শয়তানের প্রকারভেদ

0
136

শয়তান মূলত দুই প্রকার। যথা ১। অদৃশ্যমান শয়তান ও ২। দৃশ্যমান শয়তান।
অদৃশ্যমান শয়তান হলো শয়তান প্রবৃত্তিতে প্রভাবিত নফ্সে আম্মারা। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে “ইন্নান নাফসা লাআম্মারাতুম বিসসূই।” অর্থাৎ- নিশ্চয় নফ্সে আম্মারা (মানুষের জীবাত্মা) মন্দ কাজেরই প্ররোচনা দিয়ে থাকে। (সূরা ইউসুফ ১২: আয়াত ৫৩) আর এ অদৃশ্যমান শয়তান, যা মানুষের নফ্সে সক্রিয় থাকে; এ শয়তান প্রসঙ্গে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই শয়তান নিযুক্ত রয়েছে। এ কথা শ্রবণ করে সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনার সাথেও কি আছে? আল্লাহর রাসুল (সা.) বললেন হ্যাঁ, আমার সাথেও। তবে মহান আল্লাহ্ আমাকে সাহায্য করেছেন, ফলে শয়তান আমার অনুগত হয়ে গিয়েছে। সে কেবল ভালো কাজেরই পরামর্শ দিয়ে থাকে।” (বোখারী ও মুসলিমের সূত্রে তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১২)


অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “আমার শয়তান আমার হাতে মুসলমান হয়ে গিয়েছে।” (তাফসীরে জিলানী ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে শাকীক (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসুল (সা.) এরশাদ করেন “প্রতিটি মানুষের ক্বালবে দুটি করে কক্ষ রয়েছে। তার একটিতে শয়তানের অবস্থান, আর ক্বালবের অন্য কক্ষটিতে ফেরেশতা অবস্থান করে। যখন মানুষের ক্বালবে আল্লাহর জিকির জারি হয়, শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়। আর সে যখন আল্লাহর জিকির থেকে বিরত হয়, তখন শয়তান ক্বালবের ভেতর কুমন্ত্রণা দিতে থাকে।” (তাফসীরে মাজহারী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৮)


সুতরাং ষড়রিপুযুক্ত মানুষের পক্ষে নিজে নিজে সুপথে পরিচালিত হওয়া কঠিন। কারণ কু-রিপুসমূহ সাধারণত অসংযমী। অসংযমী রিপুসমূহকে কুপথ থেকে ফিরিয়ে রাখার জন্য অলী-আল্লাহগণের পরিশুদ্ধ আত্মা থেকে ফায়েজের শক্তির সাহায্য নিতে হয়। অন্যথায় অসংযমী রিপুসমূহ কুপথে ধাবিত হলে নফস অসংযমী হয়ে শয়তানের কাজ করে মানুষকে মন্দ কাজের দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য বলা হয় “যার পির বা মোর্শেদ নেই, তার পির শয়তান।” (সূফী দর্শন, পৃষ্ঠা ৩৯)


প্রকৃতপক্ষে কু-রিপুর তাড়নাযুক্ত নফ্সকে ‘নফস শয়তান’ বলে। আর এটিই অদৃশ্যমান শয়তান, যা লোকচক্ষুর অন্তরালে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে। অন্যদিকে দৃশ্যমান শয়তান হলো নফস শয়তানের প্ররোচনায় মানুষ ক্রমাগত মন্দ কাজ করতে করতে নিজেই শয়তানে পরিণত হয় এবং অন্য লোককে মন্দ কাজে প্ররোচনা দেয় ও ভালো কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। অন্যকে কুপ্ররোচনা দাতা এরূপ ব্যক্তিই মানুষ শয়তান, অর্থাৎ দৃশ্যমান শয়তান।
আল্লাহ বলেন “আমি মানুষ শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবির শত্রু করেছি।” (সূরা আল আন‘আম ৬: আয়াত ১১২) এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আন‘আম (রহ.) হতে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন “মানুষ হচ্ছে তিন প্রকার। যথা (১) প্রথম প্রকার হচ্ছে যাদেরকে আল্লাহ কিয়ামত দিবসে তাঁর আরশের ছায়া দেবেন। (২) দ্বিতীয় প্রকার মানুষ হচ্ছে পশুর ন্যায়, বরং তার চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট। (৩) আর তৃতীয় প্রকার মানুষ হচ্ছে আকৃতিতে মানুষ হলেও তারা অন্তরের দিক থেকে শয়তান।” (তাফসীরে দূররে মানছুর ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১)


