শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সি আর দত্তকে চিরবিদায়

0
154

দেওয়ানবাগ ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম সি আর দত্তের শেষকৃত্য দেশের মাটিতেই সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ফুলেল ভালোবাসায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা জানান এই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে সবাই বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীন দেশেও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সক্রিয় ছিলেন আজীবন। আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার; সেখানে সি আর দত্তের আদর্শ সামনে রেখে এগোলে এক দিন তা বাস্তবায়িত হবেই।’ গত মঙ্গলবার সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুরে সবুজবাগের রাজারবাগ শ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সি আর দত্তের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সি আর দত্তের মরদেহ শ্মশানে পৌঁছালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। সেখানে এই বীর সেনানির প্রতি সম্মান জানান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলাম।

অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন ৪ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার। তিনি ছিলেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। গত ২৫ আগস্ট ফ্লোরিডার একটি হাসপাতালে মৃত্যু হয় ৯৩ বছর বয়সি এই সেক্টর কমান্ডারের। গত সোমবার তার মরদেহ যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে পৌঁছার পর রাখা হয় ঢাকা সিএমএইচের হিমঘরে। গত মঙ্গলবার সকালে পরিবার ও স্বজনদের শেষ দেখার জন্য কফিন নেওয়া হয় তার বনানী ডিওএইচএসের বাসায়। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৮টার দিকে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত সি আর দত্তের কফিন নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে। জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মান। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে। ঢাকার জেলা প্রশাসক শহীদুল ইসলামের উপস্থিতিতে এই মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানো হয়।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সি আর দত্তকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন তার বন্ধু, সহযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষ। এসেছিলেন বিভিন্ন দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সি আর দত্তের ছেলে চিরঞ্জিত দত্ত, মহুয়া দত্ত, চয়নিকা দত্ত ও কবিতা দাশগুপ্ত।

সি আর দত্তের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি কে এম শফিউল্লাহ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন, বিএমএ সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য খ ম জাহাঙ্গীর, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ। মিলন কান্তি দত্তের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ, শৈলেন নাথ মজুমদারের নেতৃত্বে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি সি আর দত্তের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

এছাড়াও একে একে সি আর দত্তের মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোট, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ শিক্ষক ঐক্য পরিষদ, লালবাগ পূজা থানা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষ।

সি আর দত্তের ছেলে চিরঞ্জিত দত্ত ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাবার স্বপ্ন ছিল এক অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। তিনি সারা জীবন সে লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন।’ বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘দেশের প্রতি তার নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম ছিল অতুলনীয়।’

প্রসঙ্গত, সি আর দত্তের জন্ম ১৯২৭ সালের পহেলা জানুয়ারি আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here