শুভ জন্মদিনে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য, ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের জীবনের অন্তরালে

8
714
সেজো সাহেবজাদা, ইমাম ড. সৈয়দ এ. এফ. এম. ফজল-এ-খোদা (মাঃ আঃ) হুজুর । +

ড. মুহাম্মদ নাছিরউদ্দীন (সোহেল)
বছর ঘুরে আবার এলো মহিমান্বিত ১১ জুন। মহান সংস্কারক মোহাম্মদী ইসলামের পুনর্জীবনদানকারী সূফী সম্রাট হযরত সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা দেওয়ানবাগী (মা. আ.) হুজুর কেবলাজান প্রচারিত চিরশান্তির ধর্ম মোহাম্মদী ইসলামের আদর্শ বিশ্বময় প্রচারের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন বাবা দেওয়ানবাগী ও কুতুবুল আকতাব হযরত সৈয়দা হামিদা বেগম দয়াল মা (রহ.)-এর ঘরকে আলোকিত করে যে মহামানব জগতের বুকে তশরিফ নেন, তিনি হলেন সেজো সাহেবজাদা ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা (মা. আ.) হুজুর।

তাঁর শুভাগমনে সূফী সম্রাট দয়াল বাবাজান ও কুতুবুল আকতাব দয়াল মা (রহ.)-সহ পরিবারের অন্যান্য সবার মন হাসি ও আনন্দের অপূর্ব স্নিগ্ধতায় ভরে ওঠে। তাঁর জ্যোতির্ময় মায়াবী চেহারা দেখে পরিবারের সবাই বুঝতে পারেন যে, এই শিশু সাধারণ কোনো শিশু নন। প্রকৃতিও যেন এই শিশুকে ধরণীর বুকে বরণ করে নেওয়ার জন্য আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে। দয়াল বাবাজান তাঁর এই স্নেহের পুত্র সন্তানটির নাম রাখেন ‘সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা’। আশেকে রাসুলগণ তাঁকে ‘ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর’ বলে সম্বোধন করে থাকেন।

শৈশবকাল থেকে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর ছিলেন শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাবের। সময়ের অগ্রযাত্রায় বাবা দেওয়ানবাগীর সুমহান শিক্ষা ও আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি বেড়ে ওঠেন। শিশুকাল থেকে এই মহামানবকে দেখলে মনে হতো তিনি তাসাউফ জগতে এক উদীয়মান নক্ষত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি নম্র স্বভাবের সত্যের অনুরাগী এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে আপসহীন। স্বল্পভাষী ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরকে দেখলেই বুঝা যায় যে, জ্ঞান ও বিচক্ষণতার এক মূর্ত প্রতীক তিনি।

আমার মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান যখন ব্যাপকভাবে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারের জন্য ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে রাজধানী ঢাকায় দরবার শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকে অদ্যাবধি মহান আল্লাহর অপার দয়ায় আমি বাবা দেওয়ানবাগীর কদম মোবারকে আছি। সেই সুবাধে শৈশবকাল থেকেই ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর গৌরবদীপ্ত জীবনের বহু ঘটনার সাথে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই জন্য মহান মোর্শেদের কদম মোবারকে জানাই লাখো শুকরিয়া ।

২০০১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস থেকে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের খুব নিকটে আসার আমার সুযোগ হয়। আমার মহান মোর্শেদ সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান দয়া করে আমাকে সুযোগ করে দেন, সম্মানিত সাহেবজাদা হুজুরগণের সাথে থেকে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার খেদমত করার জন্য। সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের নির্দেশে এই সুমহান গোলামিতে আমি নিজেকে একনিষ্ঠতার সাথে সম্পৃক্ত করি। এই গোলামি করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম যে, সম্মানিত সাহেবজাদা হুজুরগণ অসাধারণ মেধা ও প্রজ্ঞার অধিকারী। আজ যেহেতু আমি ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরকে নিয়ে লিখছি, তাই তাঁর গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষা জীবন ও অন্যান্য কিছু বিষয় নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

