শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব-৩): ভ্রূণ অবস্থাতেই পূর্ণাঙ্গ অধিকার

0
279

নারী ও শিশু ডেস্ক: ইসলাম ধর্মে শিশুর অধিকারের ওপর অপরিসীম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে সুসন্তানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এ কারণে মানবিক ও ধার্মিক সন্তান অর্থাৎ রাসুল প্রেমিক সন্তান পেতে হলে কী করা উচিত তা নিয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।

বলা হয়েছে, সুসন্তানের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা শুরু করতে হবে বিয়ের আগে থেকেই। একজন নারী ও পুরুষ যদি সুসন্তান পেতে চায় তাহলে তাকে প্রথমেই সচ্চরিত্রবান জীবনসঙ্গী বেছে নিতে হবে। স্বামী বা স্ত্রী নির্বাচনে সতর্কতার ওপর বারবার গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হচ্ছে নতুন দম্পতি যাতে পৃথিবীকে সুসন্তান উপহার দিতে পারে। ইসলাম ধর্মে বিয়ের বিধান রাখার একটি অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, সন্তান জন্মদান। শুধু সন্তান জন্মদানই যথেষ্ট নয় সেই সন্তানকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যে হবে হযরত রাসুল (সা.)-এর অনুগত প্রেমিক বা আশেক।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে মায়ের গর্ভে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই সেখানে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়। এ কারণে ধর্মে ভ্রূণ সংক্রান্ত নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নবী বংশের অন্যতম সদস্য ইমাম কাজেম (রহ.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- কোনো নারী যদি গর্ভপাতের উদ্দেশ্যে ওষুধ খান এবং গর্ভপাত ঘটান তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে কিনা। উত্তরে তিনি বলেছেন, কারোরই এ ধরনের অধিকার নেই। নবী বংশের অন্যতম ইমাম হযরত বাকের (রহ.) এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কোনো নারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গর্ভপাত ঘটান এবং সেই গর্ভজাত সন্তানের হাড়ের ওপর যদি মাংস গজিয়ে থাকে তাহলে এর জন্য রক্তমূল্য পরিশোধ করতে হবে। স্বামীকে না জানিয়ে এ কাজ করে থাকলে সন্তানের বাবা হিসেবে ওই নারীর স্বামী রক্তমূল্য পাবেন। রক্তমূল্যের কোনো অংশই ওই নারীর জন্য প্রযোজ্য হবে না, কারণ তিনি হচ্ছেন গর্ভের সন্তানের হত্যাকারী। আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (রা.)-ও গর্ভপাতকে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে রক্তমূল্য পরিশোধের কথা বলেছেন।

ইসলাম ধর্মে গর্ভে থাকা অবস্থাতেই একটি মানব সন্তান বিভিন্ন ধরনের অধিকারের আওতায় আসে এবং এ অধিকার লঙ্ঘিত হলে এর জন্য শাস্তির কথা বলা হয়েছে। গর্ভপাতের কারণে রক্তমূল্য পরিশোধের নির্দেশ এ ধরনেরই একটি বিধান। ইসলামি দণ্ডবিধিতে বলা হয়েছে, কোনো গর্ভবতী নারী যদি এমন শাস্তির আওতায় পড়েন যা তার ভ্রূণ বা গর্ভের সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে তাহলে ওই নারীর শাস্তি শুরুর সময় পিছিয়ে দিতে হবে। নারী যদি অবৈধভাবে সন্তানের অধিকারী হয়ে থাকে তাহলেও তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কারণ অপরাধী হচ্ছে ওই নারী। তার গর্ভে যে মানব সন্তান রয়েছে সে কোনো অপরাধ করে নি। ওই নারীর কারণে সন্তানের ক্ষতি করা যাবে না। কাজেই ইসলাম ধর্মে একটি মানব সন্তান ভ্রূণ অবস্থাতেই আলাদা একজন মানুষ হিসেবে আইনি সুরক্ষা ও অধিকার লাভ করে। এই অধিকার এমন যে, গর্ভে ধারণকারী মা নিজেও ওই সন্তানের কোনো ক্ষতি করার অধিকার রাখে না। ঐশী আইন অনুযায়ী গর্ভে অস্তিত্ব লাভ করার পর থেকেই একজন মানব সন্তানের শিশুকাল শুরু হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুকালের শেষ সীমা নিয়ে কথা বলতে গেলে কুরআনের এ সংক্রান্ত তিনটি শব্দ আলোচনায় আসে। এগুলো হলো-‘হুলুম’, ‘নিকাহ’ ও ‘আশাদ’। পবিত্র কুরআনের সূরা নুরের ৫৮ ও ৫৯ নম্বর আয়াতে শিশুকালের সমাপ্তি হিসেবে ‘হুলুম’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে। ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ওয়া ইযা বালাগাল আতফালু মিনকুমুল হুলুমা…