নফস শয়তান ব্যক্তির উপর ক্রিয়া করে ব্যক্তিকে মন্দ স্বভাবযুক্ত করে, অর্থাৎ এটি ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর। পক্ষান্তরে মানুষ শয়তান অন্য মানুষকে মন্দ স্বভাবযুক্ত করে সমাজের ক্ষতি করে। এই হিসেবে মানুষ শয়তান অধিকতর ভয়ঙ্কর। এ জাতীয় মানুষ শয়তান প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন “ইন্নাশ শাইত্বানা ইয়ানঝা‘উ বাইনাহুম, ইন্নাশ শাইত্বানা কানা লিলইনসানি ‘আদুওয়্যাম মুবীনা।” অর্থাৎ- নিশ্চয় শয়তান তাদের (আমার বান্দাদের) মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উস্কানি দেয়; শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭: আয়াত ৫৩)


আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকারী মানুষকে জিন জাতির উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যে সমস্ত জিন অলী-আল্লাহর আনুগত্য করে না, তারা জিন শয়তান বা ইবলিশ। বর্ণিত আছে, মানুষ যেমন সন্তানের জন্ম দেয়, তদ্রুপ ইবলিস শয়তানও সন্তান জন্ম দেয়। ইবলিসের সন্তানদের প্রসঙ্গে হযরত মুজাহিদ (রহ.) বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন “এই ক’জন শয়তান হলো ইবলিসের বংশধর। যথা লাকীন ও ওয়ালাহান পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে ও নামাজে এ শয়তান কুমন্ত্রণা সৃষ্টি করে। হাফফাফ, মুররাহ ও যালানবুর, এদের কাজ হলো হাট-বাজারে মানুষকে অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে প্ররোচিত করা, মিথ্যা শপথ করা এবং পণ্যের মিথ্যা প্রশংসা করতে উদ্বুদ্ধ করা। আওয়ার-এর কাজ হলো ব্যভিচার করতে উৎসাহিত করা। এ শয়তান পুরুষ ও নারীর লজ্জাস্থানে ফুঁক মেরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে থাকে। মুতাওবিস-এর কাজ হলো মানুষের মুখে মুখে মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো, যে সংবাদের কোনো ভিত্তি নেই। ইয়াসূর-এর কাজ হলো মানুষের বিপদ সংঘটিত করা, তাদের মুখমণ্ডলে আঘাত করা, ক্ষত সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে বস্ত্রহীন করে দেয়া এবং দাসিম-এর কাজ হলো যখন কোনো ব্যক্তি আল্লাহর জিকির ও সালাম দেওয়া ব্যতীত ঘরে প্রবেশ করে, তখন এ শয়তানই তাকে তার ঘরের সব আসভাবপত্রকে এলোমেলো করে দেখায়। আর সে যখন বিসমিল্লাহ বলা ব্যতীত আহার শুরু করে, তখন ঐ শয়তান তার সাথে আহার করতে শুরু করে।” (তাফসীরে মাজহারী ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৯০)


তবে উল্লিখিত হাদিস ইবলিস শয়তান ও তার সন্তানদের কর্মপ্রণালীর যে বিবরণ উল্লেখ করা হলো, এ সকল শয়তানই জিন শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। আর জিন শয়তানও অদৃশ্য শয়তানের অন্তর্ভুক্ত। অধিকন্তু মহান আল্লাহ জিন শয়তান ছাড়াও নফস শয়তান ও মানুষ শয়তানের অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন “হে রাসুল (সা:)! আপনি বলুন, আমি মানুষের একমাত্র প্রতিপালক, মালিক ও উপাস্য আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তার অপকারিতা থেকে, যে মানুষের অন্তরে আত্মগোপন করে কুমন্ত্রণা দেয়, আর প্ররোচনা দানকারী জিন হতে ও মানুষ হতে।” (সূরা আন নাস ১১৪: আয়াত ১ থেকে ৬)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here