শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব-২)

0
327

নারী ও শিশু ডেস্ক : আন্তর্জাতিক শিশু সনদের খসড়া তৈরির সময় ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর পাশাপাশি আয়ারল্যান্ড ও ভ্যাটিকান বলেছিল, নারীর ডিম্বাণু পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই শিশুর মর্যাদা পেতে পারে। এসব দেশের যুক্তি হচ্ছে, জন্মের আগেই ভ্রূণের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। কাজেই শুক্রাণু দ্বারা ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই শিশুকাল শুরু হয়েছে বলে গণ্য করা উচিত এবং আইনেও তা উল্লেখ করতে হবে। আন্তর্জাতিক শিশু সনদের ১ নম্বর অনুচ্ছেদ সম্পর্কে আর্জেন্টিনা বলেছে, “ডিম্বাণু দ্বারা শুক্রাণু নিষিক্ত হওয়ার মুহূর্ত থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত সময়কে শিশুকাল হিসেবে গণ্য করা উচিত।” আর্জেন্টিনার এই অবস্থানের উৎস হচ্ছে দেশটির নিজস্ব আইন। আর্জেন্টিনার আইনে বলা হয়েছে, মাতৃগর্ভে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই তা শিশুর মর্যাদা পাবে। গর্ভাবস্থাতেই তার মর্যাদা হবে জন্মগ্রহণকারী শিশুর মতো।
পবিত্র কুরআনেও গর্ভস্থ শিশুর অধিকারকে জোরালোভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আসলে ধর্মীয় দৃষ্টিতে একজন নারী বা পুরুষ যখন নিজের জন্য একজন জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী নির্বাচন করে, তখন থেকেই শিশুর প্রতি তাদের দায়িত্ব শুরু হয়ে যায়। কারণ শিশুর অধিকার রয়েছে অধিকতর সৎ এবং মহৎ মা-বাবা পাওয়ার; একজন ভালো মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়ার, একজন মমতাময়ী ভালো নারীকে মা হিসেবে পাওয়ার; যারা তাদেরকে ভালোবাসবে এবং সত্যিকার ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। কারণ বাবা-মা যদি ভালো মানুষ না হন তাহলে অনাগত শিশুর ভবিষ্যতও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। একটি শিশু যখন মায়ের গর্ভে ভ্রূণ অবস্থায় থাকে তখন এটা তার অধিকার হয়ে পড়ে যে, বাবা-মা তাকে এই পৃথিবীতে আসার সুযোগ করে দেবে, তাকে হত্যা করবে না বরং গর্ভে থাকাকালীন সময়ে তাকে প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা করবে। এটি সৃষ্টিকর্তা নির্ধারিত অধিকার।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে শিশু হত্যা মহাপাপ। যারা জন্মের আগে বা পরে শিশুদের হত্যা করে, পবিত্র কুরআনে তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত, বিভ্রান্ত এবং স্রষ্টার দানের প্রতি অকৃতজ্ঞ বলে অভিহিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আনআমের ১৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যারা নিজ সন্তানদের নির্বুদ্ধিতাবশত কোনো প্রমাণ ছাড়াই হত্যা করেছে এবং আল্লাহ্ তাদের যেসব নেয়ামত দিয়েছিলেন সেগুলোকে আল্লাহ্র ওপর ভ্রান্ত ধারণাবশত নিজেদের ওপর হারাম করে নিয়েছে। নিশ্চয়ই তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং সুপথগামী হয়নি।’

আন্তর্জাতিক শিশু সনদ তৈরির সময় আরেকটি মত খুবই স্পষ্ট ছিল। আর তা হচ্ছে, জন্মের আগে নয়, শিশুকাল শুরু হবে জন্মের পর থেকে। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট মনে করে, জন্মের পর শিশুর বেঁচে থাকার ওপরই শিশুকাল শুরুর বিষয়টি নির্ভর করে। মার্কিন আইন অনুযায়ী জন্মের আগে ভ্রূণ শিশুর মর্যাদা পাবে না। পাশ্চাত্যের বেশিরভাগ দেশই মনে করে, জন্মগ্রহণের পর একটি মানব সন্তান বেঁচে থাকবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেই কেবল তাকে শিশু হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া উচিত। স্পেনের আইনে বলা হয়েছে, জন্মের পর মানব সন্তানকে অন্তত ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকতে হবে। আর তাহলেই কেবল সে আইন অনুযায়ী শিশু হিসেবে গণ্য হবে এবং বিভিন্ন অধিকার তার জন্য প্রযোজ্য হবে। এসব কারণে এসব দেশের আইন ভ্রূণের বয়স অনেক বেশি হওয়ার পরও গর্ভপাতের অনুমতি দেয়। আমেরিকার আইনে ছয় মাস বয়সী ভ্রূণকেও নষ্ট করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শিশুকাল শুরুর নির্দিষ্ট সময় নিয়ে বিতর্ক থাকায় শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক শিশু সনদে এ বিষয়টি সন্নিবেশিত করা হয়নি।

যেসব দেশ তাদের আইনে ভ্রূণকেও শিশু হিসেবে গণ্য করেছে সেসব দেশে একটি শিশু ভ্রূণ অবস্থাতেই নানা ধরনের অধিকার পায়। এ কারণে ভ্রূণের যেকোনো ধরনের ক্ষতিসাধন অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এতো গেল শিশুকাল শুরুর নির্দিষ্ট সময়ের কথা। আন্তর্জাতিক শিশু সনদে শিশুকালের শেষসীমা হিসেবে ১৮ বছরকে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো দেশের আইনে ১৯ ও ২১ বছরকেও শিশুকালের শেষ সীমা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনে এ বিষয়ে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। বেশিরভাগ অঙ্গরাজ্যে ১৮ বছরকে শিশুকালের শেষ সীমা বলে উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে ১৯ অথবা ২১ বছরকে শিশুকাল সমাপ্তির বয়স হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

ফ্রান্সেও ১৮ বছর শেষ হওয়ার পর মানব সন্তানকে আর শিশু হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে জার্মানিতে ২১ বছর বয়স পর্যন্ত একজন মানব সন্তান শিশু হিসেবে গণ্য হতে পারে। এই বয়সের কোনো মানুষ অপরাধ করলে তার শাস্তি তুলনামূলক কম হয়। বাংলাদেশ, কুয়েত, মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও সৌদি আরবে ১৮ বছরকে শিশু বয়স হিসেবে গণ্য করা হয়। এসব দেশের আইন অনুযায়ী ৭ বছরের কম বয়সী শিশুর ওপর কোনো দায়-দায়িত্ব বর্তায় না। তবে ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুর ওপর কিছু দায়িত্ব বর্তাবে। আর ১৮ বছর শেষ হওয়ার পর একজন মানব সন্তান পরিপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার যোগ্য হবে এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here