ক্বালবি বিদ্যার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি ছিল ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের প্রবল আগ্রহ। আমার আজও মনে পড়ে এসএসসি পরীক্ষার সময় তিনি প্রতিদিন ১০-১২ ঘন্টা পড়ালেখা করতেন। এমনও হয়েছে যে, তিনি সন্ধ্যায় পড়তে বসে ফজরের নামাজের পূর্ব পর্যন্ত একটানা পড়ে গেছেন। নামাজ আদায় করে আবার পড়তে বসেছেন। সেসময় আমার ঘুম জড়ানো চোখ দেখে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আমাকে বলতেন, “সোহলে ভাই! আপনি ঘুমান, আমি পড়তে থাকি।” সেই মায়া ভরা কথা এখনও আমি ভুলতে পারি না। আমার মনে পড়ছে ড. সেজো হুজুরের সাধারণ বিজ্ঞান (General Science) বিষয়টির প্রস্তুতি কিছুটা কম ছিল। বিজ্ঞান পরীক্ষার পূর্বে ২ দিন বন্ধ ছিল। ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর সিদ্ধান্ত নিলেন এই ২ দিন দিবা-রাত্র একটানা পড়ে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ সিলেবাস শেষ করবেন। আমরা নতুন করে সাজেশন প্রস্তুত করলাম। ছোটো-বড়ো প্রশ্ন মিলে ১৮০টি প্রশ্ন হবে। ড. সেজো হুজুর এই ২ দিনে এত প্রশ্ন কীভাবে মুখস্থ করবেন, তা ভেবে আমি কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়ি। তখন আমাদের সাথে আশেকে রাসুল ডা. মোস্তফা ভাই ছিলেন। তিনিও শঙ্কিত হয়ে আমাকে বললেন, “সেজো হুজুর মনে হয় বিজ্ঞান বিষয়ে খুব একটা ভালো করতে পারবেন না।” আমাদের উভয়ের শঙ্কা দেখে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর বললেন, আপনারা চিন্তা করবেন না, দয়াল বাবাজানের দয়ায় আমি এই ২ দিনে ১৮০টি প্রশ্ন মুখস্থ করে ফেলব। আল্লাহর কী অপূর্ব মহিমা! বিজ্ঞান পরীক্ষার পূর্বেই তিনি সব প্রশ্ন মুখস্থ করে ফেললেন এবং পরীক্ষাও খুব ভালো দিলেন।

ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর এসএসসি-তে বাণিজ্য বিভাগে ছিলেন। তিনি হিসাব বিজ্ঞান (Accounting) বিষয়ে তুখোর ছিলেন। এই বিষয়টিতে স্কুলে তিনি সবসময় A+ নম্বর পেতেন। তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি উচ্চ মাধ্যমিকে আর ভর্তি হতে পারেননি। এইভাবে ৬ বছর অতিবাহিত হয়। শারীরিক সুস্থতা লাভের পর ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর একদিন আমাকে মোবাইলে কল করে বাবে রহমতে আসতে বললেন। আমি সাথে সাথে বাবে রহমতে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, “আমি আবার পড়ালেখা শুরু করতে চাই, আপনি উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।” তাঁর পবিত্র মুখ থেকে এই কথা শুনে আমি অত্যন্ত খুশি হয়ে যাই। দীর্ঘ ৬ বছর ব্রেক অব স্টাডি (পাঠ বিরতি)-এর পর আবার নবোদ্যমে পড়া-লেখা শুরু করা অনেকটাই কষ্টসাধ্য। কিন্তু ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের অটুট মনোবল দেখে আমিও আশাবাদী হয়ে উঠি।

