচ্ছার কথা বড়দের কাছে প্রকাশ করলেও সেই ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেওয়া হয় না। এর ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশু তখন আর নিজে থেকে কিছু ভাবে না, যেকোনো সিদ্ধান্তের জন্য সে বড়দের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। এটি শিশুর আত্মনির্ভরশীলতা এবং তার ব্যক্তিত্বের গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ক্ষতিকর।

যেকোনো কাজের ভালো ও খারাপ দিকগুলো শিশুদের সামনে তুলে ধরে তাদেরই বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া উচিত। শিশুদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার প্রথম শর্ত হলো তাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের প্রশ্নগুলোর গঠনমূলক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একটি শিশু যখন নিজের আগ্রহ থেকে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন করে জানতে চায়, সেই বিষয়টি তার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হয়ে যায়। তবে শিশু যদি এমন কোনো কাজ করতে চায় বা এমন মত প্রকাশ করে, যা তার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তবে মা-বাবা বা সংশ্লিষ্ট বড়দের দায়িত্ব হবে তাকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া। রাষ্ট্র ও সরকারের উচিত আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং শিশুদের জীবনের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলো পরিকল্পনা করার সময় তাদের মতামত শোনা। কোনো মতামত যদি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ অথবা অন্য কোনো কারণে গ্রহণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সেটা শিশুকে বুঝিয়ে বলা উচিত।

শিক্ষা ও খেলাধুলাসহ স্বাভাবিক জীবনযাপনে শিশুর কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা তা জেনে নেওয়া মা-বাবা তথা অভিভাবকদেরই দায়িত্ব। শিশুর অধিকার রয়েছে তার সমস্যা ও সুযোগ-সুবিধা তুলে ধরে সে ব্যাপারে সমাধান পাওয়ার। শিশুকে ভালোভাবে বড় করার একটি সঠিক উপায় হলো, সন্তানের কথা শোনা ও  মানার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুসারে সন্তানের কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণও করা। সন্তানের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য এ ধরনের মা-বাবা’র আচরণ হলো সবচেয়ে উপযোগী।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here