শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব-১৬): শিশুকে কতটুকু শাস্তি দেওয়া যাবে?

0
153

শিশু ডেস্ক: আজ যারা প্রাপ্তবয়স্ক, এক সময় তারাও শিশু ছিলেন। প্রতিটি মানুষই শিশুকাল পেরিয়ে এসেছে। কাজেই আজকের অভিভাবক বা বাবা-মায়েরা শিশুদের সমস্যা ও সংকট সম্পর্কে কম-বেশি অবহিত। এরপরও বেশিরভাগ অভিভাবকের মাঝেই একটি বিষয়ে এখনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাজ করে আর তাহলো, শিশুদের শাস্তি দেওয়া উচিত কিনা।

কারণ শিশুরা কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। কোনোভাবেই থামানো যায় না। এ অবস্থায় কী করা উচিত?
সন্তান লালন-পালনে পুরস্কার ও শাস্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু পুরস্কার বা শাস্তির ধরণ কেমন হবে তা নিয়েই রয়েছে বিতর্ক। শিশুদের শাস্তির কথা উঠলেই প্রথমেই যে শাস্তির কথা মনে পড়ে তাহলো শারীরিক শাস্তি। তবে বেশিরভাগ মনোবিজ্ঞানীই শিশুকে শারীরিক শাস্তি দেওয়ার বিপক্ষে। তাদের মতে, এ ধরনের শাস্তি সাময়িক সমাধান হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে যায়।

অনেকেই শিশু লালন-পালনের ক্ষেত্রে একেবারে মুক্ত ও স্বাধীন রাখার কথা বলেছেন। ফরাসি দার্শনিক জ্যাঁ জ্যাক রুশো মনে করতেন মুক্ত পরিবেশেই কেবল শিশুর সহজাত ও সুপ্ত গুণাবলির বিকাশ সম্ভবপর। তার এ সংক্রান্ত একটি বইয়ের নাম হচ্ছে-এমিল। তিনি তার এই বইয়ে লিখেছেন, শিশুকে যদি কঠিন শাস্তি দেওয়া হয় তাহলে তার মনে ভয়-ভীতি জন্ম নেয় এবং তার ব্যক্তিত্ব গঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর ফলে তার মধ্যে ক্রোধ জন্ম নেয় ও সে মনোকষ্টে ভোগে।

শুধু মনোবিজ্ঞানী বা দার্শনিকরাই নন, যারা শিশুদের নিয়ে কাজ করেন তারাও মনে করেন, শিশুদের জন্য শারীরিক শাস্তি, শিশুর উপকার না করে বরং ক্ষতি করে। তাদের মতে, নিরুপায় না হলে শারীরিক শাস্তির পথ বেছে নেওয়া ঠিক নয়। তাদের মতে, ভিন্ন কোনো উপায় না থাকলে কেবল সে ক্ষেত্রেই খুবই স্বল্প মাত্রায় শারীরিক শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। ইসলামি নির্দেশনাতেও শিশুকে মারধর করতে নিষেধ করা হয়েছে। একবার এক ব্যক্তি হযরত ইমাম কাজেম (রহ.)-এর কাছে গেলেন এবং তার কাছে নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। সব শুনে ইমাম কাজেম (রহ.) বললেন, তোমার সন্তানকে মেরো না। তাকে ঠিক করার জন্য তার সঙ্গে একটু রাগ করতে পারো। তবে খেয়াল রেখো তোমার রাগ যাতে দীর্ঘ মেয়াদের না হয়। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব আবার তার সঙ্গে মিল হয়ে যেও।

এ ক্ষেত্রে আরো একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। হযরত রাসুল (সা.)-এর সাহাবি আনাস বিন মালেক তার শৈশব কাটিয়েছেন রাসুলে খোদার সান্নিধ্যে। তিনি বলেছেন, আমি অনেক বছর রাসুলের সেবায় নিযুক্ত ছিলাম। কিন্তু আল্লাহ্র রাসুল কখনোই আমাকে গালি দেন নি বা মারধর করেন নি। উম্মে সালমার উদাহরণও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তিনি রাসুলের বাড়িতে কাজ করতেন। হযরত রাসুল (সা.) একবার একটি কাজের নির্দেশ দেওয়ার পর উম্মে সালমা তা পালন করতে দেরি করেছিলেন। এর জবাবে রাসুল (সা.) বলেছেন, যদি কিসাসকে ভয় না পেতাম তাহলে কাঠের মেসওয়াক দিয়ে তোমাকে শাস্তি দিতাম। এখানে কিসাস বলতে সম্ভবত বিচার দিবসের কিসাসকে বোঝানো হয়েছে।

কোনো কোনো চিন্তাবিদ শারীরিক শাস্তিকে অনুমতি দিলেও সেটার মাত্রা খুবই কম। তাদের মতে, শারীরিক নির্যাতন এমন পর্যায়ে যাওয়া যাবে না যে, তাতে চামড়া লাল হয়ে যায়। শিশু অধিকার সনদের ১৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সব দেশের আইনকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিশুর ওপর কোনো ধরনের হিংস্রতা দেখানোর সুযোগ না থাকে। পরিবার ও স্কুলের পাশাপাশি কোনো প্রতিষ্ঠানেও শারীরিক শাস্তির ব্যবস্থা রাখা যাবে না। কারণ এ ধরনের আচরণ শিশু অধিকার সনদের বিরোধী।

চার বছর বয়স থেকে শিশুদের মধ্যে পরম করুণাময় আল্লাহ্র অস্তিত্ব এবং বিশ্ব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়। বিভিন্ন হাদিসেও এ সংক্রান্ত বক্তব্য এসেছে। ইমাম জাফর সাদেক (রহ.) বলেছেন, শিশুর বয়স যখন ৩ বছর তখনি তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ শেখান। এটুকুই যথেষ্ট। এর সাত মাস পর তাকে মোহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ শেখান। এরপর যখন তার বয়স চার বছর পূর্ণ হবে তখন তাকে সালাওয়াত পড়া শেখান। বয়স পাঁচ বছর হলে শিশুকে ডান ও বাম দিক সম্পর্কে জ্ঞান দিন এবং কেবলামুখী হয়ে সেজদা করতে বলুন। এরপর থেকে তার সামনে নামাজ পড়ুন এবং রুকু-সেজদা শেখান। এভাবে সাত বছর শেষ হলে তাকে ওজুর নিয়ম শেখান এবং তাকে নামাজ পড়তে বলুন। নয় বছর হওয়ার পর তাকে ভালো মতো ওজু ও নামাজ শেখান। এভাবে শিশুকে ওজু ও নামাজ শেখানোর পর বাবা-মা আল্লাহ্র কাছে পুরস্কার পাবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here