সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে দেশ

0
292

অনলাইন ডেস্ক: সারাদেশে অঘোষিত লকডাউনে শিথিলতার সুযোগে অসচেতন মানুষের অসর্তক চলাফেরা, রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলো সুরক্ষিত রাখতে না পারা এবং করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বসহ নানা কারণে গত কয়েক সপ্তাহে সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই উচ্চ হারে বেড়েছে, যা আগামী তিন সপ্তাহ আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ হিসাবে জুনের মাঝামাঝিতেই দেশে করোনা সংক্রমণ চূড়ান্ত (পিক) পর্যায়ে পৌঁছবে। সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ক্ষেত্রে সার্বিক সতর্কতা ব্যাপকভাবে বাড়ানো না হলে এ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। বহির্বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে করোনা সংক্রমণের পরিসংখ্যান ও গতিচিত্র এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বিশ্লেষকরা এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন।

করোনা সংক্রমণের গ্রাফ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পহেলা মে থেকে ৯ মে পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৪০০ জন এ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। এ হিসেবে প্রতি ৫ মিনিটে সংক্রমিত হয়েছে ২ জন। অথচ এর মাত্র ৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৮ মে ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৬০২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত করা হয়। অর্থাৎ প্রতি এক মিনিটে একজনের বেশি মানুষ করোনায় সংক্রমিত হয়েছে। এ হিসেবে ৫ মিনিটে করোনায় সংক্রমিত হচ্ছে ৫ জন।

মাত্র ৯ দিন আগের রোগীর সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, প্রতি ৫ মিনিটে ৩ জন করে বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ২৪ ঘণ্টায় আগের চেয়ে অতিরিক্ত রোগী শনাক্ত হচ্ছে ৮৬৪ জন।
ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত করা হয় ৩০ জানুয়ারি। সংক্রমণের নবম সপ্তাহ শেষে দেশটিতে মোট আক্রান্ত ছিল ২ হাজার ৯০২ জন। মারা গিয়েছিল ৫০ জন। একই সময় অর্থাৎ নবম সপ্তাহ শেষে বাংলাদেশে আক্রান্ত ছিল ১৩ হাজার ৭৭০। এর মধ্যে ২১৪ জনের মৃত্যু হয়। তবে এরপর মাত্র দু’সপ্তাহ না ঘুরতেই অর্থাৎ একাদশ সপ্তাহে ভারতে সংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৭৫৯ জনে। মারা যায় ৪২০ জন। অথচ বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে একাদশ সপ্তাহ অর্থাৎ ১৭ মে পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ২৬৮ জন, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার বেশি।

দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের বৈশিষ্ট্যগত মিল এবং দুই দেশেই একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করায় করোনার বিস্তার এবং এর গতিবিধি প্রায় একই রকম হওয়ার কথা। বরং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জনসংখ্যার হার তুলনা করলে দেশে এ মরণব্যাধিতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কম হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। অথচ প্রথম ১১ সপ্তাহে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার যেভাবে এগিয়ে থেকেছে, এ গতি অব্যাহত থাকলে আগামী দুই-তিন সপ্তাহ পরই পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হবে তা ভারতের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। গতকাল পর্যন্ত ভারতে আক্রান্ত ছিল ১ লাখ ১ হাজার ২৬১ জন এবং মৃতের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১৬৪ জন। এ দেশটিতে পরীক্ষাও হয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদকে সামনে রেখে মার্কেট, বিপণিবিতান ও শপিংমলসহ অন্যান্য দোকানপাট খুলে দেওয়ার পর পথঘাটে অসচেতন মানুষের অসতর্ক চলাফেরা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেচাকেনার ক্ষেত্রেও সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে বিভিন্ন যানবাহনের গাদাগাদি করে ঘরমুখো মানুষের ঢল করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ওপর রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও টঙ্গীসহ বিভিন্ন স্থানে বকেয়া বেতন আদায়ে গার্মেন্টকর্মীদের আন্দোলন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়ম না মেনে গত কয়েক দিনে সারা দেশে যেভাবে ঈদ কেনাকাটা, ঘরমুখো যাত্রা ও শ্রমিক আন্দোলন হয়েছে তাতে করোনা সংক্রমণের হার নিঃসন্দেহে কয়েকগুণ বাড়বে, যা আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই টের পাওয়া যাবে। তবে দেশে এখনো যে হারে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাতে তাদের সবাইকে চিহ্নিত করা যাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের শনাক্ত করা কতটা সহজ হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারীদের আশঙ্কা, আগামীতে নমুনা পরিধি ১০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও রোগী শনাক্তের হার মে মাসেই আরও ৪ থেকে ৫ শতাংশ বেড়ে তা শিগগিরই ২০ এ এসে দাঁড়াবে। অর্থাৎ সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ন্যূনতম দুই হাজারে গিয়ে ঠেকবে। জুনের শুরু থেকে মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত তা ক্রমান্বয়ে আরও বেড়ে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছবে। এ সময় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত রোগীর ৩ থেকে ৪ হাজার কিংবা আরও বেশি হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পর্যবেক্ষণকারীরা।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মার্কেট খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ঈদ কেনাকাটা ও ঘরমুখো যাত্রা নিয়ন্ত্রণের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথেষ্ট বিলম্ব ঘটেছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মার্কেট খুলে দেওয়ার ঘোষণা শুনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দোকানমালিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে ছুটে গিয়েছেন। অথচ পরে বেশকিছু মার্কেট না খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেশকিছু মার্কেটে দোকান খুললেও এক-তৃতীয়াংশ কর্মচারীকে কাজে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। ফলে তারা বাধ্য হয়ে আবার গ্রামের দিকে ছুটেছে। এতে ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের ভিড় বেড়েছে। অথচ প্রথম দিকে সে দিকে কেউ নজর না দিলেও শেষ সময়ে এসে আকস্মিক তাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতে একদিকে বিড়ম্বনা যেমন বেড়েছে, তেমনি সংক্রমণের ঝুঁকিও এখন ঊর্ধ্বমুখী। কেননা ঘরমুখো যাত্রায় পথে পথে বাধা পেয়ে মানুষ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে গার্মেন্টে খুলে দেওয়ার আগে শিল্প কারখানার মালিকদের শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা মনিটরিং না করায় শেষ সময়ে এসে নানা বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। গার্মেন্টের ভেতরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে শ্রমিকরা কাজ করলেও বকেয়া বেতন আদায়ের আন্দোলনে তারা গাদাগাদি করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় অবস্থান করছে। তাদের ঠেকাতে র‍্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও তাদের ভিড় মিশতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সেখানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়েছে।

এদিকে করোনার রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত অধিকাংশ এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করে এর সীমান্তের দৃশ্যমান পাহারা জোরদার করা হলেও গত ২৬ এপ্রিল দেশের পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার পর শ্রমিক আসা-যাওয়ার যে চিত্র দেখা গেছে তাতে এর লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, টঙ্গী ও ঢাকার রেড জোনগুলোর বিভিন্ন শিল্প কারখানায় যেভাবে শ্রমিক-কর্মচারীরা আসা-যাওয়া করেছে, তাতে সেখানকার লকডাউন বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আদৌও কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কিনা তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ২৬ এপ্রিল গার্মেন্ট খুলে দেওয়ার আগ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ থেকে বের হওয়া এবং সেখানে প্রবেশের বিষয়টি বেশ কড়াকড়ি থাকলেও ২৫ এপ্রিল থেকে কার্যত তা উধাও হয়ে গেছে। এ সুযোগে সেখান থেকে সুস্থ মানুষের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক করোনায় সংক্রমিত রোগীও নারায়ণগঞ্জ ছেড়েছে। গাজীপুর-কিশোরগঞ্জ-টঙ্গী ও সাভারসহ অধিক সংক্রমিত আরও বেশ কয়েকটি এলাকাতেও একই ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ক্ষেত্রে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যে অনিয়ম করা হয়েছে এর ফল ঈদের পরপরই অনেকটা হাতেনাতে পাওয়া যাবে। এছাড়া ঈদের পর ফের শ্রমজীবী মানুষের কর্মস্থলে ফেরার ঢল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ নজরুল ইসলাম বলেন, এপ্রিলের শেষ দিক থেকে পোশাক কারখানা এবং কিছু দোকানপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর দুই সপ্তাহ না যেতেই রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলার কারণে সংক্রমণের সংখ্যা বাড়বে-এটাই স্বাভাবিক। তবে এ ক্ষেত্রেও এটি হয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষজ্ঞ এই চিকিৎসকের ভাষ্য, সংক্রমণ এক সময় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে এবং পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও একই ঘটনা ঘটেছে। তবে জনসচেতনা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here