শিশু অধিকার ও ইসলাম (পর্ব ৭) : ভ্রূণ হত্যা মানুষ হত্যার শামিল

0
234

নারী ও শিশু ডেস্ক: ইসলাম ধর্ম জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেমন অনাগত সন্তানের ভালো-মন্দ দিক বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেছে ঠিক তেমনি বিয়ের পর গর্ভে আসা সন্তানের পৃথিবীতে নিরাপদ আগমন নিশ্চিত করার কথা বলেছে। ইসলাম ধর্মে মাতৃগর্ভে থাকা ভ্রূণও অধিকারপ্রাপ্ত হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনুনের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে ভ্রূণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে এক নিরাপদ আঁধারে স্থাপন করি। পরে আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংস পিণ্ডে পরিণত করি এবং মাংস পিণ্ডকে অস্থি অতঃপর অস্থিকে মাংস দ্বারা ঢেকে দেই। অবশেষে আমি তাকে গড়ে তুলি নতুন সৃষ্টিরূপে। সুতরাং কত মহান কল্যাণময় আল্লাহ্ যিনি সর্বোত্তম স্রষ্টা।”

পবিত্র কুরআনে মাতৃগর্ভে ভ্রূণের অস্তিত্ব লাভ থেকে বিকাশ পর্যন্ত ছয়টি পর্যায়ের কথা বলা হয়েছে। ভ্রূণে প্রাণের অস্তিত্বের বিষয়টি কুরআনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভ্রূণকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য করে ইসলাম। এ কারণে মাতৃগর্ভে ভ্রূণের যথাযথ পরিপুষ্টির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে ভ্রূণের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। তাই গর্ভবতী মায়ের জন্য সুষম খাদ্য ও পুষ্টিকর বাড়তি খাবারের দরকার। ভ্রূণকে তো আর সরাসরি খাবার দেওয়া যায় না, তাই মায়ের খাবারের ওপরই নির্ভর করে ভ্রূণের পরিপুষ্টির বিষয়টি। এজন্য সুস্থ ও সবল শিশু পেতে হলে গর্ভাবস্থায় মাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য খেতে দিতে হবে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘‘সন্তানের বাবার দায়িত্ব হলো মায়ের খাওয়া-পরার উত্তম ব্যবস্থা করা।’’ ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, সন্তান হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। এই বক্তব্যের মাধ্যমেও শিশুর গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই এই উপহারের মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম নয়।

দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অনেক বাবা-মা ভ্রূণ হত্যা করছে। সন্তান গর্ভে আসার পর নানা অজুহাত তুলে বিভিন্ন উপায়ে ভ্রূণ হত্যা করছেন তারা। অনেকেই অর্থনৈতিক সমস্যার কথা বলে, আবার কেউ কেউ সন্তানকে সঠিকভাবে বড় করতে পারবে না এই অজুহাত দেখিয়ে গর্ভের সন্তানকে মেরে ফেলছেন। আল্লাহ্ তায়ালা সূরা আনআমের ১৩৭ নম্বর আয়াতে বলছেন, “আর এভাবে অনেক মুশরিকের জন্য তাদের শরিকরা তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করা শোভিত করেছে, যাতে তাদেরকে ধ্বংস করতে পারে এবং তাদের নিকট তাদের দীনকে সংশয়পূর্ণ করতে পারে। আর আল্লাহ্ যদি চাইতেন, তারা তা করত না। সুতরাং তারা যে মিথ্যা বানায়, তা নিয়ে তুমি তাদেরকে থাকতে দাও।”

ইসলাম ধর্মসহ কোনো ধর্মেই ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষ হত্যা মহাপাপ। ভ্রূণ হত্যাও মানুষ হত্যার শামিল। গর্ভবতী মায়েরও অধিকার নেই তার গর্ভের ভ্রূণকে নষ্ট করা। কারণ গর্ভে জীবনের অস্তিত্ব আসার পর তা পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গণ্য হয়।

সূরা মুমতাহানার ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা ইমানদার নারীদের আনুগত্য গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যেসব শর্তারোপের কথা বলেছেন, তার মধ্যে একটি হলো সন্তানদের হত্যা না করা। এই আয়াতে আল্লাহ্ বলছেন, “হে নবি, ইমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, অন্য পুরুষের ঔরসজাত সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। কারণ আল্লাহ্ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু।”

ইসলাম ধর্মে শিশু হত্যাকে সরাসরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও অনেকেই এই নিষেধাজ্ঞা মানছেন না। অনেকেই এটা উপলব্ধি করতে পারেন না যে, গর্ভে থাকা ভ্রূণ একটি পরিপূর্ণ মানুষের অধিকারপ্রাপ্ত। ভ্রূণের ক্ষতি করার অধিকার কারো নেই। পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, কেউ যদি মনে করেন আগত শিশুকে লালন পালন করা তার পক্ষে হয়ত সম্ভব হবে না এবং সেই ভয়ে ভ্রূণকে মেরে ফেলেন, তাহলে সেটি মহাপাপ বলে বিবেচিত হবে৷ সূরা ইসরার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘‘তোমরা তোমাদের সন্তানকে দারিদ্রতার ভয়ে হত্যা করো না। আমরা তোমাকে এবং তোমার সন্তানকে দেখেশুনে রাখি৷ তাই তাদের হত্যা করা সত্যিকার অর্থেই একটি মহাপাপ৷’’

ইসলাম ধর্ম স্পষ্টভাবে বলছে, ভ্রূণের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর সেটাকে ধ্বংস করা হারাম। আহলে বাইতের ইমামরাও বিভিন্ন সময় ইচ্ছাকৃত গর্ভপাতকে হত্যা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আসলে প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও এ অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্ম যেখানে ভ্রূণের কোনো ধরনের ক্ষতিসাধনের অনুমতি দেয় নি সেখানে জন্মের পর শিশু নির্যাতন বা হত্যাকে প্রশ্রয় দেওয়ারতো প্রশ্নই আসে না। সর্বোপরি জন্মের আগে হোক আর পরে হোক, শিশুর গুরুত্ব অপরিসীম। শিশু অধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্রতিটি মানুষের। মনে রাখতে হবে আমরা বড়রাও এক সময় শিশু ছিলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here