এখানে বলা হয়েছে, তোমাদের শিশুরা বয়ঃপ্রাপ্ত হলে তারাও যেন তাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের মতো (সব সময়) অনুমতি প্রার্থনা করে। এই আয়াতে হুলুম শব্দটি বয়ঃপ্রাপ্তির রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দের মাধ্যমে এমন একটি বয়সের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যখন থেকে শিশুর মধ্যে যৌন অনুভূতি কাজ করে এবং শিশুর মধ্যে এ সংক্রান্ত কিছু পরিবর্তন ঘটে।

সূরা নিসার ৬ নম্বর আয়াতে এসেছে, হাত্তা ইযা বালাগুন নিকাহ….
এই আয়াতে বিয়ের তথা পরিবার গঠনের যোগ্য হওয়ার পর এতিমদের সম্পদ তাদের কাছে হস্তান্তরের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মুফাসসিরদের মতে, এখানে বালাগুন নিকাহ পরিভাষার মাধ্যমে বয়ঃপ্রাপ্তিকে বোঝানো হয়েছে। তবে সূরা নূরের ৫৯ নম্বর আয়াতে যে বয়ঃপ্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে সেটার সঙ্গে সূরা নিসার ৬ নম্বর আয়াতের বয়ঃপ্রাপ্তির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। সূরা নিসায় বালাগুন নিকাহ বলতে বোঝানো হচ্ছে শিশুকে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে যে, তার মধ্যে যৌন অনুভূতির পাশাপাশি বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা এবং পরিবার গঠনের সামাজিক সক্ষমতা থাকতে হবে।

অন্যভাবে বলা যায়, একজন মেয়ে বা ছেলে কেবল তখনি বিয়ে তথা পরিবার গঠনের যোগ্য হয় যখন সে নিজেই পরিবার গঠনের সামাজিক সক্ষমতা অর্জন করে ও চিন্তাগত দিক থেকেও পরিবার গঠনের পর্যায়ে পৌঁছায় এবং একটি পরিবার পরিচালনা করতে পারে। কাজেই বালাগুন নিকাহ পরিভাষার মাধ্যমে শুধু যৌন সক্ষমতা অর্জনকে বোঝানো হয় নি, যেমনটি ‘হুলুম’ পরিভাষার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন শব্দ ও পরিভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে বিশেষ অর্থ বোঝানো হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন অর্থের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

বয়ঃপ্রাপ্তির কথা বোঝাতে গিয়ে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ‘আশাদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। বয়ঃপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে হুলুম ও নিকাহ শব্দের চেয়ে ‘আশাদ’ শব্দের ব্যবহার হয়েছে তুলনামূলক বেশি। বিখ্যাত মুফাস্সিরে কুরআন আল্লামা তাবাতাবায়ি’র মতে, মানব সন্তান যখন দৈহিক ও শারীরিক দিক থেকে পরিপূর্ণতা অর্জন করে এবং তার শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্যগুলো লোপ পায় তখনি সেটাকে বালাগা আশাদা বলা হয়। পবিত্র কুরআনের তাফসির গ্রন্থ আল-মিজানে তিনি বলেছেন, বালাগা আশাদা’র বয়স হচ্ছে ১৮ বছর। তার মতে, বালাগা আশাদা হচ্ছে শিশুকালের সমাপ্তি। এরপর বয়সের নতুন পর্যায় শুরু হয় এবং বৃদ্ধকাল শুরুর আগ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। বয়ঃপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আশাদ, নিকাহ ও হুলুম শব্দের ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, পবিত্র কুরআনে শিশুকাল সমাপ্তির সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স উল্লেখ করা হয় নি। বয়ঃপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে পার্থক্যের কথাও কুরআনে আসে নি। কুরআনের বিভিন্ন আয়াত থেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, বয়ঃপ্রাপ্তি হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শিশুর দৈহিক পরিবর্তন এবং চিন্তাগত উন্নতি এর অন্তর্ভূক্ত। এসব বিষয় যেহেতু প্রাকৃতিকভাবে ঘটে সেহেতু প্রাকৃতিক চিহ্নের ভিত্তিতেই বয়ঃপ্রাপ্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here