শেখ সাদীর সুবাসিত ‘বূস্তান’

2
329

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
‘বূস্তান’-এর গল্পরীতির ধরন অনুমানের জন্য আমরা একটি গল্পের উপর আলোকপাত করতে পারি। ‘বূস্তান’-এর গল্পের বেশকিছু চরিত্রের নায়ক পশুপাখি। এই রীতি বিশ্বখ্যাত সাহিত্যকর্মের আচরিত ও স্বীকৃত রেওয়াজ। এক বুড়ির বাড়িতে একটি আদুরে বিড়াল ছিল। বিড়াল বেশ কিছুদিন ক্ষুধার জ্বালা সয়ে যাচ্ছিল। একদিন একটি ইঁদুর পেল শিকার হিসেবে। ঠিক সে সময় বিড়ালের কাছে খবর পৌঁছে পাশে আমীরের বাড়িতে যেয়াফতের মহাধুমধাম। ওখানে পেটভরে সুস্বাদু খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার বিরাট সুযোগ। বিড়াল তার শিকার ছেড়ে চলে যায় পাশে আমীরের বাড়ির যেয়াফতে। কিন্তু বিধিবাম। সুলতানের চাকররা দেখে ফেলে বিড়ালের লুকিয়ে লুকিয়ে পথ চলা। তারা বিড়ালকে নিশানা বানায় তীর বর্শার। নিষ্ঠুরভাবে তাড়িয়ে দেয় যেয়াফত হতে। খাবারের উপর পাঞ্জা বিস্তারের আগেই শুরু হয় বেচারা বিড়ালের গায়ে রক্তক্ষরণ। বিড়াল বুঝতে পারে তার জীবনের শেষ সময়। তখন করুণ চাহনিতে উপদেশের সুরে লোভী মানুষের উদ্দেশে বলে, ‘ডালভাতে তুষ্ট থাকাই উত্তম। লোভে পড়ে মধু খেতে গেলে হুলের দংশনই তার ভাগ্যে জুটে।’

‘গুলিস্তান’-এর মতো ‘বূস্তান’ও আট অধ্যায়ে বিন্যস্ত। আমরা এখানের শিরোনামগুলোর পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করব।

প্রথম অধ্যায় : ন্যায়-ইনসাফ, রাষ্ট্রপরিচালনা, মত ও সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে
সেই যুগে রাজা-বাদশাহদের কোনো কাজের সমালোচনা বা সংশোধনের চেষ্টা করা ছিল মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে শেখ সাদী এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন রাজা-বাদশাহদের সংশোধনের উদ্দেশ্যে। তিনি ‘বূস্তান’-এর প্রথম অধ্যায় রচনা করেন রাজা-বাদশাহদের শাসনকার্য ও ন্যায়-ইনসাফের গুরুত্ব নিয়ে। অতীত-বর্তমানের নানা প্রসঙ্গ টেনে সুশাসনের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং রাজ্য রক্ষায় জনগণের শান্তি ও সুখের গুরুত্ব এবং ন্যায়বিচারের ভূমিকার উপর শৈল্পিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেন। রাজা-বাদশাহদের চিন্তা, মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব কতখানি সেই ব্যাপারে শাসকবর্গকে সজাগ করেছেন। বলেছেন, দেশের শান্তিসুখের চাবিকাঠি হচ্ছে জনগণ তথা সৃষ্টির সুরক্ষা আর স্রষ্টার আদেশ নিষেধের সযত্ন পরিপালন।

দ্বিতীয় অধ্যায় : মহানুভবতা প্রসঙ্গে
মানবতার সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও সর্বশ্রেষ্ঠ সুষমা হচ্ছে মহানুভবতা বা অন্যের প্রতি দয়া, উদারতা ও অনুগ্রহ। শেখ সাদী দেখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে রাষ্ট্রনীতিকে মহানুভবতার উপর প্রতিষ্ঠিত করা যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন মেকিয়াভেলীর রাজনীতির দ্বিমুখিতা ও ভন্ডামি চরিত্র কত ঘৃণ্য, কৌশল হিসেবে ব্যর্থ ও পরিত্যাজ্য।

