শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় নজরুলকে স্মরণ

0
20


মানবতার কবি এবং বাঙালির চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র যিনি এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। তিনি বাঙালির অসম্প্রদায়িক চেতনার কবি। নিজেকে সব ধর্মের উর্ধ্বে রেখে হামদ, নাতসহ ইসলামি সংগীতের পাশাপাশি শ্যামা ও কীর্তনেও রেখে গেছেন নিজের কীর্তির ছাপ।


গত ১২ ভাদ্র, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৭ আগস্ট শুক্রবার জাতীয় কবির ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকীতে কবিকে ফুলেল শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে সর্বস্তরের জনসাধারণ ও সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। শ্রদ্ধার ফুলে সমাধিসৌধকে ঢেকে দিয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অনন্য নজির স্থাপন করেছে শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী, পরিবারের সদস্য, স্বজনও ভক্তরা। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে স্মরণ করেছে কবিকে।


সময় কখনো সুস্থির ছিল না। বিশ্বাসে, বোধে, সম্প্রদায়ে, গোত্রে অনাদিকাল থেকে মানুষ বিভক্ত। এই বিভক্তিই মানুষকে, সমাজকে, জনপদকে, সভ্যতাকে সুস্থির থাকতে দেয় না। একদল মানুষের এই বিভক্তির সুযোগকে কাজে লাগিয়েছে আরেক দল সুযোগসন্ধানী মানুষ। এমন নয় যে মানুষে মানুষে বিভক্তির যে রক্তস্রোত, যে ঘৃণা, যে বিদ্বেষ, তা এসে ঘটিয়ে গেছে অন্য কোনো গ্রহের প্রাণিকুল। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ আফগানিস্তান জনপদ। ইউরোপ, আমেরিকা সুদীর্ঘকাল আফগান জনপদ নিয়ন্ত্রণে রেখে আফগানদের মধ্যে ঐক্যের কোনো সুতো গেঁথে দেয়নি। উল্টো মানুষে মানুষে বিরোধ, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, ধর্মে, গোত্রে, সংস্কৃতিতে বিষবাষ্প আরো ঘনীভূত করে দিয়েছে। পশতুন, হাজারা সম্প্রদায়সহ অন্য সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ধর্মের আড়ালে সন্দেহের, ঘৃণার বীজ রোপণ করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এমন উদাহরণ শত শত রয়েছে।


আবার মানুষের, সভ্যতার, ধর্মের, গোত্রের, সংস্কৃতির এই অবমাননার কষ্ট জগতের বহু অসামান্য মহান মানুষ অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। মুক্তির পথ খুঁজেছেন। জীবন-সৃজন উৎসর্গ করে গেছেন তাঁরা মানুষে মানুষে ভালোবাসা, গোত্রে গোত্রে সম্প্রীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মেলবন্ধন রচনায়। তাঁদের সেই সৃজনকর্ম যুগ যুগ ধরে বিশ্বমানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছে। সংস্কৃতির ভাঙা সেতুতে জোড়া লাগিয়েছে। মানুষের হারানো বিশ্বাসে নির্ভরতার নতুন রংধনু এঁকে দিয়েছে।


কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এসব সৃজন মহান মানুষের অন্যতম। ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তিনি লিখেছিলেন: ‘হিন্দুনা ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন,/কান্ডারি বল ডুবিয়ে মানুষ সন্তান মোর মার’; রাজনৈতিক নেতাদের আপসকামী মনোভাব দেখে ডাক দিয়েছিলেন: ‘ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়’; শাস্ত্রধারীদের বাড়াবাড়ির প্রতিবাদে লিখেছিলেন: ‘মানুষ এনেছে গ্রন্থ/গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।’


প্রসঙ্গগুলোর অবতারণা করা হলো এ কারণে, আমাদের এই জনপদে বর্তমানে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? এর জবাবে বলা যায়, বিশ্বজুড়ে যত দিন ধর্ম এবং সংস্কৃতিকে আলাদা করে দেখা হবে না, তত দিন নজরুল শুধু আমাদের জনপদে প্রাসঙ্গিক নন, বিশ্বজুড়েও প্রাসঙ্গিক। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বমিডিয়ায় বিপুলভাবে প্রচার পাচ্ছে নারীর অধিকার ভূলুণ্ঠনের বিষয়টি। অথচ নজরুল সেই কবে তাঁর ‘নারী’ কবিতায় উচ্চারণ করেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। ধর্ম মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করে আর সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে তৈরি করে আনন্দ। একবিংশ শতকে এসে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে গৃহবন্দি করে রাখা, সমাজ গঠন থেকে দূরে রাখা বড্ড বেমানান।


ইউরোপ, আমেরিকার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের ওপর বর্তমানে যে চীন প্রভাববলয় তৈরি করছে, সেই চীনে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের গ্রন্থরাজি বিপুল জনপ্রিয়। এই দুই কবির গ্রন্থরাজি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ করা হয়েছে। চীনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতকালীন কিংবা গ্রীষ্মকালীন লম্বা ছুটিতে শিক্ষার্থীদের বিশ্বের অন্য মহান লেখকদের গ্রন্থের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গ্রন্থ পাঠ করতে দেওয়া হয়। এই গ্রন্থগুলো পাঠ্যপুস্তক না হলেও শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের অনেক কাজের সঙ্গে এই গ্রন্থ পাঠকেও বিশেষ গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। এটি ভীষণ আনন্দের, চীনের শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবির গ্রন্থ পাঠ করছে, যিনি আবার এই বাংলার অর্থাৎ আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।


আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষার সঙ্গে জড়িতদের মূল স্রোতে টেনে আনতে এমন উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কও আছে অনেক। তবে একটি কথা বলা যায়, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ওই শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতির শিক্ষাও দেওয়া জরুরি। এর জন্য নজরুলের সৃষ্টি কর্মের বিকল্প নেই। নজরুলের সৃষ্টি কর্ম, বিশেষ করে কবিতা ও গান বাংলা ভাষার শুধু নয়, আমাদের এই জনপদের অসামান্য অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অবিনশ্বর সম্পদ। ধর্মের বাধ্যবাধকতা আর সংস্কৃতির উন্মুক্ত আচার পাশাপাশি সহাবস্থানে থাকলে মানুষেরই জয় হয়। নজরুল সারা জীবন মানুষের সেই জয়গানই গেয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here