এরপর ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর উচ্চ মাধ্যমিকে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। দীর্ঘ ৬ বছর পর আবার নতুন করে শুরু হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অগ্রযাত্রা। ভর্তির পর পরই তিনি ভালো ফলাফলের জন্য অত্যন্ত সচেতন হয়ে ওঠেন। ইংরেজি ও হিসাব বিজ্ঞানের জন্য তিনি শ্রদ্ধেয় শিক্ষক দেবন্দ্র নাথ সান্যাল স্যারকে টিউটর রাখেন। অতঃপর প্রত্যেকদিন আমাকে সাথে নিয়ে দুপুর ও রাতে ৩ ঘন্টা করে সর্বমোট ৬ ঘন্টা পড়ালেখা করতেন। সেসময় তাঁর মাঝে যে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দেখেছি, তা সত্যিই প্রশংসার ঊর্ধ্বে। অনেকেই ভেবেছিলেন যে, দীর্ঘ ৬ বছর পর পড়া-লেখা শুরু করে বড়ো জোর পাশ করা যাবে, কিন্তু ভালো ফলাফল করা যাবে না। অথচ সবাইকে অবাক করে দিয়ে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর এইচএসসি পরীক্ষায় এ গ্রেড পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এছাড়া তিনি হিসাব বিজ্ঞান বিষয়ে ১ম ও ২য় উভয় পত্রে A+ নম্বর পান।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের নির্দেশে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম স্বনামধন্য বিদ্যাপিঠ ‘দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ (পিইউবি)-এর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে বিএ (অনার্স)-এ ভর্তি হন।

বিএ (অনার্স)-এ ভর্তি হওয়ার পর তিনি কীরূপ ফলাফল করবেন-এর একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করেন। তিনি দৃঢ়চিত্ত হন যে, তাকে অনার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সিজিপিএ পেয়ে মেধা তালিকায় ১ম স্থান অর্জন করতে হবে। এই লক্ষ্যে তিনি একটি পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। অনার্সে ৪ বছরে ১২টি সেমিস্টারে সর্বমোট ৪৪টি কোর্স পড়ানো হয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরবরাহকৃত মডিউল (গড়ফরঁষ) এবং সহায়ক গ্রন্থের সাহায্য নিয়ে প্রতিটি কোর্সের প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর নিজেই বিশেষভাবে প্রস্তুত করতেন। এছাড়া জটিল কোনো বিষয়ের সম্মুখীন হলে তিনি দয়াল বাবাজান কতৃক প্রতিষ্ঠিত ‘আল কুরআন গবেষণা কেন্দ্র’ হতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতেন। এভাবে তিনি প্রত্যেকটি প্রশ্নের নোট অত্যন্ত সুন্দর, প্রাঞ্জল ও তথ্যবহুলভাবে তৈরি করতেন। ফলে শিক্ষকদের নিকটও তা বেশ প্রশংসিত হয়। আর এর সুফলও তিনি লাভ করেন। অর্থাৎ তিনি বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯১ পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেলের জন্য মনোনীত হন। তিনি অনার্স পরীক্ষায় ৪৪টি বিষয়ের মধ্যে ৩১টি বিষয়ে এ+, ১০টি বিষয়ে এ ও ৩টি বিষয়ে এ- গ্রেড পান। তিনি বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯১ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘সৈয়দ মাহ্বুব-এ-খোদা (মা. আ.) ও সৈয়দা হামিদা বেগম (রহ.) গোল্ড মেডেল’ প্রদান করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট সেন্টারে বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পিইউবি-এর ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব প্রফেসর ড. শামীমা নাসরিন শাহেদ ও উপাচার্য প্রফেসর ড. এ.কে.এম. সালাহ্উদ্দীন তাঁকে গোল্ড মেডেল পড়িয়ে দেন। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯৮ পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে ‘প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল’-এর জন্য মনোনীত হন। তিনি এমএ পরীক্ষায় ১২টি বিষয়ের মধ্যে ১১টি বিষয়ে এ+ ও ১টি বিষয়ে এ গ্রেড পান। এমএ পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ১ম স্থান অর্জন করায় পিইউবি-এর পক্ষ থেকে পরবর্তীতে অনুষ্ঠান করে তাঁকে দয়াল বাবাজান ও দয়াল মায়ের নামে প্রবর্তিত গোল্ড মেডেল প্রদান করা হবে।
এই প্রসঙ্গে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর বলেন, “আমার কনিষ্ঠ ভাই ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. মঞ্জুর-এ-খোদা (মা. আ.)-এর প্রচেষ্টায় যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সম্মানিত পিতা ও মাতার নামে গোল্ড মেডেল প্রবর্তন করা হয়, তখন থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল যে, আমি যেন সর্বোচ্চ সিজিপিএ পেয়ে আমার পিতা ও মাতার নামে প্রবর্তিত গোল্ড মেডেলটি লাভ করতে পারি। মহান মোর্শেদের অপার দয়ায় আল্লাহ্ তায়ালা আমার এই স্বপ্ন পূরণ করেছেন। এইজন্য মহান আল্লাহ্ ও তাঁর বন্ধু সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের প্রতি রইলো লক্ষ কোটি শুকরিয়া।”