তৃতীয় অধ্যায় : প্রেম, আসক্তি ও উন্মাদনা প্রসঙ্গে
শেখ সাদী নিজেই প্রেমের শরাবে মাতোয়ারা। তিনি চেয়েছেন বিশ্বসভায় প্রেমের বীজ ছড়িয়ে দেবেন। বিশ্ব প্রেমের আবহ তৈরির প্রয়োজনে তাঁর লেখনি ক্ষুরধার অথচ মায়াময়। সৃষ্টির প্রেম থেকে কীভাবে স্রষ্টার প্রেমে উত্তরণ ঘটানো যায়, সেই পথ বাৎলে দিয়েছেন তিনি এই অধ্যায়ের কাহিনীগুলোয় কবিতার পসরা সাজিয়ে।

চতুর্থ অধ্যায় : বিনয় প্রসঙ্গে
বিনয়ী জীবন বলতে কী বুঝায়, বিনয় মানুষকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যায়, বিনয় কার জন্য শোভন, কার জন্য অশোভন সেসব সূক্ষ্ম তত্ত্ব ব্যক্ত হয়েছে এ অধ্যায়ে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মানব জীবনকে সুন্দর সুষমামন্ডিত করতে হলে চলনে বলনে থাকতে হবে বিনয়।

পঞ্চম অধ্যায় : সন্তুষ্টি প্রসঙ্গে
মানব জীবনের সৌন্দর্যের প্রধানতম অলঙ্কার তাওয়াজু বা বিনয়। বিনয়ের মধ্য দিয়ে আল্লাহর প্রতি সমর্পিত জীবনের মহিমা প্রকাশ পায়। এই সৌন্দর্যগুলো তিনি গল্প আর গল্পের আসরে আমাদের কাছে বলে গেছেন অসাধারণ কাব্যরসের একেক আসরে।

ষষ্ঠ অধ্যায়: অল্পেতুষ্টি প্রসঙ্গে
ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনায় যে ধরনের জীবন গড়ার তাগিদ দেওয়া হয় তাতে থাকে বিনয়, সন্তুষ্টি ও অল্পেতুষ্টি। শেখ সাদী আধ্যাত্মিক আবহে নির্লোভ অল্পেতুষ্টির জীবনে কী সুখ ও শান্তি নিহিত তার মহিমা গেয়েছেন এই অধ্যায়ে।

সপ্তম অধ্যায় : শিক্ষার জগৎ প্রসঙ্গে
শিক্ষাই মানব জীবনকে উন্নত ও মহিমান্বিত করে, এই সত্যটি দুনিয়ার সবাই বিশ্বাস করে। তাই দেশে দেশে জাতিতে জাতিতে এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মনুষ্যত্বের উন্নয়ন সাধন করে প্রকৃত সোনার মানুষ বানানোর শিক্ষা কোনটি শেখ সাদী গল্পের আসরে তার পথ ও প্রক্রিয়া বাৎলে গেছেন মানব জাতির উদ্দেশে। জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মহিমা নিয়ে দুনিয়ার তাবৎ মনীষীদের নির্দেশনা দিয়েছেন তাঁদের রচনায়। ইমাম গাযযালী ‘নাসিহাতুল মুলক’ গ্রন্থে দুটি অধ্যায় বরাদ্দ করেছেন শিক্ষা দীক্ষা ও মনীষীদের প্রজ্ঞার আলোচনা নিয়ে। শেখ সাদীর অপর গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ কিতাবের সপ্ত অধ্যায়টির আলোচ্য বিষয়ও হচ্ছে তারবিয়াত বা শিক্ষা ও দীক্ষা। শেখ সাদীর শিক্ষা দর্শনের মূল কথা নিজের ও অন্যের অধিকার চিনতে হবে। ভুলত্রুটি ও দোষখাতা বর্জন করার প্রেরণা থাকতে হবে। এই পথে মানুষ নিজেকে চিনবে আর আত্মপরিচয়ের সূত্র ধরে আপন স্রষ্টাকে চিনবে আর স্রষ্টার তরফ হতে অর্পিত নিজের দায়িত্ব পালনে যত্নবান হবে।

