শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব-২১): শরণার্থী শিশুদের রয়েছে যেসব অধিকার

0
152

নারী ও শিশু ডেস্ক: বিশ্বের মোট শরণার্থীর অর্ধেকই হচ্ছে শিশু। নানা কারণে শিশুরা শরণার্থীতে পরিণত হচ্ছে। এর মধ্যে আগ্রাসন, যুদ্ধ, জাতিগত বিদ্বেষ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দারিদ্র্য অন্যতম। অনেক শিশু আবার শরণার্থী শিবিরে জন্ম নিচ্ছে। এর ফলে জন্ম থেকেই তারা শরণার্থীতে পরিণত হচ্ছে।

শিশু শরণার্থীদের দুঃখ-কষ্টের শেষ নেই। নানাভাবে তারা বঞ্চিত। সুষম খাদ্য, সুচিকিৎসা, উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার কোনোটিই পায় না শরণার্থী শিশুরা। অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এসব শিশুর ভবিষ্যত একেবারেই অনিশ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই যারা শিশু বয়সেই জেনে যায় যে, তাদের সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই তারা হতাশায় ভোগে এবং এ ধরনের হতাশা তাদেরকে অসৎ পথে যেতে উৎসাহ দেয়।

আগ্রাসন আর যুদ্ধের ফলে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি শিশু আজ উদ্বাস্তু হয়ে পড়েছে। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়েও হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ভূমধ্য সাগরের সৈকতে ভেসে ওঠা শিশু আইমানের লাশ সাগরে অসংখ্য শরণার্থী শিশুর মৃত্যুর সাক্ষ্য দিয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে শিশু শরণার্থীর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। ইউনিসেফ বলছে, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় পাঁচ কোটি শিশু শরণার্থী রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার শরণার্থীদের প্রসঙ্গ এলেই প্রথমে রোহিঙ্গা শিশু শরণার্থীদের কথা আসে। বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই রয়েছে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শিশু শরণার্থী। এদের মধ্যে কয়েক হাজার শিশু রয়েছে, যাদের বাবা বা মা কেউই নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইনের স্থানীয় উগ্র বৌদ্ধরা তাদের বাবা ও মা-কে হত্যা করেছে। শুধু বাবা-মাকে নয় অনেক শিশুকেও হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রমাণ পেয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষদের পাশাপাশি শিশুদেরকেও নির্মমভাবে হত্যা করেছে। অনেক রোহিঙ্গা বাবা-মা বাংলাদেশে এসে জানিয়েছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের সামনেই দুধের শিশুদের পশুর মতো হত্যা করেছে।

জাতিসংঘ শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৫ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশু মারাত্মক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে মারাত্মক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে সন্তানসম্ভবা নারীরা। সন্তানসম্ভবা নারীর ঝুঁকি মানেই অনাগত শিশুদের ঝুঁকি। বর্ষা মৌসুমে শিশু শরণার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। কারণ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে পাহাড়ের ওপর যেখানে আশ্রয় নিয়েছে সে এলাকা আগে থেকেই বন্যা, সাইক্লোন ও পাহাড়ধস বা ভূমিধস প্রবণ এলাকা।

প্রতিটি মানব শিশু খুবই অসহায়ভাবে পৃথিবীতে আসে। তার বসতে, দাঁড়াতে, হাটতে কয়েক মাস সময় লাগে। এ জন্য মানব শিশুর অধিক যত্নের প্রয়োজন হয়। প্রয়োজন পড়ে নিরাপত্তার। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই শিশুর অধিকারের প্রতি নজর রাখতে হয়। অন্তত কৈশোর পর্যন্ত মানব সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ যত্ন নেওয়া বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। আদর সোহাগ পাওয়া প্রতিটি শিশুর অধিকার। কিন্তু শরণার্থী শিশুরা বিশেষকরে যেসব শিশু বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনকে হারিয়েছে তাদেরকে আদর-যত্ন করার কেউ নেই।

এতিম শরণার্থী শিশুদের রক্ষায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। কারণ ইসলাম ধর্ম শুধু নিজের শিশুদেরকে আদর-যত্ন করতে বলে নি। সব শিশু বিশেষকরে এতিম শিশুদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন মুসলমানদের দায়িত্বের অন্তভুর্ক্ত। শিশুদের আদর-সোহাগ করা সুন্নত। ইসলামি বর্ণনায় এসেছে, মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.) রাস্তার পাশে কান্নারত এক ইয়াতিম শিশুকে বাসায় এনে নিজের সন্তানের মতো আশ্রয় ও ভালোবাসা দিয়েছেন। মহানবি নিয়মিত শিশুদের খোঁজ-খবর নিতেন এবং মাঝে মধ্যে শিশুদের সঙ্গে রসিকতাও করতেন। মহানবি বলেছেন, তোমরা শিশুদের ভালোবাসো এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করো। আসলে শরণার্থী ও এতিম শিশুদের মতো অসহায় মানুষ আর হয় না। তাদের সাহায্যে সমাজের সবারই এগিয়ে আসা উচিত। শরণার্থী শিশুদের বিষয়ে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক সনদেও শরণার্থী শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here