মহান মোর্শেদের অপার দয়ায় ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর বিএ (অনার্স) ও এমএ সফলভাবে সম্পন্ন করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি’ থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর থিসিসের শিরোনাম ছিল- “সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান বলেন, ‘আল্লাহর নূরের আকার আছে, তিনি নিরাকার নন’ পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণ।” উল্লেখ্য যে, তিনি বৃটিশ কাউন্সিল থেকে ইংরেজি ভাষার উপর সেখানকার প্রায় সবগুলো লেভেল অত্যন্ত সফলতার সাথে সুসম্পন্ন করেন।

মূলত শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ, অদম্য আগ্রহ, বিপুল প্রচেষ্টা, অধ্যবসায়, দৃঢ়চিত্ত, হার না মানা মনোবল এই অনুপমগুণগুলো ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরকে শিক্ষা জীবনের সফলতার স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর লক্ষ্য ছিল অটুট এবং বিশ্বাস ছিল হৃদয়ে। তাই কোনো প্রতিকূলতা তাঁর সফলতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। তিনি ছুটে চলেছেন অদম্য গতিতে।

এবার আসি ভিন্ন প্রসঙ্গে। সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজান প্রচারিত মোহাম্মদী ইসলামের স্বর্ণালি অগ্রযাত্রায় ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাচ্ছেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি তাঁর প্রাণপ্রিয় অগ্রজ ভাই মেজো সাহেবজাদা ইমাম ড. আরসাম কুদরত এ খোদা (মা. আ.) হুজুরের সাথে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শ প্রচারের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সফর করেন। কয়েকটি সফরে আমারও অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। যে কোনো সফরে তাঁদের উপস্থিতি মোর্শেদ প্রেমিকদের মধ্যে প্রচণ্ড আগ্রহ ও উৎসাহের সৃষ্টি করত। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মোহাম্মদী ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে ড. মেজো সাহেবজাদা হুজুর, ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর ও ড. ছোটো সাহেবজাদা হুজুর মালয়েশিয়া সফরে যান। সেই আন্তর্জাতিক সফরে তাঁদের সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ আমিও লাভ করি। মালয়েশিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে বেশ কয়েকটি আশেকে রাসুল (সা.) মাহ্ফিলের আয়োজন করা হয়। অবশেষে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে একটি কনভেনশন সেন্টারে World Ashek-e-Rasul Conference অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানে প্রবাসী বাঙালি এবং মালয়েশিয়ার নাগরিক-সহ সহস্রাধিক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। সাহেবজাদা হুজুরগণ দয়া করে আমাকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্ব প্রদান করেন। ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর অনুষ্ঠানে সূফী সম্রাট হুজুর কেবলাজানের ৪টি প্রধান শিক্ষা যথা- আত্মশুদ্ধি, দিল জিন্দা, নামাজে হুজুরি এবং আশেকে রাসুল হওয়া সম্পর্কে সুন্দর ও সাবলিল ভাষায় বক্তব্য প্রদান করেন। তাঁর সেদিনের বক্তব্য উপস্থিত সকলকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। ঐ অনুষ্ঠানে সম্মানিত তিন সাহেবজাদা হুজুরের তাসাউফ সম্পর্কিত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনে অনেক মালয়েশিয়ার নাগরিক মোহাম্মদী ইসলামের সবক গ্রহণ করে আশেকে রাসুল হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