অষ্টম অধ্যায় : সুস্থতার শোকরিয়া প্রসঙ্গে
পৃথিবীতে মানুষকে দেওয়া আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত সুস্থতা। সুস্থ থাকতে হলে এর গুরুত্ব বুঝতে হবে। তখনই মানুষ সুস্থতার পক্ষের বিষয়গুলো অর্জন আর বিপক্ষের বিষয়গুলো বর্জনে যত্নবান হবে। কাজেই মানুষ যেন সুস্থতার জন্য নিয়ত মহান আল্লাহ দরবারে কৃতজ্ঞ থাকে। তার কথা ও আচরণে সেই শোকরিয়া ও কৃতজ্ঞতা বোধের প্রকাশ ঘটে কবিতার ছন্দে সাদী সেই প্রেরণার সুর তুলেছেন মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে।

নবম অধ্যায় : তওবা ও সঠিক পথ প্রসঙ্গে
তওবা ও পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনার মধ্য দিয়ে মানুষ কীভাবে সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারে সেই আবেদন নিয়ে শেখ সাদী তাঁর ‘বূস্তান’-এর নবম অধ্যায় সাজিয়েছেন।

দশম অধ্যায় : মোনাজাত প্রসঙ্গে
‘বূস্তান’-এর দশম অধ্যায়ের বিষয়বস্তু আল্লাহর দরবারে হৃদয়কাড়া আর্তি আর্জি।
পরিশেষে কিতাবের সমাপনীতে শেখ সাদীর অনুভূতি, সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহর। তাঁর রচনার পরতে পরতে আল্লাহরই অনুগ্রহ ও দয়ার প্রকাশ।

আমাদের দেশে আধ্যাত্মিক সাধনা বলতে বুঝায় দুনিয়ার ঝক্কি ঝামেলা দূরে ঠেলে মসজিদে খানকায় বসে তপজপ করা। এক শ্রেণির মানুষের ধারণা দুনিয়াকে বর্জন না করলে আধ্যত্মিক উন্নতি সম্ভব হবে না। এই মতবাদে আক্রান্তরা এতদিনের ঘরসংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় দায়িত্ব ত্যাগ করে সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধর্মীয় জীবনের জন্য আত্মঘাতি এমন সিদ্ধান্তকে মনে করে প্রচন্ড ধার্মিকতা আর মোক্ষ লাভের সোপান। শেখ সাদী একটি কবিতায় এই মতবাদ খন্ডন করে যে মন্তব্যটি করেছেন তা আমাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মহলের জন্য পথের দিশা। বলেছেন,
‘তারীকাত বজুয খেদমতে খালক নীস্ত
ব তাসবীহ ও সাজ্জা’দা ও দালক নীস্ত’
অর্থাৎ ‘সৃষ্টির সেবা ছাড়া সিদ্ধি নাই তরিকায়
নহে তসবীহ, জায়নামায ও আলখেল্লায়।’

