শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব-১)

0
247
ছবি- প্রতীকী

নারী ও শিশু ডেস্ক: শিশুরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ। বড়োদের নানা সমস্যা ও সংকটের প্রভাব সরাসরি শিশুদের ওপর পড়ে। এসব সমস্যা মেনে নেওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো পথ থাকে না। তবে সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই শিশুর জন্ম আনন্দদায়ক ঘটনা। নানা সমাজে শিশুকে নানাভাবে স্বাগত জানানো হয়। শিশুর জন্মের পর মুসলমানরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান আকিকা পালন করে। সদ্যপ্রসূত শিশুর মঙ্গলের জন্য গরু বা ছাগল জবাই করার রেওয়াজও রয়েছে। হিন্দুদের মধ্যে সামাজিক প্রথা অন্নপ্রাশন পালন করা হয়। এর বাইরেও নানা উপায়ে শিশুর জন্মকে উদ্যাপন করা হয়। তবে একজন মানবসন্তান ঠিক কখন থেকে শিশু হিসেবে গণ্য হবে এবং কোন বয়স পর্যন্ত শিশুর মর্যাদা পাবে তা নিয়ে মতভিন্নতা রয়েছে।

জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের এক নম্বর অনুচ্ছেদে ১৮ বছরের নিচে সব মানবসন্তানকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে যেকোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইনকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো দেশের আইনে আরও কম বয়সকে শিশু বয়সের শেষ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তাহলে সেটাকেও মেনে নেয় জাতিসংঘ।

অনেকেই মনে করেন, শিশুর বয়স সীমার শুরুটা হয় জম্মের পর থেকে। মাতৃগর্ভে থাকা সন্তান শিশু হিসেবে গণ্য হবে না। আবার কারো কারো মতে, মাতৃগর্ভে জাইগোট গঠিত হওয়ার পর থেকেই সেটাকে শিশু হিসেবে গণ্য করা উচিত। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ পাসের সময়ও এ ইস্যুতে বিতর্ক হয়েছিল। তখন আয়ারল্যান্ড, ভ্যাটিকান ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই শিশুর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে বিরোধিতা থাকায় তা নিয়ে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসে নি। এ কারণে শিশু বয়সের শুরুর বিষয়টি সনদে আসেনি। যাইহোক এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনই শেষ কথা বলবে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের চিন্তা-ভাবনা, মন-মানসিকতা ও স্বভাব-চরিত্রের প্রভাব মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর ওপরও পড়ে। এ কারণে গর্ভবতী মায়ের জন্য নেক চিন্তা করা, ইবাদত-বন্দেগী করা, সুন্দর দৃশ্য ও সবুজ মনোরম পরিবেশ দেখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ভালো পরিবেশে বসবাস করা, সমস্ত খারাপ ধ্যান-ধারণা, খারাপ পরিবেশ থেকে নিজেকে বিরত রাখা মায়ের জন্য খুবই জরুরি। জন্মের পরও মা-বাবার স্বভাব-চরিত্র শিশুর ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার ওপর অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য চলে আসে, যা একজন মুসলিম শিশুর ন্যায্য অধিকারও বটে। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ডান কানে আজানের শব্দগুলো এবং বাম কানে একামতের শব্দগুলো শুনানোকে ইসলাম ধর্মে সুন্নত হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্মে শিশু অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাহেলি যুগে শিশু হত্যা বিশেষ করে কন্যাসন্তান হত্যা তাদের অভ্যাস ছিল। মহান রাব্বুল আলামিন মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করে শিশু হত্যাকে কেয়ামত পর্যন্ত রহিত করে দিয়েছেন।

ধর্মীয় পরিবেশে সঠিকভাবে শিশুর লালন-পালন করা পিতা-মাতার দায়িত্ব। ঘরে যদি মোহাম্মদী ইসলামের পরিবেশ থাকে তাহলে এর প্রভাব শিশুর মননে বিকাশ সাধন করে; ফলে দুনিয়াতে সে কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত থাকার আশঙ্কা কম থাকে। ঘরে যদি নামাজ, রোজা, মোরাকাবা, মিলাদ-কিয়ামের পরিবেশ থাকে, তাদের দেখাদেখি শিশুটিও ধর্মীয় কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পিতা-মাতার মতো সেও ধ্যান সাধনায় নিমগ্ন হয়। যা দেখে মহান রাব্বুল আলামিন, দয়াল রাসুল (সা.) যারপরনাই খুশি হয়ে থাকেন। কিন্তু যদি তা না করে অন্যায় ও অশ্লীল কোনো দৃশ্য শিশুর সামনে পড়ে বা শিশুর সামনে অন্যায় কোনো আচরণ করা হয় তখন এর প্রভাব শিশুর মানসপটে পড়ে যায়। যা সে বড় হলে বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করে।

শিশুর অর্থপূর্ণ নাম রাখা শিশুর অধিকারের মধ্যে পড়ে। শিশুকে আদব, আমল ও সুশিক্ষা দিতে হবে। শিশুকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, তাকে আল্লাহ্ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। হযরত মুহাম্মদ (সা.) উম্মতের শাফায়াতের কাণ্ডারি। মহান মোর্শেদের অনুসরণের মাধ্যেমেই মহান আল্লাহ ও হযরত রাসুল (সা.)-কে পাওয়া সম্ভব। প্রত্যেক কাজে আল্লাহ্র নামে শুরু করার অভ্যাস গড়ে তোলাও শিশুর অধিকার।

আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সমাজে আদর্শবান শিশু না থাকলে আদর্শ সমাজ গড়ে উঠবে না। শিশুরা যাতে কোনো বিপদে না পড়ে তার নির্দেশনা ইসলাম ধর্মে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, কেউ যদি কোনো শিশুকে বিপদগ্রস্ত অবস্থায় বা বিপদশংকুল অবস্থায় দেখে, তাহলে তাকে উদ্ধার করা তার ওপর ফরজ। যদি কেউ কোনো শিশুকে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে দেখেও উদ্ধার করার চেষ্টা না করে, তাহলে ঐ শিশুর কোনো ক্ষতি হলে তার জন্য ঐ ব্যক্তিই দায়ী হবে। সমাজে অসহায়, এতিম শিশুদের প্রতিপালনের দায়িত্ব ঐ সমাজের বিত্তশালী মানুষের। যদি তারা অপারগ হয়, তাহলে রাষ্ট্রকেই সেই দায়িত্ব নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here