উল্লেখ্য যে, ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জুন ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের ৩২তম শুভদিন উপলক্ষ্যে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য প্রায় ১ হাজার আশেকে রাসুল আকস্মিকভাবে বাবে রহমত দেওয়ানবাগ শরীফে উপস্থিত হন। তাদের হঠাৎ আগমনে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় ড. সেজো হুজুর বাদ মাগরিব আমাকে মোবাইলে জানালেন যে, আমি যেন দ্রুত বাবে রহমতে চলে আসি এবং অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করি। তাঁর নির্দেশের সাথে সাথে আমি ‘বাবে রহমতে’ চলে আসি। আমি নিজেও বাবে রহমতের ৬ষ্ঠ তলা এবং এর সংলগ্ন সিড়িতে আশেকে রাসুলদের ভীড় দেখে অবাক হয়ে যাই। সবাই ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছেন ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য। আমি ড. সেজো হুজুরের অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা শুরু করি এবং তাঁর গৌরবময় জীবনের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করি।

অতঃপর অনুষ্ঠানের মধ্যমণি ইমাম ড. সৈয়দ এ.এফ.এম. ফজল-এ-খোদা (মা. আ.) হুজুর অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হন এবং কুরছি মোবারকে উপবিষ্ট হন। সেদিন তিনি মোহাম্মদী ইসলামের শিক্ষা, আদর্শ, মোর্শেদের দরবারে মুরিদের করণীয় এবং তরিকত ও মারেফতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে প্রায় ১ ঘন্টা মনোমুগ্ধকর বক্তব্য পেশ করেন। সেদিন মোর্শেদ প্রেমিকেরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তব্য শুনছিলেন। তাসাউফ জগতের অনেক নিগূঢ় রহস্য তিনি তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্যের সময় অবারিত ফায়েজের প্রবাহ মোর্শেদ প্রেমিকদের হৃদয়ে ছুঁয়ে যায়। অনুষ্ঠান শেষে অনেক আশেকে রাসুল আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন, ‘‘ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর দরবার শরীফের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করলে আমরা তাঁর নিকট থেকে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারতাম।’’ আমি আশেকে রাসুলদের সেই মনের আকুতি ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের নিকট পৌঁছে দিয়েছি। এই আহ্বান শুনে তাঁর ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু তিনি কিছু বলেননি। হয়তো আগামীতে আমরা মোর্শেদ প্রেমিকেরা তাঁর নিকট থেকে তাসাউফ সমৃদ্ধ জ্ঞানগর্ভ আলোচনা শুনতে পারব, সেই প্রত্যাশায় রইলাম।

বর্তমানে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর দেওয়ানবাগ শরীফের অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। দরবার শরীফের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চিত্ত ও বলিষ্ঠ কণ্ঠ। তিনি যেকোনো বিষয়ে প্রজ্ঞা সম্পন্ন নির্ভীক সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।

তাঁর ৩৩তম শুভ জন্মদিনে তাঁকে জানাই লক্ষ কোটি সালাম ও কদমবুসি। তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি। শুভ জন্মদিন! হে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর। আমিন।

[লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (পিইউবি)]

8 COMMENTS

  1. ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুর সম্পর্কে অসাধারণ সুন্দর একটি লেখা। এ লেখাটি পড়ে ড. সেজো সাহেবজাদা হুজুরের বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অনেক মূল্যবান তথ্য জানতে পারবেন। ধণ্যবাদ জানাচ্ছি লেখককে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here