বুস্তান, ১ম অধ্যায়, ৯নং হেকায়তের পুরো কবিতাটির অনুবাদ এখানে তুলে ধরছি।
আগেকার দিনের বাদশাহদের কাহিনীতে আছে,
পারস্য-রাজ তাকলা যখন বসলেন সিংহাসনে।
শান্তিতে জনগণ কারো ক্ষতি কেউ করে না দেশে,
সবাইকে ছাড়িয়ে অগ্রণী তিনি একা এই কীর্তিতে।
এক দরবেশের কাছে গিয়ে একদিন বললেন রাজা,
আমার এ জীবন কেটে গেল হুযুর নিষ্ফল, অযথা।
হতে চাই নিমগ্ন ইবাদত-বন্দেগিতে একাগ্রভাবে,
জীবনের বাকি কয়দিন কাটে যেন সৎভাবে।
এই প্রতিপত্তি, রাজত্ব ও সিংহাসন যখন চলে যাবে
জগতের সম্পদ যাবে না সাথে, নিঃস্বই যেতে হবে।
আলোকিত-হৃদয় দরবেশ শুনে তার কথা
তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বললেন, থামো তাক্লা।
‘সৃষ্টির সেবা ছাড়া সিদ্ধি নাই তরিকায়
নহে তসবীহ, জায়নামায ও আলখেল্লায়।’
তুমি সমাসীন থাক তোমার রাজ সিংহাসনে
তবে পূতঃচরিত্রে হও সজ্জিত দরবেশি গুণে।
সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতায় উদ্যোগী হও,
বড়বড় বুলি, আস্ফালন হতে মুখ সামলাও।
তরিকত সাধনায় বুলি নয়, চেষ্টাই চাই,
বিনা চেষ্টায় এখানে আস্ফালনের মূল্য নাই।
বুযুর্গগণ, যারা সজ্জিত ছিলেন স্বচ্ছতার সম্পদে
এই উত্তরীয় শোভিত ছিল তাদের আচকানের নিচে।
এলমে তাসাউফ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে সমাজে এক শ্রেণির লোকেরা তাসাউফ বা তরিকতকে ইসলামের বিকল্প হিসেবে চিন্তা করে। তাঁরা এমনভাবে কথা বলেন যেন তাসাউফ আলাদা একটি ধর্ম। কিন্তু এলমে তাসাউফ বা সুফিবাদ ইসলামের বিকল্প হিসেবে হতে পারে না। ইসলামে আধ্যত্মিকতা একটি আত্মিক চেতনা, ইসলামের সৌন্দর্য।

হাদিসে ‘ইহসান’ শব্দের মধ্যে এর ইঙ্গিত রয়েছে। ইহসান এর মূল ধাতু হাসান। হাসান অর্থ সুন্দর। বাবে ইফআলে গিয়ে ব্যাকরণের রূপান্তরে ইহসান মানে সাজসজ্জা, অলঙ্করণ। ইংরেজিতে বললে ‘ডেকোরেশন’। এ কথাগুলো চিন্তা না করে কুরআনে বর্ণিত তাযকিয়া ও হাদিসের পরিভাষা ইহসানকে সুফিবাদ নামে ইসলাম থেকে আলাদা একটি মতবাদ হিসেবে যারা দাঁড় করাতে চান তাঁরা নিঃসন্দেহে বিভ্রান্ত। এদের পথ-মত-চিন্তা ভ্রান্ত। শেখ সাদী (রহ.) এ কথাটি কবিতার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন মোহনীয়ভাবে। তার এই উক্তি কাল থেকে কালান্তরে ইসলামের আধ্যাত্মিক সাধনার পথের মাইল ফলক। শেখ সাদীর বলিষ্ঠ উচ্চারন
‘খেলা’ফে পায়াম্বার কেসী রাহ গোযীদ
কে হারগেয বেমানযেল না খা’হাদ রেসীদ’
অর্থাৎ ‘পয়গম্বরের পথ ভিন্ন অন্য পথে যে গেছে
কক্ষণো সে পৌঁছবে না মনজিলে মকসুদে’
সুতরাং সাধনার পথ হতে হবে নবীজির অনুসৃত পথের অনুকীর্তি। এ ছাড়া আর যত পথ মত সব বিভ্রান্তি।

শেখ সা‘দী, বুস্তান, জাভিদান প্রকাশনা সংস্থা, তেহরান, ১৩৬৬ (১৯৮৭ ইংরেজি) থেকে সংকলিত

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here